
Blasphemy in Bangladesh
বাংলাদেশে মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাঃ একটি অলীক স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের মূল ভিত্তি। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১৯ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রতিটি মানুষের মতামত পোষণ ও প্রকাশের অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদেও চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে মুক্তচিন্তক, লেখক, ব্লগার ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে বারবার ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছেন।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশে হত্যা, মব লিঞ্চিং, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, অপমান-অপদস্থ করা, দেশান্তর এবং কারাবন্দির ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় – এটি একটি সুস্পষ্ট, পুনরাবৃত্তিশীল প্যাটার্নে পরিণত হয়েছে।
ব্লাসফেমি ও শাতিমে রাসূলের ধারণাঃ ধর্মতাত্ত্বিক ও আইনি প্রেক্ষাপট
USCIRF 2023 আপডেট অনুযায়ী বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৯৫টি দেশে কোনো না কোনো ধরনের ব্ল্যাসফেমি (ধর্মনিন্দার বিরুদ্ধে) আইন বিদ্যমান – এগুলো কোথাও জরিমানা, কোথাও কারাদণ্ড, আবার কিছু দেশে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত বহাল। বাংলাদেশও আছে এই তালিকায়। বাংলাদেশে সরাসরি ‘ব্লাসফেমি’ নামে কোনো আইন না থাকলেও দণ্ডবিধির ২৯৫(ক) ধারা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন) ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আইনি কাঠামোর বাইরেও কিছু ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা বাংলাদেশের সমাজে ধর্মের নামে সহিংসতার মূলে রয়েছে – সেগুলো হলো “শাতিমে রাসূল”, “মুরতাদ”, “ইসলাম বিদ্বেষী”, “ইসলামের শত্রু”, “কাফের”, “রাসূলের দুশমন” – এমন কিছু শব্দ। সবগুলোকে একত্রে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” হিসাবে সমাজে ও আইনের দৃষ্টিতে দেখা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো – “শাতিমে রাসূল” অর্থাৎ নবীর নিন্দাকারীকে হত্যা। নবী মোহাম্মদের সমালোচনাকারী ‘শাতিমে রাসূল’ ও ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করা ‘মুরতাদ’ হিসাবে যাদের নাম ঘোষনা করা হয় – বাংলাদেশের সমাজের বড় অংশ মানুষের চোখে তারা হত্যাযোগ্য হয়ে যায়। কেননা ইসলামই এই হত্যার বিধান দিয়েছে।
ইসলামি ফিকহের সংখ্যাগরিষ্ট ধারায় দাবি করা হয়, আল্লাহর সমালোচনার ক্ষেত্রে তওবার মাধ্যমে ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও নবী মুহাম্মদের নিন্দাকারীকে হত্যা করা ফরজ, মানে মুসলমানদের জন্য সেই ব্যক্তিকে হত্যা করা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য – এবং অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেও সেই শাস্তি মওকুফ হয় না বলে ইসলামী বিশ্বাসের প্রায় সব গোষ্ঠীই মোটামুটি একমত। যদিও মূলধারার ইসলামি পণ্ডিতদের এই বিষয় নিয়ে খোলাখুলি সরাসরি খুব বেশী কথা বলতে না দেখলেও বা তারা এড়িয়ে যেতে চাইলেও, বাংলাদেশে চরমপন্থী মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো এই ব্যাখ্যাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সহিংসতা ও হত্যাকান্ডগুলোকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। পরিতাপের বিষয় হলো বেশিরভাগ সাধারন মানুষের এতে সম্মতি থাকে, কারন রাসূলের দুষমন হিসাবে যাকে চিহ্নিত করা হয় তাকে প্রায় সবাই ঘৃনা করতে শুরু করে, তাকে হত্যা করা হলেও কারো ভিতরে অনুতাপ, অনুশোচনা জাগ্রত হয় না। ইসলামে এটাই বলা আছে যে মুসলিমদের সন্তান, পিতা মাতা, এমনকি নিজের জীবনের চেয়ে নবী মোহাম্মদ ও আল্লাহকে বেশি ভালবাসতে হবে। এ বিষয়ে সহীহ হাদীসের রেফারেন্স এখানে পাবেন, যেখানে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”- আইনের এই সংজ্ঞা এতটাই অস্পষ্ট ও বিস্তৃত যে যেকোনো সমালোচনা – এমনকি ধর্মের নামে পরিচালিত প্রতারণার বিরুদ্ধে কথা বললেও, কোন ধর্মীয় নেতার দুর্নীতির রিরুদ্ধে কথা বললেও – তাকে এই অভিযোগে জড়ানো যায়। এবং অভিযোগ মাত্রই বিচার, রায় ও শাস্তি – সব একসাথে রাস্তায় নেমে কার্যকর করে ফেলতে চায় জনতা। মব লিঞ্চিং বাংলাদেশে খুব স্বাভাবিক ঘটনা। একবার কেউ কাউকে নির্দেশ করে যদি বলে সে নবী মোহাম্মদকে গালি দিয়েছে, কোরান অবমাননা করেছে – তবে তাকে হত্যা করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে শত শত জনতা জড়ো হয়ে যেতে পারে। এমন অসংখ্য নজির বাংলাদেশে আছে। এমনকি এই নিয়ে হত্যাকান্ড থেকে শুরু করে একাধিক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির একাধিক উদাহরণ আছে।
২০১৩ থেকে একের পর এক ব্লগার হত্যাঃ সংগঠিত সন্ত্রাসের ইতিহাস
শাহবাগ আন্দোলন ও তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া
