
Ancient India vs Arab
আরব যখন অন্ধকারে, ইন্ডিয়ায় তখন জ্ঞানের মশাল জ্বলে – ইসলাম কিসের অন্ধকার দূর করতে চায়?
আরবে “আইয়ামে জাহেলিয়া” আসলেই কি ছিল?
“জাহেলিয়া” শব্দটি মূলত একটি ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা। ইসলামী পরিভাষায় এর অর্থ ঐশী পথনির্দেশের আগের “অজ্ঞতার যুগ”। এর অর্থ এই নয় যে আরবরা সব দিক থেকে সভ্যতাহীন ছিল। অনেক আধুনিক ইতিহাসবিদ মনে করেন, শব্দটিকে সংস্কৃতিহীনতার সমার্থক ধরলে ভুল হয়। ইসলাম যেভাবে এটাকে বর্ননা করে তা স্রেফ প্রতারনামূলক বয়ান। যুক্তি, তথ্য দিয়ে বরং এমনও দেখা যায় ইসলামপূর্ব আরবে বরং মানুষ, বিশেষ করে নারীরা অধিক স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতো। এ বিষয়ে আমার একটি আর্টিকেল আছে, সেখানে বিস্তারিত বলা আছে – আইয়্যামে জাহেলিয়া নামে ইসলামের প্রতারনাপূর্ণ বয়ান ও বাস্তবতা।
ইসলাম-পূর্ব আরব উপদ্বীপ একরকম ছিল নাঃ
- দক্ষিণ আরব (ইয়েমেন): সাবা, হিময়ার ইত্যাদি রাজ্যে সেচব্যবস্থা (মারিব বাঁধ), মশলা ও ধূপের বাণিজ্য এবং নিজস্ব লিপি (মুসনাদ) ছিল।
- উত্তর আরব: নাবাতিয়ান সভ্যতা (পেট্রা), যাদের লিপি থেকে পরে আরবি লিপি বিবর্তিত হয়। এছাড়া রোমান-মিত্র গাসসানি ও পারস্য-মিত্র লাখমি রাজ্য ছিল।
- হিজাজ (মক্কা-মদিনা): মরুভূমি ও বাণিজ্যপথের এলাকা। কুরাইশরা ছিল ব্যবসায়ী গোত্র, আর মক্কা ছিল বাণিজ্য ও তীর্থের কেন্দ্র।
সাহিত্যের দিক থেকে আরব ছিল বেশ সমৃদ্ধ। কাব্য ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শিল্প। উকাজ মেলায় কবিতা প্রতিযোগিতা হতো এবং “মুআল্লাকাত” নামে বিখ্যাত কবিতাগুলো এই যুগেরই। অন্যদিকে সমাজে গোত্রীয় যুদ্ধ, প্রতিশোধের রীতি, দাসপ্রথা, বহুদেবতাবাদ এবং কন্যাশিশু হত্যার প্রথার ইঙ্গিতও ঐতিহ্যে পাওয়া যায়। সুতরাং বলা যায়, আরব সভ্যতাহীন ছিল না, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও রাষ্ট্রকাঠামোহীন ছিল।
সেই সময়ে আরবের কোন জ্ঞান বাইরের পৃথিবী জানত? আরব কি শুধুই “রিসিভার” ছিল?
