
Women and the Pink
নারী কি গোলাপী বা পিংক রঙ পছন্দ করে? এর পিছনে মনস্তত্ত্ব কী?
গত শীতে আমার বন্ধু লামিয়া ভাগ্নির জন্মদিনের উপহার কিনতে গিয়েছিল। দোকানি জামাগুলো সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললেন, “মেয়ের জন্য তো? পিংকটাই নিন, আপনারা মেয়েরা পিংকই ভালোবাসেন।” লামিয়া থমকে গেল। তার ভাগ্নির প্রিয় রং গাঢ় সবুজ, সে গাছ আর ফসলের মাঠ ভালোবাসে। তবু দোকানির কথাটা এমন নিশ্চিন্ত গলায় বলা হলো, যেন এটা প্রকৃতির নিয়ম। ফেরার পথে লামিয়া আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, গোলাপি কি সত্যিই মেয়েদের রং? নাকি আমরা মেয়েরা এটা পরি কারণ ছেলেরা আমাদের এভাবেই দেখতে চায়?”
প্রশ্নটা সহজ নয়। উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাসের কাছে যেতে হয়, আর ইতিহাস শুরুতেই চমক দেয়।
গোলাপি যখন ছিল পুরুষের রং
আঠারো শতকের ইউরোপে গোলাপি ছিল অভিজাতদের রং, নারী-পুরুষ দুজনেরই। ফরাসি রাজদরবারে সাটিনের গোলাপি কোট পরে ঘুরে বেড়াতেন ঠাটবাটওয়ালা পুরুষেরা। রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের প্রিয় সঙ্গিনী মাদাম দ্য পোমপাদুর গোলাপি রংটাকে এমন জনপ্রিয় করেছিলেন যে চীনামাটির বাসনের একটা বিশেষ গোলাপি শেড তাঁর নামেই পরিচিত হয়ে যায়। তখন রংটা ক্ষমতা আর বিলাসের চিহ্ন, দুর্বলতার নয়।
আরও অবাক করার কথা, ১৯১৮ সালে আমেরিকার একটি শিশুপণ্যের বাণিজ্য-পত্রিকা লিখেছিল, ছেলেদের জন্য গোলাপি আর মেয়েদের জন্য নীল। যুক্তিটা ছিল, গোলাপি “জোরালো ও দৃঢ়” রং, ছেলেদের মানায়। আর নীল “কোমল ও নাজুক”, মেয়েদের জন্য ঠিক। অর্থাৎ যে যুক্তিতে আজ গোলাপিকে নারীর রং বলা হয়, ঠিক উল্টো যুক্তিতেই একদিন তাকে পুরুষের রং বলা হয়েছিল। এতেই বোঝা যায়, রংয়ের নিজের কোনো লিঙ্গ নেই। আমরা তাতে অর্থ বসিয়ে দিই, তারপর ভুলে যাই যে অর্থটা আমরাই বসিয়েছিলাম।
বাজার যখন রং ঠিক করে দিল
