Human
Human Attraction

Human Attraction

মানুষের খোঁজে মানুষ

আজকের দিনে যখন ইউটিউব খুলি, ফেসবুক স্ক্রল করি, বা টিকটকের অন্তহীন ফিডে হারিয়ে যাই, তখন এক অদ্ভুত শূন্যতা চেপে ধরে। ভিডিও চলছে, ছবি ভাসছে, সংগীত বাজছে, কিন্তু মন আর ধরে না। একসময় যে ভিডিও দেখলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতাম, এখন তিন মিনিটও যেন অসহ্য। শর্টস, রিলস, টিকটক – এই ক্ষণস্থায়ী মাধ্যমগুলো আমাদের মনোযোগের পরিসরকে এতটাই সংকুচিত করেছে যে এক ঘণ্টার কোনো গভীর আলোচনা বা তিন ঘণ্টার কোনো প্রামাণ্যচিত্র দেখার ধৈর্য আর অবশিষ্ট নেই। অথচ এই অস্থিরতার মাঝেও একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে উঠছে – মানুষ এখনো মানুষের খোঁজে ফিরে যায়। রক্তমাংসের মানুষের কণ্ঠস্বর, তার দ্বিধা, তার ভুল, তার অসম্পূর্ণতা – এসবের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সেই টান, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত নির্মাণে পাওয়া যায় না।

আজকের কনটেন্টের জগৎ এক বিরাট কারখানা। এআই দিয়ে লেখা স্ক্রিপ্ট, অন্যের ভিডিও থেকে কপি-পেস্ট করা আইডিয়া, ধর্মীয় অনুভূতিকে উসকে দিয়ে এনগেজমেন্ট বাড়ানোর কৌশল – সব মিলে এক ধরনের যান্ত্রিক উৎপাদন চলছে। ভিউ বাড়বে, লাইক বাড়বে, অ্যালগরিদম খুশি হবে। কিন্তু দর্শকের মনে কি কিছু থাকে? প্রায়শই থাকে না। একটা ভিডিও শেষ হলেই পরেরটা চলে আসে, আর আগেরটার কোনো চিহ্ন থাকে না। এ যেন একটা অন্তহীন নদী, যার জল কখনো স্থির হয় না, কখনো গভীর হয় না। মানুষ এই নদীর তীরে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সে চায় এমন কিছু, যা তাকে থামিয়ে দেয়, ভাবায়, নাড়া দেয়।

এই নাড়া দেওয়ার ক্ষমতা আছে কেবল মানুষের তৈরি জিনিসের। একটা হাতে লেখা চিঠির কথা ভাবুন। আজকাল চিঠি লেখার রীতি প্রায় লুপ্ত। তবু যদি কোনো প্রিয়জনের হাতের দুই লাইন লেখা কোনো কাগজ হাতে আসে, ইলেকট্রনিক মাধ্যমেও আসতে পারে – হোক না সেটা অত্যন্ত সাধারণ, হোক না সেটা ব্যাকরণের ভুলে ভরা, না হোক সেটা সাহত্যিক – তবু সেটার ওজন আলাদা। সেই কালি, সেই কাঁপুনি, সেই অসম্পূর্ণ অক্ষরগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। চিঠি স্থায়ী – এ কথা আজও সত্য। কারণ চিঠি কেবল তথ্য বহন করে না, বহন করে উপস্থিতিকে। লেখকের শ্বাস, তার মুহূর্তের অনুভূতি, তার নিঃসঙ্গতা বা আনন্দ – সবকিছু সেই কাগজের ভাঁজে আটকে থাকে। ডিজিটাল বার্তা মুছে যায়, কিন্তু হাতে লেখা দুই লাইন বছরের পর বছর ধরে টেবিলের ড্রয়ারে পড়ে থাকে, আর প্রতিবার দেখলেই মন ভরে ওঠে।

মানুষের কনটেন্টও ঠিক তেমনই। একজন সাধারণ মানুষ যখন নিজের জীবনের কোনো অভিজ্ঞতা শেয়ার করে – তার ব্যর্থতা, তার দ্বিধা, তার ছোটখাটো আনন্দ – তখন সেটা শ্রোতার ভেতরে একটা আয়না হয়ে যায়। এআই-এর তৈরি নিখুঁত বক্তৃতায় এই আয়না নেই। কারণ এআই জানে না ব্যর্থতা কী, জানে না রাত জেগে ভাবার কষ্ট কী, জানে না কোনো সম্পর্কের ভাঙনের পর যে শূন্যতা আসে তার স্বাদ কী। মানুষের কণ্ঠে যে কাঁপুনি থাকে, যে বিরতি থাকে, যে হঠাৎ করে উঠে আসা আবেগ থাকে – সেগুলোই আসল। সেগুলোই দর্শককে বন্ধন দিয়ে ধরে রাখে।

শর্টস আর রিলসের যুগে এই বন্ধন তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ মনোযোগের বাজার এখন ক্ষণস্থায়ী। তিন সেকেন্ডে ধরতে না পারলে দর্শক চলে যায়। ফলে কনটেন্ট নির্মাতারা বাধ্য হন উত্তেজনা তৈরি করতে, ধর্মীয় বা জাতীয়তাবাদী অনুভূতিকে উসকে দিতে, বা এমন কোনো নাটকীয়তা তৈরি করতে যা সত্য নয় কিন্তু ক্লিক বাড়ায়। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায়। যা থাকে তা হলো একধরনের কৃত্রিম উত্তেজনা, যা শেষ হলেই ফাঁকা হয়ে যায়। অথচ মানুষ জানে, তার ভেতরে এখনো সেই ক্ষুধা আছে – গভীর কিছুর জন্য, ধীর কিছুর জন্য, অসম্পূর্ণ কিন্তু সত্য কিছুর জন্য।