পুরোপুরি রিসিভার বলা যায় না, আবার বড় জ্ঞানকেন্দ্রও ছিল না। আরবের অবদান ছিল মূলত এই কয়েকটি ক্ষেত্রেঃ
- বাণিজ্য ও যোগাযোগঃ ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে মশলা, সুগন্ধি ও চামড়ার বাণিজ্যে আরবরা মধ্যস্থতাকারী ছিল।
- নক্ষত্র ও আবহাওয়া জ্ঞানঃ মরুযাত্রায় নক্ষত্র দেখে দিক ও ঋতু নির্ণয়ের লোকজ জ্ঞান।
- ভাষা ও কাব্যঃ নিখুঁত মৌখিক সাহিত্যিক ঐতিহ্য, যা পরবর্তীকালে আরবি ভাষাবিজ্ঞানের ভিত্তি হয়।
গণিত, চিকিৎসা, দর্শন বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের লিখিত ধ্রুপদী ঐতিহ্য তখন আরবে প্রায় ছিল না। এই ধরনের জ্ঞান আরবে এসেছে পরে, অষ্টম-নবম শতকে অনুবাদ আন্দোলনের মাধ্যমে। তখন গ্রিক, পারসিক ও ভারতীয় গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হয়। তাই ৬ষ্ঠ শতকের আরব সম্পর্কে “জ্ঞান গ্রহণকারী অঞ্চল” বলা চলে। তবে পরবর্তী ইসলামী স্বর্ণযুগের (আল-খারিজমি, ইবনে সিনা, ইবনুল হাইসাম প্রমুখ) প্রেক্ষিতে এই চিত্র আমূল বদলে যায়, যদিও তারা সরাসরি আরবের কেউ ছিলেন না, আবার ইসলাম ধর্মেরও ছিলেন না বা ইসলাম ধর্ম তাদেরকে উৎসাহিত করা তো দূরে থাক, পদে পদে লাঞ্চনা ও হত্যা করেছে।
মুহাম্মদের জ্ঞানের উৎস কী?
এ প্রশ্নে দুটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, এবং দুটিই জানা দরকার।
মুসলিম বিশ্বাসঃ মুহাম্মদ ছিলেন নিরক্ষর (উম্মি) এবং কুরআন তার কাছে ওহি বা প্রত্যাদেশ হিসেবে এসেছে। কুরআন নিজেই সেকালের এই অভিযোগের জবাব দিয়েছে যে “একজন মানুষ তাকে শেখায়” (সূরা নাহল ১৬:১০৩)।
আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণাঃ গবেষকরা মনে করেন, হিজাজ কোনো বিচ্ছিন্ন অঞ্চল ছিল না। সেখানে ইহুদি গোত্র (বিশেষত মদিনায়), বিভিন্ন খ্রিস্টান সম্প্রদায় (ইয়েমেনের নাজরান, সিরিয়ার বাণিজ্যপথ) এবং একেশ্বরবাদী “হানিফ”-রা ছিল। খাদিজার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেল খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন বলে ঐতিহ্যে আছে। মুহাম্মদ নিজেও বাণিজ্যের কাজে সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। এসব কারণে কুরআনে বাইবেলীয় ও আরবীয় একেশ্বরবাদী ঐতিহ্যের অনেক উপাদানের অস্তিত্ব নিয়ে পণ্ডিতেরা আলোচনা করেন।
প্রথম ধারার বিশ্বাসীদের কাছে এসব আলোচনা মূল বিষয়কে বদলায় না, আর দ্বিতীয় ধারার গবেষকদের কাছে এটি স্বাভাবিক ঐতিহাসিক প্রশ্ন। ধর্মীয় বয়ান ইতিহাসের গবেষণা দিয়ে প্রমাণ বা খণ্ডন করা যায় না, কারন ধর্মীয় বিশ্বাস মানেই সেটা অন্ধ বিশ্বাস, সেখানে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই – এটুকু মনে রাখা জরুরি।
পার্শ্ববর্তী কোন সমৃদ্ধ সভ্যতা ও সাম্রাজ্যে মুহাম্মদের কথা নেই কেন?
