False?

Ayyām al-Jāhiliyyah

ইসলামের জন্মভূমিতে নারীঃ আইয়ামে জাহেলিয়া কি ইসলাম আগমনের পূর্বে ছিল নাকি এখন আছে?

ইসলামি প্রচারণায় বলা হয়, ইসলাম আসার আগে আরব ভূখণ্ডে ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ — অর্থাৎ ‘অজ্ঞতার যুগ’ — বিরাজ করত। নারীদের জীবন্ত কবর দেওয়া হত, তাদের কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিল না। ইসলাম এসে সেই অন্ধকার দূর করেছে — এটাই দাবি। যদিও এই দাবী প্রতারনাপূর্ণ, এ নিয়ে আমার একটা লেখা আছে এখানে, পড়ে দেখতে পারেন। যদি আইয়ামে জাহেলিয়া দাবীকে সত্যও ধরে নেই তাহলে এই ২০২৬ সালের সৌদি আরব, ইসলামের নিজস্ব জন্মভূমি, সেই দাবিকে কতটুকু সত্য প্রমাণ করছে? রাষ্ট্রীয় মদদে যে ব্যবস্থাগুলো সেখানে চলছে, তার দিকে তাকালে প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

দার আল-রেয়াঃ ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ না নারী-কারাগার?

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ‘দার আল-রেয়া’ (Dar al-Re’aya) নামক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে ছিল। সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ানের তদন্তমূলক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রকাশিত তথ্যের কারণে এগুলো আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে।
১৯৬০-এর দশকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত তৈরি করা হয়েছিল অপরাধে অভিযুক্ত নারীদের ‘পুনর্বাসনের’ জন্য — মনোবিজ্ঞানীদের সহায়তায়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো এখন পরিণত হয়েছে এক ভয়ঙ্কর বন্দিশালায়। ( সোর্স এখানে )

এই ‘কেয়ার হোমগুলো’ আসলে বন্দিশালা, যেখানে মেয়েদের পাঠানো হয় পুরুষ অভিভাবকের নির্দেশে — ‘অবাধ্যতা’ বা পারিবারিক নিয়ম ভাঙার অভিযোগে। অনেক সময় পরিবার মেয়েকে পুলিশ স্টেশনে ফেলে যায় এবং সম্পর্ক ত্যাগ করে, যার পরিণতিতে মেয়েটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই প্রতিষ্ঠানে আটক হয়ে পড়ে। ( সোর্স এখানে )

পুরুষ অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া নারীরা এই প্রতিষ্ঠান থেকে বের হতে পারে না। এখানে দীর্ঘমেয়াদে বন্দি থাকা নারীরা কার্যত তাদের অভিভাবকের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। ( সোর্স এখানে )

ভেতরে কী হয়?

প্রাক্তন বন্দিনীরা এই স্থানগুলোকে বর্ণনা করেছেন ‘নরকের মতো’ — সাপ্তাহিক বেত্রাঘাত, জোরপূর্বক ধর্মীয় শিক্ষা, বাইরের পৃথিবীর সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্কবিচ্ছেদ এবং দীর্ঘকালীন বন্দিত্ব। প্রবেশের সময় দেহ তল্লাশি, কুমারীত্ব পরীক্ষা এবং ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর বিবরণও পাওয়া যায়। ( সোর্স এখানে )

সেখানে নারীরা নিজেদের নাম হারান — তাদের নম্বরে ডাকা হয়। ( সোর্স এখানে )

আমিনার গল্প

২৫ বছর বয়সী আমিনা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর বুরাইদাহর একটি কেন্দ্রে আশ্রয় খুঁজেছিলেন। কিন্তু পরদিনই তার বাবাকে ডেকে পাঠানো হয়। আমিনার দাবি ছিল সামান্য — মারধর না করা, জোরপূর্বক বিয়ে না দেওয়া, চাকরি করতে দেওয়া। কিন্তু তার বাবা শর্ত দিলেন পুরুষ অভিভাবক ছাড়া বাইরে না যাওয়ার। ভয়ে সই করতে বাধ্য হন আমিনা। বাড়ি ফিরে আবারও নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষমেশ দেশ ছেড়ে পালাতে হয় তাকে।

লায়লা ও শামসের অভিজ্ঞতা

লায়লা নামের আরেক নারী পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন সাহায্যের আশায়। উল্টো তার বিরুদ্ধেই ‘পরিবারের সম্মানহানি’র অভিযোগ এনে তাকে দার আল-রেয়ায় পাঠানো হয়।

