People
The Root of Indian People

The Root of Indian People

একদা ভারতীয় উপমহদেশের মানুষ বিশ্বের সব ধর্মের অত্যাচারিত, নিপিড়ীত মানুষকে আশ্রয় দিতো

ইতিহাসের দুই হাজার বছরের পথ ধরে হাঁটলে আপনি আপনার জেনেটিক উত্তরাধিকার নিয়ে যেমন গর্ব করতে পারবেন, তেমনি একটি বিস্ময়কর সত্য উন্মোচিত হতে দেখবেন – যে ভূখণ্ডকে আজ আমরা দারিদ্র্য ও অনুন্নয়নের প্রতীক হিসেবে চিনি, সেই ভারতীয় উপমহাদেশ একদিন বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ, জ্ঞানসম্পন্ন ও উদার সভ্যতার আঁতুড়ঘর ছিল। হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভারতে দুর্ভিক্ষের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অথচ দখলদার ঔপনিবেশিক শাসনগুলোর পর থেকে এই উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষ বিশ্বের সবচেয়ে অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। এই অধোগতির পেছনে রয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা বহিরাগত শক্তির লুণ্ঠন, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং ধর্মের নামে কৃত্রিম বিভাজন। চলুন একটু ইতিহাসের পথ ধরে হাঁটি। বলে নেই, আমার সব বর্ননা ১০০% ঠিক নাও হতে পারে, জানালে সংশোধন করে নিবো।

এক. সোনার ভারত — সমৃদ্ধির সুবর্ণ যুগ

১.১ বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবদান

ব্রিটিশ অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন তাঁর যুগান্তকারী গবেষণায় এক অবিশ্বাস্য তথ্য উদঘাটন করেছেন। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকে ১৭০০ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বছর ধরে ভারত বিশ্ব জিডিপিতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রেখেছে। ১৬০০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সময় ব্রিটেনের বিশ্ব জিডিপিতে অবদান ছিল মাত্র ১.৮ শতাংশ, আর ভারতের ছিল ২২.৫ শতাংশ। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজকোষে শুধু কর থেকেই বার্ষিক আয় ছিল ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড। ভারত তখন বিশ্বের শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ – বস্ত্র, ধাতুশিল্প, খনিজ সম্পদ, কৃষি – সর্বক্ষেত্রে ভারত বিশ্বকে নেতৃত্ব দিত।

এই সমৃদ্ধির পেছনে ছিল ভারতের কৃষিভিত্তিক শান্তিপ্রিয় সমাজ। ভারতীয় মানুষ কখনো সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব পোষণ করেনি। তারা অন্য দেশ জয় করতে যায়নি, বরং নিজের ভূমিতে উৎপাদন, শিল্প ও বাণিজ্যের মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। সুপ্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় বণিকেরা আরব, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন ও ইউরোপের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করত, পণ্য ও ধারণা বিনিময় করত।

১.২ হাজার বছরে কোনো দুর্ভিক্ষ নেই

প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাস বলে, হাজার হাজার বছরে সেখানে কোনো বড় দুর্ভিক্ষের রেকর্ড নেই। এর কারণ ছিল ভারতের বৈচিত্র্যময় কৃষিব্যবস্থা, স্থানীয় মজুদ পদ্ধতি এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক সহায়তার শক্তিশালী ঐতিহ্য। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ফসল চাষ হত, তাই এক অঞ্চলে ফসলহানি হলে অন্য অঞ্চল থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত। এই স্থিতিশীলতা ছিল ভারতীয় সমাজের অন্তর্নিহিত শক্তির প্রমাণ।

দুই. জ্ঞানের আলোকবর্তিকা — তক্ষশিলা ও নালন্দা

২.১ তক্ষশিলা — পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রায় ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গান্ধার রাজ্যে (বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ) প্রতিষ্ঠিত তক্ষশিলা বা টেক্সিলা পৃথিবীর প্রথম সুসংগঠিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। এটি ছিল তিনটি প্রধান বাণিজ্যপথের সংযোগস্থলে — পূর্ব ভারত, পশ্চিম এশিয়া ও কাশ্মীর থেকে আসা পথ এখানে মিলিত হত। ফলে তক্ষশিলা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল সভ্যতার এক অসাধারণ সংযোগকেন্দ্র।