দূর্ভিক্ষপীড়িত রুক্ষ আরব অঞ্চল আসলে আশপাশের কোন সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য বা সভ্যতার কাছে আকর্ষনীয় ছিল না। সেজন্য তারা মুহাম্মদের ধর্ম প্রচার, শাসন এসব নিয়ে কিছুই জানতো না, তাদের কাছে সেটা ছিল স্রেফ এক বিচ্ছিন্ন গোত্রভিত্তিক নবীর আগমন বা আরো অনেক ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণের মতোই একটি মতবাদ। সাম্রাজ্যগুলো তাদের অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত ছিল। সেজন্য তাদের কোন ইতিহাস, নিদর্শনে মুহাম্মদের কোন নাম-নিশানা, নিদর্শন কিছুই নেই। কেউ দাওয়াতও দেয়নি, কেউ আক্রমনও করতে যায়নি। মুহাম্মদের বিষয়টা তাদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন।
এর কয়েকটি কারণ রয়েছেঃ
- ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বঃ হিজাজ ছিল বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের কাছে প্রান্তিক এলাকা। মক্কার একজন ধর্মপ্রচারক তাঁদের নজরে পড়ার কথা নয়।
- সাম্রাজ্যগুলো ব্যস্ত ছিলঃ ৬০২ থেকে ৬২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাইজেন্টাইন ও পারস্যের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছিল।
- সমকালীন সূত্রের সংকট: প্রাচীনকালে কোনো ব্যক্তি রাজকীয় মনোযোগ পেলেই কেবল লিখিত রেকর্ডে আসতেন।
তবে বিষয়টি পুরোপুরি নীরবও নয়। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দের “ডক্ট্রিনা ইয়াকোবি”, আর্মেনীয় ইতিহাসকার সেবেওস (আনু. ৬৬০-এর দশক) এবং অন্যান্য সিরীয় খ্রিস্টান লেখায় আরব “নবী”-র উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলো তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর থেকে কয়েক দশকের মধ্যে লেখা। পরে অবশ্য আরবরা সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে এসে পড়লে তাদের উল্লেখ বহুগুণ বেড়ে যায়। ইসলামের উত্থানের ব্যাপ্তি এতই দ্রুত ছিল যে সমসাময়িক লেখকেরা চমকে গিয়েছিলেন। তবে সেসব ইসলামের ইতিহাস লেখার সূচনা আবার হয়েছিল আরব থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে পারস্যে, আরবে নয়। সকল হাদিসের সংকলক, সিরাত লেখক কেউ আরবের নয়। তখনো আরব ইতিহাস, জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শনে আগ্রহী ছিল না।
সেই সময় আরবে শিক্ষার অবস্থা কেমন ছিল?
আরবের শিক্ষা ছিল মূলত মৌখিক। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিদ্যালয় ছিল না। স্মৃতিশক্তি, বংশতালিকা, কবিতা ও গোত্রীয় ইতিহাস মুখে মুখে সংরক্ষিত হতো। এইজন্য দেখেন না সেই ঐতিহ্য মেনে এখনো বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে শিশুদের নির্মম নির্যাতন করে কুরানের মতো একটা বই মুখস্ত করানো হয় যখন ছোট্ট একটা মোবাইল ডিভাইসেই কয়েক লক্ষ কোরআনের কপি রাখা যায়! ঐতিহ্য অনুযায়ী মক্কায় লিখতে-পড়তে জানা মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তবু বাণিজ্যিক লেনদেন ও চুক্তির জন্য লেখার ব্যবহার একেবারে অজানা ছিল না। দক্ষিণ আরবে শিলালিপির সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল। এই পটভূমিতে কুরআনের লিখিত সংকলন ও পরবর্তী আরবি লিখিত সাহিত্যের দ্রুত বিকাশ একটি বড় সাংস্কৃতিক রূপান্তর হিসেবে দেখা হয়।
সভ্যতা, শিল্প, জ্ঞান বিজ্ঞানে তখন ভারতের অবস্থা কেমন ছিল?
মুহাম্মদ যখন আরবে তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত অভিলাষ পূরণ করার জন্য একটি রাজনৈতিক মতবাদকে ধর্মীয় আবরনে প্রচার করছিল তখন ভারতে চলছিল জ্ঞান প্রবাহের এক সমৃদ্ধ ধারা। ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে ভারত সভ্যতা, শিল্প ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিক থেকে ছিল এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। গুপ্ত যুগের পর হর্ষবর্ধনের সময় পর্যন্ত নগরায়ণ, বাণিজ্য ও কৃষি বেশ উন্নত ছিল, আর স্থল ও সমুদ্রপথে রোম, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের ব্যবসা চলত। শিল্পকলায় অজন্তার গুহাচিত্র, এলোরার পাথর কাটা মন্দির, গুপ্ত ও চালুক্য স্থাপত্য এবং সারনাথের বুদ্ধমূর্তির মতো অসাধারণ কাজ হয়েছে। সাহিত্যে কালিদাস, বাণভট্ট ও ভারবির মতো কবিরা সংস্কৃত কাব্য-নাটককে উচ্চমানে পৌঁছে দেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানে আর্যভট্ট ও বরাহমিহির জ্যোতির্বিদ্যায়, ব্রহ্মগুপ্ত গণিতে (শূন্য ও দশমিক পদ্ধতির নিয়মাবলিসহ), চরক ও সুশ্রুত চিকিৎসায় এবং ধাতুবিদ্যায় (দিল্লির লৌহস্তম্ভ যার নিদর্শন) ভারত বিশেষ অগ্রগতি দেখিয়েছিল। নালন্দা ও বলভীর মতো বিহারে দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও বিজ্ঞানের চর্চা হতো এবং চীন, কোরিয়া ও তিব্বত থেকে ছাত্ররা সেখানে আসতেন। তবে একই সময়ে রাজনৈতিক বিভাজন, রাজ্যে রাজ্যে সংঘাত ও বর্ণভেদভিত্তিক সামাজিক বৈষম্যও ছিল, তাই পুরো চিত্রটিকে নিখুঁত স্বর্ণযুগ বলা ঠিক হবে না।
ভারতে তক্ষশিলা ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে ও কখন শুরু হয়?
