
The Grip of Fundamentalism in Bangladesh
অন্ধকারের মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোকে প্রশ্রয় দেয়ার ফল বাংলাদেশ আরো পাবে, অনেক পাবে
বাংলাদেশে সবসময়ই একটা উগ্রবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী আছে যারা গান, নাচ, সংস্কৃতি চর্চাকে ভয় পায় এবং তাদের প্রতিপক্ষ ভাবে। স্পষ্ট করে বললে মুসলিম মৌলবাদী গোষ্ঠী। সেখানে একেবারে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা না জানা মানুষ যেমন আছেন, তেমনি আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষা পাওয়া মানুষও, এমনকি পিওর সাইন্স পড়ে আসা অনেক ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারও। শুধু মাদ্রাসা শিক্ষিত বলে তাদের আলাদা করার সুযোগ নেই। এরা মনে করে মানুষ সৃজনশীলতার চর্চা করলে এবং জ্ঞান, বিজ্ঞানে এগিয়ে গেলেই তাদের ধর্ম ব্যবসা, তাদের ধর্মের জারিজুঁরি ফাঁস হয়ে যাবে। তখন তারা নানান বাহানায় শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানের পিছনে লাগে। যার সর্বশেষ উদাহরণ সিলেটের জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা নির্বাচিত হওয়া বিউটি পাল ও তার উপর ঘটানো সংঘবদ্ধ সাইবার বুলিং।
আপনারা জানেন, তিনি সুন্দর পরিপটি পোশাকে ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে …’ গানের সঙ্গে ক্যাটাওয়াকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়াতে সেই অন্ধকারের গোষ্ঠী তাকে সাইবার স্পেসে বুলিং করছে নানাভাবে, সেখানে নানান পেশার মানুষ আছেন। তাদের ভাবটা এমন যে উনি এই গানের সঙ্গে ভিডিও করে দেশকে রসাতলে নিয়ে যাচ্ছেন! এখানে বিষয় দুইটা, প্রথমতঃ একজন প্রধান শিক্ষিকা গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে সৃজনশীল উপায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে শিক্ষাটাকে আনন্দদায়ক করছেন – সেটা তারা নিতে পারছেন না। আর দবিতীয়তঃ উনি জন্মগতভাবে সনাতনী, একজন সনাতনী তাও আবার নারী, একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা, জেলার ভিতরে শ্রেষ্ঠ – সেটাও মৌলবাদী পুরুষতান্ত্রিক ধর্মাশ্রয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠদের গাত্রদাহের কারন। উনি বিউটি পাল না হয়ে বিউটি খাতুন হলে কিন্তু এই সিনারিও হতো না, এটা বাংলাদেশের ইসলাম শাসিত সমাজের ঘুঁন ধরা বাস্তবতা, আপনি মানলেও ঠিক, না মানলেও। বাংলাদেশের মতো ইসলাম নিয়ন্ত্রিত বহুত্ববাদী সমাজে একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী যখন প্রকাশ্যে স্বীকৃতি ও প্রশংসা অর্জন করেন, তখন সেই অর্জনকে ঘিরে ধর্মীয় ও লিঙ্গভিত্তিক পূর্বাগ্রহ একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকেই যায়। ফলে সমালোচনার আড়ালে যে বিদ্বেষ কাজ করছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ কম। আর ইসলামে তো সকল গান-বাজনা, সংকৃতি চর্চা, খেলাধূলা, সাহিত্য, সৃজনশীলতার চর্চা করা হারাম, ইসলাম চায় না শিশুরা ছোট থেকেই এগুলোতে জীবনের মানে খুঁজতে শিখুক।
ক্লাসে ছাত্রদের সঙ্গে তার এই ভিডিও দুইটি দেখুন, কী চমৎকার! আমার তো বরং আফসোস হচ্ছে, আমরা এমন একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা পাইনি আমাদের সময়ে।
https://facebook.com/reel/1700894607796022
https://facebook.com/reel/1579115583927650
বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি প্রজন্মেই এই নির্দিষ্ট মৌলবাদী গোষ্ঠী সৃজনশীলতা, শিল্পচর্চা ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে, প্রতিরোধ সৃষ্টি করে বাঁধা দিয়েছে। গান, নাচ, সাহিত্য কিংবা খেলাধুলা – এসব কিছুকে তারা কেবল বিনোদন বা সৃজনশীলতার চর্চা হিসেবে নয়, বরং তাদের প্রতিষ্ঠিত মতাদর্শের প্রতি এক ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ যখন মানুষ সৃষ্টিশীলতা চর্চা করে, প্রশ্ন করতে শেখে, নতুন কিছু ভাবতে শেখে, তখন প্রচলিত অনেক ধরনের কর্তৃত্ব বা বয়ান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই আশঙ্কা থেকেই সৃজনশীল, আনন্দদায়ী শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলার প্রবণতা তৈরি হয়।
