Israel
Israel and Muslims

Israel and Muslims

ইসরায়েলের সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ঃ ঘৃণা, বাস্তবতা ও অধিকার

ইসরায়েল নাম শুনলে অনেকের মনে প্রথমেই যে প্রতিক্রিয়া আসে তা হলো – ঘৃণা। বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়া প্রবল। কারণ ইসলাম ধর্মে ইহুদিদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ভিত্তি রয়েছে, ইসলাম ধর্মের প্রধান গ্রন্থগুলোতে সরাসরি ইহুদীদের শত্রু বলা হয়েছে। অনেক মুসলমান মনে করেন, ইসরায়েল মানেই মুসলমানদের দুশমন, আর ইহুদিরা মুসলমানদের জাত শত্রু। এই ভাবনার পেছনে রয়েছে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, ঐতিহাসিক সংঘাত, এবং আধুনিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু এই ভাবনার বাইরে গিয়ে যদি আমরা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সমাজ কাঠামো, বিশেষ করে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অধিকার ও জীবনমান বিশ্লেষণ করি, তাহলে একটি ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। বলে রাখি, ২০২৫ সালের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষদের দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষ ১০ এ ইসরায়েলের অবস্থান ৮ম।

ইহুদি-মুসলিম সম্পর্কের ইতিহাস বহু পুরনো। ইসলামের প্রাথমিক যুগেই মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়, যার ফলাফল ছিল নির্বাসন, যুদ্ধ, এবং গণহত্যা। পরবর্তীতে মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোতে ইহুদিরা “জিম্মি” হিসেবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হতো। একইভাবে খ্রিস্টান ইউরোপেও ইহুদিদের ওপর নির্যাতন, গণহত্যা, এবং নির্বাসনের ইতিহাস রয়েছে – যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় হিটলারের নাৎসি জার্মানিতে।

হাজার বছরের এই দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাসের ফলে ইহুদিরা আজও বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ১% এরও কম। অথচ তারা বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত রাষ্ট্র – ইসরায়েল – গঠন করেছে, যা মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে বিরোধপূর্ণ।

ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ১৮% মুসলমান, ২% খ্রিস্টান, এবং ৭৩–৭৫% ইহুদি বংশোদ্ভূত। কিন্তু “ইহুদি” পরিচয় এখানে ধর্মীয় নয়, বরং জাতিগত। Gallup-এর ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬৫% ইসরায়েলি নিজেদের “নিধার্মিক” বা “নিশ্চিত নাস্তিক” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, এই সংখ্যা যে গত ১০ বছরে নাটকীয়ভবে বেড়েছে তাতে কোনই সন্দেহ নেই। ৪০% মানুষ নিজেদের “সেক্যুলার” হিসেবে পরিচয় দেন। অর্থাৎ, ইসরায়েলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মকে তাদের প্রাত্যহিক জীবনে গুরুত্ব দেন না। সেজন্য তাদের কাছে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তোমার ধর্ম কী? আপনি হয়তো উত্তর পাবেন ধর্ম নেই, তাদের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের কোন ধর্ম নেই, আপনি ঠিকই শুনছেন ইসরায়েলের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ ইহুদী না, তারা হয়তো ইহুদী পরিবারে জন্ম নিয়েছে কিন্তু তারা নিজদের ইহুদী পরিচয় দেয় না। স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নিতে পারেন মুসলমানদের মধ্যে নিধার্মিক, নাস্তিক, সেক্যুলার কম।

এই ধর্মনিরপেক্ষতা ইসরায়েলের সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য কম, এবং নাগরিক অধিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্মনিরপেক্ষ আইনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

ইসরায়েলে প্রায় ২০ লাখ মুসলমান বাস করেন, যারা মূলত আরব বংশোদ্ভূত এবং বহু প্রজন্ম ধরে দেশটির নাগরিক হিসেবে বসবাস করছেন। তারা ইসরায়েলের পূর্ণ নাগরিকত্বভুক্ত, যার ফলে ভোটাধিকার, আইনি সুরক্ষা, এবং নাগরিক সুবিধা ভোগ করার অধিকার রাখেন। এই মুসলিম জনগোষ্ঠী ইসরায়েলের সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি, ব্যবসা, এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে থাকেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিম ছাত্রছাত্রীরা সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনা করতে পারে, এবং অনেক মুসলিম শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। হাইফা, নাজারেথ, এবং জেরুজালেমের মতো শহরে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় ধর্মীয় স্কুল ও মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে ইসলামিক শিক্ষা দেওয়া হয়। মুসলিম শিক্ষকরা সরকারি স্কুলেও নিয়োজিত আছেন, এবং শিক্ষা প্রশাসনে তাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবায় মুসলমানরা সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারেন, এবং অনেক মুসলিম ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী ইসরায়েলের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। উদাহরণস্বরূপ, হাইফা শহরের Rambam Health Care Campus-এ মুসলিম চিকিৎসকরা নিয়মিত কাজ করছেন, এবং রোগীদের সেবা দিচ্ছেন ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে।

