
Who is More Humane?
ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায়, মতাদর্শ, জাতীয়তাঃ একটি মানবিক পরীক্ষা
এক ছোট জাহাজে ক্যাপ্টেন ও ১২ জন যাত্রী ভ্রমনে বের হয়েছিলেন। ১২ জনের মধ্যে প্রত্যেক জাতিস্বত্বার ২ জন করে ও ধর্মীয় মতাদর্শের দুইজন করে ছিল। মাঝ সমুদ্রে দূর্ঘটনায় পড়ে জাহাজ ডুবতে শুরু করলে ক্যাপ্টেন জানান – জাহাজে মাত্র একটি লাইফ ভেস্ট আছে, যে কোন দুইজন বাঁচতে পারবেন, উনি নিজে একজন হিউম্যানিস্ট হিসাবে নিজের জীবনের মায়া করছেন না, যাত্রীদের মাঝে লটারি হবে, যার নাম উঠবে তিনি সঙ্গে একজনকে নিতে পারবেন।
সেখানে যাত্রী হিসাবে ছিল –
- একজন বাঙালি মুসলমান ও একজন বাঙালি হিন্দু
- একজন নেপালী বৌদ্ধ ও একজন নেপালী হিন্দু
- একজন আরবী মুসলমান ও একজন আরবী ইহুদি
- একজন জার্মান খ্রিস্টান ও একজন জার্মান নাস্তিক
- একজন জাপানি বৌদ্ধ ও একজন জাপানি ইহুদি
- একজন ইংলিশ খ্রিস্টান ও একজন ইংলিশ নাস্তিক
# যদি সম্ভাব্য সবাই লটারি বিজয়ী হয় তবে কে কাকে বাঁচানোর জন্য সঙ্গে নিবে?
# কেউ যদি নিজে স্যাক্রিফাইস করে অন্যের জীবন বাঁচাতে চায় সবার আগে সেই প্রস্তাব কে দিবে?
# কেউ যদি নিয়ম ভেঙ্গে লাইফ ভেস্ট দখলে নিতে চায় তবে সবার আগে সেটা কে করবে?
এই নিয়ে আমি একবার ডিসকাস করেছিলাম কেরালায় ব্যাকওয়াটার ট্যুরে পরিচিত হওয়া পশ্চিমবঙ্গের এক কাপল ও তাদের ভুবনেশ্বর ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া মেয়ের সঙ্গে। জীবন হারানোর মতো ক্রাইসিস মোমেন্টে মানুষ সাধারনত ভনিতা করে না, তার মনে যা আছে তাই করে। মানুষ তার আসল জাতিস্বত্বা তখন প্রকাশ করে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবর্তন ও মানুষের সাইকোলজি বিশ্লেষণ করলে উত্তরগুলো কেমন হতে পারে?
প্রশ্নগুলো ও তার সম্ভাব্য উত্তরগুলো কিন্তু শুধুই একটি কাল্পনিক দৃশ্যকল্প নয় – এটি মানুষের ভেতরের সবচেয়ে সৎ প্রশ্নটি তুলে ধরে। চরম সংকটে মানুষ আসলে কে – ধার্মিক, জাতীয়তাবাদী, নাকি শুধুই একটি বেঁচে থাকতে চাওয়া প্রাণী?
লটারি জিতলে কে কাকে নেবে?