এখানে ৬৮টি বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হত — বেদ, ব্যাকরণ, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, অস্ত্রচিকিৎসা, রাজনীতি, তিরন্দাজি, সঙ্গীত, বাণিজ্য সহ বিস্তৃত বিষয়শ্রেণি। ভর্তির ন্যূনতম বয়স ছিল ১৬ বছর। আরব, পারস্য, গ্রিস, বাবিলোনিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসত। চাণক্য, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, জীবক (বুদ্ধের চিকিৎসক) — এরা সকলেই তক্ষশিলার ছাত্র ছিলেন। ১৯৮০ সালে ইউনেস্কো তক্ষশিলাকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

“তক্ষশিলা ছিল প্রাচীন বিশ্বের এক অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে বেদ ও শাস্ত্র থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও রাজনীতি পর্যন্ত সব বিষয় পঠিত হত। শিক্ষার্থীরা সুদূর আরব, পারস্য ও গ্রিস থেকে এসে এখানে জ্ঞানের সন্ধান করতেন।” — Teachers Institute, Ancient Indian Universities, 2026

২.২ নালন্দা — বিশ্বের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়

খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে বিহারের (বর্তমান ভারত) নালন্দায় প্রতিষ্ঠিত নালন্দা মহাবিহার ছিল পৃথিবীর প্রথম সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। ৪২৭ থেকে ১১৯৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৭৭০ বছর ধরে এটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে বিরাজমান ছিল। এখানে একসঙ্গে প্রায় ১০,০০০ ছাত্র ও ২,০০০ শিক্ষক বাস করতেন। চীন, কোরিয়া, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, পারস্য ও তুরস্ক থেকে পণ্ডিতেরা এখানে আসতেন।

নালন্দায় বৌদ্ধ দর্শন, বেদান্ত, যুক্তিশাস্ত্র, ব্যাকরণ, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও শিল্পকলা পড়ানো হত। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং (জুয়ানজাং) এখানে পড়াশোনা করেছিলেন এবং নালন্দার বিস্তারিত বিবরণ রেখে গেছেন। নালন্দার গ্রন্থাগারে লক্ষাধিক পাণ্ডুলিপি ছিল — তিনটি বিশাল গ্রন্থভবন, যাকে ‘রত্নসাগর’, ‘রত্নদধি’ ও ‘রত্নরঞ্জক’ বলা হত।

এই দুটি বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই প্রমাণ করে যে ভারত কেবল অর্থনৈতিকভাবে নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষায়ও বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। ইউরোপের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বোলোনা স্থাপিত হয়েছিল ১০৮৮ সালে — তক্ষশিলার প্রায় দুই হাজার বছর পরে।

তিন. উদারতার দেশ — ভালবাসা বিলানো ভূমি ভারত

ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাদের উদারতা ও সহানুভূতি। ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যখনই কোনো মানুষ নির্যাতিত হয়েছে, ভারত তাদের জন্য উন্মুক্ত বাহু মেলে রেখেছে।

প্রথম শতাব্দীতে জেরুজালেমের পতনের পর নির্যাতিত ইহুদিরা ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করে। অন্তত চতুর্থ শতাব্দী থেকে, সম্ভবত আরও আগে থেকে, নির্যাতিত খ্রিস্টানরা ভারতে এসেছেন — বিশেষত কেরালায় সেন্ট থমাস-আনীত খ্রিস্টধর্মের গভীর শিকড় আজও বিদ্যমান।

সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (৬৪১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে) আরব মুসলিম বাহিনী পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে। এর ফলে পারস্যে ইসলামের বিস্তার শুরু হয়। পরবর্তীকালে উমাইয়া খিলাফতের শাসনামলে স্থানীয় পারসি বা জরথুষ্ট্রীয়দের ওপর দমনপীড়ন তীব্র আকার ধারণ করে। জিজিয়া কর আরোপ করা হয়, ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করা হয়, জরথুষ্ট্রীয়দের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হতো যাতে তারা বাধ্য হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। অষ্টম শতাব্দীর প্রথম দিকে (এবং তার কিছু আগে-পরে) ইরানে এই দমনপীড়নের মুখে পারসিরা (যারা মূলত জরথুষ্ট্রীয় বা Zoroastrian ধর্মাবলম্বী ছিলেন) ভারতে এসেছেন এবং এদেশের মাটিতে মিশে গেছেন। তীব্র ধর্মীয় ও সামাজিক নিপীড়ন থেকে নিজেদের ধর্ম এবং সংস্কৃতি রক্ষা করার জন্য পারসিদের একটি বড় দল সমুদ্রপথে পারস্য উপসাগর পাড়ি দিয়ে ভারতের গুজরাট উপকূলে (সঞ্জান নামক স্থানে) এসে আশ্রয় নেয়। ভারতের স্থানীয় হিন্দু রাজা (যিনি ‘যাদি রানা’ নামে পরিচিত ছিলেন) তাদেরকে উদারভাবে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ভারতে এই পারসি অভিবাসীরাই পরবর্তীকালে ‘পার্সি’ (Parsi) সম্প্রদায় নামে পরিচিতি লাভ করে। ভারতের বিরাট বড় বিজনেস সম্রাট, টাটা সাম্রাজ্যের জামশেদজি টাটা থেকে শুরু করে রতন টাটা পর্যন্ত বহু কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব সেই পারসি উত্তরাধিকারের বাহক।

এছাড়া আর্মেনিয়ান, আরব মুসলিম বণিক, উনিশ শতকে নির্যাতিত বাহাই সম্প্রদায় — সকলেই ভারতে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছেন। পলাশীর যুদ্ধের সময়ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বণিক ও পেশাজীবীরা গঙ্গা অববাহিকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। সুপ্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় সভ্যতা এই উদারতার কারণেই বিভিন্ন মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করে আরও সমৃদ্ধ হয়েছে, সহানুভূতির চাদর বিছিয়ে দিয়েছে বিশ্বের নির্যাতিত, অত্যাচারিত মানুষদের উপর।

দুই হাজার বছর আগে থেকে কয়েক শতক ধরে ভারতীয় বণিক, অভিবাসী ও পণ্ডিতেরা চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যাওয়া-আসা করতেন। সেই সম্পর্কের গভীর প্রভাব আজও ওই দেশগুলোর ভাষা, সাহিত্য ও স্থাপত্যে স্পষ্ট। যেমন তারাও আমাদের মতো করে পহেলা বৈশাখের সময়েই তাদের নববর্ষ পালন করেন। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ, কম্বোডিয়ার ঐতিহ্য অংকর ওয়াট (Angkor Wat) সেই ভারতীয় সংস্কৃতির এক্সটেনশান আজও, এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ধর্মীয় উপাসনালয়, যা দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ হিন্দু ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেছিলেন (পরবর্তীতে এটি বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়)। ইতিহাসের পাতায় এই গৌরবময় অধ্যায়টিকে “বৃহত্তর ভারত” (Greater India) বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার “ভারতীয়করণ” (Indianization) বলা হয়ে থাকে। থাইল্যান্ডের জাতীয় মহাকাব্য ‘রামাকিয়েন’ (Ramakien) মূলত ভারতীয় রামায়ণেরই থাই সংস্করণ। দেশটির প্রাচীন রাজধানী ছিল ‘অয়ুথ্যায়া’ (Ayutthaya), যা ভারতের ‘অযোধ্যা’ শব্দের থাই উচ্চারণ। এমনকি বর্তমান থাই রাজাদের উপাধিও হয় ‘রামা’ (যেমন বর্তমান রাজা হলেন রামা দশম)। ইসলাম বা ইউরোপের মতো কোনো সামরিক আক্রমণ বা জোরপূর্বক সাম্রাজ্য বিস্তার ছাড়াই, কেবল বাণিজ্য, ধর্ম (হিন্দু ও বৌদ্ধ) এবং সংস্কৃতির মাধ্যমে এই বিশাল অঞ্চলের মানুষের মন জয় করা হয়েছিল। প্রাচীন ভারতের সেই সফট পাওয়ার (Soft Power) বা সাংস্কৃতিক প্রভাব কতটা শক্তিশালী ও স্থায়ী ছিল, যা হাজার বছর পরেও আজ স্বমহিমায় টিকে আছে।