মানবাধিকারকর্মী আমানি আল-আহমাদি জানান, তিনি স্কুলে থাকতেই একবার দার আল-রেয়া থেকে আসা নারীদের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেখানে শিক্ষার্থীদের যৌনরোগের ছবি দেখিয়ে বলা হয়েছিল — পরিবারের কথা না মানলে এই পরিণতি হবে। এটা ছিল পুরুষতান্ত্রিক অভিভাবকত্ব মানার জন্য রাষ্ট্রীয় ভয় তৈরির একটি পদ্ধতি। ( সোর্স এখানে )

সারাহ আল-ইয়াহিয়া নামের এক অ্যাক্টিভিস্ট জানান, তার বাবা তাকে যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদ করার জন্য দার আল-রেয়ায় পাঠানোর হুমকি দিয়েছিলেন। “যদি তোমাকে তোমার ভাই বা বাবা ধর্ষণ করে এবং তুমি গর্ভবতী হও, তাহলে পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য পাঠানো হবে তোমাকেই।” ( সোর্স এখানে )

ধর্ষণের অভিযোগ করা যায় নাঃ এক নিষ্ঠুর আইনি বাস্তবতা

সৌদি আরবে ধর্ষণের মামলায় সাজার প্রমাণ করতে হলে চারজন/দুজন পুরুষ সাক্ষী অথবা অভিযুক্তের নিজের স্বীকারোক্তি প্রয়োজন। এছাড়া দেশটিতে বৈবাহিক ধর্ষণের কোনো আইনি স্বীকৃতিই নেই। ( সোর্স এখানে )

এর ব্যবহারিক পরিণতি ভয়ঙ্কর। ধর্ষণের শিকার একজন নারী যদি অভিযোগ করতে যান এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষী না থাকে, তাহলে উল্টো তার বিরুদ্ধেই ‘বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক’-এর অভিযোগ আনা সম্ভব। ফলে ধর্ষণের শিকার হওয়া মানে নিজেই আসামি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া।

রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখে নারী অধিকারকর্মীরা

শুধু সাধারণ নারীরা নন, যারা এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, তাদেরকেও নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে।

লুজাইন আল-হাথলুল
লুজাইন আল-হাথলুল ২০১৮ সালের মে মাস থেকে গ্রেপ্তার ছিলেন। প্রথম তিন মাস তাকে পরিবার ও আইনজীবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রেখে আটক করা হয়। সেই সময়কালে তাকে মারধর করা হয়, ওয়াটারবোর্ডিং করা হয়, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়, যৌন হেনস্তা করা হয় এবং ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ( সোর্স এখানে )

তার পরিবার জানায়, মা-বাবার সাথে দেখা করার সময় লুজাইনের উরুতে কালশিটে ছিল এবং তিনি কাঁপছিলেন, ঠিকমতো হাঁটতে বা বসতে পারছিলেন না। তাকে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল যদি তিনি নির্যাতনের কথা অস্বীকার করেন। তিনি অস্বীকার করতে রাজি হননি। ( সোর্স এখানে )

তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ছিল নারীর গাড়িচালানোর অধিকারের পক্ষে প্রচারণা চালানো, পুরুষ অভিভাবকত্ব ব্যবস্থার বিরোধিতা করা এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখা। ( সোর্স এখানে )

মানাহেল আল-ওতাইবি
ফিটনেস ইনফ্লুয়েন্সার ও নারী অধিকারকর্মী মানাহেল আল-ওতাইবি ২০২২ সালের নভেম্বরে গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় নারী অধিকারের সপক্ষে পোস্ট করা এবং আবায়া ছাড়া ছবি দেওয়া। তাকে মারধর, দংশন, মৃত্যুর হুমকি এবং একাকিত্বে আটক রাখা হয়। ( সোর্স এখানে )

২০২৫ সালে আপিল আদালত তার সাজা ১১ বছর থেকে কমিয়ে ৫ বছর করে এবং তার ওপর পাঁচ বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। ( সোর্স এখানে )

সালমা আল-শেহাব
যুক্তরাজ্যে পিএইচডি করা সৌদি শিক্ষার্থী সালমা আল-শেহাব ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন — শুধুমাত্র নারী অধিকারের সপক্ষে টুইট করার জন্য। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চার বছর কাটানোর পর তিনি মুক্তি পান। ( সোর্স এখানে )

আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সংঘাত

সৌদি আরবে নারীর বিরুদ্ধে এই সব অনুশীলন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের একাধিক মৌলিক নীতিকে লঙ্ঘন করে।

