Fallacy

Islamic Fallacy

ইসলামের সার্কুলার লজিক ফ্যালাসি

স্থান: ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনের কেবিন
চরিত্র: মাওলানা আব্দুর রহমান (তাবলিগ জামাতের একজন দায়িত্বশীল) ও অধ্যাপক রেজওয়ান (সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী)


মাওলানা: প্রফেসর সাহেব, এত বই নিয়ে সফরে বের হলেন! আমরা তো এক জোড়া কাপড় আর একটা বিছানা নিয়েই বের হই। (হেসে) আসলে দুনিয়ার সব জ্ঞান এক কুরআনেই আছে।

রেজওয়ান: (হেসে) আপনার কথা শুনে কৌতূহল হচ্ছে, মাওলানা সাহেব। সবকিছুই কি আছে?

মাওলানা: জি, সবকিছু। ইসলাম আল্লাহর মনোনীত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। আপনি এত পড়াশোনা করেছেন, অথচ দ্বীনের আলো থেকে দূরে। আমার খুব কষ্ট হয়। মৃত্যুর পর কী হবে ভেবেছেন? কবরের আযাব, হাশরের ময়দান, পুলসিরাত পার হওয়া, তারপর জান্নাত অথবা জাহান্নাম।

রেজওয়ান: ভেবেছি বলেই তো প্রশ্ন আছে। জান্নাতের বর্ণনায় বলা হয় নদী, ফলমূল, হুর, সোনার থালা। জাহান্নামের বর্ণনায় আগুন, ফুটন্ত পানি, চামড়া পুড়ে গেলে নতুন চামড়া দেওয়া, যাতে আবার পোড়ানো যায়। একজন সসীম মানুষ সত্তর-আশি বছর জীবনে ভুল বা অবিশ্বাস করল, আর তার শাস্তি অনন্তকালের আগুন। এটা কি ন্যায়বিচারের সঙ্গে মেলে?

মাওলানা: আল্লাহ কারও ওপর জুলুম করেন না। তিনিই প্রকৃত ন্যায়বিচারক।

রেজওয়ান: তাহলে একটু ভাবুন। এক হাজার বছরের অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তিও তো সসীম হওয়ার কথা। অসীম শাস্তি আমাদের ন্যায়ের ধারণার সঙ্গে খাপ খায় না। তা ছাড়া জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনা পড়লে দেখবেন, সেগুলো সপ্তম শতকের আরব মরুভূমির মানুষের কল্পনার জগতের ছবি। মরুর মানুষের কাছে ছায়া, বহতা নদী আর ফলের বাগানই তো স্বর্গ। আর ভয় দেখিয়ে বিশ্বাস আদায় করা তো যুক্তি নয়, এটা ভীতি প্রদর্শনের ফ্যালাসি (Appeal to Fear)। “বিশ্বাস না করলে আগুনে পুড়বে” বললে সেটা সত্য প্রমাণ হয় না, শুধু ভয় পাইয়ে দেয়।

মাওলানা: ভাই, এটা ভয় নয়, সতর্কবার্তা। নবীরা সুসংবাদ আর সতর্কবার্তা দুটোই নিয়ে এসেছেন।

রেজওয়ান: সুসংবাদ আর সতর্কবার্তা সত্য হতে হলে আগে তো সেগুলোর উৎস প্রমাণ করতে হবে। এবার গল্পগুলোর কথা বলি। বোরাকে চড়ে এক রাতে মক্কা থেকে জেরুজালেম, তারপর সাত আসমান ভ্রমণ। চাঁদ দুই টুকরো হওয়া। সুলাইমান (আ.) পিঁপড়ার কথা বুঝতেন। নূহ (আ.)-এর নৌকায় পৃথিবীর সব প্রাণীর জোড়া। আধুনিক জীববিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, পদার্থবিদ্যা বলে, এগুলো ঘটেনি বা ঘটা সম্ভব নয়। চাঁদ ভেঙে গেলে পৃথিবীর অন্য কোনো সভ্যতা তার উল্লেখ রাখল না কেন? বিশ্বব্যাপী বন্যার প্রমাণ ভূতাত্ত্বিক স্তরে কোথায়?