বাঙালি অতীশ দীপঙ্কর আজও তিব্বতের ইতিহাসে এক চিরন্তন এবং অবিস্মরণীয় ‘আলোকবর্তিকা’ (Light of Asia)। আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে তিব্বতের অন্ধকারাচ্ছন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক পরিস্থিতিতে তিনি যে সংস্কারের আলো জ্বালিয়েছিলেন, তার প্রভাব আজও সেখানে অম্লান। বাঙালির এই মহান সন্তানকে তিব্বতীয়রা বুদ্ধের পরেই দ্বিতীয় সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় আসন দেন এবং তাকে ভালোবেসে ডাকেন ‘জোবো জে’ (Jowo-je) বা ‘মহাপ্রভু’ নামে।

চার. লুণ্ঠনের শতাব্দী — একে একে ধ্বংস হলো সভ্যতা

৪.১ বিদেশী আক্রমণকারীদের প্রথম আঘাত

ভারতের মানুষদের এই সমৃদ্ধি ও শান্তিপ্রিয়তাই তাকে বারবার বিদেশী লুণ্ঠনকারীদের লক্ষ্যে পরিণত করেছে। যারা নিজেরা কখনো অন্যের ভূমিতে যায়নি, তাদের সম্পদ লুট করতে বারবার এসেছে বিদেশী শক্তি। দ্বাদশ শতাব্দীতে বখতিয়ার খলজির আক্রমণে নালন্দার অতুলনীয় ক্ষতি হয়, গ্রন্থাগার ও বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, গ্রন্থাগারে আগুন লাগার পর এতটাই বিশাল ছিল সেটি যে কয়েক মাস ধরে জ্বলেছিল। এই ধ্বংসযজ্ঞ ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষতি।

নাদির শাহের আক্রমণের পর বলা হয়েছিল, ভারত থেকে এতটাই সম্পদ লুট করা হয়েছিল যে পারস্যে তিন বছর কর মওকুফ করা সম্ভব হয়েছিল। মুঘল আমলেও তাজমহাল নির্মাণের ব্যয় মেটাতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।

৪.২ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ

১৬০০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতের ভাগ্যে যে অন্ধকার নেমে এসেছিল, তা ইতিহাসের সবচেয়ে সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক শোষণের উদাহরণ। পলাশী যুদ্ধের পর দেখা গেল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্যদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন — অর্থাৎ ভারত লুণ্ঠনে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতৃত্বের যৌথ স্বার্থ ছিল।

ব্রিটিশ শাসন শুরু হয়েছিল ১৭৬৯-৭০ সালের মহাদুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে। শুধু বাংলায় ওই দুর্ভিক্ষে প্রায় এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। এরপর পুরো ব্রিটিশ শাসনকালজুড়ে নিয়মিত দুর্ভিক্ষ হয়েছে। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে (যার জন্য চার্চিলের নীতি অনেকাংশে দায়ী) আরও ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। সব মিলিয়ে ব্রিটিশ শাসনকালে ৬ কোটিরও বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা গেছেন বলে ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন।

“অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতের বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান ছিল ২৩ শতাংশ, যা সমগ্র ইউরোপের সমান। ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার সময় তা নেমে এসেছিল মাত্র ৩ শতাংশে। কারণটি সহজ: ভারত শাসিত হয়েছিল ব্রিটেনের সুবিধার জন্য।” — শশী থারুর, Inglorious Empire