২০১৩ সালে ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হলে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো পাল্টা প্রচারণা শুরু করে। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও ব্লগারদের “নাস্তিক” ও “ইসলামবিরোধী” আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন সংগঠন তাদের হত্যার দাবি তোলে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ব্লগার হত্যার ধারাবাহিকতা ঠিক তখনই শুরু হয় যখন সেক্যুলার অ্যাক্টিভিস্টরা ধর্মের নামে রাজনৈতিক শক্তি অর্জনকারী নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবি করেন। অর্থাৎ নিশানা ছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ধর্মীয় নেতাদের রাজনৈতিক সমালোচকরা। বাংলাদেশে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত নয় এমন অনেক কওমি মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে একত্রিত হয়। শাহবাগ আন্দোলনের সময় তারা আন্দোলনকারীদের “নাস্তিক ব্লগার” আখ্যা দিয়ে জনমনে ভয় ও ঘৃণা উসকে দেয়, এবং ৫ মে ২০১৩ তারিখে সারাদেশের হাজার হাজার অপ্রাপ্তবয়স্ক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে এনে বিশাল শো-ডাউন করে। এই সমাবেশ ছিল সংগঠিত ধর্মীয় শক্তির এক প্রকাশ্য রাজনৈতিক প্রদর্শন, যেখানে শিশুদেরকে রাজনৈতিক দাবির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাদের ১৩ দফা দাবির মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা, ধর্মীয় সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রকে আরও ধর্মীয়ীকরণের আহ্বান ছিল – যা বাংলাদেশের সংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এই চাপের মুখে সরকারও এক পর্যায়ে হেফাজতের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নেয় এবং বেশ কয়েকজন ব্লগার ও অনলাইন লেখককে গ্রেফতার করে, যদিও তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার কোনো প্রমাণ ছিল না। একই সঙ্গে সাধারণ পাঠ্যপুস্তক থেকে বিবর্তনবাদসহ বহু বিজ্ঞানভিত্তিক প্রবন্ধ বাদ দেওয়া শুরু হয়, এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কবি-লেখকদের রচনা সরিয়ে ফেলা হয় – যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও সংকীর্ণ ও মতাদর্শগতভাবে নিয়ন্ত্রিত করে তোলে। এই প্রবণতা শুধু মুক্তচিন্তা ও বৈজ্ঞানিক মননকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে ভয়, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ধর্মীয় চাপের মধ্যে আবদ্ধ করেছে। ফলে রাষ্ট্র, ধর্মীয় গোষ্ঠী ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে, যা আজও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
নিহত মুক্তচিন্তকদের তালিকা
রাজীব হায়দার (থাবা বাবা): ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার পল্লবীতে নিজ বাড়ির সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এই ব্লগারকে। তিনি শাহবাগ আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন। হত্যাকারীরা ছিল আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য।
অভিজিৎ রায়: বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতাকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বইমেলা থেকে ফেরার পথে চাপাতি দিয়ে হত্যা করা হয়। তার স্ত্রী রাফিদা বন্যা আহমেদ গুরুতর আহত হন।
ওয়াশিকুর রহমান বাবু: ২০১৫ সালের মার্চে ঢাকার তেজগাঁওয়ে চাপাতিতে হত্যা করা হয় এই তরুণ ব্লগারকে।
অনন্ত বিজয় দাশ: ২০১৫ সালের মে মাসে সিলেটে চাপাতি দিয়ে হত্যা করা হয় বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে।
নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নীলয়: ২০১৫ সালের আগস্টে ঢাকার গোড়ানে নিজ বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এই ব্লগারকে।
ফয়সাল আরেফিন দীপন: ২০১৫ সালের অক্টোবরে ঢাকার শাহবাগে নিজের প্রকাশনা অফিসে হত্যা করা হয় প্রকাশক দীপনকে।
প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে একই কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে – প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে আক্রমণ করে পালিয়ে যাওয়া। আনসার আল ইসলাম ও আল-কায়েদার উপমহাদেশীয় শাখা (AQIS) এই হত্যাগুলোর দায় স্বীকার করে।
ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া ও গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে বেঁচে ফেরা মানুষদের তালিকাটা অনেক দীর্ঘ, এক প্রবন্ধে সবাইকে নিয়ে কথা বলাটা যুক্তিসংগত না। বাংলাদেশের সরকারগুলোর বিরুদ্ধে ধর্মীউ উগ্রবাদী নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগও তোলেন কেউ কেউ, দিনে দিনে এই উগ্রতা ও সহিংসতার ধারা তো কমেনি, বরং বেড়েছে।
জীবন্ত পুড়িয়ে মারাঃ লালমনিরহাট (অক্টোবর ২০২০)
বাংলাদেশে ধর্মীয় সহিংসতা শুধু চাপাতির আঘাতে সীমাবদ্ধ নয় – এখানে মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতাও ঘটেছে। ২০২০ সালে লালমনিরহাট জেলায় এক স্কুলকর্মীকে “কোরআন অবমাননা”র অভিযোগে হাজারো মানুষের সামনে পিটিয়ে, অচেতন অবস্থায় জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারা হয়।
এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল সাধারণ গ্রামবাসী, দোকানদার, পথচারী – যারা মুহূর্তের মধ্যে একটি উন্মত্ত জনতার রূপ নেয়। উন্মত্ত জনতা ভুক্তভোগী হতভাগ্য স্কুলকর্মীর নিজের মুখের বক্তব্য জানারও চেষ্টা করেনি।
এমন ঘটনা এই একটাই নয়, কিছু সংবাদ মাধ্যমে আসে, কিছু আসে না, অন্য কারনে হত্যাকান্ড বলে ধামাচাপা দেয়া হয়। এই বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশে কোন গবেষণা পরিচালনা করা ও তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এই সমস্ত ঘটনা প্রমাণ করে যে ধর্মীয় সহিংসতার মানসিকতা কেবল সংগঠিত জঙ্গি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সমাজের গভীরে, মানুষের দৈনন্দিন চিন্তা-চেতনার ভেতর, নীরবে জমে থাকা এক বিপজ্জনক আগ্নেয়গিরির মতো।
যে সমাজে গুজব, ধর্মীয় আবেগ, এবং জনতার উন্মাদনা একসাথে মিশে যায় – সেখানে একজন নিরস্ত্র মানুষকে মুহূর্তেই “শত্রু” ঘোষণা করে পুড়িয়ে মারা সম্ভব হয়ে ওঠে। সুতরাং একজন মাত্র ধর্মীয় জঙ্গিও একজন নাস্তিক, মানববাদী ব্যক্তিকে আক্রমন করলে সেটাকে প্রতিহত করার উপায় থাকে না, সেখানে মূহুর্ত্তেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে মব লিঞ্চিং করে হত্যা করে ফেলতে পারে। যেমনটি আমি পারিনি, ২০২২ সালের ২১ জুন সন্ধ্যায় আমার উপর আক্রমন হলেও আমি প্রতিহত করার চেষ্টা করতে চাইনি, পিছে জঙ্গি সন্ত্রাসী সাধারন মানুষকে ডাক দিয়ে আমাকে সম্মিলিতভাবে হত্যা করতে উদ্যত হবে – এই ভয়ে। বাংলাদেশে মসজিদের মাইক থেকে গ্রামবাসীকে ডেকে নাস্তিক, মানববাদী ব্যক্তিদের এমনকি অন্য সাধারন মানুষদেরও মব করে আক্রমন করারও অনেক রেকর্ড আছে।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলো বাংলাদেশের সমাজের বাস্তবতাকে নগ্ন করে দেখায় এবং প্রমান করে যে ধর্মের নামে মানুষের জীবন সহজেই জনতার রোষের শিকার হতে পারে। এগুলো কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি গভীর সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি – যেখানে মানবিকতা, যুক্তি, এবং ন্যায়বিচার প্রতিদিনই উন্মত্ততার কাছে পরাজিত হচ্ছে। এটা দেখায় যে এখানে আইনের শাসন দুর্বল ও ধর্মীয় উগ্রতা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। এসব প্রতিহত করার ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশের সক্রিয়তার তেমন প্রমানিত নজির নেই। আমার নিজের জীবনের উদাহরণ থেকে বলতে পারি, আমাকে অনেকবার হত্যার হুমকি দেয়ার পরে আমি যখন পুলিশের সাহয্য চেয়েছিলাম – তখন তাদের বক্তব্য ছিল আমি ওসব কেন লিখি, আমি যেনো বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য কোন দেশে চলে যাই।
খুলনার উৎসব মণ্ডলঃ পুলিশের সামনেই গণপিটুনি (সেপ্টেম্বর ২০২৪)
২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনার সোনাডাঙ্গায় আজম খান সরকারি কমার্স কলেজের ছাত্র উৎসব মণ্ডলকে ফেসবুকে মহানবীকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে একদল ছাত্র ধরে পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে যায়। তখন সেখানে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার মানুষ জমায়েত হয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং তাকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করে।
পুলিশ জানায়, উৎসব মণ্ডল একটি পোস্টে ক্ষুব্ধ হয়ে মন্তব্য করেছিলেন এবং পরে বুঝতে পেরে সেটি মুছে দেন। কিন্তু কয়েকজন সেই মন্তব্যের স্ক্রিনশট রেখে দেন এবং ছড়িয়ে দিয়ে তাকে বিপদে ফেলেন।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও কিছু জনতা ডেপুটি কমিশনার পুলিশের কার্যালয়ে প্রবেশ করে এবং পুলিশ ও আর্মির সামনেই উৎসবকে আক্রমণ করে। শেষে সশস্ত্র বাহিনীর আপ্রাণ চেষ্টায় তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।এরপর উৎসব মণ্ডলের পুরো পরিবার আবার আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে পালিয়ে যায় এবং তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। মব জাস্টিসের কাছে বাংলাদেশের পুলিশও অসহায়ত্ব বোধ করে প্রায় সময়। এমনও দেখা যায় পুলিশের অনেক কর্মকর্তা মব জাস্টিসের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনে ভূমিকা রাখে।
উৎসব মন্ডলের এই ঘটনাটি বাংলাদেশে “মব জাস্টিস”-এর একটি ভয়াবহ উদাহরণ – যেখানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতেও হাজার হাজার মানুষ একজনকে গণপিটুনি দিতে পারে, মসজিদ থেকে মাইকে মৃত্যু ঘোষণা করা হয়, এবং আক্রান্ত পরিবারকে দেশ ছাড়তে হয়।
ময়মনসিংহের দীপু চন্দ্র দাসঃ জীবন্ত পুড়িয়ে মারা (ডিসেম্বর ২০২৫)