সাহিত্যের ইতিহাস এই ক্ষুধার সাক্ষ্য দেয়। চিঠিপত্রের সাহিত্য, ডায়েরি, স্মৃতিকথা – এগুলো সবই মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতার দলিল। রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র, বিভূতিভূষণের স্মৃতি, জীবনানন্দের ডায়েরি – এগুলো পড়লে মনে হয় লেখক যেন পাশে বসে কথা বলছেন। কোনো এআই এই অনুভূতি তৈরি করতে পারে না, কারণ এআই-এর কোনো জীবন নেই। তার কোনো স্মৃতি নেই, কোনো ক্ষত নেই, কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। মানুষের তৈরি কনটেন্টের মূল্য ঠিক এখানেই – সে জীবনের ছাপ বহন করে।

আজকের ডিজিটাল যুগে এই ছাপ খুঁজে পাওয়া কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। কিছু নির্মাতা এখনো আছেন যারা ধীরগতির, গভীর, ব্যক্তিগত কনটেন্ট তৈরি করেন। তারা জানেন যে ভিউ কম হতে পারে, কিন্তু যারা দেখবেন তারা মনে রাখবেন। একটা ভালো পডকাস্ট, একটা নিখুঁতভাবে সম্পাদিত নয় এমন কিন্তু সৎ ভিডিও, একটা হাতে লেখা নোটের মতো অসম্পূর্ণ কিন্তু আন্তরিক ব্লগ পোস্ট – এগুলোই আজকের দিনের চিঠি। এগুলোই মানুষকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনে।

চিঠির স্থায়িত্বের কথাটা আবার বলি। চিঠি কেবল কাগজ নয়, চিঠি হলো সময়ের ওপর মানুষের দাবি। যখন কেউ কাউকে উদ্দেশ্য করে দুই লাইন লেখে, তখন সে সময়কে থামিয়ে দেয়। সে বলে – এই মুহূর্তটা আমার, এই অনুভূতিটা তোমার জন্য। ডিজিটাল কনটেন্টের অধিকাংশই এই দাবি করতে পারে না। তারা সময়কে অতিক্রম করতে চায়, কিন্তু সময়কে ধরতে পারে না। মানুষের কনটেন্ট সময়কে ধরে। সে বলে – আমি এখানে আছি, আমার এই অভিজ্ঞতা, আমার এই চিন্তা। তুমি যদি চাও, থেমে শোনো।

এই থেমে শোনার ক্ষমতাই আজকের সবচেয়ে বড় সংকট। আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি অবিরাম গতির সঙ্গে। কিন্তু মানুষের মন গতির পশু নয়। সে চায় বিরতি, চায় নিঃশব্দতা, চায় এমন কোনো কণ্ঠ যা তাকে নিজের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। রক্তমাংসের মানুষের কনটেন্ট সেই বিরতি তৈরি করে। সে বলে – আমিও ভয় পাই, আমিও ব্যর্থ হই, আমিও আনন্দিত হই। এই স্বীকৃতিই সবচেয়ে বড় সংযোগ।

ভবিষ্যতে এআই আরো নিখুঁত হবে, কনটেন্ট আরো বেশি উৎপাদিত হবে, অ্যালগরিদম আরো সূক্ষ্মভাবে আমাদের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু মানুষের ক্ষুধা অপরিবর্তিত থাকবে। সে খুঁজবে সেই কণ্ঠ, যেখানে ভুল আছে, যেখানে দ্বিধা আছে, যেখানে জীবনের ছাপ আছে। সে খুঁজবে সেই দুই লাইন, যা কেউ তার জন্য লিখেছে। হোক না সেটা খুব সাধারণ। কারণ সাধারণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অসাধারণের টান।

শেষ পর্যন্ত কনটেন্টের মূল্য নির্ধারিত হয় না ভিউ কাউন্ট দিয়ে, নির্ধারিত হয় সেই নাড়া দিয়ে যা দর্শকের বা শ্রোতার ভেতরে জেগে ওঠে। হাতে লেখা চিঠি যেমন বছরের পর বছর ধরে সেই নাড়া তৈরি করে, তেমনি মানুষের তৈরি সৎ কনটেন্টও সময়ের ওপর টিকে থাকে। এআই হয়তো নিখুঁত বাক্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু সে তৈরি করতে পারে না সেই অসম্পূর্ণতা, যা মানুষকে মানুষের কাছে টেনে আনে। আর সেই টানই চিরকালীন।

Related Posts

Muhammad Ali Jinnah

Jinnah was a thoroughly secular atheist, yet by playing the religious card he divided the country!

The first killing in India over writing and accusations of hurting religious sentiments took placeRead More

Muhammad Ali Jinnah

জিন্নাহ ছিলেন আপদমস্তক একজন সেকুল্যার নাস্তিক, অথচ ধর্মীয় কার্ড খেলে তিনি দেশ ভাগ করেন!

ভারতবর্ষে লেখালিখির কারনে ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে প্রথম কোন হত্যাকান্ড ঘটে কলকাতায়, ১৯২৪Read More

Women’s Jewelry: Then and Now

Bengali Women and Their Love for Jewelry: History, Modern Trends, and the Culture of Excess

When the first gold bangle was put on Nalini Devi’s wrist, she was only seven.Read More

Comments are Closed