Dignity
Dignity violations are a grave offense

Dignity Violations

রাষ্ট্র যখন মানুষের মর্যাদা নষ্ট করে তখন সে রাষ্ট্রকে আর সভ্য বলা যায় না

ইউটিউবে, ফেসবুকে এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক এবং ঢাকার আরও অনেক উন্মুক্ত স্থানের ভিডিও ঘুরছে। সেখানে দেখা যায় পুলিশ নানা বয়সের মানুষকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে, কারও গায়ে হাত তুলছে, কাউকে চড়-থাপ্পড় দিচ্ছে, আবার কোথাও লাঠি দিয়ে পিটিয়েও দিচ্ছে। বলা হচ্ছে, এসব জায়গাকে নাকি মাদকমুক্ত করার অভিযান চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো – রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি এভাবে যাকে-তাকে মারধর করতে পারে? পারে না। এটা শুধু অনৈতিক নয়, এটা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। একজন সাধারণ মানুষ যখন কাউকে আক্রমণ করে, সেটা যেমন অপরাধ, রাষ্ট্রের বাহিনী হয়ে পুলিশ যখন নিরপরাধ মানুষকে বা এমনকি অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত কাউকেও বিচারবহির্ভূতভাবে নির্যাতন করে, সেই অপরাধ আরও বড়, আরও ভয়াবহ। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার সবসময়ই ব্যক্তিগত অপরাধের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর।


আমেরিকার রাস্তাঘাটে, বাসস্টপে, ট্রেন স্টেশনে অসংখ্য হোমলেস মানুষ থাকে। তাদের অনেকেই নানা ধরনের অপরাধে জড়ায়, কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ, কেউ আবার আসক্ত। কিন্তু সেখানে পুলিশের আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপনি যদি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, পুলিশ এসে প্রথমে তাকে অনুরোধ করে সরে যেতে, সতর্ক করে দেয় যেন ওই এলাকায় আর না আসে। পরিস্থিতি একটু জটিল হলে হেলিকপ্টার টহল পর্যন্ত দেওয়া হয়, যাতে মানসিক চাপ তৈরি হয় এবং অপরাধপ্রবণতা কমে। অভিযোগ গুরুতর হলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে, কিন্তু তাও আইন মেনে, প্রক্রিয়া মেনে। দুই-চার দিনের জন্য আটক রাখে, আদালতে পাঠায়। বাংলাদেশের অনেক মানুষ মনে মনে ভাবতে পারে – “দুই-চারটা বেতের বাড়ি দিলে তো ভালো হতো!” কিন্তু সেখানে সেটা কল্পনাও করা যায় না। কারণ কেউ যদি অভিযোগ করে যে পুলিশ তার হাত জোরে ধরেছে, আর সেই কারণে তার হাত মচকে গেছে, তাহলে ক্ষতিপূরণ তো সে পায়ই, সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়। বিশেষ করে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকার পুলিশ আরও সতর্ক, আরও সংবেদনশীল।

মানুষের মর্যাদা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিষয়গুলোর একটি। আমি একজন নাগরিক হিসেবে কারও সমালোচনা করতে পারি, কারও আচরণ নিয়ে কটাক্ষ করতে পারি – এটা আমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় বাহিনী কখনোই কাউকে অপমান করতে পারে না, গায়ে হাত তোলা তো অনেক দূরের কথা। শাস্তি দেওয়ার অধিকার আদালতের, পুলিশের নয়। সভ্যতার মূল নিয়মই হলো – বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, আবেগ বা ক্ষমতার জোরে নয়। একজন মানুষ জন্মগ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র তার কিছু মৌলিক মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেয়। তাকে মানবাধিকারের চাদরে ঢেকে রাখা রাষ্ট্রের কর্তব্য। রাষ্ট্রীয় বাহিনী কাউকে কান ধরে উঠবস করাতে পারে না, কাউকে অপমানজনক ভাষায় হেয় করতে পারে না, কারণ এতে রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর সঙ্গে আরও একটি ভয়ংকর প্রবণতা যুক্ত হয়েছে – মোরাল পুলিশিং। সমাজে কিছু মানুষ, কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কিছু সদস্যও, নিজেদের নৈতিকতার বিচারক মনে করে অন্যের ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক, সম্পর্ক, চলাফেরা, এমনকি কার সঙ্গে কথা বলছে – এসব নিয়েও হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। মোরাল পুলিশিংয়ের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এটি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোথায় যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে, কী পরবে, কীভাবে সময় কাটাবে – এসব তার ব্যক্তিগত অধিকার। কিন্তু যখন রাষ্ট্র বা সমাজের কিছু অংশ নিজেদের নৈতিকতার রক্ষক সাজে, তখন তারা এই ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে। এতে সমাজে ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ এবং আত্মগোপনের সংস্কৃতি তৈরি হয়। মানুষ নিজের স্বাভাবিক আচরণকেও সন্দেহ করতে শুরু করে, ভাবতে থাকে – কেউ কি দেখছে, কেউ কি বিচার করছে, কেউ কি ভিডিও করছে। এই ভয় সমাজকে অসুস্থ করে তোলে।

