
Down with dictatorship
স্বৈরতন্ত্র, ধর্মীয় শাসন ও গণতন্ত্রের তুলনামূলক বাস্তবতাঃ ভেনেজুয়েলা থেকে বাংলাদেশ
রুবেন নামের ভেনেজুয়েলান ভদ্রলোকটির সঙ্গে আমার পরিচয় বহুদিনের। তিনি প্রতিদিনের শ্রমে ব্যস্ত, পরিবারকে সহায়তা করতে নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠান – ভেনেজুয়েলাতেই পাঠান বেশি, মাঝে মাঝে ব্রাজিলে। তিনি পেশায় একজন রংমিস্ত্রী, জীবন যুদ্ধে ছুটে বেড়ানো হাজারো অভিবাসীর মতো তিনিও এক বাস্তবতার প্রতিনিধি। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা নোবেল পুরস্কারের মতো বিষয় তাদের দৈনন্দিন জীবনের অগ্রাধিকার নয়। তবু মাচাদোর নোবেলজয়ের খবরটি যখন তাকে জানালাম, তার চোখেমুখে যে উচ্ছ্বাস দেখেছিলাম, তা এই শ্রমজীবী মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাংস্কৃতিক গর্ব ও জাতীয় পরিচয়ের গভীরতাকে স্পষ্ট করে।
রুবেনের মতো মানুষেরা প্রযুক্তিগতভাবে খুব দক্ষ নন – গুগলে খবর খোঁজা বা তথ্য যাচাই করার অভ্যাসও নেই। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক স্মৃতি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। ভেনেজুয়েলার অতীত সমৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পতন, এবং শ্যাভেজ–মাদুরো যুগের দুঃশাসন নিয়ে রুবেনের আক্ষেপ বারবার শুনেছি। তার কথায় স্পষ্ট – একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আদর্শ যখন বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার পরিণতি হয় অর্থনৈতিক পতন, সামাজিক অস্থিরতা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভাঙন।
ভেনেজুয়েলা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভান্ডারের দেশ, প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। তবে এত বিশাল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটির জনগণের সামগ্রিক সুখের মান মাঝারি – ২০২৪ সালের বিশ্ব সুখ সূচকে ভেনেজুয়েলার স্কোর প্রায় ৫.৬, যা বিশ্ব গড়ের কাছাকাছি হলেও উন্নত দেশের তুলনায় অনেক কম। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল সম্পদ থাকার পরেও তাদের জণগন এখন ঠিকমতো খেতে পায় না, জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় ওষূধ পায় না।
কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থা সাধারণত সমতা, ন্যায়বিচার ও শোষণমুক্ত সমাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় – ক্ষমতায় আসার পর তারা দ্রুতই authoritarian resilience–এর পথে হাঁটে (Levitsky & Way, 2010)। বিখ্যাত তত্ত্ব Authoritarian Resilience Framework অনুযায়ী স্বৈরশাসন টিকে থাকে তিন কারণে – দমন (Repression), সহযোগিতা (Co-optation) ও প্রচার (Propaganda)। কমিউনিস্ট শাসকেরা ক্ষমতায় আসার আগে নীতিপুস্তকে সুখী, সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখান, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় Authoritarian Resilience Framework এর বাস্তব প্রয়োগ। বিশ্বের কোথাও তারা তাদের সেইসব সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতির সফল উদাহরণ দেখাতে পারেননি। বর্তমানে যেসব দেশে কমিউনিজম প্রচলিত, সেসব জায়গায় গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, স্বৈরতন্ত্রের দাপট, বাকস্বাধীনতার সংকোচন এবং অর্থনৈতিক–সামাজিক অস্বস্তি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। নির্বাচন থাকলেও তা অনেক সময়ই হয় আনুষ্ঠানিকতা মাত্র; ক্ষমতাসীনরা যুগের পর যুগ ক্ষমতায় থেকে যান, জেঁকে বসেন জগদ্দল পাথরের মতো। রাশিয়া, চীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা -এসব দেশগুলো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
এই যে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে বিদেশী শক্তি উঠিয়ে নিয়ে গেল, দেশের জনগণের বড় অংশ হয়তো আপত্তি করলো না। কারণ জনগণের নীরব সমর্থন ছাড়া এমন কোনো অপারেশন বাস্তবায়ন করাই কঠিন। জণগন তাদের দমন-পীড়নের মুখে প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে এমনই কোন কিছুর জন্য যেনো অপেক্ষায় ছিল। দূর দেশ থেকে অনেক কথা বলা হলেও আপনি যদি ভেনেজুয়েলার খুব সাধারন একজন মানুষের মতামত নেন তবে দেখবেন তারা এই কথাই বলছে।
ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যর্থতার চিত্র দেখা যায়, সেটাও ঐতিহাসিকভাবে সফল বলে প্রমানিত হয়নি, বরং মানুষের জীবনে দূর্দশার কারন হয়েছে। ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রগুলোতে সাধারণত বাকস্বাধীনতা সীমিত, নারীর শিক্ষা ও চলাফেরার অধিকার সংকুচিত, মানবাধিকার ও ভোটাধিকার উপেক্ষিত থাকে। ইরান, আফগানিস্তান, সুদান, সিরিয়া – এসব উদাহরণ প্রায়ই আলোচনায় উঠে আসে। ধর্মীয় শাসনের নামে উগ্রবাদও বিশ্বকে ভোগাচ্ছে – আইএস, তালেবান, আল-কায়েদার মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো তার চরম উদাহরণ।