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান বলে, মানুষ সংকটে সবার আগে তার “in-group” খোঁজে – যে মানুষটির সাথে সে সবচেয়ে বেশি পরিচিত, যার ভাষা সে বোঝে, যার সাথে তার স্মৃতি আছে। তাই প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি হলো – বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জাতীয় ও ভাষাগত পরিচয় ধর্মীয় পরিচয়কে হারিয়ে দেবে।
| যাত্রী | সম্ভাব্য পছন্দ | মূল কারণ | আস্থার মাত্রা |
|---|---|---|---|
| 🇧🇩বাঙালি মুসলমান ইসলাম ধর্ম | বাঙালি হিন্দু | ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক স্মৃতি ধর্মীয় পার্থক্যকে ছাড়িয়ে যায় – ১৯৭১-এর উত্তরাধিকার | ৭৫%বিকল্পঃ আরবী মুসলমান (২৫%) |
| 🇧🇩বাঙালি হিন্দু হিন্দু ধর্ম | বাঙালি মুসলমান | অভিন্ন ভাষাসত্তা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধন সবচেয়ে শক্তিশালী | ৭৮%বিকল্পঃ নেপালী হিন্দু (২২%) |
| 🇳🇵নেপালী বৌদ্ধ বৌদ্ধ ধর্ম | নেপালী হিন্দু | হিমালয়ের দেশে বৌদ্ধ-হিন্দু ঐতিহাসিক সহাবস্থান; জাতীয় পরিচয় প্রবল | ৮০%বিকল্পঃ জাপানি বৌদ্ধ (২০%) |
| 🇳🇵নেপালী হিন্দু হিন্দু ধর্ম | নেপালী বৌদ্ধ | দেশীয় পরিচয় ও ভাষা ধর্মকে পরাজিত করে; নেপালে এই দুই ধর্ম সহোদরতুল্য | ৮২%বিকল্পঃ বাঙালি হিন্দু (১৮%) |
| 🇸🇦আরবী মুসলমান ইসলাম ধর্ম | আরবী ইহুদি | মৃত্যুর মুখে semitic ভাষা-সংস্কৃতির টান রাজনৈতিক বৈরিতাকে গলিয়ে দিতে পারে | ৪৫%বিকল্পঃ বাঙালি মুসলমান (৫৫%) — অনিশ্চিত |
| 🇮🇱আরবী ইহুদি ইহুদি ধর্ম | আরবী মুসলমান | ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক নৈকট্য; আরবি ভাষার অভিন্নতা মৃত্যুর মুখে অপ্রত্যাশিত বন্ধন তৈরি করে | ৪৮%বিকল্পঃ জার্মান নাস্তিক (৩২%), জাপানি ইহুদি (২০%) |
| 🇩🇪জার্মান খ্রিস্টান খ্রিস্ট ধর্ম | ইংলিশ খ্রিস্টান | পশ্চিমা সভ্যতার অভিন্ন মূল্যবোধ ও খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের দ্বিমুখী টান | ৭০%বিকল্পঃ জার্মান নাস্তিক (৩০%) |
| 🇩🇪জার্মান নাস্তিক নাস্তিক্যবাদ | ইংলিশ নাস্তিক | Secular মানবতাবাদী মতাদর্শ + পশ্চিমা পরিচয়; ধর্মহীনরা মতাদর্শকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দেয় | ৭২%বিকল্পঃ জার্মান খ্রিস্টান (২৮%) |
| 🇯🇵জাপানি বৌদ্ধ বৌদ্ধ ধর্ম | জাপানি ইহুদি | জাপানি পরিচয় সবার আগে; জাপানে ইহুদিরা গভীরভাবে জাপানি সংস্কৃতিতে মিশেছেন | ৮৫%বিকল্পঃ নেপালী বৌদ্ধ (১৫%) |
| 🇯🇵জাপানি ইহুদি ইহুদি ধর্ম | জাপানি বৌদ্ধ | জাতীয় পরিচয় সর্বোচ্চ; জাপানি সমাজে ধর্মীয় পরিচয় দ্বিতীয় স্থানে | ৮৮%বিকল্পঃ আরবী ইহুদি (১২%) |