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় হিন্দু গার্মেন্ট কর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে কারখানার একটি অনুষ্ঠানে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পরে পিটিয়ে, গাছের সাথে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়। পরবর্তী তদন্তে কর্তৃপক্ষ জানায়, অভিযোগের সমর্থনে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুলিশ খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছে আলোচ্য দীপু চন্দ্র দাস পুলিশের ভাষ্যে ‘ধর্ম অবমাননাকর’ কোন কথা আদৌ বলেছিলেন কিনা। কিন্তু উনি এমন কিছু বলে থাকলেও যে তাকে অপমান, অপদস্থ, পিটানো, হত্য করা, আগুনে পোড়ানো যায় না – এই বোধটুকু বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর আচরনে লক্ষ করা যায় না। উগ্র ধর্মান্ধ সাধারন মানুষ তো ধরেই নেয়, ধর্ম অবমাননায় অভিযুক্ত ব্যক্তির এমন পরিনতি খুব স্বাভাবিক।
দীপু চন্দ্র দাসকে তার কর্মস্থল থেকে টেনে বের করে, এক কিলোমিটারেরও বেশি পথ মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হয়, একটি ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে গাছে বেঁধে তার নিথর দেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় – শত শত দর্শকের সামনে। এই ঘটনা এটা দেখায় – ইসলাম ধর্ম অবমাননার গুজব বা অভিযোগ পেলে শত শত মানুষ কতটা ক্রোধান্বিত হয়ে যায় যে একজন মৃত মানুষকে আবার আগুণেও পুড়িয়ে দিতে পারে। তাদের বক্তব্য, তাদের এই আক্রোশ থেকে অন্য মুক্তমনা, নাস্তিক, মানববাদী, সেক্যুলাররা শিক্ষা নিক, তাদের কন্ঠ তারা বন্ধ করে রাখুক!
এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট হত্যাটিকে “ভয়াবহ” বলে নিন্দা করে এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষার আহ্বান জানায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার দাবি করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনাটিকে “বর্বর হত্যাকাণ্ড” বলে নিন্দা করে। এই নিন্দা ও প্রতিক্রিয়ারও একটি কারন হলো দীপু চন্দ্র দাস পারিবারিকভাবে হিন্দু সনাতন ধর্মাবলম্বী। তার পক্ষে বাংলাদেশের ১২% সনাতন জনগণ ও পাশের শক্তিশালী সনাতন সংখ্যাগরিষ্ট ভারতের তীব্র প্রতিবাদ ছিল। কিন্তু সত্য বলতে আমাদের মতো মুসলিম পরিবারে জন্ম নেয়া অতি ক্ষুদ্র সংখ্যক নাস্তিক, মানববাদী, সেক্যুলার মানুষদের উপর হত্যাকান্ড ও সহিংসতার প্রতিবাদে এমন প্রতিক্রিয়া দেখানোর তেমন কেউ থাকে না, এটা বাস্তবতা।
হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (এইচআরসিবিএম) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির অভিযোগে অন্তত ৭১টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যা ৩০টিরও বেশি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।
আমার উপর আক্রমণঃ মুক্তচিন্তকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
মানবাধিকার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, নারী অধিকার ও বিজ্ঞান শিক্ষা নিয়ে লেখালেখির কারণে সামান্য লেখক ও এক্টিভিস্ট হলেও আমি একাধিকবার মৌলবাদী সহিংসতার শিকার হয়েছি, অসংখ্যবার হত্যার হুমকি পেয়েছি, আমার বৃদ্ধা মা’কে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে মৌলবাদীরা, আমার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের গ্রামের আশ্রয়স্থল আগুণে পুড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে, এমনকি এখন আমি বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে চলে আসলেও মৌলবাদীরা আমার গ্রামের বাড়িতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, আমাকে হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
২০১২ থেকে ধারাবাহিক হুমকি
২০১২ সাল থেকে আমাকে হত্যার হুমকি নিয়ে চলতে হয়। ২০১২ সালের ৩১ মার্চ আমার জন্ম জেলা সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রমে মঞ্চায়িত হওয়া একটি স্কুল নাটককে কেন্দ্র করে মিথ্যা ‘ধর্ম অবমাননা’ অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে, যা স্থানীয় ইসলাম ধর্মীয় গোষ্ঠী -সমর্থিত পত্রিকার ভুল সংবাদে আরও উসকে যায়। পরদিন হাজারো মানুষ “তৌহিদি জনতা” ব্যানারে সংগঠিত হয়ে ফতেহপুর হাইস্কুল, প্রাইমারি স্কুল এবং সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায় – যার ফলে অন্তত সাতটি হিন্দু পরিবারের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বহু মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় পালিয়ে যায়। এই সহিংসতার প্রতিবাদ ও তথ্য প্রকাশে যুক্ত থাকার কারনে এবং পরবর্তীতে স্থানীয় শিক্ষিত সচেতন ছাত্রদের অনলাইন কমিউনিটি হোমসাতক্ষীরা থেকে নির্যাতিত সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর পক্ষে অবস্থান নিতে শুরু করায় উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রকাশ্য হত্যার হুমকি পাই, আমার গ্রামের বাড়িঘর আগুণে পুড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয় তারা যেখানে আমার বৃদ্ধ বাবা-মা বসবাস করতেন। পুরো ঘটনাটি বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় ধর্মীয় গুজব, সংগঠিত উগ্রতা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর পুনরাবৃত্ত সহিংসতার একটি ভয়াবহ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০১৭ সালের মে মাসের ২৫ তারিখ
