Minorities
Rights of Minorities in Bangladesh

Rights of Minorities in Bangladesh

বাংলাদেশে তৌহিদী জনতার আক্রমন ও সংখ্যালঘুদের ধর্মচর্চার অধিকারে বাঁধাদান

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ ও কালী মন্দির প্রাঙ্গণে একটি বিশাল রাম মূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। নিজেদের জমিতে, নিজেদের অর্থে, নিজেদের উপাসনাস্থলে একটি মূর্তি স্থাপনের এই প্রকল্প সম্পূর্ণভাবে তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় চর্চার অংশ ছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত টিকল না। ইমাম উলামা পরিষদসহ স্থানীয় কিছু মৌলবাদী সংগঠনের আপত্তি, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের চাপে, এবং প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলা সমালোচনার মুখে, মন্দির কর্তৃপক্ষ “সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি” রক্ষার নামে নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হন। এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় – এটি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ধর্ম চর্চার অধিকার ক্রমাগত সংকুচিত হওয়ার দীর্ঘ ধারাবাহিকতার সর্বশেষ সংযোজন মাত্র।

কোনো ধর্ম বা ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি না করে নিজের মতো ধর্মচর্চা করবে – এটি কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়, এটি একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। একটি সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব মন্দিরের প্রাঙ্গণে নিজস্ব অর্থে একটি মূর্তি স্থাপন করলে তাতে অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীর “অনুভূতি আহত” হওয়ার দাবি তোলার নৈতিক বা আইনি ভিত্তি থাকতে পারে না। কারো ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী মূর্তিপূজা পাপ হতে পারে – কিন্তু সেই বিশ্বাস কেবল তাঁর নিজের আচরণের জন্য প্রযোজ্য, অন্য কারো উপাসনা পদ্ধতি নির্ধারণের অধিকার তাতে তৈরি হয় না। একজনের ধর্মতত্ত্ব আরেকজনের নাগরিক অধিকারের সীমানা নির্ধারণ করতে পারে না – এটিই বহুত্ববাদী সভ্য সমাজের প্রাথমিক শর্ত।

যখন কেউ বলে “মূর্তি বানিয়েছ, তাই ভাঙব” বা “মূর্তি বানাতে দেব না” – এই যুক্তি আসলে অন্যের ধর্মতত্ত্বকে নিজের ধর্মতত্ত্ব দিয়ে প্রতিস্থাপন করার দাবি, যা ফ্যাসিস্ট আচরণ। এটি সহাবস্থানের নীতি নয়, আধিপত্যের নীতি। আর কোনো রাষ্ট্র যদি এই দাবির কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে সেই রাষ্ট্র কার্যত স্বীকার করে নেয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুভূতি সংখ্যালঘুর সাংবিধানিক অধিকারের চেয়ে বড়।

পলাশবাড়ীর ঘটনা একা দাঁড়িয়ে নেই। বাংলাদেশে গত দেড় দশকে ভাস্কর্য ও মূর্তি নিয়ে সহিংসতা ও হুমকির একটি ধারাবাহিক ইতিহাস তৈরি হয়েছে। মতিঝিলে “বলাকা” ভাস্কর্য, বিমানবন্দর এলাকায় লালন শাহের ভাস্কর্য, হাইকোর্টের সামনে গ্রিক দেবী থেমিসের আদলে তৈরি ন্যায়বিচারের প্রতীক ভাস্কর্য – এসবই বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদী চাপের মুখে অপসারিত বা স্থানান্তরিত হয়েছে। প্রতি বছর দুর্গাপূজার মৌসুমে দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে প্রতিমা ভাঙচুরের খবর আসে। কোথাও কোথাও ধর্মপ্রচারকরা প্রকাশ্যেই ঘোষণা দেন যে তাদের জীবনের লক্ষ্য মূর্তি ধ্বংস করা। এই প্রবণতা নতুন নয় – ইসলামি ইতিহাসের প্রথম যুগেও প্রতিমা ও মূর্তি ধ্বংসের ঘটনা নথিভুক্ত আছে, এবং পরবর্তীকালে আফগানিস্তানে বামিয়ানের বৌদ্ধমূর্তি ধ্বংসের মতো ঘটনা সেই ঐতিহ্যেরই আধুনিক পুনরাবৃত্তি হিসেবে আলোচিত হয়।

