
When a religious myth becomes inhumane
১২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ৫ বছর বয়সী ইমাম মাহদি যেভাবে ইরানের লক্ষ মানুষকে হত্যা করছে
ইরান সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানি, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সত্যটি সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থাকে – তা হলো ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এক ধর্মতাত্ত্বিক মিথের ওপর। শিয়া ইমামিয়া মতবাদে ১২ ইমামের ধারণা সুপরিচিত। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ১১তম ইমাম মৃত্যুর আগে তাঁর পাঁচ বছরের শিশুপুত্র – মুহাম্মদ আল-মাহদিকে – লুকিয়ে রাখেন, এবং সেই শিশু ৫ বছর বয়সে “গায়ব” হয়ে যান। এই শিশুই শিয়াদের মতে ১২তম ইমাম, যিনি ১,২০০ বছর ধরে অদৃশ্য অবস্থায় আছেন এবং একদিন ফিরে এসে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে বিষয়টি যাই হোক, ইরানের সমস্যা শুরু হয় যখন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খামেনি এই ধর্মীয় ধারণাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কেন্দ্রে বসিয়ে দেন। ইরানের সংবিধানে সরাসরি উল্লেখ করা হয় যে রাষ্ট্রটি পরিচালিত হবে “গায়ব ইমামের অনুপস্থিতিতে তাঁর প্রতিনিধি” দ্বারা। অর্থাৎ, ইমাম নেই – তাই আলেমরা নেতৃত্ব দেবে; নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করবে ধর্মীয় শ্রেণি; আর সেই শ্রেণির সর্বোচ্চ প্রতিনিধি হবেন সর্বোচ্চ নেতা – সুপ্রিম লিডার। এইভাবে একটি ধর্মীয় মিথকে রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎসে পরিণত করা হয়।
ফলাফল হলো – ইরানের জনগণের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয় ফ্যাসিজমের প্রতিষ্ঠা। ১,২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটি শিশুর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নীতি বানিয়ে ফেলা হয়, আর সেই অপেক্ষার নামে সুপ্রিম লিডারের হাতে অবারিত ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়। খামেনি যা বলবেন, সেটাই হবে রাষ্ট্রের আইন, নীতি, নৈতিকতা – সবকিছু। ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করার এই কৌশল ইরানের মতো ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ, জ্ঞানচর্চায় অগ্রসর জাতিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। এতো বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার পরেও আজ তারা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত।
ইরানের সংবিধানের Article 5 – এ বলা হয়েছে যেঃ
গায়বত (absence) অবস্থায় ‘হজরত সাহেব-এ-জামান’ – অর্থাৎ Hidden Imam – এর অনুপস্থিতিতে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নেতৃত্ব ও সার্বভৌম কর্তৃত্ব একজন ফকিহ (Guardian Jurist / Supreme Leader) পালন করবেন।
এখানে “Lord of the Age”, “Sahib al-Zaman”, “Hidden Imam” – সবই ১২তম ইমাম মাহদি-র উপাধি।
অর্থাৎ সংবিধান সরাসরি ঘোষণা করেঃ
- Hidden Imam এখন গায়ব অবস্থায় আছেন
- তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে একজন ফকিহ রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন
- সেই ফকিহই Supreme Leader
সংবিধানের প্রস্তাবনা (Preamble)–তেও উল্লেখ আছে যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেঃ
- ইমাম মাহদির প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি হিসেবে,
- এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থা তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করছে
(এ অংশটি গবেষণামূলক উৎসে বারবার উদ্ধৃত হয়, যদিও Article 5–এর মতো সরাসরি উদ্ধৃতি নয়।)
Article 107–110 তেও বর্ননা করা হয়েছে সেই অদৃশ্য ইমাম সম্পর্কে।
এই অনুচ্ছেদগুলো Supreme Leader–এর ক্ষমতা বর্ণনা করে – এবং এগুলোর ভিত্তি Article 5–এ বর্ণিত Hidden Imam – এর প্রতিনিধিত্ব। একটি মিথ, কুসংস্কার, ধর্মীয় অন্ধত্ব বছরের পর বছর ধরে এভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যার বৈধতা উৎপাদন করে।