ঢাকায় আমার ভাড়া বাড়ির সামনে মৌলবাদীরা মব সৃষ্টি করে হত্যার উদ্দেশ্যে উন্মাদনা তৈরি করে। সেই সন্ধ্যার বিভিষিকায় আমার পরিবারের শিশুসহ সবাই ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে এক রুমে লকড হয়ে ছিলাম। প্রতিনিয়ত মৃত্যু তাড়া করে ফিরেছে যে কখন মিছিল নিয়ে আসা মব বাড়ির মেইন গেট ভেঙ্গে, তিনতলায় উঠে দরজা ভেঙ্গে আমাদের হত্যা করে, আগুণে পুড়িয়ে দেয়। বাড়িওয়ালা পুলিশ অফিসার ও এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় তার হস্তক্ষেপে সে যাত্রা আমি রক্ষা পেলেও এরপর একের পর এক হত্যার হুমকির কারণে ও রাস্তায় জঙ্গিরা আমাকে অনুসরন করতে শুরু করলে পালিয়ে বেড়ানোর ফলে আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে তৈরি স্টার্টআপ সম্পূর্ণ থমকে যায়। আমি নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়ে যাই। বিশ্বব্যাপী আমার থিম ব্যবহার করা লোকজনের কাছে আমি আস্থাহীন হতে শুরু করি। আমার সুনাম মাতাত্মকভাবে ব্যাহত হতে শুরু করে। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক ব্যাপক যা আমি আজও পুষিয়ে উঠতে পারিনি। আমার কাজটা ছিল এমন যে একবার পিছিয়ে পড়লে ঘুড়ে দাঁড়িয়ে আগের অবস্থান পুনরুদ্ধার করা খুবই দূরহ।
২০২২ সালের ২১ জুন, কলারোয়া
মৌলবাদীদের একের পর এক হুমকি, রাস্তায় অনুসরন করার ভয়ে একটু শংকাহীন জীবনের আশায় আমি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ছেড়ে আমার জন্মস্থান সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়ায় নিজ গ্রামে ফিরে যাই। কিন্তু সেখানে গিয়েও রেহাই মেলেনি। করোনা ভাইরাস প্যান্ডামিকের সেই কঠিন দিনগুলোতে সেখানে মৌলবাদী আক্রমণের শিকার হই আমি। এই হামলায় আমার হাত – বিশেষত ডান হাত – ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাম হাত লোহার রডের আঘাতে ক্ষত হয়ে পড়ে ও অনেক রক্তক্ষরণ ঘটে। ডান হাতের সমস্যায় দীর্ঘদিন থেরাপি নিয়ে কিছুটা উন্নতি হলেও সেই ক্ষত ও যন্ত্রণা আমি এখনও বহন করে চলেছি। মাসের পর মাস ব্যাথা, যন্ত্রনায় আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারতাম না। বিদেশে অর্থকষ্টে পড়ে ও মেডিক্যল ইন্সুরেন্স না থাকায় চিকিৎসাও নিতে পারিনি দীর্ঘদিন।
আক্রমণের পরদিন ২২ জুন ২০২২ আমাকে ভারতে পালিয়ে যেতে হয়েছিল, কারন আক্রমনের দিন দুইজন ব্যক্তির কারনে আমি প্রাণে বেঁচে ফিরলেও আক্রমনকারী জঙ্গি আমাকে হুমকি দিয়েছিল পরদিন (২২ জুন) মসজিদ থেকে শত শত মুসল্লি নিয়ে আমাকে যেখানে পাবে সেখান থেকেই টেনে হিঁচড়ে বের করে পেটাতে পেটাতে মেরে ফেলবে। আরো হুমকি দেয় তারা সংখ্যায় অনেক, আমি একা, আমার কিছুই করার থাকবে না। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই তারা মানুষের মানবাধিকার হরণ করেও সেটাকে জায়েজ করার চেষ্টা করে। ইন্ডিয়ায় গিয়ে সেখানে দীর্ঘদিন প্রচণ্ড অর্থকষ্টে থাকতে হয় কারন আমার হাতে খরচ করার মতো যথেষ্ট টাকা পয়সা নিতে পারিনি। ২১ তারিখ সন্ধ্যায় আক্রমনের শিকার হয়ে পরদিন ২২ তারিখ ভোরের আলো ফোটার আগেই আমাকে ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে পালিয়ে যেতে হয়।
২০২৫ সালের ৯ মার্চ, গ্রামের বাড়িতে হামলা
২০২৫ সালের ৯ মার্চ রাতের আঁধারে একদল লোক আমার গ্রামের বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পাঁচিলের মূল গেট ধরে ধাক্কা দিয়ে তাঁর নাম ধরে গালিগালাজ করে এবং “পেলেই জবাই করে মারব” বলে চিৎকার দেয়। পরে জানা যায়, এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর অনুসারীরা এই তাণ্ডব চালায় – কারণ আমি আমার লেখায় বাংলাদেশের স্বঘোষিত গ্র্যান্ড মুফতি দাবীদার ডক্টর এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর নাস্তিক হত্যার হুমকি ও উৎসাহ দেয়া সম্বলিত বক্তব্যের সমালোচনা করেছিলাম।
চলমান হুমকি
আমাকে রাসূলের দুশমন তথা ‘শাতিমে রাসূল’ আখ্যায়িত করে আমাকে হত্যার হুমকি দিয়ে প্রতিনিয়ত আমাকে ফেসবুক কমেন্টে ও ম্যাসেজে অনেকে হুমকি দেয়। বেশ কয়েক বছর আগে আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক হিন্দু সনাতনীদের একটি গ্রুপ ইসকনের বিরুদ্ধে মানুষকে উসকে দেয়, যার ফলশ্রুতিতে দেশে কয়েক জায়গায় ইসকনের সদস্যদের উপর আক্রমনের ঘটনা ঘটে। আমি এর প্রতিবাদ করায় ইলিয়াসের সমর্থকরা আমাকে ইসকনের দালাল আখ্যায়িত করে কুকুরের মতো মারার হুমকি দেয়।
রেইপিস্টদের বিরুদ্ধে লেখার একটি সূত্রে আমি উল্লেখ করেছিলাম ইসলামের নির্দেশিত নারীদের বাধ্যতামূলক পোশাক হিজাব ধর্ষণ কমাতে পারে না। মুসলমানদের অনেক ধর্মগুরু দাবী করে থাকেন হিজাব পরলে মেয়েরা নিরাপদ থাকে, ধর্ষিত হয় না। আমি এর বিপক্ষে পরিসংখ্যান দিলে মাওলানা মামুনুল হকের এক অনুসারী আমাকে প্রকাশ্যে হত্যা করার জন্য তার সহযোগীদের নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য যে, মাওলানা মামুনুল হক ২০২৬ এর জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর ও কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক উগ্র সংগঠন হেফাজতে ইসলামের একজন শীর্ষ নেতা। দেশে ইসলামের নামে উগ্র বক্তব্য দেয়ার নজির রয়েছে তার।