চাকরি ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও মুসলমানরা উল্লেখযোগ্যভাবে সক্রিয়। তারা সরকারি ও বেসরকারি খাতে চাকরি করছেন – প্রশাসন, প্রযুক্তি, নির্মাণ, পরিবহন, এবং মিডিয়া খাতে মুসলিম কর্মীদের উপস্থিতি রয়েছে। অনেক মুসলমান উদ্যোক্তা ছোট ও মাঝারি ব্যবসা পরিচালনা করছেন, যেমন – রেস্টুরেন্ট, দোকান, পরিবহন কোম্পানি, এবং প্রযুক্তি স্টার্টআপ।

ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে মুসলমানরা স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে মুসলিমদের নিজস্ব মসজিদ রয়েছে, যেখানে তারা নামাজ আদায় করেন, রমজান মাসে তারাবীহ ও ইফতার আয়োজন করেন, এবং ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উদযাপন করেন। মুসলিম ধর্মীয় নেতারা (ইমাম) ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্ব প্রদান করেন। মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় আদালত (Sharia Courts) রয়েছে, যেখানে পারিবারিক ও বিবাহ সংক্রান্ত বিষয়াদি ইসলামিক আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হয়।

হজ পালনের জন্য মুসলমানরা ইসরায়েলি পাসপোর্ট ব্যবহার করে সৌদি আরবে যেতে পারেন। ইসরায়েল সরকার মুসলিম নাগরিকদের হজে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। প্রতি বছর শত শত মুসলমান ইসরায়েল থেকে হজে যান, এবং ধর্মীয়ভাবে তা পালন করেন।

এই বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয় যে, ইসরায়েলের মুসলমানরা শুধু সহনশীলতা নয়, বরং সক্রিয় নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করছেন। যদিও কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক বৈষম্য রয়েছে, তবুও মুসলমানরা সেখানে নিরাপদ, সম্মানজনক ও ধর্মীয়ভাবে স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারেন।

ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন, যা দেশটির স্থানীয় প্রশাসনে সংখ্যালঘুদের সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। উদাহরণস্বরূপ, নাজারেথ শহর – যা ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় আরব শহর – এর বর্তমান মেয়র মুসলিম। এই শহরে মুসলিম ও খ্রিস্টান আরবদের দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব রয়েছে, এবং স্থানীয় প্রশাসনে তারা নাগরিক সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন।

এছাড়া ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ “নেসেট”-এ মুসলিম সদস্যরা নিয়মিত নির্বাচিত হন। ২০২৫ সালের ২৫তম নেসেট-এ অন্তত ১০ জন আরব সদস্য রয়েছেন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন মুসলিম। তারা মূলত “United Arab List (Ra’am)”, “Hadash-Ta’al”, এবং “Balad” দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই সদস্যরা মুসলিম জনগণের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জমি বরাদ্দ, এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত বিষয়ে সংসদে আইন প্রণয়ন ও বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন।

উল্লেখযোগ্য মুসলিম সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেনঃ

Iman Khatib-Yasin: একজন নারী মুসলিম সংসদ সদস্য, যিনি ধর্মীয় ও নারী অধিকার নিয়ে সক্রিয়।
তাদের সংসদীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার, এবং জমি সংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়। যদিও রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবুও মুসলিম সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে সংখ্যালঘুদের অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

Mansour Abbas (United Arab List): যিনি ইসরায়েলের মূলধারার জোট সরকারে অংশগ্রহণ করে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

Ahmad Tibi (Ta’al): একজন অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য, যিনি দীর্ঘদিন ধরে আরব জনগণের পক্ষে কথা বলে আসছেন।

Freedom House-এর ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইসরায়েল একটি “ফ্রি” রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা মোটামুটি সুরক্ষিত। যদিও আরব সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে কিছু কাঠামোগত বৈষম্য রয়েছে, যেমন বাজেট বরাদ্দে ঘাটতি, শিক্ষা ব্যবস্থায় অসমতা, এবং স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা, তবুও ধর্মীয় স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।

একটি জরিপে দেখা গেছে, ৮৩% ইসরায়েলি ইহুদি ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে, যার মধ্যে ৭১% “ন্যাশনাল রিলিজিয়াস” ইহুদিরাও অন্তর্ভুক্ত [সূত্র: Boulder Jewish News, 2025]।