মাওলানা: এগুলো মুজিজা। মুজিজা মানেই প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম। আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব।

রেজওয়ান: এটাই তো ফ্যালাসি, মাওলানা সাহেব। “আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব” কথাটা এমন, যা কোনো অবস্থাতেই ভুল প্রমাণ করা যায় না। যে দাবি কখনো ভুল প্রমাণ করা যায় না, তা বিজ্ঞানে অচল। একে বলে অপ্রমাণযোগ্যতা (Unfalsifiability)। আর কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল, তার প্রমাণ কী? শুধু পরবর্তীকালে লেখা বর্ণনা। এখানে কর্তৃত্বের কাছে আবেদন (Appeal to Authority) কাজ করে।

মাওলানা: কুরআন তো বলেই দিয়েছে, এর মতো একটি সূরাও কেউ বানাতে পারবে না। এটাই কুরআনের সবচেয়ে বড় মুজিজা।

রেজওয়ান: এই চ্যালেঞ্জটা ভালো করে দেখুন। “এর মতো বানাতে পারবে না” বলে নিজেই সাহিত্যের মান ঠিক করে দিল, আর বিচারকও কুরআনের অনুসারীরাই। কেউ বলল, আমি পারি। আপনারা বললেন, পারোনি। এটা নিজের সুবিধামতো লক্ষ্যখুঁটি সরানোর ফ্যালাসি (Moving the Goalposts)। তাছাড়া সাহিত্যিক সৌন্দর্য কোনো বিষয়ের ঐশ্বরিক উৎসের প্রমাণ নয়। হোমারের মহাকাব্য, শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ, সবই অনন্য। তাই বলে তাঁদের কেউ ঈশ্বর-প্রেরিত নয়।

মাওলানা: আপনি কুরআনের ভুল দেখাতে পারবেন না। কুরআন নিজেই বলেছে, এতে কোনো বৈপরীত্য নেই।

রেজওয়ান: ভালো কথা বললেন। এটা আবার একটা আত্মপ্রত্যয়ী দাবি (Self-referential Claim)। বইটা নিজেই বলছে যে সে নির্ভুল, আর সেই কথাই তার নির্ভুলতার প্রমাণ। এবার উদাহরণ দেখুন। কুরআনে আছে, জুলকারনাইন সূর্যকে কর্দমাক্ত ঝরনায় অস্ত যেতে দেখলেন। পাহাড়কে বলা হয়েছে পেরেক বা খুঁটি। মানুষের শুক্র নাকি পিঠ ও বুকের হাড়ের মাঝখান থেকে বের হয়। এগুলোর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আপনাদের আলেমরা “রূপক” বলেন। অথচ যখন আধুনিক বিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কারের সঙ্গে কোনো আয়াতের মিল খুঁজে পান, তখন সেটাকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে বলেন, “দেখো, ১৪০০ বছর আগেই কুরআনে ছিল!” সুবিধা হলে আক্ষরিক, অসুবিধা হলে রূপক। এটাকে বলে বেছে নেওয়ার ফ্যালাসি (Cherry Picking) আর বিশেষ সুবিধা আদায়ের ফ্যালাসি (Special Pleading)।

মাওলানা: (একটু চুপ থেকে) … আপনি অনেক কিছু বললেন। কিন্তু আপনি বুঝতে পারছেন না, ঈমান এমন এক নূর, যা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দেন।

রেজওয়ান: মাওলানা সাহেব, একটা অনুরোধ করি। আপনি আমাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরটা সহজ করে বলুন। ইসলাম সত্য কেন?

মাওলানা: কারণ মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর নবী।

রেজওয়ান: কে বলেছে যে তিনি আল্লাহর নবী?

মাওলানা: আল্লাহ বলেছেন।

রেজওয়ান: আপনি সেটা কীভাবে জানেন?

