Bloggers
Freethinkers Under Threat

Freethinkers Under Threat

বাংলাদেশে মুক্তমনাদের অনিশ্চিত জীবন: নাস্তিক ও সেক্যুলার ব্লগারদের উপর মৌলবাদী নিপীড়ন

গত এক দশকে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে, বিশেষ করে নাস্তিক, সেক্যুলার ব্লগার, লেখক এবং মুক্তমনা চিন্তাবিদদের জন্য। এরা – যাদের অনেকেই “মুক্তমনা” নামে পরিচিত – ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে বারবার হুমকি, নিপীড়ন এবং নির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন। তাদের অপরাধ? তারা ধর্মীয় গোঁড়ামি বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের নানা অন্ধকার দিক, কুসংস্কার, বর্বরতা, বিজ্ঞান শিক্ষার বিপরীত অবস্থান এসবকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, যুক্তিবাদ ও মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন।

সেক্যুলার কণ্ঠের উত্থান

২০০৭ সালের দিক থেকে বাংলা ব্লগ কমিউনিটিতে এক নতুন সেক্যুলার আন্দোলনের সূচনা ঘটে। মুক্তমনা, সামহোয়্যার ইন ব্লগ, নাগরিক ব্লগসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে লেখক ও চিন্তাবিদরা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী আলোচনা শুরু করেন। তারা বিজ্ঞান, মানবাধিকার, নারী স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। এই অনলাইন লেখালেখি ধীরে ধীরে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে রূপ নেয়, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও যুক্তিবাদ ছিল কেন্দ্রবিন্দু।

এই কণ্ঠস্বর দ্রুতই মৌলবাদী গোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে। “নাস্তিক ব্লগারদের” তালিকা প্রকাশিত হয়, এবং তাদের গ্রেপ্তার বা হত্যার দাবিতে জনসমক্ষে আহ্বান জানানো হয়।

টার্গেট করে হত্যা ও নির্মমতা

এই সহিংসতার সূচনা হয় ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যার মাধ্যমে। তিনি শাহবাগ আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ও সেক্যুলার ব্লগার ছিলেন। তাকে তার বাসার সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা ছিল আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য, যারা আল-কায়েদা দ্বারা অনুপ্রাণিত।

এরপর এক ভয়াবহ ধারাবাহিকতা শুরু হয়। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে ঢাকা বইমেলা থেকে ফেরার পথে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার স্ত্রী রাফিদা বন্যা আহমেদ গুরুতর আহত হন। অভিজিৎ যুক্তিবাদ, বিজ্ঞান ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে লেখালেখি করতেন।

এর কয়েক সপ্তাহ পর, ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। এরপর সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশ এবং ঢাকায় নিলয় নীল – দুজনেই যুক্তিবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদবিরোধী লেখালেখির জন্য পরিচিত – নৃশংসভাবে খুন হন।

প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে একই কৌশল দেখা যায়: হামলাকারীরা প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। এই সহিংসতা শুধু শারীরিক নয়, আদর্শিকও। বার্তা ছিল স্পষ্ট – প্রতিবাদ করলে মৃত্যু অনিবার্য।

রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও নীরবতা

যদিও কিছু হত্যাকারীকে পরে গ্রেপ্তার ও দণ্ডিত করা হয়েছে, রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল ও দ্বিধাগ্রস্ত। অনেক সময় দেখা গেছে, সরকার ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি বেশি সংবেদনশীল, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চেয়ে। কিছু ক্ষেত্রে নিহতদেরই “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” দেওয়ার অভিযোগে দোষারোপ করা হয়েছে।

২০১৩ সালে সরকার কয়েকজন ব্লগারকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে। এই পদক্ষেপ মৌলবাদীদের উৎসাহিত করে এবং বাংলাদেশের সংবিধানে থাকা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির বিপরীত বার্তা দেয়।

