
Bengali Women and Beauty
বাঙালি নারীর সৌন্দর্য যেনো তার শত্রু!
মানুষের শারীরিক সৌন্দর্যও বিজ্ঞান। কিন্তু বাংলার শ্বশুরবাড়ি-বিজ্ঞান বলে ভিন্ন কথা – নারীদের সৌন্দর্য এক ধরনের “প্রি-এক্সিস্টিং কন্ডিশন”, যার জন্য বীমা কোম্পানিও ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি নয়। বিয়ের কনে দেখতে যাওয়ার সময় পরিবারের সবাই একবাক্যে বলে, “মেয়েটা যা সুন্দর!”, ব্যাপারটা এমন – এই মেয়েকেই তাদের দরকার! আর বিয়ের ছয় মাস পর সেই একই পরিবার বলে, “সুন্দরী হলেই কি সংসার চলে?” – যেন সৌন্দর্য আর সংসার দুটো সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রাশি, একটা বাড়লে আরেকটা কমতে বাধ্য, নিউটনের তৃতীয় সূত্রের মতোই অমোঘ।
একদা যে শ্বশুরবাড়ির সবাই তাদের বাড়ির ছেলেকে বিয়ে দিয়ে সুন্দরী বউ অনতে ছিল বদ্ধপরিকর, তারাই নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়ে ফেলে সুন্দরী বউকে। তাদের মন্তব্যের ধরনও বেশ বৈচিত্র্যময় –
■ ননদ ভাববেঃ “এই বউ আসার পর আমার গুরুত্ব কমে গেল।”
■ জা ভাববেঃ “এত সুন্দর হলে রান্না করতে জানে তো? ঠ্যাঙ্গের উপর ঠ্যাং তুলেই খাবে।”
■ শাশুড়ি ভাববেঃ “রূপ দিয়ে আমার ছেলের মাথা খাবে।”
■ আর শ্বশুর? তিনি সাধারণত নীরব থাকেন। কারণ তিনি জানেন – এখানে কোন পক্ষে কথা বললে বিপদ।
বিনয়ীর সংকট, দেমাগীর দুর্ভোগ
বাঙালি সুন্দরী বউয়ের সামনে দুটো পথ খোলা থাকে – বিনয়ী হওয়া, অথবা একটু আত্মবিশ্বাসী হওয়া। দুটোই সমান বিপজ্জনক, ঠিক যেমন দুই রাস্তাতেই কুয়া, একটায় পানি কম, আরেকটায় পানি বেশি, কুয়াতে পড়তে আপনাকে হবেই।
বিনয়ী হলে বলা হয়, “ভাব দেখাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু মনে মনে ষোলোআনা অহংকার!” আর একটু আয়নার সামনে বেশি সময় দিলেই সেটা হয়ে যায় “রূপের দেমাগ” – যার বিচার বসে ননদ-জা এর যৌথ আদালতে, রায় ঘোষিত হয় রান্নাঘরের চুলার পাশে দাঁড়িয়ে, আর সাজা কার্যকর হয় প্রতিটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে টিপ্পনী কেটে।
অলিখিত সংবিধানের কিছু ধারা
শ্বশুরবাড়ি নামক প্রতিষ্ঠানের একটা অলিখিত সংবিধান আছে, যেখানে সুন্দরী বউদের জন্য আলাদা কিছু ধারা সংরক্ষিতঃ
ধারা ১ঃ কোনো কাজে সামান্য ত্রুটি হলেই তা রূপের সাথে সংযুক্ত করে বিচার করতে হবে। যেমন – “হ্যাঁ, সুন্দর বউ ঘরে নিয়ে আসছে… তাকেতো আবার কিছু বলা যাবে না…” (এখানে “কিছু বলা যাবে না” কথাটা বলার সময়েই আসলে অনেক কিছু বলে ফেলা হয়ে যায়, এটাই এই বাক্যের কারিগরি চমৎকারিত্ব)।
ধারা ২ঃ সৌন্দর্য আর দক্ষতা – দুটো একসাথে থাকা যাবে না, এমন একটা কাল্পনিক নিয়ম বলবৎ রাখতে হবে। “বউ সুন্দর হলেই হয় না শুধু, সাথে সংসারের কাজকামও কিছু করতে হয়…” — যেন এতদিন বউ শুধু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, রান্নাঘরের দরজাটা কোন দিকে সেটাই এখনো খুঁজে পায়নি।