২০২৫ এর মার্চ মাসে এক লোক আমাকে গালি দিয়ে সামনে পেলে আল্লাহর নামে জবাই করার হুমকি দেন। আমি ইসলামের প্রবর্তক নবী মোহাম্মদের কিছু নীতি ও কাজের সমালোচনা করে একটা লেখা লিখেছিলাম। যার প্রেক্ষিতে তিনি এই হুমকি দেন। এটি অনেকগুলো থেকে একটি মাত্র উদাহরণ।

ইরানের কট্টর ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করার কারণে এখনও আমাকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে নিয়মিত হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমাকে হত্যার হুমকি দিয়েই তারা ক্ষ্যন্ত হচ্ছেন না, তারা আমার বৃদ্ধা মা’কে, আমার বোনকে ধর্ষন করারও হুমকি দিচ্ছেন।
আমি বাংলাদেশে মুক্তচিন্তা বিকাশে খুব সামান্য অবদান রাখতে পেরেছি বা রাখছি। এতেই আমার উপর এতো হুমকি, নির্যাতন! এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশে মুক্তচিন্তকদের জীবনের দুর্দশার একটি খন্ডিত চিত্র মাত্র। নাস্তিক, মানববাদী, মুক্তচিন্তকরা বাংলাদেশে সবচেয়ে সংখ্যালঘু – তাদের পক্ষে কথা বলার মতো কেউ নেই।
মৌলবাদী নেতাদের প্রকাশ্য হুমকি ও রাষ্ট্রের নীরবতা
মৌলবাদী নেতা ও বাংলাদেশের প্রধান মুফতি দাবিদার ডক্টর এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এ প্রকাশ্য জনসভায় বলেন, নাস্তিকদের সমালোচনা যদি তাদের বাক স্বাধীনতা হয়, তাহলে তাদের কল্লা কাটা মৌলবাদীদের হাতের স্বাধীনতা। যারা নবী মোহাম্মদের সমালোচনা করবে তাদের প্রকাশ্যে হত্যার জন্য তিনি তার অনুসারীদের উদ্দেশ্যে আহবান জানান। এটি ছিল ঢাকার প্রধান মসজিদ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গনে, শত শত মানুষের সম্মুখে। প্রকাশ্যে এমন হুমকি দিলেও সরকার তার বিরুদ্ধে কিছুই করেনি। তিনি এখনো প্রতিদিন হেলিকপ্টারে করে দেশের এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত পর্যন্ত ঘন্টায় লক্ষ টাকার বিনিময়ে ইসলামী বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছেন।
এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এমনভাবে জঙ্গিবাদ ও জেহাদ উসকে দিচ্ছেন বাংলাদেশের প্রাধান অনেক ইসলামী বক্তা। বিভিন্ন সময়ে এমন অনেকের বক্তব্য সোস্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়ায়। মাহমুদুল হাসান গুনবী, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা ময়জুল হক, মাওলানা মুফতি কাজী ইব্রাহীম, আবু ত্বহা আদনান, মাওলানা জসিমুদ্দিন রাহমানীসহ এমন শতাধিক ধর্মীয় নেতা আছেন এই তালিকায়। গত বছর এদের অনেককে সরকারের নির্দেশে জেল থেকে মুক্তিও দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে বারবার দেখা গেছে, রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে ভিকটিমকে সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে উল্টো তার বিরুদ্ধে মামলা নেয় এবং মৌলবাদীদের তুষ্ট করার জন্য নানান উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর অনেক উদাহরণ আছে। সুনামগঞ্জের ঝুমন দাস একজন প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ফেসবুকে সামান্য এক পোস্ট দেয়ার অভিযোগে মৌলবাদীরা দলবেঁধে তার সম্প্রদায়ের উপর ভয়াবহ তান্ডব চালায়। ঝুমন দাসকেই উল্টো গ্রেফতার করা হয়, তার জামিন হয়নি দীর্ঘদিন। বাংলাদেশের প্রথিতযশা ব্লগার, এক্টিভিস্ট আসিফ মহিউদ্দীন ২০১৩ সালে মৌলবাদী জঙ্গিদের দ্বারা আক্রমনের শিকার হয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরেন। কিন্তু উল্টো সরকার মামলা দিয়ে তাকেই কারাগারে প্রেরন করেছিল একই বছরে।
বাংলাদেশে পুলিশ গুরুতর অপরাধ দমনে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হলেও ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত অভিযোগ খুব দ্রুততার সঙ্গে আমলে নেয়। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মব জাস্টিস, গ্রেফতার খুব সাধারন ঘটনা বাংলাদেশে। খুব সামান্য ধর্মীয় সমালোচনাও বাংলাদেশে বড় করে দেখা হয়। মানুষের ধারনা ইসলাম ধর্ম সবার সেরা, সেখানে কোন ভুল থাকতে পারে না – কারন সেটা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রদত্ত বিধান। আমার জন্মজেলা সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়ায় কোরআন অবমাননার অভিযোগে ২৫ বছর বয়সী সোহাগ নামের এক যুবককে প্রথমে জুতার মালা পরিয়ে অপমান করে গণপিটুনি দেয় জনতা, পরে পুলিশ আটক করে ধর্ম অবমাননার মামলা দেয়। ছবি দেখা বোঝা যায় তাকে এমনভাবে গণপিটুনি দেয়া হয়েছে যে পুলিশের কাঁধে ভর দিয়েও তিনি ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছেন না।
আতাউর রহমান বিক্রমপুরী নামের এক ধর্মীয় নেতা ফেসবুক, হোয়াটসএ্যাপে গ্রুপ খুলে রীতিমতো শাতিম, মুরতাদদের হত্যার জন্য মিটিং করেন। ‘এন্টি শাতিম মুভমেন্ট‘ নামে তার এই উদ্যোগের পরেও সরকার তাকে কিছুই বলে না। বরং তার অনুসারীরা নবী মোহাম্মদ এর কাজের, কথার বা মতের সমালোচনাকারী তথা শাতিমকে হত্যার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি এঁকে প্রচারনা চালায়।