অর্থনীতিবিদ উৎসা পটনায়ক গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে ব্রিটেন ভারত থেকে প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার (আজকের মূল্যমানে) সম্পদ নিষ্কাশন করেছে। ভারতের বিশ্ব উৎপাদন রপ্তানির শেয়ার ব্রিটিশ শাসনে ২৭ শতাংশ থেকে নেমে এসেছিল মাত্র ২ শতাংশে। দাদাভাই নওরোজি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Poverty and Un-British Rule in India’ (১৯০১)-এ এই সম্পদ নিষ্কাশনকে (Drain of Wealth) ভারতের দারিদ্র্যের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বাংলা থেকে লুট করা সম্পদ ব্রিটেনে যেত, সেখানে শিল্পবিপ্লবের জ্বালানি যোগাত। অথচ ভারতে কৃত্রিমভাবে কুটির শিল্প ধ্বংস করা হয়েছিল। ব্রিটিশরা ভারতের কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পণ্য আবার ভারতে বিক্রি করত — এ যেন অপমানের উপর অপমান। উনিশ শতকের শেষ নাগাদ ভারত ছিল ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎস এবং ব্রিটিশ পণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা — আর সেই সব খরচ বহন করত ভারতীয়রাই।

পাঁচ. স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র — দুর্ভিক্ষের অবসান

অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে ভারতে আর কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি। তিনি বলেন, যত দিন না ভারতের জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার পেয়েছে, তত দিন ভারত দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি পায়নি। গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং একটি মুক্ত সংবাদমাধ্যম দুর্ভিক্ষ রোধের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। এটি প্রমাণ করে যে ভারতের দারিদ্র্য কোনো প্রাকৃতিক নিয়তি ছিল না — তা ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের সুচিন্তিত পরিণাম।

ছয়. ধর্মের নামে বিভাজন — হারানো সম্ভাবনার ইতিকথা

৬.১ দেশভাগ এবং তার পরিণাম

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের প্রসঙ্গে বলতে হয়, এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয়। ব্রিটিশ ব্যারিস্টার সিরিল র‌্যাডক্লিফ মাত্র কয়েক সপ্তাহে পাঞ্জাব ও বাংলাকে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিভক্ত করেন — এমন একটি রেখা টানা হয়, যা গ্রামের মধ্য দিয়ে, মাঠের মধ্য দিয়ে চলে গেছে। প্রায় দেড় কোটি মানুষ একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে উদ্বাস্তু হন, ৩ লাখ থেকে দশ লাখের মতো মানুষ প্রাণ হারান, হাজারো নারী নির্যাতনের শিকার হন।

যে উপমহাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বাস করেছিল, যেখানে মুসলিম ও হিন্দু প্রতিবেশী একে অপরের উৎসবে অংশ নিত, একই ভাষায় কথা বলত, একই সংস্কৃতির অংশীদার ছিল — সেই মানুষগুলোকে হঠাৎ করে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করে দেওয়া হলো। ব্রিটিশ ‘বিভাজন করো ও শাসন করো’ নীতির সর্বোচ্চ প্রকাশ ছিল এই দেশভাগ।

৬.২ ধর্মীয় বিভাজনের দীর্ঘমেয়াদী মূল্য

ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান — এই তিন দেশ একই ঐতিহাসিক শিকড়ের উত্তরাধিকারী। একই নদী, একই মাটি, একই লোকসংস্কৃতি, একই রন্ধনশৈলী — এতকিছু মিলিয়েও ধর্মীয় বিভাজনের কারণে এই তিন দেশ সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে পারেনি। সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা নিশ্চিত করতে। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্রমাবনতি, কাশ্মীর সমস্যা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস সার্ককে কার্যত অকার্যকর করে রেখেছে।

চিন্তা করুন, ধর্মীয় বিষবাষ্প সরিয়ে রেখে যদি এই তিন দেশ যদি একযোগে কাজ করত বা এক থাকতো — তাহলে ১৭০ কোটিরও বেশি মানুষের এই অঞ্চল এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লক হতে পারত। বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ২৪ শতাংশ এই অঞ্চলে বাস করে, অথচ বৈশ্বিক আয়ে তাদের ভাগ মাত্র ২.৬২ শতাংশ। এই বিশাল বৈষম্যের পেছনে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী ধর্মীয় রাজনীতিজাত বিভাজনও, ইসলামের উগ্রবাদী মনোভাবের কারনে এই পিছুটান।

