
When society itself becomes the killer
সমাজ যখন খুনিঃ নৈতিকতার ভিত্তি হওয়া উচিত মানবিকতা, সামাজিক লজ্জা নয়
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান বা দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে “সম্মান” বা “ইজ্জত” ধারণাটি এতটাই বিকৃতভাবে প্রতিষ্ঠিত যে পরিবারের কোনো সদস্য – বিশেষ করে মেয়ে – সমাজের চোখে “লজ্জাজনক” কিছু করলে পরিবার মনে করে তাদের সামাজিক মর্যাদা নষ্ট হয়ে যাবে। এই ভয় থেকেই বহু পরিবার নিজের সন্তানকেই হত্যা করে, বা তাকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করে, যাকে বলতে পারেন “honor killing” বা সম্মান রক্ষার নামে হত্যা। এটি এমন একটি ঘটনা যেখানে সামাজিক লজ্জা সরাসরি হত্যার কারণ।
ধরা যাক, পাকিস্তানের একটি গ্রামে ১৭ বছরের একটি মেয়ে তার পছন্দের ছেলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করতে চায়। পরিবার বিষয়টি জানতে পারে। সমাজে খবর ছড়িয়ে পড়ে – “মেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে”, “পরিবারের ইজ্জত শেষ”, “এমন মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখলে পুরো পরিবার অপমানিত হবে”।
সমাজের এই চাপ, গসিপ, অপমানের ভয়- সব মিলিয়ে মেয়েটির বাবা বা ভাই সিদ্ধান্ত নেয় “সম্মান রক্ষার” জন্য মেয়েটিকে হত্যা করতে হবে। এটি কোনো কল্পকাহিনি নয় – পাকিস্তানে প্রতি বছর শত শত নারী এভাবে নিহত হয়। ভারতেও একইভাবে আন্তঃজাতি বা আন্তঃধর্ম প্রেমের কারণে মেয়েদের হত্যা করা হয়। বাংলাদেশেও এমন ঘটনা ঘটে, যদিও তুলনামূলক কম রিপোর্ট হয়। এখানে হত্যার মূল কারণ ব্যক্তিগত নৈতিকতা নয়, বরং সমাজের লজ্জা ও সামাজিক চাপ।
বাংলাদেশে অবিবাহিত অবস্থায় গর্ভধারণের জন্য কত সদ্য জন্ম দেয়া শিশুকে হত্যা করা হয় বা উক্ত নারী আত্মহত্যা করেন – তার হিসাব কেউ দিতে পারবে না। রাস্তাঘাটে, বনে-বাঁদাড়ে কত শিশু শিয়াল-কুকুরের খাদ্য হয়, কতজন্য টয়লেটের ফ্ল্যাশের সঙ্গে ভেসে যায়। রাস্তায়, ডাস্তবিনে কত শিশুকে খুঁজে পাওয়া যায়। যে সমাজের কারনে এই পরিস্থিতি – তাকে আপনি আদর্শ সমাজ বলবেন? মানব শিশুর জন্ম যেভাবেই হোক, এই পৃথিবীতে তার ও তার মায়ের পরিপূর্ণ অধিকার আছে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে অবিবাহিত মেয়েদের গর্ভধারণকে সমাজ ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে দেখে।
ধরা যাক, একটি কলেজছাত্রী ভুল করে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। সে জানে –
- পরিবার তাকে মারধর করবে
- সমাজ তাকে “অবৈধ”, “খারাপ মেয়ে”, “জারজের মা” বলে অপমান করবে
- ভবিষ্যতে বিয়ে, শিক্ষা, চাকরি – সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে
- পরিবার সমাজের কাছে মুখ দেখাতে পারবে না
এই ভয়, লজ্জা, অপমানের চাপ তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।
অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা গোপনে আত্মহত্যা করে – কারণ তারা মনে করে মৃত্যু সমাজের বিচার থেকে সহজ। এখানে আত্মহত্যার কারণ ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং সমাজের নির্মম লজ্জা-সংস্কৃতি। এই হত্যাকাণ্ডের খুনের দায় সমাজের। কিন্তু সমাজ যেহেতু কোন নির্দিষ্ট মানুষ না, সেজন্য কারো শাস্তি হয় না।
- সমাজ যখন লজ্জাকে নৈতিকতার চেয়ে বড় করে তোলে