ভারতে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির উত্থানের ফলে হিন্দুত্ববাদী উগ্রতার বিস্তার নিয়েও অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সেখানে বর্তমান ধর্মাশ্রয়ী শাসকের ছায়ায় ধর্মীয় উগ্রবাদী জঙ্গিরা রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, এমনকি খেলাধুলার ক্ষেত্রেও তাদের প্রভাব রাখতে শুরু করেছে। একসময় বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত ভারত এখন এই উগ্রতার কাছে নতি স্বীকার করেছে – এমন মন্তব্যও শোনা যায়, বাস্তবেও দেখা যায়।
এই দুই ধরনের শাসনব্যবস্থারই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো – শত্রু চিহ্নিত করার প্রবণতা। কমিউনিস্ট শাসকেরা দেখায় ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’-এর ভয়, ইসলামী শাসকেরা দেখায় ‘মার্কিন আগ্রাসন’ বা ভিন্নধর্মী নাগরিকদের হুমকি, নাস্তিক-মানববাদীদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তারের ভয়। পাকিস্তান দেখায় ‘ভারত জুজু’, আর ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা দেখায় ‘পাকিস্তান জুজু’ – এমনকি নিজেদের দেশের মুসলিম ও খ্রিস্টান নাগরিকদেরও শত্রু হিসেবে তুলে ধরে তারা। সাম্প্রতিক একের পর এক মুসলিম হত্যা, খ্রিস্টানদের বড়দিনের উৎসব পন্ড করে দেয়ার মধ্য দিয়ে ভাতরের হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিরা তাদের ক্ষমতার প্রদর্শন করেছে।
বিশ্বের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সফল শাসনব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে – এমনটাই বহু গবেষকের মূল্যায়ন। যেসব দেশে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল, দৈনন্দিন জীবনে নিরাপদ, এবং আইনের শাসনে আস্থা রাখে – সেসব দেশ প্রায় সবই গণতান্ত্রিক। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান, কানাডা – এসব দেশ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
কিন্তু নামমাত্র গণতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনাও কম নয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণ বহুবার দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা, বাকস্বাধীনতার সংকোচন, দুর্নীতি, গুম–খুনের বিস্তার, বিচারব্যবস্থার অবক্ষয় – এসবই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে স্বৈরশাসনের বাস্তবতা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মুক্তিপ্রত্যাশী মানুষের গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় সরকারী দল ও সরকারী বাহিনির হাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ও পঙ্গুত্বের প্রমান দেখায় স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা কতটা নৃশংস ছিল তার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের পতন ঘটে এবং তারা দেশত্যাগে বাধ্য হন – ভারতে পালিয়ে যান।
২০২৪ সালের আগস্টের আগেও বাংলাদেশের বহু মানুষ আশা করত – কোনো বিদেশী শক্তি এসে তাদেরকে শেখ হাসিনা দুঃশাসন থেকে মুক্ত করবে। ভেনেজুয়েলার মতো যদি কোনো বিদেশী শক্তি ক্ষমতাসীনদের সরিয়ে নিত, অনেকেই রাস্তায় নেমে আনন্দ করত, বেশিরভাগ মানুষই সেটা সমর্থন করতো। কারণ জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো বিদেশী শক্তির পক্ষে এমন পদক্ষেপ নেওয়া প্রায় অসম্ভব। কোন বিদেশী শক্তি এই ধরনের অপারেশান শুধুমাত্র তখনই করতে পারে যখন নিজ দেশের জণগনই তাদের শাসকদের উপরে অতিষ্ট হয়ে যায় এবং তারা নিজেরা সেই দুঃশাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার রাস্তা খুঁজে পায় না।
Related Posts

Islam and the Qur’an must go through reform, otherwise Islam will be pushed aside
Historically, Islamic jurisprudence or classical fiqh developed within a specific social and political context, whichRead More

ইসলাম ও কোরআনকে রিফর্মের মধ্য দিয়ে যেতে হবে অথবা ইসলাম ছিটকে পড়বে
ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ক্লাসিক্যাল ফিকহ একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছিল, যাRead More

Reading the Qur’an, its translations, tafsir, sirah and hadith – no person with common sense can remain in Islam
Will you continue to remain a blind believer? Blind faith prevents a person from seeingRead More

Comments are Closed