এই ধর্মীয় স্বৈরশাসনের ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় বিচারব্যবস্থায়। সাম্প্রতিক জনবিক্ষোভকে কেন্দ্র করে একজন মানুষকে গত বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করা হলো, পাঁচ দিনের মধ্যে বিচার শেষ, এরপর ফাঁসি – এটাই ইরানের বাস্তবতা। অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ নেই, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই। অভিযোগ? “আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।” এই অস্পষ্ট, ধর্মীয়ভাবে আবেগপ্রবণ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে রাষ্ট্র যাকে খুশি তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী, ধর্মদ্রোহী বা “মোহারেব” ঘোষণা করতে পারে। কয়েক দিনের মধ্যে ২,৫০০-এর বেশি প্রতিবাদী মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, এবং আরও শত শত মানুষকে ইসলামের নামে ফাঁসি দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। রাষ্ট্রীয় অদক্ষতা ও সন্ত্রাসকে ধর্মীয় বৈধতা দেওয়ার এই প্রক্রিয়া মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইরানের জনগণ আজ যে বাক, ব্যক্তি স্বাধীনতাহীন দমন-পীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তার মূল কারণ এই ধর্মীয়-রাজনৈতিক নেক্সাস – যেখানে ধর্মকে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে। জনগণের কণ্ঠরোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন, নারীদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মূল, প্রতিবাদীদের মৃত্যুদন্ড – সবকিছুই “ইসলাম রক্ষা”র নামে বৈধতা পায়। অথচ বাস্তবে এটি একটি ক্ষমতালোভী ধর্মীয় শ্রেণির স্বার্থরক্ষা ছাড়া কিছুই নয়, যারা নিজেদের ক্ষমতার জন্য দিনের পর দিন মানবতা বিরোধী অপরাধ করে চলে।
ইরানের বিপ্লব একসময় মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কিন্তু সেই স্বপ্নকে গ্রাস করেছে ধর্মীয় স্বৈরশাসন। আজ ইরান এমন এক রাষ্ট্র যেখানে মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, মর্যাদা – সবকিছুই নির্ভর করে সুপ্রিম লিডারের ইচ্ছার ওপর। ১,২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটি শিশুর নামে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক কাঠামো ইরানকে আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে দমনমূলক রাষ্ট্রগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
ধর্ম যখন রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি হয়, তখন তা মানুষের বোধ-বুদ্ধিকে অবশ করে দেয়। ইরানের বর্তমান অবস্থা তারই নির্মম উদাহরণ – যেখানে ধর্মীয় মিথ, রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতা মিলেমিশে এক ভয়াবহ দমনযন্ত্র তৈরি করেছে। এই দমনযন্ত্রের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ – যারা স্বাধীনতা চায়, ন্যায় চায়, মানবিক মর্যাদা চায়। কিন্তু খামেনির শাসন তাদের সেই অধিকার কেড়ে নিয়েছে।
ইরানের জনগণ আজ যে সংগ্রাম করছে, তা শুধু রাজনৈতিক নয় – এটি মানবতার সংগ্রাম। ধর্মীয় ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, এবং সেই অন্ধকারের বিরুদ্ধে যা ১,২০০ বছরের পুরোনো এক মিথকে ব্যবহার করে পুরো জাতিকে বন্দি করে রেখেছে। এই সংগ্রাম কি শেষ পর্যন্ত ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে – স্বৈরশাসনের অন্ধকারে ডুবে থাকবে, নাকি মুক্তির আলো খুঁজে পাবে?
Related Posts

In Bangladesh, the very meaning of the “blasphemy” law is to find a new pretext for persecuting minorities
The attack on the house, shop, and temple of Deepto Roy in Tahirpur, Sunamganj isRead More

বাংলাদেশে “ধর্ম অবমাননা” আইনের অর্থই হলো সংখ্যালঘু নির্যাতনের নতুন এক বাহানা খোঁজা
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে দীপ্ত রায়ের বাড়ি, দোকান ও মন্দিরে হামলার ঘটনা নতুন কিছু নয়। এটি একটিRead More

Islam and the Qur’an must go through reform, otherwise Islam will be pushed aside
Historically, Islamic jurisprudence or classical fiqh developed within a specific social and political context, whichRead More

Comments are Closed