ইসরায়েলে প্রায় ১৮০,০০০ খ্রিস্টান বাস করেন, যাদের অধিকাংশই আরব। তারা গির্জা পরিচালনা করেন, ধর্মীয় শিক্ষা দেন, এবং খ্রিস্টান উৎসব পালন করেন। যদিও মাঝে মাঝে চরমপন্থী ইহুদি গোষ্ঠীর হামলার শিকার হন, তবুও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ধর্মীয় অধিকার স্বীকৃত।

দ্রুজ সম্প্রদায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। ফলে তারা কিছু অতিরিক্ত সুবিধা পান, যেমন সরকারি চাকরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার।

ইসরায়েলের ধর্মহীন জনগোষ্ঠী – যাদের মধ্যে নাস্তিক, অজ্ঞেয়বাদী, এবং ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার মানুষ অন্তর্ভুক্ত – দেশটির সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে বিবেচিত যারা ধর্মীয় রীতিনীতি, আচার-অনুষ্ঠান, এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকেন। এই জনগোষ্ঠী ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয় এবং ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণে বিশ্বাসী। তারা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় ধর্মীয় পক্ষপাতিত্ব থাকা উচিত নয়, বরং সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে – ধর্ম নির্বিশেষে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

ধর্মহীন জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ইসরায়েলের ধর্মীয় নীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, যখন চরমপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠী কোনো আইন বা নীতিতে ধর্মীয় অনুশাসন চাপিয়ে দিতে চায়, তখন ধর্মনিরপেক্ষ ও নাস্তিক জনগোষ্ঠী সংসদ, আদালত, এবং গণমাধ্যমে এর বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করে। ফলে রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধর্মীয় সহনশীলতা ও বহুত্ববাদ বজায় থাকে।

এছাড়া, ধর্মহীন নাগরিকরা শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তাদের চিন্তাধারা ইসরায়েলের উদ্ভাবনী শক্তিকে ত্বরান্বিত করে এবং সমাজে মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবোধের চর্চা বাড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এবং মিডিয়ায় ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার মানুষদের উপস্থিতি ইসরায়েলের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের ধর্মহীন জনগোষ্ঠী শুধু সংখ্যার দিক থেকে নয়, বরং চিন্তাগত ও নীতিগত দিক থেকেও একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি। তারা ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে যুক্তিবোধ ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

ইসরায়েলের মুসলমানরা সাধারণভাবে নিরাপদ জীবনযাপন করেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় তারা নাগরিক সুরক্ষা ভোগ করেন, এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের শিকার হন না। খাদ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সুসংগঠিত বাজার, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, এবং সরকারি সহায়তা কার্যকরভাবে বিদ্যমান। তারা স্বাধীনভাবে হালাল খাদ্য গ্রহণ করতে পারেন, এবং রমজান মাসে ইফতার ও সেহরির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকে।

শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবায় মুসলমানরা প্রবেশাধিকারভুক্ত, এবং এসব খাতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। মুসলিম ছাত্রছাত্রীরা সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে পড়াশোনা করে, এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মুসলিম শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ক্রমবর্ধমান, বিশেষ করে প্রযুক্তি, আইন, এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে। অনেক মুসলিম শিক্ষক সরকারি স্কুলে নিয়োজিত, এবং শিক্ষা প্রশাসনেও তাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।

চিকিৎসা খাতে মুসলমানদের অবদান উল্লেখযোগ্য। হাইফা, জেরুজালেম, এবং তেল আবিবের হাসপাতালগুলোতে মুসলিম ডাক্তার, নার্স, এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত কাজ করছেন। উদাহরণস্বরূপ, হাইফা শহরের Rambam Health Care Campus-এ মুসলিম চিকিৎসকরা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন ধর্ম, জাতি বা ভাষা নির্বিশেষে। তারা মেডিকেল গবেষণায়ও অংশ নিচ্ছেন, এবং ইসরায়েলের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

প্রযুক্তি খাতেও মুসলমানদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। অনেক মুসলিম তরুণ স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা করছেন, বিশেষ করে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সাইবার সিকিউরিটি, এবং মোবাইল অ্যাপস তৈরির ক্ষেত্রে। ইসরায়েলের “Startup Nation” খ্যাতির পেছনে মুসলিম উদ্যোক্তাদেরও অবদান রয়েছে, যদিও তা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।

ব্যবসা ও বাণিজ্যেও মুসলমানরা সক্রিয়। তারা ছোট ও মাঝারি ব্যবসা পরিচালনা করেন – রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, নির্মাণ, এবং খুচরা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে। মুসলিম ব্যবসায়ীরা স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, এবং অনেকেই ইসরায়েলি আরব অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন।

এই বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয় যে, ইসরায়েলের মুসলমানরা শুধু নিরাপদ জীবনযাপনই করেন না, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে অবদান রাখেন। তারা নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, এবং পেশাগত স্বীকৃতি ভোগ করেন, যা অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও সংখ্যালঘুদের জন্য নিশ্চিত নয়।