বাংলাদেশের আইনগুলো ধর্মের সমালোচনাকারী, মুক্তমনা, হিউম্যানিস্ট, নাস্তিক, সেক্যুলারদের জন্য খুবই ভয়ংকর। এমনিতেই সমাজে তাদেরকে অপরাধী হিসাবে সাব্যস্ত করা হয়, দেশের আইনও তাদের বিপক্ষে। প্রায় সময় দেখা যায় এসব প্রচলিত আইনে মুক্তচিন্তকদের তাদের লেখা ও কথার কারনে গ্রেফতার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশই জনরোষ থেকে তাদের রক্ষার জন্য আগেভাগে গ্রেফতার করে বা গ্রেফতার করে মব তৈরি করা জনতাকে শান্ত করে।

উদাহরণস্বরূপ, দণ্ডবিধির অধ্যায় XV-তে ধর্ম সংক্রান্ত একাধিক অপরাধের বিধান রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে উপাসনাস্থল অপবিত্র করা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ব্যাহত করা এবং কবরস্থানে অনধিকার প্রবেশ। এই অধ্যায়ের একাধিক ধারা ব্যবহার করে নাস্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ধারা ২৯৫এ-তে বলা হয়েছে:

যে ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিকদের কোনো শ্রেণির ধর্মীয় অনুভূতিকে ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণভাবে আঘাত করার উদ্দেশ্যে, কথার মাধ্যমে – লিখিত বা মৌখিক – অথবা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে, সেই শ্রেণির ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করে বা অপমান করার চেষ্টা করে, সে ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

ধারা ২৯৮-এ বলা হয়েছে:

যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করার ইচ্ছাকৃত উদ্দেশ্যে, সেই ব্যক্তির শ্রবণে কোনো শব্দ উচ্চারণ করে বা কোনো শব্দ সৃষ্টি করে, অথবা সেই ব্যক্তির দৃষ্টিগোচরে কোনো অঙ্গভঙ্গি করে, অথবা কোনো বস্তু স্থাপন করে, সে ব্যক্তি সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

নির্বাসন, ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণ

হত্যার উদ্দেশ্যে প্রকাশ্য আক্রমন, হত্যার হুমকি ও নজরদারির মুখে অনেক মুক্তমনা লেখক দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। যেমন, বন্যা আহমেদ, আসিফ মহিউদ্দীন, আসাদ নূর, নূর নবী দুলাল, আকাশ মালিক, আজম খান, গোলাম সারোয়ার প্রমুখ এখন প্রবাসে থেকে তাদের লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা দেশে রয়ে গেছেন, তারা ছদ্মনামে লেখেন বা লেখালেখি বন্ধ করে দিয়েছেন।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রভাব সুস্পষ্ট। এক সময়ের প্রাণবন্ত অনলাইন কমিউনিটি এখন নিস্তব্ধ। ধর্ম, রাজনীতি ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা এখন অনেক বেশি সতর্ক। আত্মনিয়ন্ত্রণের এই সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক বিতর্কের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

আমার উপর আক্রমন

আমি যে মানবাধিকার, ধর্মের অন্ধকার দিক, নারী অধিকার, সমপ্রেমীদের অধিকার, বাক স্বাধীনতা, নারীদের পোশাকের স্বাধীনতা, বিজ্ঞান শিক্ষা নিয় টুকটাক লেখালিখি করি ও একটি সুন্দর সমাজের জন্য এক্টিভিজম করি তার জন্য আমাকেও সেই ২০১২ সাল থেকে হত্যার হুমকি নিয়ে চলতে হয়। ২০১৭ সালের মে মাসের ২৫ তারিখে আমার ভাড়া বাড়ির সামনে মৌলবাদীরা মব সৃষ্টি করে আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে জড়ো হয়ে উন্মাদনা তৈরি করেছিল। সে যাত্রায় আমি বেঁচে ফিরলেও এরপর একের পর এক হত্যার হুমকি নিয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর ফলে আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তৈরি করা স্টার্টআপ একেবারে থমকে যায়। ঢাকা শহর ছেড়ে ২০২২ সালে গ্রামে ফিরে গিয়েও রেহাই পাইনি। সেখানেও জুন মাসের ২১ তারিখে আমি মৌলবাদী আক্রমনের শিকার হই। এর প্রেক্ষিতে আমার হাত বিশেষ করে ডান হাত ভয়াবহ রকমের ক্ষতগ্রস্থ হয় যে যন্ত্রনা আমি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। কত রাত আমি হাতের যন্ত্রনায় ঘুমাতে পারিনি ঠিকমতো সেটা আমি জানি। দীর্ঘদিন থেরাপি নিয়ে কিছুটা উন্নতি হলেও আমি এখনো সেই ক্ষত ও যন্ত্রনার সঙ্গী।