মোরাল পুলিশিংয়ের আরেকটি ক্ষতি হলো এটি প্রকৃত অপরাধ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়। যখন পুলিশ বা সমাজের শক্তি ব্যয় হয় প্রেমিক-প্রেমিকা উদ্যানে বসেছে কিনা, কেউ রাতে হাঁটছে কেন, কেউ বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে কেন – এসব তুচ্ছ বিষয়ে, তখন প্রকৃত অপরাধী, প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ী, প্রকৃত সহিংস মানুষরা আরও স্বাধীন হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রের নজর ভুল জায়গায় আটকে থাকে। এতে আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হয়, অপরাধ বাড়ে, আর সাধারণ মানুষ আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়ে।

একটা উদ্যান কি নিষিদ্ধ এলাকা? মানুষ নেশা করতে যাওয়া ছাড়া আরও হাজারো কারণে রাতে উদ্যানে যেতে পারে। কারও থাকার জায়গা নেই, সে হয়তো সেখানে রাত কাটায়। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যায়। কেউ হাঁটতে যায়, কেউ নিঃশ্বাস নিতে যায়। আপনি যদি সন্ধ্যার পর কাউকে বাইরে থাকতে না দেন, সেটা সভ্যতা নয়, সেটা বর্বরতা। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এমন চিন্তা অবাস্তব, অমানবিক। ছাত্রছাত্রীরা যদি পড়ার টেবিল ছেড়ে বাইরে সময় নষ্ট করে, আপনি তাদের মোটিভেশন দিতে পারেন, কাউন্সেলিং করতে পারেন, কিন্তু তাদের মানবাধিকার কেড়ে নেওয়ার অধিকার আপনার নেই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিরাপত্তা দেওয়া, ভয় দেখানো নয়; পথ দেখানো, অপমান করা নয়।

মোরাল পুলিশিং, বিচারবহির্ভূত শাস্তি, এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার – এই তিনটি মিলেই একটি সমাজকে ধীরে ধীরে অসভ্যতার দিকে ঠেলে দেয়। মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা – এটাই সভ্যতার প্রথম শর্ত। রাষ্ট্র যদি সেই শর্ত ভঙ্গ করে, তাহলে সমাজে আর কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। যে দেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনী নাগরিককে সম্মান করতে শেখে, সেই দেশই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ, আধুনিক ও মানবিক হয়ে ওঠে।

Related Posts

The Terrifying Spread of Extremism - Bangladesh

Threats of being burned to ashes in public: The shrinking of Bangladesh’s cultural sphere and the frightening spread of extremism

19 August 2026. That afternoon, a concert by popular rock bands Ashes and Nobelman wasRead More

The Terrifying Spread of Extremism - Bangladesh

প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়ার হুমকিঃ বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক পরিসরের সংকোচন ও উগ্রবাদের ভয়াল বিস্তার

১৯ আগস্ট, ২০২৬। কিশোরগঞ্জের ওল্ড স্টেডিয়ামে সেদিন বিকেলে জনপ্রিয় রক ব্যান্ড অ্যাশেজ ও নোবেলম্যানের কনসার্টRead More

The Grip of Fundamentalism in Bangladesh

Bangladesh will continue to suffer – and suffer greatly – from the consequences of nurturing these extremist fundamentalist groups

In Bangladesh, there has always been an extremist, religiously fanatical group that fears music, dance,Read More

Comments are Closed