এই প্রশ্নের উত্তর হলো – না। ইসরায়েলের মুসলমানদের মধ্যে ইউরোপ বা আমেরিকায় আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা নেই। তারা দেশ ছাড়তে উদগ্রীব নন, বরং ইসরায়েলের নাগরিক হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে নিরাপদ ও স্থিতিশীল মনে করেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা, যা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রম।

UNHCR-এর ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ১২৩.২ মিলিয়ন মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার মধ্যে ৩৬.৮ মিলিয়ন শরণার্থী এবং ৮.৪ মিলিয়ন আশ্রয়প্রার্থী। আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে সিরিয়া (৬.০ মিলিয়ন), আফগানিস্তান (৫.৮ মিলিয়ন), এবং দক্ষিণ সুদান (২.৩ মিলিয়ন) থেকে। অথচ ইসরায়েলি মুসলমানদের মধ্যে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য দেশত্যাগ বা শরণার্থী আবেদন দেখা যায় না।

Eurostat-এর ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রথমবারের মতো আশ্রয় চাওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯১২,০০০ জন। এর মধ্যে শীর্ষ তিনটি দেশের নাগরিকরা ছিলেন – সিরিয়া (১৪৭,৯৬৫ জন), ভেনেজুয়েলা (৭২,৭৭৫ জন), এবং আফগানিস্তান (৭২,১৫৫ জন)। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, এবং সিরিয়ার মুসলমানরা ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বড় অংশ দখল করেন, যা তাদের নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুঃশ্চিন্তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানবাধিকার সংকটের প্রতিফলন।

এই পরিসংখ্যানগুলো ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং সংখ্যালঘু মুসলমানদের অধিকার নিশ্চিত করার সক্ষমতার একটি বাস্তব প্রমাণ। ইসরায়েলের মুসলমানরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ পান। ফলে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ ইসরায়েলেই দেখতে পান, অন্য কোনো দেশে নয়।

আপনি কি কখনো শুনেছেন, কোনো ইসরায়েলি মুসলমান ইউরোপ, আমেরিকা বা আরব দেশগুলোতে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন? এমন কোনো পরিসংখ্যান কি আপনার হাতে আছে, যা এই দাবিকে খণ্ডন করতে পারে? যদি না থাকে, তাহলে এটিই প্রমাণ করে যে ইসরায়েল তার নিজের দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য একটি কার্যকর ও নিরাপদ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

ইসলাম ধর্মে ইহুদিদের প্রতি বাধ্যতামূলক ঘৃনা ও নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও, বাস্তবতা অনেক সময় ধর্মীয় ব্যাখ্যার বাইরে চলে যায়। ইসরায়েলের মুসলমানরা ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন, এবং নিরাপদ জীবনযাপন করেন। তাই “ইসরায়েল মানেই মুসলমানদের শত্রু” এই ধারণা পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

ইসরায়েল একটি জটিল রাষ্ট্র, যার অভ্যন্তরীণ সমাজ কাঠামো ধর্ম, জাতি, ও রাজনীতির সংমিশ্রণে গঠিত। সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় – বিশেষ করে মুসলমানরা – সেখানে নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, এবং সামাজিক নিরাপত্তা ভোগ করেন। যদিও কিছু কাঠামোগত বৈষম্য রয়েছে, তবুও ইসরায়েলের সংখ্যালঘুরা অন্য অনেক মুসলিম দেশে সংখ্যালঘুদের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছেন।

এই বাস্তবতা আমাদের শেখায়, ধর্মীয় ঘৃণার পরিবর্তে যুক্তি, তথ্য, এবং মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রকে মূল্যায়ন করা উচিত। ইসরায়েল সম্পর্কে আমাদের ধারণা যদি শুধুই ধর্মীয় আবেগে গঠিত হয়, তাহলে আমরা বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাব।

Related Posts

Hindu Attacked for Speaking

In Bangladesh, the very meaning of the “blasphemy” law is to find a new pretext for persecuting minorities

The attack on the house, shop, and temple of Deepto Roy in Tahirpur, Sunamganj isRead More

Hindu Attacked for Speaking

বাংলাদেশে “ধর্ম অবমাননা” আইনের অর্থই হলো সংখ্যালঘু নির্যাতনের নতুন এক বাহানা খোঁজা

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে দীপ্ত রায়ের বাড়ি, দোকান ও মন্দিরে হামলার ঘটনা নতুন কিছু নয়। এটি একটিRead More

Islam will not Survive Without Massive Reform

Islam and the Qur’an must go through reform, otherwise Islam will be pushed aside

Historically, Islamic jurisprudence or classical fiqh developed within a specific social and political context, whichRead More

Comments are Closed