আমাকে যেদিন আক্রমন করা হয় সেদিন আমি মুখেও কোন প্রতিবাদ করতে পারিনি। কারন বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে কাউকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে সাধারন মানুষ মব তৈরি করে তার উপর আক্রমন চালায় এর শত শত উদাহরণ আছে। লালমনিরহাট জেলায় এক স্কুল কর্মীকে পিটিয়ে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল ২০২০ সালে। সেখানে অংশ নিয়েছিল একেবারে সাধারন মানুষ বলে পরিচিত হাজার হাজার মানুষেরা। কোরান, ধর্ম বা নবী মোহাম্মদকে অবমাননার অভিযোগ তুললে হাজার হাজার জনতা অভিযুক্তের বিপক্ষে মারমুখী হয়ে যায়। আমি সেদিন সেখানে উপস্থিত দুজন সহৃদয়বান ব্যক্তির কারনে প্রাণে বেঁচে গেলেও আমাকে পরদিন ২২ জুন ২০২২ পাশের দেশ ভারতে চলে যেতে হয়েছিল। সেখানে দীর্ঘদিন থেকে প্রচন্ড অর্থকষ্টে ভুগে দেশে ফিরে রাতের আঁধারে গ্রামে ফিরে পরে বর্তমানের দেশে চলে এসেছিলাম। আঘাত করার পরে আমাকে জঙ্গি সন্ত্রাসীটি হুমকি দিয়েছিল পরের দিন মসজিদ থেকে শত শত লোক নিয়ে আমাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এসে পিটিয়ে মেরে ফেলবে, আমি যেখানেই থাকি আমাকে তারা খুঁজে বের করবে। সে আরো বলেছিল আমি সংখ্যায় একা, তারা হাজার হাজার। আসলেও তাই, আমরা যারা বাংলা ভাষায় ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লেখালেখি করি, যারা হিউম্যানিস্ট, সেক্যুলার, নাস্তিক তারা বাংলাদেশে খুবই সংখ্যালঘু, আমাদের পক্ষে কথা বলার মতো কেউ নেই।

এইতো কয়েক মাস আগে, এ বছরের (২০২৫) মার্চ মাসেরর ৯ তারিখ রাতে বাংলাদেশে আমাদের গ্রামের বাড়িতে একদল লোক ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। প্রথমে তারা পাঁচিলের মূল গেইট ধরে খুব জোরে ধাক্কা-ধাক্কি করে ও আমার নাম ধরে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে, আমাকে পেলে সেই জায়গায় জবাই করে হত্যা করবে বলে চিৎকার দেয়। বাইরে থেকে বাড়ির উপরে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে কিছুক্ষন পরে তারা সে স্থান ত্যাগ করে। উল্লেখ্য যে, আমাদের গ্রামের বাড়িতে কেউ থাকে না, ঘর-বাড়ি লোহার গেইট দিয়ে আটকানো। প্রতিবেশীদের ভাষ্য মতে, এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী হুজুরের অনুসারীরা উচ্চস্বরে গালি দেয় আর বলতে থাকে যে আমি ইসলামের দুশমন, মুরতাদ, নবীর দুশমন – শাতিম, ইসরায়েলের চর, সমকামীতা বিস্তারকারী – আমাকে হত্যা করা তাদের জন্য অবশ্য পালনীয়, আমি কেন তাদের নেতা ডক্টর এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীকে সমালোচনা করেছি, আমি কেন ইসরায়েলের জন্য লিখি, আমি কেন সমকামীদের অধিকারের পক্ষে লিখি। উল্লেখ্য, মৌলবাদীদের নেতা ও বাংলাদেশের প্রধান মুফতি দাবীদার (ডক্টর!) এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশ্য জনসভায় বলেন নবী ও আল্লাহকে সমালোচনা করা যদি কোন নাস্তিকের স্বাধীনতা হয়ে থেকে থাকে তবে তারা নিজ হাতে সেই নাস্তিকদের কল্লা কেটে নিবে – সেটাও তাদের হাতের স্বাধীনতা। প্রকাশ্যে এমন হুমকি দিলেও সরাকার তার কিছুই করেনি, বরং সরকার ও রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন সময়ে এই সমস্ত মৌলবাদীদের তুষ্ট করার জন্য নানান উদ্যোগ নেয়। তিনি এখনো প্রায় সময় এমন হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। জনাব আব্বাসী মার্চ মাসে নারীদের পোশাকের কারনে প্রকাশ্যে যৌন হেনস্তার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া এক যুবককে ছাড়ানোর জন্য পুলিশ স্টেশনে মব সৃষ্টি করেন ও সেই অভিযুক্তকে ফুলের মালা পরিয়ে মুক্ত করে আনেন।