রাষ্ট্রীয় দমনের হাতিয়ারঃ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইন
২০১৮ সালে প্রণীত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) এবং ২০২৩ সালে প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) মুক্তচিন্তা দমনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই আইনের ২৮ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও সম্পাদক পরিষদ বারবার এই আইনের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের আইনগুলো ধর্মের সমালোচনাকারী, মুক্তমনা, নাস্তিক, হিউম্যানিস্ট ও সেক্যুলারদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এমনিতেই সমাজে তাদের অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়, দেশের আইনও তাদের বিপক্ষে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশই জনরোষ থেকে রক্ষার জন্য আগেভাগে গ্রেপ্তার করে বা গ্রেপ্তার করে মব তৈরিকারী জনতাকে শান্ত করে।
এমনকি আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকে জামিন অযোগ্য এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড দিয়ে আইন প্রনয়ন করার জন্য সরকারকে পরামর্শও দিয়েছিল। সাইবার নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় জামিন আবেদন নিষ্পত্তি করে এ মতামত দিয়েছিলেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ।
নির্বাসন ও নীরব দেশত্যাগ
শারীরিক আক্রমণ ছাড়াও বহু মুক্তচিন্তক ও লেখককে বাংলাদেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করা হয়েছে। আমিসহ তসলিমা নাসরিন, বন্যা আহমেদ, আসিফ মহিউদ্দীন, আসাদ নূর, নূর নবী দুলাল, আকাশ মালিক, আজম খান, গোলাম সারোয়ারসহ অনেকে এখন প্রবাসে থেকে লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা দেশে রয়ে গেছেন, তারা ছদ্মনামে লেখেন বা লেখালেখি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন।
বাংলাদেশে মুক্তচিন্তক, নাস্তিক, মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল লেখকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় – এটি একটি ধারাবাহিক, সংগঠিত, এবং রাষ্ট্র–সমাজের নীরব সমর্থনে চলা দমনচক্র। ধর্মীয় উগ্রবাদীরা প্রকাশ্যে হত্যার তালিকা তৈরি করে, ব্লগারদের বাড়ি-অফিসে হামলা চালায়, আর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ভুক্তভোগীদের রক্ষা করার বদলে প্রায়ই তাদেরই দোষারোপ করে “ধর্ম অবমাননা”র অভিযোগে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন দমনমূলক আইনে মুক্তচিন্তাকে অপরাধে পরিণত করা হয়েছে, ফলে লেখালেখি মানেই গ্রেপ্তার, মামলা, নজরদারি, বা জনতার হাতে লিঞ্চিংয়ের ঝুঁকি। এই বাস্তবতায় অনেকেই দেশ ছাড়া ছাড়া আর কোনো পথ দেখেন না – কারণ দেশে থাকা মানে নিজের জীবন, পরিবার, এবং ভবিষ্যৎকে প্রতিদিন মৃত্যুর হুমকির সামনে দাঁড় করানো।
আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF)-এর ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ১৮০টি দেশের মধ্যে নিচের দিকেই অবস্থান করছে। ২০২৪ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ১৬৫তম, আর ২০২৫ সালে কিছুটা উন্নতি হলেও তা মাত্র ১৪৯তম স্থানে – যা এখনো “খুবই গুরুতর” পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। এই সূচক রাজনৈতিক চাপ, আইনি দমননীতি, লেখক-সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, সেন্সরশিপ, এবং মিডিয়ার স্বাধীনতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। RSF-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে লেখক-সাংবাদিকদের ওপর মামলা, গ্রেপ্তার, নজরদারি, এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন (CSA/DSA) ব্যবহার করে দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা কন্ঠ ও সংবাদমাধ্যমকে কার্যত আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য করেছে। এই অবস্থান শুধু একটি সংখ্যা নয় – এটি দেখায় যে রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো মুক্তমত প্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয় না, বরং নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে।
ফ্রিডম হাউসের বার্ষিক Freedom in the World প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে “Partly Free” বা “আংশিক স্বাধীন” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে – যেখানে রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এবং আইনের শাসনকে মূল্যায়ন করা হয়। সংবিধানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, এবং নাগরিক অধিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এই অধিকারগুলো প্রায়ই সীমিত, নিয়ন্ত্রিত বা দমনমূলক আইনের মাধ্যমে খর্ব করা হয়। সাংবাদিক, ব্লগার, মানবাধিকারকর্মী, এবং মুক্তচিন্তকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, হুমকি, এবং অনলাইন নজরদারি দেখায় যে সংবিধানিক প্রতিশ্রুতি মাঠের বাস্তবতায় রূপ নিতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সূচকগুলো তাই শুধু দেশের অবস্থানই দেখায় না – এগুলো প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের ঘোষিত মূল্যবোধ ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে একটি গভীর বৈপরীত্য রয়েছে, যা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে।