- তক্ষশিলাঃ গান্ধার অঞ্চলের (বর্তমান পাকিস্তান) এই শিক্ষাকেন্দ্র খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ-৫ম শতক থেকে পরিচিত। ঐতিহ্যে বলা হয় ব্যাকরণবিদ পাণিনি, চিকিৎসক জীবক ও অর্থশাস্ত্রের চাণক্যের সঙ্গে এর যোগ ছিল। এটি ছিল মূলত শিক্ষক-কেন্দ্রিক, গুরুর কাছে বিদ্যা অর্জনের ব্যবস্থা। পঞ্চম শতকে হুণ আক্রমণে এর পতন শুরু হয়।
- বৌদ্ধ বিহারঃ মৌর্য সম্রাট অশোকের (খ্রি.পূ. ৩য় শতক) পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ সংঘ ও বিহার বিস্তৃত হয়। ভিক্ষুদের আবাস ক্রমে শিক্ষাকেন্দ্রে রূপ নেয়।
- নালন্দাঃ গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্তের আমলে (আনু. ৪২৭ খ্রি.) প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করা হয়।
এখানে বলা দরকার – শশাঙ্ক, হর্ষবর্ধন ও বাণভট্ট ছিলেন ৭ম শতকের শুরুর দিকের মানুষ, অর্থাৎ ৫৭০-এর কয়েক দশক পরের। পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার নির্মিত হয় আরও পরে, অষ্টম শতকের শেষভাগে পাল সম্রাট ধর্মপালের সময়ে। আর তক্ষশিলা ততদিনে ক্ষয়িষ্ণু। সুতরাং ভারতে তখন উন্নত শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রবাহ আগে থেকেই চলমান ছিল।
ভারতের বিহারগুলোকে “বিশ্ববিদ্যালয়” বলা হয় কেন?
অনেকে বলেন, এগুলোই ছিল বিশ্বের বুকে স্থাপিত প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়, এর স্বপক্ষে অনেক যুক্তি-প্রমান আছে। “বিশ্ববিদ্যালয়” শব্দটি এখানে আধুনিক অর্থে ব্যবহৃত, কারণ এগুলোর বৈশিষ্ট্য অনেকটা মিলে যায়ঃ
- হাজার হাজার ছাত্র ও শত শত শিক্ষক একসঙ্গে আবাসিকভাবে থাকতেন।
- বহু বিষয়ের পাঠ্যক্রম ছিলঃ বৌদ্ধ ও বৈদিক দর্শন, তর্কশাস্ত্র, ব্যাকরণ, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা।
- নালন্দায় প্রবেশের জন্য কঠিন যাচাই-পরীক্ষা ছিল।
- রাজা ও জনগণের দেওয়া গ্রামভিত্তিক অনুদানে খরচ চলত।
- বিশাল গ্রন্থাগার (নালন্দার “ধর্মগঞ্জ”) ছিল।
চীনা পরিব্রাজক জুয়ানজাং (সুয়ান-ৎসাং) ও ই-চিং-এর বিবরণ থেকে এসব তথ্য জানা যায়। কেউ কেউ মনে করেন, ইউরোপের মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগত কাঠামোর পুরো মিল নেই, তবে প্রাচীন উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে তুলনা অযৌক্তিক নয়।
সেই সময় ভারতে আর কী কী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল?