তাহলে গোলাপি মেয়েদের হলো কীভাবে? উত্তরটা মূলত বাজারে। ১৯৪০-এর দশকের পর আমেরিকায় গোলাপি ধীরে ধীরে মেয়েদের দিকে সরে যেতে থাকে। ১৯৫০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের স্ত্রী মেমি আইজেনহাওয়ার এতই গোলাপি পরতেন যে “মেমি পিঙ্ক” নামটাই চালু হয়ে যায়। তখন গোলাপি হয়ে ওঠে গৃহিণীর রং, নরম, নিরীহ, সংসারী নারীর রং।
তারপর এল সত্তরের দশক। নারীবাদী আন্দোলনের ঢেউয়ে অনেক মা মেয়েদের গোলাপির বদলে ডুঙ্গারি আর নিরপেক্ষ রং পরাতে শুরু করলেন। কিন্তু আশির দশকে গর্ভাবস্থায় শিশুর লিঙ্গ আগেভাগে জানা সম্ভব হলো। এতে বাজারের সামনে সুবর্ণ সুযোগ খুলে গেল। বড় ভাইয়ের পুরোনো জামা ছোট বোন পরলে কোম্পানির বিক্রি বাড়ে না। কিন্তু “মেয়েদের আলাদা” আর “ছেলেদের আলাদা” জিনিস থাকলে প্রতিটি পরিবারকে দুবার কিনতে হয়। খেলনা, খাতা, জুতো, এমনকি রেজার আর কলমেও “মেয়েদের সংস্করণ” এল, গোলাপি রঙে, প্রায়ই বেশি দামে। একে এখন বলা হয় “পিঙ্ক ট্যাক্স”।
আমার পরিচিত এক শিক্ষিকা, সৃষ্টি আপা, একবার ঘটনাটা বলেছিলেন। তাঁর ছেলে ছোটবেলায় বোনের গোলাপি জলের বোতল নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল। বন্ধুরা এমন হাসাহাসি করল যে সে পরদিন থেকে আর ওটা ছোঁয়নি। আটবছরের একটা ছেলে শিখে গেল যে গোলাপি মানে “মেয়েলি”, আর মেয়েলি মানে লজ্জার। এই শিক্ষা কোনো বই থেকে আসেনি, এসেছে চারপাশের চোখ থেকে।
তাহলে কি সবই পুরুষের চোখের কারসাজি?
এবার লামিয়ার আসল প্রশ্নে আসা যাক। নারী কি পুরুষের দেখতে চাওয়া ভঙ্গিতেই নিজেকে সাজায়?
ব্রিটিশ লেখক জন বার্জার ১৯৭২ সালে লিখেছিলেন, পুরুষ কাজ করে আর নারী দৃশ্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ নারী শেখে যে সে কেবল কিছু করছে না, অন্যের চোখে কেমন দেখাচ্ছে সেটাও তার ভাবনার অংশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীর “মূল্য” যাচাই হয়েছে তার রূপে, বিয়ের বাজারে, ক্যামেরার লেন্সে। এই চাপের মধ্যে বড় হওয়া কেউ যদি নিজের অজান্তেই এমন রং বেছে নেয় যা “নারীসুলভ” বলে স্বীকৃত, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমরা যাকে “নিজের পছন্দ” বলি, তার অনেকটা আসলে ধার করা।