- যখন মানুষের জীবনকে সামাজিক সম্মানের নিচে রাখা হয়
- যখন পরিবার সমাজের ভয়কে সন্তানের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়
তখন সামাজিক লজ্জাই সরাসরি হত্যার বা আত্মহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রত্যেক বাবা-মায়ের মৌলিক দায়িত্ব হলো সন্তানকে এমনভাবে বড় করা, যাতে তারা বুঝতে পারে – সমাজের মতামত কোনো চূড়ান্ত নৈতিক মানদণ্ড নয়। সমাজের মূল্যবোধ সময়ের সঙ্গে বদলায়, অঞ্চলভেদে বদলায়, এমনকি একই সমাজের মধ্যেও শ্রেণি, ধর্ম, লিঙ্গভেদে ভিন্ন হয়। তাই সন্তানদের শেখাতে হবে যে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সমাজের অনুমোদন নয়, বরং যুক্তি, মানবিকতা, এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাই প্রধান। আর যদি কখনো তারা ভুল সিদ্ধান্ত নেয় বা বিপদে পড়ে, তখন বাবা-মাই হবে তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সহায়। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবারগুলোতে এই নির্ভরতার জায়গাটি দুর্বল – কারণ এখানে বাবা-মাকে শাসক হিসেবে দেখা হয়, অভিভাবক হিসেবে নয়। অথচ গবেষণা দেখায়, যেসব পরিবারে সন্তানরা ভুল করলে বাবা-মায়ের কাছে নির্ভয়ে যেতে পারে, সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের হার কমে, মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে, এবং সংকট মোকাবিলার ক্ষমতা বাড়ে।
ধরা যাক, একটি মেয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক বয়সে তার সমবয়সী কোনো ছেলের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান – এই তিন দেশের সমাজে এমন ঘটনা জানাজানি হওয়া মানেই মেয়েটির ওপর সামাজিক শাস্তি। কিন্তু এই শাস্তি কোনো নৈতিক যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং এটি পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর ফল, যেখানে যৌনতার দায় একতরফাভাবে মেয়েদের ওপর চাপানো হয়। ছেলেটি প্রায়ই দায়মুক্ত থাকে, কারণ সমাজ তার আচরণকে “স্বাভাবিক” বলে ধরে নেয়। অথচ অপ্রাপ্ত বয়সে যৌন সম্পর্কের ঝুঁকি সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা না দেওয়ার দায় সমাজেরই। যে সমাজ যৌনতা নিয়ে নীরবতা বজায় রাখে, তথ্য গোপন করে, কুসংস্কার ছড়ায় – সে সমাজের নৈতিকভাবে বিচার করার অধিকার নেই। তাই মেয়েটির প্রথম কাজ হওয়া উচিত সমাজের অযৌক্তিক বিচারকে উপেক্ষা করা, এবং বাবা-মায়ের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সন্তানের পাশে দাঁড়ানো – কারণ নৈতিকতার ভিত্তি হওয়া উচিত মানবিকতা, সামাজিক লজ্জা নয়।
যে কোনো বয়সে যৌন সম্পর্কের ফলে যদি কোনো শারীরিক দুর্ঘটনা ঘটে – যেমন অতিরিক্ত রক্তপাত, সংক্রমণ, বা অন্য কোনো জটিলতা – তখন চিকিৎসা পাওয়াই হওয়া উচিত প্রথম অগ্রাধিকার। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে চিকিৎসার আগে খোঁজা হয় দোষী। মেয়েটি মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকলেও সমাজ ব্যস্ত থাকে তার চরিত্র বিচার করতে। এটি শুধু অমানবিক নয়, বরং জনস্বাস্থ্যবিরোধী। কারণ চিকিৎসা বিলম্বিত হলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে, এবং ভয়-লজ্জার কারণে অনেক মেয়ে চিকিৎসা নিতে দেরি করে। বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সন্তান জানবে – যে কোনো বিপদে তারা প্রথমেই বাবা-মায়ের কাছে আসতে পারে। সমাজের বিচার নয়, সন্তানের জীবনই প্রধান।
বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের ফলে সন্তান গর্ভে এলে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে মেয়েদের ওপর যে ভয়াবহ চাপ তৈরি হয়, তা বহু জীবন নষ্ট করে। সামাজিক লজ্জার ভয়ে অনেক মেয়ে আত্মহত্যা করে, কেউ গর্ভপাত করায়, কেউ জন্মের পর শিশুকে হত্যা করে বা রাস্তায় ফেলে যায়। এই আচরণগুলো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় – এগুলো সামাজিক ব্যর্থতা। কারণ সমাজ যদি একজন একাকী মা’কে সমর্থন না দেয়, যদি শিশুকে “অবৈধ” বলে কলঙ্কিত করে, তবে সেই সমাজই মানবিকতার পরীক্ষায় ফেল করে। বাস্তবিকভাবে, কোনো শিশুই “অবৈধ” নয় – কারণ শিশুর জন্মের পরিস্থিতি তার মানবিক মর্যাদা নির্ধারণ করে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এবং সমাজের দায়িত্ব হলো মা-বাবাকে সমর্থন করা। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজকে শিখতে হবে – মানুষের মর্যাদা জন্মসূত্রে নয়, মানবিকতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো সঠিক যৌন শিক্ষা। গবেষণা প্রমাণ করে, যেসব দেশে প্রাথমিক স্তর থেকেই যৌন শিক্ষা দেওয়া হয়, সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভধারণ, যৌন রোগ, ধর্ষণ, এবং যৌন সহিংসতার হার কমে। কারণ তথ্য মানুষকে দায়িত্বশীল করে, আর অজ্ঞতা মানুষকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ যৌনতা নিয়ে নীরবতা বজায় রেখে আসলে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শিশুদের শেখানো উচিত – শরীর কীভাবে কাজ করে, যৌন সম্পর্কের ঝুঁকি কী, সম্মতি কী, বিপদে কোথায় সাহায্য পাওয়া যায়। ধর্ষণের মতো অপরাধ কমাতে শুধু শাস্তির ভয় যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানবিকতা, সহমর্মিতা, এবং যৌনতার সামাজিক-মানসিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান – এই তিন দেশের সমাজই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও পরিবর্তনকে ভয় পায়। কারণ পরিবর্তন মানে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে যাওয়া। কিন্তু সমাজ যদি মানুষের প্রয়োজন, নিরাপত্তা, এবং মানবিকতার ভিত্তিতে পরিবর্তিত হতে না পারে, তবে তাকে পাত্তা না দিলেই একসময় সে বাধ্য হবে পরিবর্তন হতে। ইতিহাস দেখায় – মানুষের প্রয়োজনই সমাজকে বদলায়, সমাজের ভয় নয়।
Related Posts

‘Hijab is my choice’ – the same people who make this claim in secular countries often force women to wear hijab in their own countries
Iranian singer Parastu Ahmadi has been sentenced to 74 lashes for the “crime” of performingRead More

হিজাব ইজ মাই চয়েস – এই বুলি সেক্যুলার দেশে যারা দাবী করেন তারা নিজেদের দেশে হিজাব পরতে বাধ্য করেন
ইরানি গায়িকা পারাস্তু আহমাদিকে হিজাব ছাড়া মঞ্চে পরিবেশনার অপরাধে ৭৪টি বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়েছে। এইRead More

Attacks by “Tawhidi Janata” in Bangladesh and Obstruction of Minority Religious Practice
In Palashbari upazila of Gaibandha, local Sanatan (Hindu) devotees had taken the initiative to buildRead More

Comments are Closed