Sharia
Sharia Law and Justice

Sharia Law and Justice

ইসলামী শরীয়া আইনে নারীর অধিকার এবং আধুনিক ন্যায়বিচার প্রাপ্তি কি আদৌ সম্ভব?

২০০৮ সালে সোমালিয়ার কিসমায়ো শহরে ঘটে যাওয়া ১৩ বছরের কিশোরী আয়েশা ইব্রাহিম দুহুলোর নির্মম হত্যাকাণ্ডটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ধর্মীয় মৌলবাদ ও মধ্যযুগীয় শরীয়া আইনের পদ্ধতিগত ত্রুটির এক ভয়াবহ বাস্তব রূপ। গণধর্ষণের শিকার একটি শিশু যখন বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো “ব্যভিচার” বা “যিনা”র অভিযোগে অভিযুক্ত হয় এবং হাজারো মানুষের সামনে পাথর ছুড়ে (রজম) তাকে হত্যা করা হয়, তখন তা আধুনিক সভ্যতার বিবেককে চরমভাবে নাড়া দেয়। এই ঘটনাটি ইসলামী শরীয়া আইনের অধীনে নারীর অবস্থান, ধর্ষণের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আধুনিক মানবাধিকারের সাথে এর মৌলিক বিরোধের বিষয়গুলোকে গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে।

নিচে আয়েশা দুহুলোর ঘটনা এবং শরীয়া আইনের বিভিন্ন কাঠামোগত দিক বিশ্লেষণ করে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হলোঃ

‘ধর্ষণ’ ও ‘যিনা’র আইনি বিভ্রান্তি এবং প্রমাণের জটিলতা

ঐতিহ্যগত ইসলামী শরীয়া আইনে ‘ধর্ষণ’ (Rape)-কে একটি স্বাধীন বা পৃথক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার চেয়ে একে ‘যিনা’ (ব্যভিচার বা অবৈধ যৌন সম্পর্ক)-এর একটি জোরপূর্বক রূপ হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণাগত কাঠামোর কারণেই বিচারপ্রার্থী নারী নিজেই অপরাধী হিসেবে গণ্য হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।

  • চারজন পুরুষ সাক্ষীর শর্ত: শরীয়া আইনে যিনা বা জোরপূর্বক যিনা প্রমাণের জন্য চারজন প্রাপ্তবয়স্ক, সৎ মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর প্রয়োজন হয়, যারা অপরাধটি সরাসরি (চাক্ষুষ) সংঘটিত হতে দেখেছে। আধুনিক বাস্তবতায় কোনো ধর্ষক চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে অপরাধ সংঘটন করে না।
  • ডিএনএ ও আধুনিক ফরেনসিকের অস্বীকৃতি: অনেক রক্ষণশীল শরীয়া আদালতে ডিএনএ টেস্ট, মেডিকেল রিপোর্ট বা ফরেনসিক প্রমাণকে একক বা চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। এগুলোকে বড়জোর পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য (قرينة – Qarina) হিসেবে ধরা হয়, যা সর্বোচ্চ শাস্তি (হদ) কার্যকরের জন্য যথেষ্ট নয়।
  • অভিযোগকারীর উল্টো শাস্তি (কযফ): যদি কোনো নারী ধর্ষণের অভিযোগ আনেন এবং চারজন পুরুষ সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হন, তবে শরীয়া আইনের পরিভাষায় তা অনেক সময় ‘কযফ’ (কারো বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ দেওয়া) অথবা নারীর নিজের পক্ষ থেকে ‘যিনা’র স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য হতে পারে। ফলে ধর্ষিতা নারী নিজেই বেত্রাঘাত বা পাথর ছুড়ে হত্যার শিকার হন।

প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও ভিকটিম ব্লেমিং (Victim Blaming)

শরীয়া ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থায় এবং সামাজিক কাঠামোতে প্রায়শই ধর্ষণের দায় নারীর ওপর চাপানোর একটি পদ্ধতিগত প্রবণতা দেখা যায়।

  • পর্দা ও গতিবিধির ওপর দায় চাপানো: অনেক সময় যুক্তি দেওয়া হয় যে, নারী সঠিক নিয়মে হিজাব বা পর্দা না করায় পুরুষ “প্ররোচিত” হয়েছে। এছাড়া পুরুষ অভিভাবক (মাহরাম) ছাড়া নারীর বাইরে বের হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ধর্ষণের ঘটনাকে নারীর “অবাধ্যতা”র ফল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
  • পরিসংখ্যানের শুভঙ্করের ফাঁকি: শরীয়া শাসিত বা কট্টরপন্থী মুসলিম দেশগুলোতে কাগজের কলমে ধর্ষণের হার কম দেখানোর মূল কারণ আইনি ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব। ইউরোপ বা আধুনিক পশ্চিমা বিশ্বে যেখানে বৈবাহিক ধর্ষণ (Marital Rape)-সহ সম্মতির অনুপস্থিতিকে ধর্ষণের আওতায় এনে কঠোর আইন করা হয়েছে, সেখানে শরীয়া আইনে নারীরা লোকলজ্জা, সামাজিক বর্জন এবং উল্টো শাস্তির ভয়ে অভিযোগই করতে পারেন না।