সিলেটের শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা বিউটি পালের ঘটনা এই বৃহত্তর প্রবণতার একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত মাত্র। একজন শিক্ষক যখন গতানুগতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৃজনশীলভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন, তখন সেটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার বদলে সমাজের সেই প্রতিক্রিয়াশীল অন্ধকারের অংশ সেটিকে “অনৈতিকতা” বা “শিক্ষকতার মর্যাদাহানি” হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। অথচ শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করে তোলার এই প্রচেষ্টা বিশ্বজুড়ে আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞানেরই একটি স্বীকৃত দিক। বাংলাদেশের যে এটার চর্চা কেউ শুরু করেছে সেটাই বরং সৌভাগ্য।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে ধর্মভিত্তিক উগ্র মতাদর্শকে যেভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে, তা এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ভোটের রাজনীতি, ধর্মীয় অনুভূতির হিসাব-নিকাশ এবং স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের প্রয়োজনে বিভিন্ন সরকার ও দল বারবার এই গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আপস করেছে। ফলে যা একসময় প্রান্তিক অবস্থানে ছিল, তা ধীরে ধীরে সামাজিক পরিসরে জায়গা করে নিয়েছে এবং আজ তা মূলধারার আলোচনাকেও প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশে বহু বছর ধরে বিভিন্ন সরকার ও রাজনৈতিক দল এই ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলিকে প্রশ্রয় দিয়েছে। তাদের ওয়াজ-মাহফিল, ধর্মসভা, ঘৃণাবক্তৃতা – সবকিছুকে অবারিত সুযোগ দিয়ে সমাজে বিষ ছড়ানোর পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। নারী, ভিন্ন ধর্মের মানুষ, মুক্তচিন্তা – এসবের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর যে অবাধ পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা সমাজকে ক্রমাগত কলুষিত করেছে। সাপকে কোলে তুলে রাখলে যেমন একসময় ছোবল দেয়, তেমনি এই গোষ্ঠীগুলো এখন সমাজের প্রতিটি স্তরে আঘাত হানছে – মাঠে, ময়দানে, বাড়িতে, গাড়িতে, প্রকাশ্যে ও গোপনে ওয়াজ ও ধর্ম চর্চার নামে ঘৃনার প্রচারের অবশ্যম্ভাবী পরিনাম এগুলো।
প্রত্যেক সুবিবেচনার নিরপেক্ষ মানুষ এই বিষয়ে একমত হবেন যে, ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সমাবেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নারী, ভিন্নধর্মাবলম্বী ও সাংস্কৃতিক চর্চার বিরুদ্ধে যেভাবে প্রকাশ্যে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, তার সামাজিক প্রভাব উপেক্ষা করার উপায় নেই। যখন ঘৃণা প্রচারের এই মাধ্যমগুলো নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে থাকে, তখন সামাজিক মাধ্যমে একজন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ বুলিং কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় – বরং তা দীর্ঘমেয়াদি এক আদর্শগত চর্চারই বহিঃপ্রকাশ।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্র ও সমাজ কীভাবে এই প্রবণতা মোকাবিলা করবে। কেবল প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপ – যেমন নির্দিষ্ট ঘটনার পর নিন্দা জানানো – যথেষ্ট নয়। বরং শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীলতা, বহুত্ববাদ ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক সহনশীলতার চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে বিউটি পালের মতো শিক্ষকেরা নিরাপদে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ভয়হীন পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বিউটি পালকে ঘিরে সাইবার বুলিংয়ের ঘটনাটি শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অবিচার নয় – এটি বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বহুত্ববাদী চেতনার বিরুদ্ধে এক ধারাবাহিক প্রবণতার প্রতিফলন। যতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সমাজ ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগকে সীমিত না করে সৃজনশীলতা ও শিক্ষার প্রসারকে অগ্রাধিকার না দেবে, ততদিন এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে। বিউটি পালের মতো শিক্ষকেরা নিরুৎসাহিত হয়ে তাদের উদ্যম, সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলবে, হয়তো একদিন দেশ ছাড়বে বাধ্য হয়ে।
Related Posts

The Birth of Conscience: How Humans Became Moral Without Allah or Religion
It was almost seventy-five thousand years ago. A group of Neanderthals lived in the ShanidarRead More

বিবেকের জন্মঃ আল্লাহ ও ধর্ম ছাড়াই মানুষ কীভাবে নৈতিক হয়ে উঠল?
প্রায় পঁচাত্তর হাজার বছর আগের কথা। ইরাকের শানিদার গুহায় বাস করত এক দল নিয়ান্ডারথাল। সেইRead More

Why Do People Become Pedophiles? Why and How Does Islam Support Pedophilia and Severe Child Abuse?
The news that an 11-year-old child in a madrasa in Madan Upazila of Netrokona becameRead More

Comments are Closed