CEDAW (নারীর বিরুদ্ধে সকল বৈষম্য নিরসনের আন্তর্জাতিক সনদ): MENA রাইটস গ্রুপসহ বিভিন্ন সংস্থা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে সৌদি আরব CEDAW-এর অধীনে তার বাধ্যবাধকতা পালন করেনি। ( সোর্স এখানে )

নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশন (CAT): বৈদ্যুতিক শক, ওয়াটারবোর্ডিং, শারীরিক নির্যাতন — এগুলো এই সনদের সরাসরি লঙ্ঘন।

বিচারবিহীন আটকঃ অনেক ক্ষেত্রে কোনো আইনি প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হয় না। ( সোর্স এখানে )

জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়াঃ ২০২৪ সালের মার্চে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা সৌদি সরকারকে চিঠি দিয়ে অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সাথে সংগতিপূর্ণ কিনা জানতে চেয়েছে। ( সোর্স এখানে )

‘ভিশন ২০৩০’ ও কাগুজে সংস্কার

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া, কনসার্টে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাসহ কিছু সংস্কারের কথা বলছেন। কিন্তু দার আল-রেয়ার অব্যাহত অস্তিত্ব এই সংস্কারের দাবির সাথে সম্পূর্ণ বিরোধপূর্ণ। ২০২৪ সালে জেন্ডার সমতা প্রসারে জাতিসংঘের কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেনের সভাপতিত্ব পায় সৌদি আরব — অথচ একই সময়ে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে ১৪৬টি দেশের মধ্যে সৌদির অবস্থান ছিল ১২৬তম। ( সোর্স এখানে )

আইয়ামে জাহেলিয়া?

ইসলামের দাবীকৃত আইয়ামে জাহেলিয়ার নারীরা অন্তত নিজেদের গোত্রের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে পেরেছেন, সম্পদের অধিকার রেখেছেন। ২০২৬ সালের সৌদি আরবে একজন নারী ধর্ষণের অভিযোগ দিতে গিয়ে নিজেই আসামি হয়ে যেতে পারেন। নারী অধিকারের কথা টুইট করলে ২৭ বছরের জেল হতে পারে। আবায়া ছাড়া ছবি দিলে ‘সন্ত্রাসবাদ’ আইনে মামলা হতে পারে। পুরুষ অভিভাবকের পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত নারীকে বছরের পর বছর একটি বন্দিশালায় কাটাতে হতে পারে।

মানবাধিকারকর্মী মরিয়ম আল-দোসারি বলেছেন, একজন নারী সেখানে ততদিন থাকবে যতদিন না সে সম্পূর্ণ পরিবার ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের কাছে নতি স্বীকার করে। ( সোর্স এখানে )

এটাকেই যদি জাহেলিয়ার অবসান বলা হয়, তাহলে জাহেলিয়া কেমন ছিল সেই প্রশ্নটা নতুন করে তোলার সময় হয়েছে।

প্রধান রেফারেন্সসমূহঃ

The Guardian investigative report on Dar al-Re’aya (2025)
US State Department: 2024 Country Reports on Human Rights Practices — Saudi Arabia
Amnesty International: Saudi Arabia Annual Report (2025)
MENA Rights Group: Report to CEDAW on Discrimination against Women in Saudi Arabia
Human Rights Watch: Briefings on Saudi women’s guardianship system
ALQST for Human Rights: Girls’ and Women’s Care Institutions in Saudi Arabia
New Lines Magazine: “Saudi Arabia’s Houses of Horror for Disobedient Women” (2021)
Tom Lantos Human Rights Commission: Case of Loujain al-Hathloul
Wikipedia: Rape in Saudi Arabia (legal framework)

Related Posts

Hoor vs. Women

The 72 full‑breasted, personality‑less houris of Paradise vs. the personality‑rich cherished women of the world! What do you want?

It is said that in Paradise a believing servant will receive 72 exquisitely beautiful houris;Read More

Hoor vs. Women

জান্নাতের ৭২ উন্নতবক্ষা ব্যক্তিত্বহীন হুর বনাম দুনিয়ার ব্যক্তিত্ববান শখের নারী! কী চান?

বলা হয় জান্নাতে মুমিন বান্দা ৭২ জন অপূর্ব সুন্দরী হুর পাবেন, তারা হবে চিরযৌবনা, চিরকুমারী।Read More

Islamic deception

Islamic deception – the believer disguised as a close friend may actually be on a mission to kill you!

For the sake of Islam and establishing its supremacy, yesterday morning could have become aRead More

Comments are Closed