দাসপ্রথা, যুদ্ধবন্দী এবং ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’

ইসলামের সমালোচকদের মতে, ক্লাসিক্যাল শরীয়া আইনে যৌন সম্মতির ধারণাটি সার্বজনীন নয়, যা আধুনিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।

  • ডান হাতের মালিকানা (দাসীবৃত্তি): ঐতিহাসিক ইসলামী আইন ও ঐতিহ্যগত তাফসীর অনুযায়ী, যুদ্ধবন্দী বা ক্রীতদাসীদের (যাদের কোরআনের ভাষায় “মা মালাকাত আইমানুকুম” বা ডান হাতের মালিকানাধীন বলা হয়েছে) সাথে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের সম্মতির আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল না।
  • নাবালিকা বিয়ে: শরীয়া আইনে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর আগেই মেয়েদের বিয়ের বৈধতা এবং স্বামীর সাথে শারীরিক সম্পর্কের সুযোগ রয়েছে, যা আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনে শিশু নির্যাতন ও শিশু ধর্ষণের শামিল।

আধুনিক বিশ্ব বনাম শরীয়া আইনঃ সক্ষমতার সংকট

একবিংশ শতাব্দীতে এসে শরীয়া আইন একটি সমতার সমাজ গঠনে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মূল কারণ এই আইনগুলো সপ্তম শতকের আরব উপদ্বীপের উপজাতীয় সংস্কৃতির সামাজিক বাস্তবতায় তৈরি।

তুলনামূলক দিকআধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ আইনঐতিহ্যগত শরীয়া আইন
মূল ভিত্তিমানবাধিকার, লিঙ্গ সমতা ও ব্যক্তিগত সম্মতি।ধর্মীয় অনুশাসন, পুরুষতান্ত্রিক অভিভাবকত্ব।
প্রমাণ্য দলিলডিএনএ, ফরেনসিক, মনস্তাত্ত্বিক প্রমাণ ও ভিকটিমের জবানবন্দী।চারজন চাক্ষুষ পুরুষ সাক্ষী বা অপরাধীর স্বীকারোক্তি।
বৈবাহিক ধর্ষণদণ্ডনীয় অপরাধ।স্বামীর যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ স্ত্রীর ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে গণ্য।
শাস্তির ধরণকারাদণ্ড, পুনর্বাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংশোধন।পাথর ছুড়ে হত্যা (রজম), বেত্রাঘাত বা অঙ্গচ্ছেদ।

ইসলামী শরীয়া আইন কোন সমাধান নয় …

আয়েশা ইব্রাহিম দুহুলোর ঘটনাটি কোনো সাধারণ বিচারিক ভুল ছিল না; এটি ছিল একটি ত্রুটিপূর্ণ আইনি দর্শনের যৌক্তিক পরিণতি। যখন একটি আইনি ব্যবস্থা অপরাধীর চেয়ে ভিকটিমের পোশাক, চরিত্র এবং লিঙ্গকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন ন্যায়বিচার অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ইসলামী শরীয়া আইনের উৎসগুলোকে (কোরআন, হাদিস ও ফিকহ) যদি যুগের উপযোগী করে সম্পূর্ণ সংস্কার বা বর্জন না করা হয়, তবে আয়েশাদের মতো নিরপরাধ নারীদের ধর্মের নামে এই নিষ্ঠুরতার শিকার হতেই হবে। একটি সভ্য, মানবিক ও প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের জন্য অলঙ্ঘনীয় ধর্মীয় আইনের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে সার্বজনীন মানবাধিকার এবং লিঙ্গ সমতাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ আইনি কাঠামো গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই।

Related Posts

Islam and Bengali Culture

Why do Islamist clerics consider Bengali cultural festivals their enemy?

This year, unlike many previous years, the major Hindu religious festival Durga Puja in BangladeshRead More

Islam and Bengali Culture

ইসলামিস্ট মোল্লারা কেন বাঙালিদের আনন্দ উৎসবকে তাদের শত্রু মনে করে?

এবার বাংলাদেশে অন্যবারের তুলনায় বেশ শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর পরিবেশে হিন্দু ধর্মের বড় ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজা হয়েRead More

Islamist cyber‑based jihad activities

Why do Islamist cyber‑jihadis insult, threaten, and file false reports against people with different opinions?

Maulana Azhari once advised Islamists that sharing his Facebook posts is also an Islamic act;Read More

Comments are Closed