| 🇬🇧ইংলিশ খ্রিস্টান খ্রিস্ট ধর্ম | জার্মান খ্রিস্টান | ইউরোপীয় খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য ও পশ্চিমা সভ্যতার সংহতি | ৬৮%বিকল্পঃ ইংলিশ নাস্তিক (৩২%) |
| 🇬🇧ইংলিশ নাস্তিক নাস্তিক্যবাদ | যে কেউ | Secular humanist চিন্তা in-group bias কমায়; সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা – অপরিচিত বা সবচেয়ে বিপদগ্রস্তকে বেছে নেওয়ার | ৪০%জার্মান নাস্তিক ৩৫% · র্যান্ডম ২৫% |
বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি হিন্দু – এই দুজনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। দুজনেই একে অপরকে বেছে নেবেন, কারণ একই ভাষা, একই গান, একই রান্নার গন্ধ, একই নদীর স্মৃতি – এগুলো ধর্মীয় বিভেদের চেয়ে গভীর। ১৯৭১ সালে এই সত্যটি রক্ত দিয়ে প্রমাণ হয়েছিল।
একইভাবে নেপালী বৌদ্ধ ও নেপালী হিন্দু পরস্পরকে বেছে নেবেন, কারণ হিমালয়ের দেশে বৌদ্ধ আর হিন্দু কখনো পরস্পরের শত্রু ছিল না, বরং প্রতিবেশী ছিল।
জার্মান খ্রিস্টান ইংলিশ খ্রিস্টানকে বেছে নেবেন – পশ্চিমা সভ্যতার একটি অদৃশ্য সুতো তাদের টানবে।
জার্মান নাস্তিক ও ইংলিশ নাস্তিক একে অপরকে বেছে নেবেন, কারণ ধর্মহীন যুক্তিবাদী মানুষেরা মতাদর্শগত মিলকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।
সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হবে আরবী মুসলমান ও আরবী ইহুদির বেলায়। রাজনৈতিকভাবে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে বিভক্ত দুটি সম্প্রদায়। কিন্তু মৃত্যুর মুখে? একই আরবি ভাষা, একই মরুভূমির সংস্কৃতি, একই খাবারের স্বাদ – এই টান কতটা শক্তিশালী হবে তা অনিশ্চিত। তবে গবেষণা বলে, ভয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে শত্রুতাও গলে যায়, কারণ সামনে থাকে শুধু দুটি মানুষ।
জাপানি বৌদ্ধ ও জাপানি ইহুদির সংমিশ্রণটি পৃথিবীতে বিরল। জাপানে ইহুদি জনগোষ্ঠী অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং তারা জাপানি সংস্কৃতিতে গভীরভাবে মিশে গেছে। এই দুজন সম্ভবত জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে একে অপরকে বেছে নেবেন – কারণ “জাপানি” পরিচয়টি তাদের দুজনের কাছেই ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে গভীর।
সর্বোচ্চ নিশ্চিততাঃ জাপানি জুটি, ৮৫–৮৮% · জাতীয় পরিচয় প্রধান
সর্বাধিক অনিশ্চিতঃ আরবী জুটি, ৪৫–৪৮% · ভাষা বনাম রাজনীতি
সবচেয়ে মানবিকঃ ইংলিশ নাস্তিক, in-group bias সবচেয়ে কম
মূল সিদ্ধান্তঃ ১০টির মধ্যে ৮টি ক্ষেত্রে জাতীয় ও ভাষাগত পরিচয় ধর্মীয় পরিচয়কে হারিয়ে দেয়। একমাত্র ব্যতিক্রম আরবী জুটি – যেখানে রাজনৈতিক ইতিহাস ভাষাগত বন্ধনের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
আত্মত্যাগ – সবার আগে কে এগিয়ে আসবে?