তবে গল্পটা এখানেই শেষ করলে অন্যায় হবে, কারণ নারীকে নিছক পুতুল ভাবাও এক ধরনের অবিচার। আমার পরিচিত এক ফেসবুক ফ্রেন্ড তিথি এক বছর ধরে ইচ্ছে করে গোলাপি পরা বন্ধ রেখেছিল। সে বলে, “আমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম আমি ‘অন্য রকম মেয়ে’।” পরে একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝল, গোলাপি এড়ানোটাও তো সেই একই খেলা। প্রথমে দেখানো হচ্ছিল “আমি মেয়েলি”, এখন দেখানো হচ্ছে “আমি মেয়েলি নই”। দুটোতেই ঘুরে-ফিরে অন্যের চোখেই থাকা। এখন সে গোলাপি শাড়ি পরে, কারণ রংটা তার ভালো লাগে। এটুকুই তার কাছে যথেষ্ট কারণ।
এখানেই গোলাপির সবচেয়ে মজার দিক। একই রং একসময় দুর্বলতার প্রতীক ছিল, আবার একসময় শক্তির। উত্তর প্রদেশের “গুলাবি গ্যাং” গোলাপি শাড়ি পরে নারী-নির্যাতনের বিরুদ্ধে লাঠি হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৭ সালে আমেরিকায় লাখ লাখ নারী মাথায় গোলাপি টুপি পরে প্রতিবাদে হেঁটেছিলেন। ২০২৩ সালের “বার্বি” সিনেমা গোলাপিকে একই সঙ্গে ব্যঙ্গ আর উদযাপন করেছিল। আর জাপানে গোলাপি সাকুরা অনেক সময় পুরুষ যোদ্ধার ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। রং একই, অর্থ বদলায় মানুষের হাতে।
আসলে প্রশ্নটা কী হওয়া উচিত
আমার মনে হয় “গোলাপি পুরুষের পছন্দ নাকি নারীর” প্রশ্নটাই কিছুটা ভুল জায়গা থেকে শুরু হয়। ইতিহাস বলছে, রংটা কখনো এক পক্ষের একার ছিল না। কখনো পুরুষ পরেছে, কখনো নারী, কখনো বাজার চাপিয়ে দিয়েছে। আর “নারী পুরুষের পছন্দে নিজেকে সাজায়” কথাটাও আধা-সত্য। সমাজের প্রত্যাশা সত্যিই আমাদের পছন্দকে আকার দেয়, কিন্তু সেই প্রত্যাশা শুধু পুরুষের কাছ থেকে আসে না। মা, দিদা, বান্ধবী, বিজ্ঞাপন, দোকানি, সবাই তাতে হাত লাগায়। অনেক নারী নিজেদের জন্য, নিজেদের আনন্দে, অন্য নারীদের চোখে প্রশংসা পাওয়ার জন্যও সাজেন। এগুলোকে সবই “পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি” বলে দিলে নারীর নিজের ইচ্ছাশক্তিকে অস্বীকার করা হয়।
আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, পছন্দটা কি আমার হাতে আছে? যে মেয়ে গোলাপি ভালোবেসে পরে, আর যে মেয়ে ভালোবাসে না বলে পরে না, দুজনেই স্বাধীন, যদি সিদ্ধান্তটা সত্যিই তাদের নিজের হয়। কিন্তু যে ছেলেটা গোলাপি বোতল ছেড়ে দিল লজ্জায়, কিংবা যে মেয়েটা সবুজ ভালোবেসেও গোলাপি পরল কারণ “সবাই তাই পরে”, তাদের পছন্দ তখনই আটকে গেল।
লামিয়ার ভাগ্নি শেষ পর্যন্ত সবুজ জামাটাই পেয়েছিল। জন্মদিনে সে গাছের ছবিওয়ালা সেই জামা পরে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াল। একদিন তার ছোট্ট বন্ধু ছেলেটা বলেছিল, “আমার একটা গোলাপি জামা আছে, দেখবি?” মেয়েটা বিনা দ্বিধায় বলল, “দেখা!” দুজনের কারও মনে হলো না যে এতে কিছু অদ্ভুত আছে।
হয়তো রংয়ের মুক্তি এভাবেই আসবে। বড় কোনো ঘোষণায় নয়, বরং এমন একদিন, যেদিন গোলাপি দেখে কেউ আর জিজ্ঞেস করবে না “এটা কার রং?” কারণ উত্তরটা সবাই জানবে: যে পরতে চায়, তার।
Related Posts

People knew that the Moon has no light of its own more than 1,150 years before the births of Muhammad and Allah; the story of the Moon splitting in two is a fanciful myth
Islam’s interest in the Moon seems endless. Months, days, dates, acts of worship, Eid, andRead More

মুহাম্মদ ও আল্লাহর জন্মেরও ১১৫০ বছর আগেই মানুষ জানতো চাঁদের নিজস্ব আলো নেই, চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার কেচ্ছা গাঁজাখোরি
চাঁদ নিয়ে ইসলামের আগ্রহের শেষ নেই। মাস, দিন, তারিখ, ইবাদত-বন্দেগী, ঈদ, রোজা সব চাঁদ কেন্দ্রিক।Read More

Humans cannot even see 1% of the beauty and colors of Earth and the universe! Are humans really the best of creation?
The human eye can generally detect visible light or color in the wavelength range ofRead More

Comments are Closed