এটি ভুললে চলবে না যে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ সুপ্রাচীনকাল থেকে কখনো অন্য দেশ আক্রমণ করেনি। তারা বহু নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সেই একই মানুষগুলোকে পরস্পরের শত্রুতে পরিণত করেছে। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ঐতিহ্য এই অঞ্চলে নতুন নয়, কিন্তু তার সবচেয়ে বিধ্বংসী প্রকাশ ঘটেছে দেশভাগের মাধ্যমে।

সাত. ইতিহাসের পাঠ ও ভবিষ্যতের পথ

হাজার বছর ধরে যে মানুষগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাণিজ্যে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে, বিশ্বের নির্যাতিত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, কখনো আগ্রাসনের পথে যায়নি — সেই মানুষগুলো আজ পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র অঞ্চলের বাসিন্দা। এই অধোগতি প্রকৃতির অভিশাপ নয়, এটি মানুষের তৈরি ইতিহাসের ফলাফল।

শতাব্দীর পর শতাব্দর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ ভারতের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। ১৭০০ সালে ২৭ শতাংশ থেকে ১৯৫০ সালে ৪ শতাংশে নেমে আসা বিশ্ব জিডিপির শেয়ার এই লুণ্ঠনের প্রমাণ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি, যা এই অঞ্চলের মানুষকে একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে সামষ্টিক উন্নয়নের সম্ভাবনা নষ্ট করেছে।

তবু আশার কথা এই যে — অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারতে দুর্ভিক্ষ বন্ধ হয়েছে। নালন্দার পুনর্প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হচ্ছে। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ পরস্পরের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক চায়। ইতিহাসের পাঠ হলো — যে সভ্যতা একদিন বিশ্বকে জ্ঞান ও সম্পদ দিয়েছে, সেই সভ্যতার মানুষের মধ্যে সেই শক্তি এখনো আছে।

প্রয়োজন শুধু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সেই পুরনো ঐতিহাসিক বন্ধনের শিকড়কে স্বীকার করা। তক্ষশিলার জ্ঞান ও নালন্দার আলো যাদের পূর্বপুরুষরা জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, তারা আজও সেই আলো ফিরিয়ে আনতে পারে — যদি ইতিহাসের ক্ষতগুলো সারিয়ে, পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে, একসাথে হাঁটার সাহস দেখানো যায়।

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

১. Angus Maddison, Contours of the World Economy 1–2030 AD — OECD, 2007
২. Shashi Tharoor, Inglorious Empire: What the British Did to India — Penguin, 2017
৩. Utsa Patnaik, Drain of Wealth estimate — Columbia University Press, 2018
৪. Dadabhai Naoroji, Poverty and Un-British Rule in India — 1901
৫. Amartya Sen, Development as Freedom — Oxford University Press, 1999
৬. Teachers Institute, Ancient Indian Universities: Nalanda, Takshashila, and Vikramashila — 2026
৭. UNESCO World Heritage — Taxila (1980), Nalanda (2016)
৮. Wikipedia, University of ancient Taxila; Nalanda; Economic history of India
৯. Imperial War Museums, Partition of India — iwm.org.uk
১০. Shashi Tharoor, An Era of Darkness: The British Empire in India — Aleph Book Company, 2016

Related Posts

Women’s Jewelry: Then and Now

Bengali Women and Their Love for Jewelry: History, Modern Trends, and the Culture of Excess

When the first gold bangle was put on Nalini Devi’s wrist, she was only seven.Read More

Women’s Jewelry: Then and Now

বাঙালি নারীর গহনা প্রীতি – ইতিহাস থেকে বর্তমান ও বাড়াবাড়ির সংস্কৃতি

নলিনী দেবীর হাতে যখন প্রথম সোনার বালা পরানো হয়েছিল, তখন তাঁর বয়স মাত্র সাত। বিয়েরRead More

Humanity’s endless waiting

From ‘Waiting… Nazir’, ‘Aijuddin is in pain’ to waiting on Facebook Messenger — the waiting of humans

About two and a half decades ago, one could see some emotional lines written onRead More

Comments are Closed