Attack
Hindu Attacked for Speaking

Hindu Attacked for Speaking

বাংলাদেশে “ধর্ম অবমাননা” আইনের অর্থই হলো সংখ্যালঘু নির্যাতনের নতুন এক বাহানা খোঁজা

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে দীপ্ত রায়ের বাড়ি, দোকান ও মন্দিরে হামলার ঘটনা নতুন কিছু নয়। এটি একটি দীর্ঘ, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং প্রায় অনুমানযোগ্য প্যাটার্নের অংশ – যেখানে একটি ফেসবুক পোস্ট, সত্য হোক বা মিথ্যা হোক, রূপান্তরিত হয় গণপিটুনিতে, ঘরবাড়ি ভাঙচুরে, মন্দিরে আগুনে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বৈধতা দেওয়া হয় “ধর্ম অবমাননা” নামক একটি ধারণার আড়ালে – যা আধুনিক গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী মৌলিকভাবে সমস্যাজনক। কিন্তু বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মের সেবক নামের তৌহিদী জনতারা তো কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি, মানবাধিকারের নীতি, বাক স্বাধীনতার ধারনা কিছুরই ধার ধারে না। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো তৌহিদী জনতার উন্মত্ত মবের সামনের সারিতে দেখলাম ছোট ছোট মাদ্রাসার ছাত্ররা! এই বয়সেই এদের মাথায় ইসলামের বিষ ঢুকিয়ে উন্মাদ বানানোর শুরু হয়ে গেছে।

আধুনিক উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার মেলবন্ধনের ওপর, যা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে কোনো আদর্শ, বিশ্বাস বা মতাদর্শই—তা ধর্মীয় হোক কিংবা রাজনৈতিক – সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। একটি মুক্ত ও প্রগতিশীল সমাজে মানুষের যেকোনো প্রতিষ্ঠিত চিন্তাধারা বা ধর্মকে প্রশ্ন করার, তার যৌক্তিক বিশ্লেষণ করার এবং এর প্রবক্তাদের ভুলত্রুটি নিয়ে জোরালো সমালোচনা করার অবিচ্ছেদ্য অধিকার রয়েছে। এই অধিকার কেবল মৃদু অসম্মতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রয়োজনে তীব্র ভাষায় নিজের ভিন্নমত বা ক্ষোভ প্রকাশ করার স্বাধীনতাও এর অন্তর্ভুক্ত, এমনকি কটুক্তি করাও সেই স্বাধীনতার অংশ। যখন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থা ধর্ম ও রাজনীতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও নাগরিকদের ভয়হীনভাবে প্রশ্ন তোলার এবং স্বাধীন মত প্রকাশের এই অধিকারকে আইনি ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেয়, তখনই সেখানে প্রকৃত উদারনৈতিক গণতন্ত্রের চর্চা নিশ্চিত হয়। কোনো মতবাদকে অলঙ্ঘনীয় বা পবিত্র ঘোষণা করে জনমানুষের কণ্ঠ রোধ করা মূলত গণতান্ত্রিক চেতনারই পরিপন্থী।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ ২০১১ সালে “ধর্মের অবমাননা” সংক্রান্ত প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়, কারণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে – আইন মানুষকে রক্ষা করে, বিশ্বাসকে নয়। ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার নামে আইন প্রণয়ন করলে তা বাকস্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং সংখ্যালঘু কণ্ঠস্বরকে দমন করার হাতিয়ারে পরিণত হয়। আইনের কাজ দীপ্ত রায়, উৎসব মন্ডল, ঝুমন দাস, দীপু চন্দ্র দাস – অর্থাৎ মানুষকে রক্ষা করা। কোন দেশের আইন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যখন তার নাগরিককে রক্ষা করার বদলে সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেয় তবে বুঝতে হবে সেই দেশের আইন ও ব্যবস্থা একটা অসভ্যতার বৃত্তে আটকে আছে এখনো।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আশঙ্কা কাল্পনিক নয় – এটি বাস্তব এবং বারবার প্রমাণিত।

বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (বা তার উত্তরসূরী সাইবার নিরাপত্তা আইন) এবং দণ্ডবিধির ২৯৫(ক) ধারা কার্যত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একটি নির্ভরযোগ্য অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। প্যাটার্নটি এমনঃ