আমি ০৩ মার্চ, ২০২৫ আমার সাইটে “ইসরায়েলের সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ঃ ঘৃণা, বাস্তবতা ও অধিকার” শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম, যেখানে আমি তথ্য উপাত্ত দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছিলাম যে ইসরায়েল সুখী মানুষের তালিকায় বিশ্বে ৮ম শীর্ষ দেশ, সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় বিশেষ করে মুসলমানরা সেখানে পরিপূর্ণ ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক অধিকার উপভোগ করেন। বাংলাদেশের সমাজে, বিশেষ করে মৌলবাদী, ধর্মান্ধদের কাছে ইসরায়েলের প্রশংসা করা, ইহুদীদের অধিকারের পক্ষে কথা বলাকে কারো অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাকে আঘাত করলে, এমনকি হত্যা করলেও সেখানে বেশীরভাগ মানুষ সেই হত্যাকারী, খুনিদের পক্ষ নেয়। মার্চ ৭, ২০২৫ এ আমি লিখেছিলাম “অন্ধ অনুসারীদের দোষ দেয়ার আগে আল্লাহ ও নবী মুহাম্মদকে কাঁঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবেন?” সেখানে বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের বিস্তার এবং তাদের দ্বারা হত্যা ও তান্ডবের কিছু কারন চিহ্নিত করেছিলাম। সেখানে জনাব আব্বাসীর হত্যার হুমকি দেয়া বয়ানের কোট, ভিডিও ও ছবি ছিল। এই দুটি লেখার কারনে সম্ভবত এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর সমর্থকেরা আমার গ্রামের বাড়িতে এ তান্ডব চালায়।

Mr. Abbasi freed the accused of sexual harassment by placing a flower garland

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে মুক্তমনা লেখকদের নিপীড়ন শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি দৃষ্টান্ত নয় – এটি জাতির আত্মার উপর এক গভীর ও বেদনাদায়ক আঘাত। ১৯৭১ সালে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ জন্ম নিয়েছিল একটি মুক্ত, বহুত্ববাদী, ভাষাভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যুক্তিবাদ, এবং মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র এবং মুক্তচিন্তার প্রতি শ্রদ্ধা। কিন্তু আজ যখন মুক্তমনা চিন্তাবিদরা ধারাবাহিকভাবে মৌলবাদী হামলার শিকার হন, তখন সেই চেতনা বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই হামলা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার উপর নয়, বরং জাতীয় আদর্শ ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের উপরও আঘাত হানে। যখন একটি রাষ্ট্র তার চিন্তাশীল নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন তা মৌলবাদ ও কর্তৃত্ববাদকে প্রশ্রয় দেয়, এবং একটি মুক্ত সমাজের পরিবর্তে ভয় ও নিপীড়নের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি আমাদেরকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে – আমরা কি সত্যিই সেই বাংলাদেশে বাস করছি বা করেছিলাম, যার স্বপ্ন আমাদের পূর্ব পুরুষরা দেখেছিল?

