
Woman, Life, Freedom
মাশা আমিনী, “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” এবং একটি প্রতিবাদের সাক্ষী
ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৩ এর একটি প্রতিবাদ, চলতি পথে দেখা একটি প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ। এই সমবেত হাজার হাজার মানুষের প্রায় সবাই ইরানী।
রাস্তায় হাঁটছিলাম, হঠাৎ দেখি জনস্রোত। ব্যানার, স্লোগান, চোখে জল — কিন্তু সেই চোখে একটা দৃঢ় আগুনও। কৌতূহলবশত পা মেলালাম তাদের সাথে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম, এটা শুধু একটা মিছিল নয় — এটা একটা জাতির বুকফাটা কান্না, ঐতিহাসিকভাবে একটি সমৃদ্ধ জাতির ধর্মীয় স্বৈরশাসকদের অসভ্যতার বিরুদ্ধে মানবতার সম্মিলিত প্রতিবাদ।
মাশা আমিনী — একটি নাম, একটি আন্দোলন
মাশা আমিনী ছিলেন ইরানের এক তরুণ কুর্দি নারী। বয়স মাত্র বাইশ বছর। সাধারণ একটি মেয়ে, সাধারণ স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে ছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালে ইরানের নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে তার মৃত্যু ঘটে — এবং সেই মৃত্যু আর শুধু একটি মৃত্যু রইল না, হয়ে উঠল বিশ্বের কোটি মানুষের প্রতিরোধের প্রতীক।
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২। তেহরানে নৈতিকতা পুলিশ — যাদের ইরানে বলা হয় “গাশত-এ-এরশাদ” — মাশাকে আটক করে। অভিযোগ? হিজাব সঠিকভাবে না পরা। এই একটি মাত্র অভিযোগে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় পুলিশ ভ্যানে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভ্যানের ভেতরেই তাকে মারধর করা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন, ভর্তি হন হাসপাতালে।
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২। মাশা আর ফিরলেন না।
ইরান সরকার বলল — হার্ট অ্যাটাক। মাশার পরিবার বলল — সুস্থ মেয়েকে পুলিশে দিয়েছিলাম, লাশ ফিরে পেলাম। হাসপাতালের ছবি ছড়িয়ে পড়ল সোশ্যাল মিডিয়ায় — মাথায় আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট।
“Woman, Life, Freedom” — আগুন ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বে
মাশার মৃত্যুর পর ইরানের রাস্তায় নামল লক্ষ মানুষ। নারীরা প্রকাশ্যে হিজাব খুলে ফেললেন, চুল কাটলেন। তরুণরা আগুন ধরিয়ে দিল নৈতিকতা পুলিশের গাড়িতে। স্লোগান উঠল — “Zan, Zendegi, Azadi” — নারী, জীবন, স্বাধীনতা।
এই আন্দোলন শুধু হিজাবের বিরুদ্ধে ছিল না। এটা ছিল দশকের পর দশক ধরে চলে আসা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে নারীর শরীর ও মনের উপর নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে, একটি ক্লান্ত জাতির বিস্ফোরণ।
আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বের প্রতিটি কোণে। ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া — যেখানে ইরানি প্রবাসীরা আছেন, সেখানেই জ্বলে উঠল প্রতিবাদের মশাল। সেই মিছিলগুলোর একটিতেই আমি ছিলাম সেদিন।
মিছিলের এক কোণে — খামেনির মুখোশ আর স্যাটানিক ভার্সেসের ব্যানার
মিছিলের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন মানুষ। তার মুখে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির মুখোশ — ব্যঙ্গাত্মক, প্রতীকী। হাতে ব্যানারে লেখা — “Islam Satanic Verses“।

যারা জানেন না তাদের জন্য বলছি — “দ্য স্যাটানিক ভার্সেস” হলো ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক সালমান রুশদীর একটি উপন্যাস, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। বইটি প্রকাশের পরপরই ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেইনি রুশদীর বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেন — মাথার দাম ঘোষণা করেন কোটি কোটি টাকা। সেই ফতোয়া আজও কার্যকর।
এরপর থেকে সালমান রুশদীর জীবন হয়ে পড়ে দুর্বিষহ। বছরের পর বছর আত্মগোপনে, নিরাপত্তারক্ষীবেষ্টিত জীবন। ২০২২ সালের আগস্টে নিউইয়র্কে একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে এক মুসলিম জঙ্গির ছুরিকাঘাতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। হারান এক চোখ। একটি বই লেখার মূল্য দিতে হয় এইভাবে।
কোরানে কি সত্যিই “স্যাটানিক ভার্সেস” আছে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রশ্ন উঠে আসে।
ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের অনেক সূত্র — যার মধ্যে ইবনে ইসহাক, আল-তাবারি সহ বিখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিকরাও আছেন — উল্লেখ করেছেন যে একসময় কোরানে এমন কিছু আয়াত ছিল যেগুলো মক্কার তিনটি প্রধান দেবীকে — লাত, উজ্জা এবং মানাত — স্বীকৃতি দিত। পরে বলা হয়, শয়তান নবীকে প্রতারণা করে সেই আয়াতগুলো নাজিল করিয়েছিল। তাই সেগুলো বাতিল করা হয়।

মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকরা এই পুরো ঘটনাকেই অস্বীকার করেন। অনেকে বলেন — এটা শত্রুদের তৈরি করা মিথ্যা গল্প। কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় তা হলো — কোরান কি একটি অপরিবর্তনীয়, অপরিবর্তিত গ্রন্থ? নাকি এর সংকলন ও সম্পাদনার ইতিহাস অনেক বেশি জটিল?
ইতিহাস বলে — হযরত ওসমানের খিলাফতকালে বিভিন্ন সংস্করণের কোরান পুড়িয়ে একটি মাত্র সংস্করণ চালু করা হয়েছিল। বিভিন্ন সাহাবীর কাছে যে কোরান ছিল, সেগুলো একে অপরের সাথে মিলত না। এই বাস্তবতা স্বয়ং মুসলিম পণ্ডিতরাও স্বীকার করেন।
সালমান রুশদীর উপন্যাসে এই ঐতিহাসিক প্রশ্নটিকেই সাহিত্যিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তার “অপরাধ” ছিল একটি প্রশ্ন করা। একটি বই লেখা।
যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়
সেদিন মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল — এই মানুষগুলো কতটা সাহসী। নিজের দেশে গেলে জেল, নির্যাতন, এমনকি মৃত্যু — তবুও তারা রাস্তায়। মাশার জন্য, তাদের মায়েদের জন্য, বোনদের জন্য, এখনও ইরানে বন্দী হাজার হাজার মানুষের জন্য।
মাশা আমিনীর প্রশ্ন আমাদের সামনে রেখে গেছে — কোনো রাষ্ট্রের কি অধিকার আছে একটি মেয়ের মাথার কাপড়ের হিসাব নিতে? ধর্মের নামে কতটুকু ক্ষমতা একটি সরকার ভোগ করতে পারে? আর যখন সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে — একজন লেখক, একজন নারী, একটি আন্দোলন — তখন কি তাকে থামিয়ে দেওয়াই উত্তর?
ইতিহাস বলে — আগুনকে চাপা দিয়ে রাখা যায় না।
মাশা আমিনীর মৃত্যু একটি স্ফুলিঙ্গ ছিল। সেই আগুন এখনো জ্বলছে।
“Zan, Zendegi, Azadi” — নারী, জীবন, স্বাধীনতা।
ইরান — একসময়ের গৌরবময় পারস্য সভ্যতার ভূমি, যে সভ্যতা বিশ্বকে দিয়েছে গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কবিতা আর স্থাপত্যের অমূল্য সম্পদ — আজ সেই ভূমির মানুষ বন্দী এক অদ্ভুত ধর্মীয় স্বৈরশাসনে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ইরানে যে শাসনব্যবস্থা চলছে, তার ভিত্তি কোনো আধুনিক রাষ্ট্রনীতি নয় — বরং সেই শাসনের বৈধতা টিকে আছে দেড় হাজার বছর আগে অন্তর্ধান হওয়া একজন শিশু ইমামের — ইমাম মাহদীর — পুনরাগমনের অপেক্ষার উপর ভর করে। একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে এমন একজনের প্রতিনিধিত্বের দাবিতে, যাকে কেউ দেখেনি, যার অস্তিত্ব কেবল বিশ্বাসের গভীরে। এই অলীক ভিত্তির আড়ালে চলছে নারীর শরীর ও মন নিয়ন্ত্রণ, ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি মেধাবী জাতিকে ভয় আর দমনের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা।
মানবসভ্যতার ইতিহাস সাক্ষী — ধর্মের নামে ক্ষমতা যখন মানুষের মৌলিক মর্যাদাকে পদদলিত করে, তখন সেই ক্ষমতার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। মাশা আমিনীর মৃত্যু, রাস্তায় চুল কেটে প্রতিবাদ করা ইরানি নারীরা, কারাগারে বন্দী হাজারো তরুণ — এরা প্রত্যেকে সেই অনিবার্য পরিবর্তনের দূত। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে যারা মানবতায় বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে আজ একটাই প্রার্থনা — ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ পারস্যের মানুষ মুক্তি পাক, ধর্মীয় বর্বরতার আবরণে পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রের অবসান ঘটুক, আর মানবতা একদিন সত্যিকারের স্বাধীনতার মুখ দেখুক।
Related Posts

The Iranian court sentenced them to death solely because they became Christians!
2009. Two young Iranian women, Marziyeh Amirizadeh and Maryam Rostampour, were sentenced to death byRead More

শুধুমাত্র খ্রিস্টান হওয়ার কারনে ইরানের আদালত তাদের মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিয়েছিল!
২০০৯ সাল। ইরানের দুই তরুণী মারজিয়েহ আমিরিজাদে ও মরিয়ম রোস্তামপুরের বিরুদ্ধে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়ার রায়Read More

Spending the night in Umm Hani’s house and then meeting Allah in the heavens – he named it Mi’raj
Mi’raj is a central event in Islamic belief. On the night of Mi’raj, the ProphetRead More

Comments are Closed