বিভিন্ন দেশের সরকার – বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, নরওয়ে ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন – বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে ধারাবাহিক উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশে সাংবাদিক, ব্লগার, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক সমালোচকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, নজরদারি, এবং সহিংসতা একটি “গুরুতর সমস্যা” হিসেবে রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর “গুরুতর বিধিনিষেধ” ছিল এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সেন্সরশিপ ও অনলাইন দমননীতি ব্যাপক ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নও তাদের মানবাধিকার সংলাপে বারবার উদ্বেগ জানিয়েছে যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA/CSA) মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করে এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও গভীর উদ্বেগ জানায় প্রতিনিয়ত।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ (UNHRC) এবং ARTICLE 19-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে “in crisis” বা সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে বলে বর্ণনা করেছে। ARTICLE 19-এর গ্লোবাল এক্সপ্রেশন রিপোর্টে বাংলাদেশকে ধারাবাহিকভাবে সবচেয়ে নিচের স্তরে রাখা হয়েছে, যেখানে লেখক-সাংবাদিকদের ওপর হামলা, অনলাইন নজরদারি, সেন্সরশিপ, এবং দমনমূলক আইনকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকরা একাধিকবার বলেছেন যে বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতা, রাজনৈতিক সহিংসতা, এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বর দমনে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় উভয় পক্ষের ভূমিকা একটি “গভীর মানবাধিকার সংকট” তৈরি করেছে। Human Rights Watch-ও বলেছে যে লেখক, কবি, প্রকাশক ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর হামলা এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই মূল্যায়নগুলো দেখায় যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোতে বাংলাদেশকে এমন একটি দেশ হিসেবে দেখা হয় যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কাঠামোগতভাবে সীমিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
এসব মন্তব্য দেখায় যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ-ঝুঁকির দেশ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে সমালোচনামূলক মত প্রকাশ করা নিরাপত্তাহীনতার সমান।
উপসংহার
বাংলাদেশে মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন সহিংসতার সমষ্টি নয়। এটি একটি সুপরিকল্পিত ও কাঠামোগত দমন-প্রক্রিয়া – যেখানে কখনো সংগঠিত জঙ্গি, কখনো গণমানুষের উত্তেজিত ক্রোধ, মব জাস্টিস, কখনো রাষ্ট্রীয় আইন একসাথে কাজ করে বিকল্প কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রভাব সুস্পষ্ট। এক সময়ের প্রাণবন্ত অনলাইন কমিউনিটিগুলো এখন নিস্তব্ধ। ধর্ম, রাজনীতি ও মানবাধিকার নিয়ে আলোচনায় এখন সবাই অনেক বেশি সতর্ক। সবাই নিজের কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে বাধ্য হয় জীবন, সম্মান হারানোর ভয়ে। আত্মনিয়ন্ত্রণের এই সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক বিতর্কের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
১৯৭১ সালে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে জন্ম নেওয়া একটি মুক্ত, ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের আদর্শ আজ প্রতিটি চাপাতির কোপে, প্রতিটি জ্বলন্ত গাছে, প্রতিটি অনুত্তরিত হত্যার হুমকিতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।
যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে সমাজ আসলে নিজের দুর্বলতাকেই ভয় পায়।
Related Posts

Islam and the Qur’an must go through reform, otherwise Islam will be pushed aside
Historically, Islamic jurisprudence or classical fiqh developed within a specific social and political context, whichRead More

ইসলাম ও কোরআনকে রিফর্মের মধ্য দিয়ে যেতে হবে অথবা ইসলাম ছিটকে পড়বে
ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ক্লাসিক্যাল ফিকহ একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছিল, যাRead More

Reading the Qur’an, its translations, tafsir, sirah and hadith – no person with common sense can remain in Islam
Will you continue to remain a blind believer? Blind faith prevents a person from seeingRead More

Comments are Closed