প্রধান কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ছিলঃ
- নালন্দা (বিহার): সর্বাধিক বিখ্যাত।
- বলভী (গুজরাট): মৈত্রক রাজবংশের আমলে, বিশেষত ৬ষ্ঠ-৭ম শতকে খ্যাতিমান।
- ওদন্তপুরী, বিক্রমশীলা (পাল আমলে, ৮ম-৯ম শতক)।
- সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর, বর্তমান বাংলাদেশ)।
- জগদ্দল (বরেন্দ্র অঞ্চল), কাঞ্চী (দক্ষিণ ভারত) প্রভৃতি।
কোন কোন দেশ থেকে মানুষ ভারতে শিক্ষা নিতে আসত?
তিব্বতে বাংলাদেশের অতীশ দীপংকরের যে সম্মান ও অবদান তা তারা এখনো একবাক্যে স্বীকার করেন এখনো। বাংলা বর্ষপঞ্জি দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলোতে ছড়িয়েছিল কিভাবে? এমন অনেক প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া যায় সেই সময়ে পুরো এশিয়ায় ভারতের শিক্ষার অবদান সম্পর্কে। চীন (জুয়ানজাং ৬২৯-৬৪৫ সালে ভারতে ছিলেন এবং নালন্দায় পড়েছেন; ফা-হিয়েন তারও আগে এসেছিলেন), কোরিয়া, জাপান, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (সুমাত্রা, জাভা) থেকে ছাত্র ও ভিক্ষুরা আসতেন। বিক্রমশীলা ও নালন্দা তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের বিকাশে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।
জ্ঞান-বিজ্ঞানে ভারতের অবদান কী ছিল?
আবব যখন মূল বিজ্ঞান, দর্শনে অন্ধকারে ছিল ঠিক সেই সময়ে ভারত ছিল জ্ঞানের মশাল হাতে। ঐ সময়কালের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবদানঃ
- গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যাঃ আর্যভট্ট (৪৭৬ খ্রি.) পৃথিবীর আবর্তন ও π-এর মান নিয়ে কাজ করেছেন। ব্রহ্মগুপ্ত (৬২৮) শূন্য নিয়ে গাণিতিক নিয়মাবলি লিপিবদ্ধ করেছেন। দশমিক স্থানমান পদ্ধতি এবং শূন্যের ব্যবহার ভারতেই বিকশিত হয়, যা পরে আরবদের মাধ্যমে বিশ্বে ছড়ায় (আমরা এখনো “হিন্দু-আরবি সংখ্যা” বলি)।
- চিকিৎসাঃ চরক ও সুশ্রুত সংহিতা। সুশ্রুতে অস্ত্রোপচারের বিবরণ আছে।
- ব্যাকরণ ও ভাষাবিজ্ঞানঃ পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী।
- দর্শন ও যুক্তিবিদ্যাঃ দিগনাগ, ধর্মকীর্তি প্রমুখের বৌদ্ধ ন্যায়শাস্ত্র।
শান্তি স্থাপনে ভারতের অবদান কী?