মাওলানা: এটা কুরআনে লেখা আছে।

রেজওয়ান: কুরআনকে কেন বিশ্বাস করব?

মাওলানা: কারণ এটা আল্লাহর বাণী, যা মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে নাজিল হয়েছে।

রেজওয়ান: আপনি সেটা কীভাবে জানেন?

মাওলানা: কারণ মুহাম্মদ (সা.) নিজে এটা বলেছেন।

রেজওয়ান: মুহাম্মদকে কেন বিশ্বাস করব?

মাওলানা: কারণ… তিনি আল্লাহর নবী।

রেজওয়ান: (মৃদু হেসে) ঠিক এখানেই আমরা পুরো একটা বৃত্ত ঘুরে এসে প্রথম কথায় ফিরলাম। দেখলেন? এটা একটা বৃত্তাকার যুক্তি (Circular Reasoning), ল্যাটিন ভাষায় Petitio Principii। যে কথাটা প্রমাণ করতে চাইছেন, সেটাকেই আপনি প্রমাণের ভিত্তি হিসেবে ধরে নিচ্ছেন। প্রমাণ শুরু হয় নবীকে দিয়ে, শেষও হয় নবীতে। বাইরের কোনো স্বাধীন সাক্ষ্য এখানে নেই। এটা শুধু ইসলাম নয়, যেকোনো ধর্মগ্রন্থ নিজেকে নিজে প্রমাণ করতে গেলে একই ফাঁদে পড়ে।

মাওলানা: (কিছুক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে) প্রফেসর সাহেব, আমি আপনার সঙ্গে তর্কে জিততে চাই না। আমি জানি, আমি আপনার মতো পড়াশোনা করিনি। তবে আমি জানি, আমার ঈমান আমাকে শান্তি দিয়েছে। আর আপনার এই জ্ঞান আপনাকে কী দিয়েছে?

রেজওয়ান: (নরম গলায়) আপনার প্রশ্নটা ভালো। আমি আপনার শান্তিকে অস্বীকার করছি না। মানুষ যে বিশ্বাসে শান্তি পায়, তাতে আমার আপত্তি নেই। আমার আপত্তি শুধু এই দাবিতে যে, সেটাই একমাত্র সত্য এবং যুক্তির দ্বারা প্রমাণিত। আমি প্রশ্ন নিয়ে বাঁচি, আর আপনি বিশ্বাস নিয়ে। দুজনই মানুষ।

মাওলানা: তাহলে একটা কাজ করুন। আপনি তো অনুসন্ধানী মানুষ। নিজের চোখে দেখুন। আমাদের সঙ্গে এক চিল্লার জন্য বের হন। চল্লিশ দিন। মসজিদে মসজিদে থাকবেন, মানুষের সেবা করবেন, আমাদের জীবন দেখবেন। তারপর আপনার প্রশ্ন যেখানে থাকার, সেখানেই থাকবে। হয়তো উত্তরও পেয়ে যেতে পারেন।

রেজওয়ান: (একটু ভেবে, হাসিমুখে) চল্লিশ দিন আমার গবেষণার ছুটির চেয়েও লম্বা! তবে অনুসন্ধানী হিসেবে আমন্ত্রণটা মনে রাখলাম, মাওলানা সাহেব। শর্ত একটাই: আমার প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকবে।

মাওলানা: (হেসে) প্রশ্ন করুন, জনাব। আল্লাহ তো প্রশ্নকারীদেরই পথ দেখান। চলুন, সিলেট আসতে এখনো অনেক দেরি। চা খাবেন?

Related Posts

Islam’s Circular‑Logic Fallacy

Place: Cabin of a Dhaka–Sylhet-bound trainCharacters: Maulana Abdur Rahman (a responsible member of Tabligh Jamaat)Read More

i need a break

A Break

1 When the morning sun falls on the tin roof of the Ulipur post office,Read More

i need a break

বিরতি

১ উলিপুর ডাকঘরের টিনের চালে ভোরের রোদ পড়লে জায়গাটা একটু একটু করে জেগে ওঠে। বারান্দারRead More

Comments are Closed