এই হামলা নিছক স্থানীয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ, যেখানে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও গোঁড়ামি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করতে চায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে – যেমন, পাকিস্তান, সৌদি আরব, ইরান, এমনকি ভারতের কিছু অংশেও – মুক্তচিন্তার লেখক, ব্লগার ও সাংবাদিকরা একই ধরনের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। আফগানিস্তানের কথা তো বাদই দেয়া যায়। তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে, নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে, কিংবা চুপ থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তি স্বাধীনতার বিপর্যয় নয়, বরং গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপরও হুমকি। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় – স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ, এবং চিন্তার অধিকার কতটা ভঙ্গুর, কতটা অনিরাপদ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি সমাজে মুক্তচিন্তা টিকে থাকার জন্য শুধু আইনি সুরক্ষা নয়, দরকার সামাজিক সচেতনতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

আশা ও প্রতিরোধ

সব ভয় ও নিপীড়নের মাঝেও অনেকেই এখনও প্রতিবাদ করছেন। PEN International, Reporters Without Borders, Human Rights Watch-এর মতো সংগঠনগুলো এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে এবং বিচার দাবি করেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা মুক্তমনা লেখকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দেশের ভেতরেও ছাত্র, শিল্পী ও কর্মীরা নীরবে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সেই সংখ্যা খুবই কম। আমি আগেই বলেছি, আমরা বাংলাদেশে সবচেয়ে সংখ্যালঘু। প্রায় প্রতি বছর বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে অনেক সনাতন হিন্দুদের বাড়িঘর লুট করা হয়, আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়, ভাংচুর চালানো হয়। এই অত্যাচারের প্রতিবাদ অনেকেই করেন, যেটা আরো জোরেসোরে করা দরকার। কিন্তু আমাদের যে জীবন সংশয়, জঙ্গিরা যে আমাদের ঘাড়ের পিছন থেকে কোপ দিয়ে কল্লা ফেলে দেয় – আমাদের রক্ষা করার জন্য কোন সংগঠন বাংলাদেশে বসে আমাদের অধিকারের পক্ষে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারে না। আমরা আসলে সেখানে খুবই অসহায় ও প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে থাকি।

এই কণ্ঠগুলোকে রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশকে আবার ধর্মনিরপেক্ষতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে যার কোন লক্ষন নিকট ভবিষ্যতে আছে বলে মনে হয় না। মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা আইন বাতিল করতে হবে। হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এবং সবচেয়ে জরুরি – অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি সামাজিকভাবে মানুষকে মুক্তমতের প্রতি সম্মান দেখানোর সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশের পরিস্থিতি হচ্ছেটা এর সম্পূর্ণ উল্টো।

শেষ কথা

বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংকটই নয়, বরং একটি বৃহত্তর আদর্শিক সংঘাতের প্রতিচ্ছবি – যেখানে যুক্তিবাদ ও মুক্তচিন্তা মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় উগ্রতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে। এই ভয়াবহ সহিংসতার মুখেও অনেক লেখক ও চিন্তাবিদ তাদের কণ্ঠস্বর থামিয়ে দেননি। তারা প্রমাণ করেছেন – চিন্তার শক্তি কখনও নিঃশেষ হয় না। একটি সমাজে যতদিন কেউ সত্য বলার সাহস রাখে, ততদিন স্বাধীনতার আলো নিভে যেতে পারে না। এই সাহসিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা শুধু আইনি দায়িত্ব নয়, এটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের অংশ। বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার এই সংগ্রাম চলমান, এবং তা জাতির ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Related Posts

Hijab is My Choice!

‘Hijab is my choice’ – the same people who make this claim in secular countries often force women to wear hijab in their own countries

Iranian singer Parastu Ahmadi has been sentenced to 74 lashes for the “crime” of performingRead More

Hijab is My Choice!

হিজাব ইজ মাই চয়েস – এই বুলি সেক্যুলার দেশে যারা দাবী করেন তারা নিজেদের দেশে হিজাব পরতে বাধ্য করেন

ইরানি গায়িকা পারাস্তু আহমাদিকে হিজাব ছাড়া মঞ্চে পরিবেশনার অপরাধে ৭৪টি বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়েছে। এইRead More

Rights of Minorities in Bangladesh

Attacks by “Tawhidi Janata” in Bangladesh and Obstruction of Minority Religious Practice

In Palashbari upazila of Gaibandha, local Sanatan (Hindu) devotees had taken the initiative to buildRead More

Comments are Closed