ইতহাসের কালক্রমে একটা বিষয় খেয়াল করবেন, ভারতে আভ্যন্তরীন সংঘাত হলেও ভারত হাজার বছরের কখনোই বাইরের কোন দেশ বা সভ্যতা আক্রমন করতে যায়নি। ভারত আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু সামর্থ্য থাকা স্বত্তেও ভারত আক্রমন করতে যায়নি। কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোকের অহিংসা-নীতি গ্রহণ ও “ধম্ম”-নীতির প্রচার, বৌদ্ধ ও জৈন অহিংসাদর্শনের বিস্তার এবং বৌদ্ধধর্মের মাধ্যমে এশিয়াজুড়ে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান শান্তির ইতিহাসে বড় অধ্যায়। তবে ইতিহাসের ভারসাম্য রক্ষায় এটাও বলতে হয় যে সে সময়ের ভারতও রাজনৈতিক যুদ্ধ-বিগ্রহ, রাজবংশীয় সংঘাত (যেমন শশাঙ্ক ও হর্ষের লড়াই) এবং বর্ণপ্রথাভিত্তিক সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্ত ছিল না।
ভারত ও আরবের এই সময়ের আর্থ-সামাজিক তুলনা
| বিষয় | আরব (৬ষ্ঠ-৭ম শতক) | ভারত (৬ষ্ঠ-৭ম শতক) |
|---|---|---|
| রাষ্ট্রব্যবস্থা | গোত্রভিত্তিক, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র নেই | রাজতান্ত্রিক রাজ্য ও সাম্রাজ্য |
| অর্থনীতি | বাণিজ্য, পশুপালন, মরু-মরূদ্যান কৃষি | কৃষিনির্ভর, উন্নত বাণিজ্য ও নগরায়ণ |
| শিক্ষা | মৌখিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক | প্রাতিষ্ঠানিক বিহার ও গুরুকুল |
| লিখিত ঐতিহ্য | সীমিত (কাব্য মৌখিক) | সমৃদ্ধ সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত সাহিত্য |
| সামাজিক সমস্যা | গোত্র-দ্বন্দ্ব, দাসপ্রথা | বর্ণভেদ, রাজনৈতিক বিভাজন |
তাহলে ইসলাম অন্ধকার দূর করার দাবী করে কেন?
ইসলামিস্টরা প্রায় দাবী করেন তারা অন্ধকার দূর করবেন পৃথিবী থেকে। কিসের অন্ধকার? কোথায় অন্ধকার? যার শুরুটাই একটা অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে তা যদি দূনিয়ায় আলো দেখাতে চায় তাহলে সেটা খুবই হাস্যকর ও শিশুতোষ হয়ে যায়। যেখানে মুহাম্মদের জন্মেরও অনেক আগে থেকে ভারত আলোকিত ছিল সেখানে জ্ঞান বিজ্ঞানে তেমন কোন অবদান না রাখা আরবের ইসলাম কিভাবে কোন অন্ধকারকে প্রতিস্থাপন করে আলোকিত করবে?
এটা প্রমানিত সত্য যে ৬ষ্ঠ-৭ম শতকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, লিখিত জ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানে ভারত আরবের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। কিন্তু দুটি কথা মনে রাখা দরকার। প্রথমত, “জাহেলিয়া” একটি ধর্মীয় পরিভাষা, সাংস্কৃতিক বিচারের মাপকাঠি নয়, আর আরবের নিজস্ব কাব্যিক, বাণিজ্যিক ও ভাষাগত ঐতিহ্য ছিল। দ্বিতীয়ত, ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। ইসলামের উত্থানের পর মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সভ্যতা গ্রিক, পারসিক ও ভারতীয় জ্ঞান আত্মস্থ করে নিজে বিশাল অবদান রেখেছে যদিও সেখানে ইসলামের কোন অবদান নেই, বরং ইসলাম বাঁধার সৃষ্টি করেছে; আবার ভারতীয় গণিত ও চিকিৎসা সেই বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মাধ্যমেই ইউরোপে পৌঁছেছে। সভ্যতাগুলোকে একটির বিরুদ্ধে আরেকটি দাঁড় করানোর চেয়ে এই আদান-প্রদানের ইতিহাস বোঝাই বেশি ফলপ্রসূ কিন্তু সেখানে মুহাম্মদের আরব ও ইসলামের সভ্যতা নামে আলাদা কোন শাখার দৃশ্যমান দেখা পাওয়ার সুযোগ নেই।
Related Posts

When Arabia Was in Darkness, India Was Carrying the Torch of Knowledge – So What Darkness Does Islam Claim to Remove?
What Was the “Age of Jahiliyyah” in Arabia Really Like? The term “Jahiliyyah” is fundamentallyRead More

Islam’s Circular‑Logic Fallacy
Place: Cabin of a Dhaka–Sylhet-bound trainCharacters: Maulana Abdur Rahman (a responsible member of Tabligh Jamaat)Read More

ইসলামের সার্কুলার লজিক ফ্যালাসি
স্থান: ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনের কেবিনচরিত্র: মাওলানা আব্দুর রহমান (তাবলিগ জামাতের একজন দায়িত্বশীল) ও অধ্যাপকRead More

Comments are Closed