
Olivia and Bengali Cinema
চলচ্চিত্রের বিবর্তন, রঙিন পর্দার ইতিহাস এবং ঢাকাই সিনেমার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রঃ অলিভিয়া গোমেজ
ঢাকাই সিনেমায় যে কয়েকজন নায়িকাকে মানুষ পরম শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন অলিভিয়া গোমেজ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের অন্যতম গ্ল্যামারাস, ফ্যাশন-সচেতন এবং শক্তিশালী অভিনেত্রীদের একজন হলেন অলিভিয়া। তাঁকে এ দেশের সিনেমা জগতে অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। পরিচালকেরা থেকে শুরু করে সহশিল্পীরা, এমনকি সাধারন মানুষ – সবাই তাঁকে ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করতেন, যা তাঁর আভিজাত্য এবং ব্যক্তিত্বের প্রতি এক অনন্য স্বীকৃতি।
অলিভিয়া গোমেজের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তানের করাচিতে (পরবর্তীতে তাঁরা বাংলাদেশে চলে আসেন)। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুন্দরী এবং স্টাইলিশ। মডেলিংয়ের মাধ্যমে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হলেও, ১৯৭২ সালে এস এম শফী পরিচালিত ‘ছন্দ হারিয়ে গেলো’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে পা রাখেন। শুরুতেই তিনি তাঁর সাবলীল অভিনয় এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব দিয়ে দর্শকদের মন জয় করে নেন।
অলিভিয়ার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মাইলফলক হলো ১৯৭৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এস এম শফী পরিচালিত সিনেমা ‘দ্য রেইন’। এই সিনেমাটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, দেশের বাইরেও তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। অলিভিয়া এবং ওয়াসিম জুটির এই সিনেমাটি তখন বক্স অফিসে রীতিমতো ঝড় তুলেছিল। ‘দ্য রেইন’ সিনেমার গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। বিশেষ করে, রুনা লায়লার কণ্ঠে এবং আনোয়ার পারভেজের সুরে “একা একা কেন ভালো লাগে না” গানটি সে সময়ের তরুণ-তরুণীদের উন্মাদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই গানে অলিভিয়ার সাবলীল অভিব্যক্তি, তাঁর ওয়েস্টার্ন ফ্যাশন সেন্স এবং গ্ল্যামার তাঁকে তৎকালীন ঢাকাই সিনেমার শীর্ষ নায়িকার আসনে বসিয়ে দেয়। সিনেমাটির গানগুলো এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, এটি উর্দু এবং ফরাসি ভাষাতেও ডাব করা হয়েছিল।

অলিভিয়া কেবল গ্ল্যামারাস চরিত্রেই আটকে থাকেননি। তিনি গ্রামীণ, সামাজিক এবং অ্যাকশনধর্মী চরিত্রেও সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ
- ‘দোস্ত দুশমন’ (বিখ্যাত হিন্দি সিনেমা ‘শোলে’-এর রিমেক, যেখানে তিনি হেমা মালিনীর চরিত্রটি করেছিলেন)
- ‘যাদুর বাঁশী’
- ‘বাহাদুর’
- ‘শ্রীমতি ৪২০’
তিনি সে সময়ের ঢাকাই সিনেমায় ফ্যাশনের এক নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন। তাঁর হেয়ারস্টাইল, পোশাক নির্বাচন এবং মেকআপ তৎকালীন নারীদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করত। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের একজন সত্যিকারের ‘ফ্যাশন আইকন’।
সিনেমা জগতে অলিভিয়া ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং পেশাদার। ফালতু গসিপ বা বিতর্কে তাঁকে কখনও জড়াতে দেখা যায়নি। সে কারণেই ইন্ডাস্ট্রির সবাই তাঁকে ‘ম্যাডাম’ বলে ডাকত। ১৯৯৫ সালে স্বামী এস এম শফীর মৃত্যুর পর তিনি ধীরে ধীরে সিনেমা জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। বর্তমানে তিনি প্রচারের আলো থেকে সম্পূর্ণ দূরে, নিভৃতে এক আধ্যাত্মিক ও শান্তিময় জীবন যাপন করছেন। তবে পর্দার আড়ালে থাকলেও, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে
সিনেমা প্রযুক্তির ইতিহাসঃ আলো ও ছায়ার জাদুকরী শুরু
সিনেমা প্রযুক্তির ইতিহাস মূলত বিজ্ঞান ও শিল্পের এক অপূর্ব মেলবন্ধনের ইতিহাস। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই জাদুর সূচনা হয়।
- প্রাথমিক যুগ (Early Era): ১৮৯০-এর দশকে টমাস আলভা এডিসন এবং তাঁর সহকারী উইলিয়াম কেনেডি ডিকসন ‘কাইনেটোস্কোপ’ (Kinetoscope) নামক একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে চলন্ত ছবি দেখতে পেতেন। তবে সিনেমার প্রকৃত উন্মেষ ঘটে ১৮৯৫ সালে, যখন ফ্রান্সের লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় (অগাস্ট এবং লুই লুমিয়ের) ‘সিনেমাটোগ্রাফ’ (Cinematograph) আবিষ্কার করেন। এটি একই সাথে ক্যামেরা, প্রজেক্টর এবং প্রিন্টার হিসেবে কাজ করত। তারা প্যারিসের এক ক্যাফেতে সর্বপ্রথম দর্শকদের সামনে চলন্ত ছবি প্রদর্শন করেন।