এই ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে পলাশবাড়ীর ঘটনাটি একটি গুণগত পরিবর্তন নির্দেশ করে। আগে যা ছিল প্রধানত ভাঙচুর বা ধ্বংস – অর্থাৎ ইতিমধ্যে বিদ্যমান কিছুর ওপর আক্রমণ – এখন তা সম্প্রসারিত হয়েছে নির্মাণে বাধাদানে। অর্থাৎ এখন আর শুধু “তোমার মূর্তি আমি সহ্য করব না” নয়, বরং “তুমি মূর্তি বানাতেও পারবে না”। এটি প্রতিক্রিয়াশীল আক্রমণ থেকে পূর্ব-প্রতিরোধমূলক নিয়ন্ত্রণের দিকে একটি স্পষ্ট অগ্রগতি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে যা খুশি তাই করতে চাওয়াটা স্পষ্টত স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ।

“মূর্তি বনাম ভাস্কর্য” বিতর্কের ফাঁপা যুক্তি দেন অনেক বুদ্ধিজীবী – এই ধরনের প্রতিটি ঘটনার পর একদল বুদ্ধিজীবী একটি পরিচিত যুক্তি হাজির করেন – মূর্তি আর ভাস্কর্য এক জিনিস নয়, ভাস্কর্য শিল্প ও সংস্কৃতির অংশ, তাই তা রক্ষা করা উচিত, কিন্তু মূর্তি ধর্মীয় উপাসনার বস্তু বলে তা নিয়ে আলাদা সংবেদনশীলতা দরকার। এই পার্থক্য বিশ্লেষণাত্মকভাবে হয়তো অর্থপূর্ণ, কিন্তু এটি মূল প্রশ্নটি এড়িয়ে যায়। প্রশ্নটি এই নয় যে মূর্তি ও ভাস্কর্যের সংজ্ঞাগত পার্থক্য কী। প্রশ্নটি হলো – কারও নিজস্ব জমি, নিজস্ব অর্থ ও নিজস্ব উপাসনাস্থলে কোনো বস্তু স্থাপনের সিদ্ধান্তে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ করার অধিকার আছে কি না। সেই বস্তুটি ভাস্কর্য হোক বা মূর্তি, ধর্মনিরপেক্ষ শিল্পকর্ম হোক বা উপাসনার প্রতীক – এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর একই থাকা উচিত: না, নেই। সিম্পল এন্ড স্ট্রেইট-কাট।

মূর্তি-ভাস্কর্যের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে তর্ক করে এই বুদ্ধিজীবীরা কার্যত একটি বিপজ্জনক অনুমান মেনে নেন – যে “মূর্তি” নামক বস্তুটির ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার একটা যৌক্তিকতা থাকতে পারে, শুধু সংজ্ঞাটা ঠিকমতো প্রয়োগ করা দরকার। প্রকৃতপক্ষে মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে এই শ্রেণিবিভাগ অপ্রাসঙ্গিক হওয়া উচিত।

মালয়েশিয়ার উদাহরণ এবং একটি অপ্রয়োজনীয় যুক্তিও দেন অনেকে, অনেক সনাতনীকেও দেখেছি এই বলতে। পলাশবাড়ীর ঘটনার পর অনেকে যুক্তি দিয়েছেন – মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম-প্রধান দেশে যদি বিশাল রাম মূর্তি (বাতু কেভ মন্দিরে) থাকতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে কেন থাকবে না। তুলনাটি বাস্তব এবং কার্যকর, কিন্তু এই যুক্তির কাঠামোতেই একটি সমস্যা লুকিয়ে আছে। কারণ এই যুক্তি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয় যে মূর্তি স্থাপনের বৈধতা নির্ভর করে অন্য কোনো মুসলিম দেশের নজির আছে কি না তার ওপর। অর্থাৎ অধিকারটি প্রমাণসাপেক্ষ হয়ে ওঠে, স্বতঃসিদ্ধ থাকে না।

বাস্তবে এই তুলনার প্রয়োজনই হওয়া উচিত নয়। কোনো গোষ্ঠী তাদের নিজের সম্পত্তিতে যা খুশি নির্মাণ করতে পারে, যতক্ষণ না তা কারও শারীরিক বা প্রত্যক্ষ ক্ষতি করছে। অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীর কাছে সেই নির্মাণ আপত্তিকর মনে হলে, সেটি সেই ধর্মের অভ্যন্তরীণ ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যা – এটি রাষ্ট্রের আইন বা প্রতিবেশীর অনুমতির বিষয় হতে পারে না। কোনো সভ্য, ধর্মনিরপেক্ষ আইনি কাঠামোয় “আমার বিশ্বাসে এটা ভুল, তাই তুমি করতে পারবে না” একটি বৈধ যুক্তি হতে পারে না। মালয়েশিয়ার উদাহরণ টেনে আনতে হওয়াটাই বরং দেখিয়ে দেয় যে বাংলাদেশে অধিকারের প্রশ্নটি ইতিমধ্যে কতটা দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে নীতি না নতি তা দৃশ্যমান, বাংলাদেশের সরকারগুলো সবসময় তৌহিদী জনতার অন্যায় আবদারের কাছে নতি স্বীকার করে। পলাশবাড়ীর ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি মৌলবাদীদের প্রতিবাদ নয় – প্রতিবাদ করার অধিকার সবার আছে, এমনকি যাঁরা ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু তাঁদেরও। উদ্বেগের জায়গা হলো রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। প্রশাসনিক চাপে মন্দির কর্তৃপক্ষকে “সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি” রক্ষার অজুহাতে নিজেদের বৈধ নির্মাণকাজ স্থগিত করতে হয়েছে। এই ভাষা লক্ষণীয় – “সম্প্রীতি রক্ষা” শব্দবন্ধটি ব্যবহৃত হয়েছে এমন এক পরিস্থিতিতে যেখানে একপক্ষ কেবল নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করছিল, আর অন্যপক্ষ সেই অধিকার প্রয়োগে বাধা দিচ্ছিল। “সম্প্রীতি” শব্দটি এখানে প্রকৃতপক্ষে অন্যায়ের সঙ্গে আপসের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে – এবং আপসটি একতরফা, কারণ ছাড় দিতে হয়েছে কেবল সংখ্যালঘু পক্ষকেই।