প্রথমত, অভিযোগঃ একটি ফেসবুক পোস্ট – প্রায়শই স্ক্রিনশট আকারে, প্রায়শই প্রসঙ্গ বিচ্ছিন্ন, কখনো কখনো নকল বা হ্যাক করা অ্যাকাউন্ট থেকে – ছড়িয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, তৌহিদী জনতার বিচারঃ যাচাই-বাছাই ছাড়াই “উত্তেজিত তৌহিদী জনতা” হামলা করে। ঘর ভাঙে, মন্দির পোড়ে, মানু মরে, মানুষ পালায়।

তৃতীয়ত, পুলিশের ভূমিকাঃ পুলিশ ভুক্তভোগীকেই “নিরাপত্তার জন্য” হেফাজতে নেয় – অর্থাৎ অভিযুক্তকে নয়, বরং হামলাকারীদের থেকে বাঁচাতে পালিয়ে বেড়ানো মানুষটিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

চতুর্থত, বিচারহীনতাঃ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে সাধারণত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এখন পর্যন্ত এমন কোন নজির দেখা যায়নি।

এই চক্রটি এতটাই সুপরিচিত যে একে আর “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলার উপায় নেই।

মজার বিষয় হলো, ইসলামের অনেক বক্তা নিজেরাই অন্য ধর্ম নিয়ে বা এমনকি ইসলাম নিয়ে যা বলেন, সেই একই কথা একজন হিন্দু ধর্মের মানুষ ইসলাম সম্পর্কে বললে তার পরিণতি হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এই দ্বিমান কেবল ব্যক্তিগত পক্ষপাত নয় – এটি একটি সামাজিক সমস্যা। যখন “ধর্ম অবমাননা” আইন কার্যত শুধুমাত্র সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধেই প্রয়োগ হয়, তখন সেই আইন আর ন্যায়বিচারের হাতিয়ার থাকে না – সেটা হয়ে ওঠে বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

কুমিল্লায় যদি পূজামণ্ডপে কুরআন রাখার মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে সহিংসতা ছড়ানো সম্ভব হয়, তাহলে প্রশ্ন জাগে – এই “ধর্ম অবমাননা” আসলে ধর্মের অবমাননার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া, নাকি পূর্বপরিকল্পিত সহিংসতার একটি সুবিধাজনক অজুহাত? একবার ভেবে দেখুন তো কুমিল্লায় হনুমানের পায়ে কোরআন রাখার কাজটা গদা ইকবাল না করে যদি সুব্রত মন্ডল নামের কেউ করতো তাহলে তাকে এই পৃথিবীতে আস্ত রাখতো তৌহিদী জনতা? কত বেশি তান্ডব হতো, কত ঘরবাড়ি আগুণে পুড়তো – একবার কল্পনা করে দেখুন। গদা ইকবালের কী হয়েছে? কারন ইকবাল মুসলমান, সংখ্যাগুরু। এমনও হতে পারে ইকবালকে কোন চক্রান্তকারী ইসলামিস্ট ব্যবহার করেছিল হিন্দুদের নিধন করার উদ্দেশ্য নিয়ে।

বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা ও সকল নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র বারবার দুটি ভুল করেঃ

প্রথম ভুল – প্রতিরোধে ব্যর্থতাঃ সহিংসতার আগে গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও, উত্তেজনা তৈরির পর্যায়ে, রাষ্ট্র নিষ্ক্রিয় থাকে।

দ্বিতীয় ভুল – তৌহিদী জনতার চাপে নতি স্বীকারঃ পুলিশ “আইনশৃঙ্খলা রক্ষার” নামে মূলত যা করে তা হলো জনতার ক্রোধ প্রশমিত করতে অভিযুক্তকে বা মূল আক্রান্তকে গ্রেপ্তার করা – তদন্তের আগেই। এতে বার্তা যায় – তৌহিদী জনতা রাস্তায় নামলেই রাষ্ট্র তাদের হয়ে যায়।

এই দুটি ব্যর্থতা মিলে তৈরি হয় একটি পরিবেশ যেখানে সংখ্যালঘুরা জানে – তারা এমন এক ভূমিতে আছে যেখানে বিপদে পড়ার কোন নির্দিষ্ট সময় বা অযুহাত নেই, এমনকি ফেসবুকের পোস্ট বাটনে ক্লিক করার আগেই তাকে ইসলাম ধর্ম অবমাননাকারী বলে আক্রমন করা হতে পারে।