ক্যাপ্টেন নিজেই ইতিমধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবং এটি সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য আত্মত্যাগ – কারণ এর পেছনে কোনো স্বর্গের প্রতিশ্রুতি নেই, কোনো পরকালের পুরস্কার নেই, শুধু আছে বিশুদ্ধ মানবিক নৈতিকতা। একজন হিউম্যানিস্টের আত্মত্যাগ তাই সবচেয়ে নিঃস্বার্থ।
এরপর সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী নেপালী বৌদ্ধ ও জাপানি বৌদ্ধ। বৌদ্ধ দর্শনে অহং ক্ষণস্থায়ী, মৃত্যু একটি রূপান্তর মাত্র। Bodhisattva আদর্শে অন্যের জন্য নিজের মুক্তি বিসর্জন দেওয়া সর্বোচ্চ নৈতিকতা – এই দর্শন তাত্ত্বিকভাবে সবচেয়ে সুগঠিত এবং হাজার বছর ধরে চর্চিত। তবে একটি সৎ সতর্কতা দিতে হবে – আদর্শ আর বাস্তব আচরণের মধ্যে সবসময় ফারাক থাকে। গবেষক Zimbardo ও Milgram বারবার দেখিয়েছেন, চরম চাপে মানুষ তার বিশ্বাস থেকে সরে আসে।
জার্মান ও ইংলিশ নাস্তিকরাও এগিয়ে আসতে পারেন – পরকালের ভয় না থাকলে মৃত্যু কখনো কখনো হালকা মনে হয়, এবং secular মানবতাবাদী মূল্যবোধ থেকে অন্যকে বাঁচানোর প্রেরণা আসতে পারে।
নিয়ম ভেঙে দখল – সবার আগে কে করবে?
এটি সবচেয়ে কঠিন ও সবচেয়ে সৎ প্রশ্ন। এবং উত্তরটিও সবচেয়ে অস্বস্তিকর।
বিবর্তন বলে – self-preservation সব নৈতিকতার আগে। এটি জীববিজ্ঞানের মূল সত্য, এবং কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ এটিকে সম্পূর্ণ মুছে দিতে পারেনি। Titanic ডুবির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যারা আগে লাইফবোট দখল করেছিল তারা কোনো বিশেষ ধর্ম বা জাতির মানুষ ছিল না – তারা ছিল সেই মানুষ যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সামাজিক চাপকে উপেক্ষা করতে পারে।
তাই সত্যিকারের উত্তর হলো – এটি ধর্ম বা জাতি নির্ধারণ করে না, নির্ধারণ করে ব্যক্তিত্বের ধরন। Dark Triad personality – উচ্চ narcissism, কম empathy, বেশি impulsivity – এই বৈশিষ্ট্যের মানুষ প্রতিটি ধর্মে ও প্রতিটি জাতিতে আছে। সে-ই সবার আগে এগিয়ে যাবে। কোনো বিশেষ ধর্ম বা জাতিকে এখানে দায়ী করা বিজ্ঞানসম্মত নয়।
সবচেয়ে গভীর সত্য
মানুষ সারাজীবন পরিচয় বহন করে – আমি মুসলমান, আমি হিন্দু, আমি বৌদ্ধ, আমি নাস্তিক, আমি বাঙালি, আমি আরবী। কিন্তু মৃত্যু যখন সামনে দাঁড়ায়, তখন এই পরিচয়গুলো একে একে খুলে পড়ে – এবং ভেতরে থাকে শুধু একটি ভয়-পাওয়া মানুষ, যে বাঁচতে চায়, ভালোবাসতে চায়, এবং মাঝে মাঝে অসাধারণ সাহসও দেখাতে পারে।
ধর্ম ও মতাদর্শ চরম সংকটে হয় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, নয়তো সবার আগে ঝরে পড়ে। কোনটি হবে – সেটি নির্ভর করে ঐ মানুষটির সারাজীবনের চর্চার উপর, শুধু বিশ্বাসের উপর নয়।
Related Posts

‘Hijab is my choice’ – the same people who make this claim in secular countries often force women to wear hijab in their own countries
Iranian singer Parastu Ahmadi has been sentenced to 74 lashes for the “crime” of performingRead More

হিজাব ইজ মাই চয়েস – এই বুলি সেক্যুলার দেশে যারা দাবী করেন তারা নিজেদের দেশে হিজাব পরতে বাধ্য করেন
ইরানি গায়িকা পারাস্তু আহমাদিকে হিজাব ছাড়া মঞ্চে পরিবেশনার অপরাধে ৭৪টি বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়েছে। এইRead More

Attacks by “Tawhidi Janata” in Bangladesh and Obstruction of Minority Religious Practice
In Palashbari upazila of Gaibandha, local Sanatan (Hindu) devotees had taken the initiative to buildRead More

Comments are Closed