যখন রাষ্ট্র এই ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে, তখন একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হয়: যে কোনো গোষ্ঠী যথেষ্ট সংখ্যায় রাস্তায় নামলে, যথেষ্ট জোরে প্রতিবাদ করলে, রাষ্ট্রীয় নীতি তাদের পক্ষে বদলে যাবে – আইন বা সংবিধান যা-ই বলুক না কেন। এটি আইনের শাসনের বিপরীত একটি ব্যবস্থা, যেখানে অধিকার নির্ধারিত হয় কোন পক্ষ বেশি সংগঠিত প্রতিবাদ করতে পারে তার ভিত্তিতে। বাংলাদেশে অবধারিতভাবেই তৌহিদী জনতার সংখ্যা বেশি।

বাংলাদেশের একাধিক সরকারের আমলে এই প্যাটার্ন বারবার দেখা গেছে – শেখ হাসিনার শাসনামলেও ভাস্কর্য অপসারণ ও বাধার ঘটনায় প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেওয়ার বদলে প্রায়শই সমঝোতার পথ বেছে নিয়েছে। সরকার পরিবর্তন হলেও এই কাঠামোগত দুর্বলতা পরিবর্তিত হয়নি। প্রশ্ন তাই থেকেই যায় – রাষ্ট্র কি সংখ্যালঘুর সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করবে, নাকি প্রতিটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে সোচ্চার ও সংগঠিত চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে?

ধর্মীয় সহনশীলতার আসল পরীক্ষা হয় তখন, যখন একটি ধর্মের অনুসারীকে অন্য ধর্মের আচার সহ্য করতে হয়, এমনকি তা তার নিজের বিশ্বাসের পরিপন্থী হলেও। একটি সমাজ তখনই বহুত্ববাদী, যখন কেউ নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারে অন্যের অনুমতি ছাড়াই, এবং অন্যের বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন সহ্য করতে পারে নিজের অনুমোদন ছাড়াই। পলাশবাড়ীর রাম মূর্তি নির্মাণ স্থগিত হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশে এই পরীক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েই বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

মূর্তি ভাঙা থেকে মূর্তি বানাতে না দেওয়া পর্যন্ত – এই অগ্রগতি প্রমাণ করে যে সমস্যাটি কোনো একক ঘটনার নয়, বরং একটি কাঠামোগত প্রবণতার, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভেটো ক্ষমতা ক্রমশ সাংবিধানিক অধিকারের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। যতদিন না রাষ্ট্র স্পষ্টভাবে ঘোষণা করছে যে নিজের সম্পত্তিতে নিজের অর্থে ধর্মচর্চার অধিকারে হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না – তা যত বড় সংখ্যাগরিষ্ঠ চাপই আসুক না কেন – ততদিন এই প্যাটার্ন পুনরাবৃত্ত হতেই থাকবে।

Related Posts

Islam and Bengali Culture

Why do Islamist clerics consider Bengali cultural festivals their enemy?

This year, unlike many previous years, the major Hindu religious festival Durga Puja in BangladeshRead More

Islam and Bengali Culture

ইসলামিস্ট মোল্লারা কেন বাঙালিদের আনন্দ উৎসবকে তাদের শত্রু মনে করে?

এবার বাংলাদেশে অন্যবারের তুলনায় বেশ শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর পরিবেশে হিন্দু ধর্মের বড় ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজা হয়েRead More

Islamist cyber‑based jihad activities

Why do Islamist cyber‑jihadis insult, threaten, and file false reports against people with different opinions?

Maulana Azhari once advised Islamists that sharing his Facebook posts is also an Islamic act;Read More

Comments are Closed