ধারা ৩ঃ স্বামীকেও রেহাই দেয়া যাবে না। “সারাজীবন কি শুধু রূপ দেখেই কাটবে?” – এই প্রশ্নটা এমনভাবে ছোঁড়া হয় যেন সুন্দরী স্ত্রী পাওয়াটা একটা অপরাধ, আর স্বামী তার সহযোগী আসামি।
ধারা ৪ঃ কোনো প্রমাণ ছাড়াই “সারাজীবন রূপচর্চা করেই কাটবে?” জাতীয় ভবিষ্যদ্বাণীমূলক অভিযোগ আনা যাবে – এটা অনেকটা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো, ভুল হলেও কেউ জবাবদিহি করে না।
যে সংসারে সুন্দরও অপরাধ, আটপৌরেও অপরাধ
মজার ব্যাপার হলো, এই বিচারব্যবস্থায় সৌন্দর্য নিয়ে গর্ব থাকা আর না-থাকা – দুটোতেই সমান শাস্তি। রূপ নিয়ে অহংকার থাকলে “দেমাগী” আখ্যা জোটে, আর বিনয়ী হলেও কোনো একটা “ঊনিশ-বিশ” ঘটনা খুঁজে বের করে খোঁটা দেয়া হয়। এ যেন সেই পরীক্ষা, যেখানে উত্তর সঠিক দিলেও নম্বর কাটা যায়, ভুল দিলে তো কথাই নেই। আগের আমলের শিক্ষকদের মতো, বাংলা-ইংরেজি-সমাজ বিষয়গুলোতে সর্বোচ্চ মানের লিখলেও মার্ক সেই ৭০%, শিক্ষক নিজে লিখলেও অন্য শিক্ষকও ৭০% এর বেশি দিবেন না।
আসলে সমস্যাটা রূপে নয়, সমস্যাটা সেই মানসিকতায় – যেখানে একজন নতুন মানুষকে পরিবারে জায়গা দেয়ার বদলে তার প্রতিটা গুণ-অগুণকে অস্ত্র বানিয়ে ব্যবহার করা হয়। সুন্দরী হওয়া তার দোষ নয়, বরং তাকে “প্রতিদ্বন্দ্বী” ভাবাটাই দোষ। ননদ-জায়ের চোখে সুন্দরী বউ যেন পারিবারিক সৌন্দর্য-প্রতিযোগিতার এক অনাহূত প্রতিযোগী, যাকে হারাতে না পারলে অন্তত টিপ্পনী কেটে ছোট করে দিতে হবে।
শেষ কথা, তবে সমাধান নয়
সুখের বিষয়, সময়ের সাথে সাথে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষা, সচেতনতা আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাংলার অনেক পরিবারেই এই সেকেলে হিসাব-নিকাশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তবে যতদিন না “সুন্দর” শব্দটা কোনো পরিবারে অভিযোগ হিসেবে নয়, বরং স্বাভাবিক একটা বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে, ততদিন এই রম্য বাস্তবতা রয়েই যাবে – হাসতে হাসতে বলা এক করুণ সত্য, যার নাম “সুন্দরী বউয়ের বিড়ম্বনা”।
তবে বাহ্যিক চেহারা দিয়ে মানুষের সৌন্দর্যের মাপ নেয়া সমাজের রীতিটা বন্ধ হোক, মানুষের সৌন্দর্য ফুটে উঠুক তার বিনয়, সততা, জ্ঞান, দক্ষতা, স্মার্টনেস দিয়ে।
Related Posts

Islam’s Circular‑Logic Fallacy
Place: Cabin of a Dhaka–Sylhet-bound trainCharacters: Maulana Abdur Rahman (a responsible member of Tabligh Jamaat)Read More

ইসলামের সার্কুলার লজিক ফ্যালাসি
স্থান: ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনের কেবিনচরিত্র: মাওলানা আব্দুর রহমান (তাবলিগ জামাতের একজন দায়িত্বশীল) ও অধ্যাপকRead More


Comments are Closed