ইসলাম ধর্ম কি এতটাই ঠুনকো? এই প্রশ্নটি কেবল বাগাড়ম্বর নয়। যে ধর্ম চোদ্দশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আস্থা ধরে রেখেছে, সেই ধর্ম কি একজন তরুণের ফেসবুক পোস্টে সত্যিই “অপমানিত” হয়? যদি না হয়, তাহলে এই ক্রোধ কীসের? ইসলামিক বক্তা ও ইসলামিস্টরা তো ঘাটে, মাঠে, পথে, সোস্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত অন্য ধর্মের বিশ্বাস নিয়ে ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, সমালোচনা, হুমকি দেয় – তাতে তারা এতো ধৈর্য্য ধরে রাখে কিভাবে? তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্ম কি ইসলামের চেয়ে শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত? ইসলামিস্টদের আচরন দেখে তো তাই মনে হয়, দুইশো কোটি মানুষের ধর্ম এক উঠতি বয়সী যুবকের সামান্য ফেসবুক পোস্টে চিৎকাৎ হয়ে ভেঙ্গে পড়ে! ইসলামের বই পুস্তক, কোরান, হাদিস, সিরাত, তাফসির থেকে হুবুহু উদ্ধৃতি দিলেও দেখি এখন ধর্ম অবমাননার অভিযোগ দেন ইসলামিস্টরা! কি তাজ্জব ব্যাপার!

উত্তর সম্ভবত এখানে যে ধর্মীয় অনুভূতি আহত হওয়ার দাবিটি প্রায়শই আন্তরিক আধ্যাত্মিক বেদনা নয় – এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি পদ্ধতি। এটি সংখ্যালঘুদের মনে ভয় তৈরি করার, তাদের স্বেচ্ছায় নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার চাপ দেওয়ার একটি কৌশল। ইসলামিস্টদের জ্ঞান, বুদ্ধি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, দক্ষতা, যোগ্যতা কম থাকলেও তারা যে সংখ্যায় অনেক বেশি, এবং তাদের আছে কোটি কোটি উন্মাদ অন্ধ অনুসারী – সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমন চালিয়ে তাদের সেই সংখ্যার ক্ষমতা প্রদর্শন করে। যেহেতু রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে থাকে, তারা সেই ক্ষমতার প্রদর্শন একের পর এক করেই যায়।

বাংলাদেশে “ধর্ম অবমাননা” ধারণাটি সভ্য সমাজের জন্য অগ্রহণযোগ্য অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অর্থ ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয় – এর অর্থ হলো এই দাবি করা যেঃ

  • আইন সবার জন্য সমান হতে হবে।
  • কোনো মানুষের শারীরিক নিরাপত্তা একটি ফেসবুক পোস্টের উপর নির্ভর করতে পারে না।
  • রাষ্ট্র জনতার চাপে বিচার করতে পারে না।
  • বিশ্বাসকে সমালোচনা থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া মানবাধিকারের পরিপন্থী।

দীপ্ত রায়ের মন্দির ভাঙা হয়েছে, তৌহিদী জনতার তান্ডব কোথায় গিয়ে থামবে তাও অজানা। কিন্তু এই তাণ্ডব আসলে আরেকটি জিনিসকেও ভাঙছে – বাংলাদেশের সেই প্রতিশ্রুতিকে, যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমান নাগরিক হিসেবে বাঁচতে পারবে। ভারত তার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় বা অধিকারে কী করছে সেই প্রশ্ন এখানে অবান্তর। রাষ্ট্র হিসাবে যে বাংলাদেশ একের পর এক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে তা তো দৃশ্যমান।

Related Posts

Hindu Attacked for Speaking

In Bangladesh, the very meaning of the “blasphemy” law is to find a new pretext for persecuting minorities

The attack on the house, shop, and temple of Deepto Roy in Tahirpur, Sunamganj isRead More

Islam will not Survive Without Massive Reform

Islam and the Qur’an must go through reform, otherwise Islam will be pushed aside

Historically, Islamic jurisprudence or classical fiqh developed within a specific social and political context, whichRead More

Islam will not Survive Without Massive Reform

ইসলাম ও কোরআনকে রিফর্মের মধ্য দিয়ে যেতে হবে অথবা ইসলাম ছিটকে পড়বে

ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ক্লাসিক্যাল ফিকহ একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছিল, যাRead More

Comments are Closed