- নির্বাক যুগ থেকে সবাক যুগ (Silent to Sound Era): প্রথম দিকের সিনেমাগুলো ছিল নির্বাক। পর্দায় ছবি চলত আর প্রেক্ষাগৃহে আবহসংগীত হিসেবে পিয়ানো বাজানো হতো। ১৯২৭ সালে ‘দ্য জ্যাজ সিঙ্গার’ (The Jazz Singer) মুক্তির মাধ্যমে সিনেমায় শব্দের যুগ শুরু হয়। প্রযুক্তির এই বিশাল উল্লম্ফন চলচ্চিত্রকে এক নতুন মাত্রা দেয়।
- ক্যামেরা ও রিলের বিবর্তন: শুরুর দিকে সেলুলয়েড ফিল্ম (৩৫ মিমি) ব্যবহার করা হতো, যা ছিল অত্যন্ত দাহ্য। পরে সেফটি ফিল্মের প্রচলন হয়। অ্যানালগ ক্যামেরা থেকে বিবর্তিত হয়ে আজ আমরা ডিজিটাল ক্যামেরার যুগে প্রবেশ করেছি। রেড (RED), আরি (ARRI)-এর মতো আধুনিক ডিজিটাল ক্যামেরাগুলো এখন নিখুঁত রেজ্যুলেশনে সিনেমা ধারণ করতে পারে।
- ভিএফএক্স (VFX) ও সিজিআই (CGI): বর্তমান সিনেমা প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস এবং কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজেরি। ‘জুরাসিক পার্ক’ বা ‘অ্যাভাটার’-এর মতো সিনেমাগুলো প্রমাণ করেছে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে কল্পনার যেকোনো জগৎকে পর্দায় জীবন্ত করে তোলা সম্ভব।
রঙিন সিনেমার ইতিহাসঃ সাদাকালো থেকে রঙের দুনিয়ায়
সিনেমা যখন আবিষ্কৃত হয়, তখন তা ছিল কেবল সাদাকালো। কিন্তু মানুষের চোখ তো রঙিন দুনিয়া দেখতেই অভ্যস্ত। তাই নির্মাতারা শুরু থেকেই সিনেমায় রঙ যুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
- হাতে রাঙানো সিনেমা (Hand-tinting): বিশ শতকের একেবারে শুরুতে, জর্জেস মেলিয়েস-এর মতো নির্মাতারা ফ্রেম ধরে ধরে ফিল্মের ওপর হাতে রং করতেন। এটি ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়া।
- কাইনেমাকালার (Kinemacolor): ১৯০৬ সালে জর্জ আলবার্ট স্মিথ কাইনেমাকালার আবিষ্কার করেন। এটি ছিল প্রথম সফল টু-কালার (লাল ও সবুজ) মোশন পিকচার প্রসেস।
- টেকনিকালার (Technicolor): রঙিন সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপ্লবটি ঘটে ‘টেকনিকালার’ প্রযুক্তির মাধ্যমে। ১৯১৫ সালে এই কোম্পানির যাত্রা শুরু হলেও, ১৯৩২ সালে তাদের থ্রি-স্ট্রিপ (Three-strip) প্রসেস আবিষ্কারের পর তা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। এই প্রযুক্তিতে লাল, সবুজ এবং নীল—এই তিনটি রঙের আলাদা ফিল্ম ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ রঙিন ছবি তৈরি করা হতো। ১৯৩৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দ্য উইজার্ড অব ওজ’ (The Wizard of Oz) এবং ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ (Gone with the Wind) টেকনিকালার প্রযুক্তির অমর সৃষ্টি।
- ইস্টম্যানকালার ও ডিজিটাল যুগ: ১৯৫০-এর দশকে ‘ইস্টম্যানকালার’ প্রযুক্তি আসার পর রঙিন সিনেমা নির্মাণ আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে। আর আজকের দিনে ডিজিটাল কালার গ্রেডিংয়ের মাধ্যমে সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে মনের মতো রং, কন্ট্রাস্ট ও মুড তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশে সিনেমার ইতিহাসঃ শেকড় থেকে সোনালী যুগ
বিশ্ব চলচ্চিত্রের এই প্রযুক্তিগত ও শৈল্পিক বিবর্তনের প্রভাব আমাদের এই বদ্বীপেও পড়েছিল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও সফলতার এক অনন্য দলিল।
- সূচনালগ্ন: এই অঞ্চলে চলচ্চিত্রের প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল ১৮৯৮ সালে, ঢাকার ক্রাউন থিয়েটারে। তবে বাঙালি হিসেবে প্রথম সিনেমা নির্মাণের কৃতিত্ব হীরালাল সেনের।
- প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র: পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ সবাক বাংলা চলচ্চিত্র হলো ‘মুখ ও মুখোশ’। আবদুল জব্বার খানের পরিচালনায় এই সিনেমাটি ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পায়। কোনো স্টুডিও বা উন্নত প্রযুক্তি ছাড়াই অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে এই সিনেমাটি নির্মিত হয়েছিল, যা এ দেশের চলচ্চিত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
- এফডিসি (FDC) প্রতিষ্ঠা: ১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী) উদ্যোগে ‘পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন’ (বর্তমান বিএফডিসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
- সোনালী যুগ (Golden Era): ষাট, সত্তর এবং আশির দশক ছিল বাংলাদেশের সিনেমার সোনালী যুগ। জহির রায়হান, আলমগীর কবির, আমজাদ হোসেন, সুভাষ দত্তের মতো কিংবদন্তি পরিচালকরা একের পর এক কালজয়ী সিনেমা নির্মাণ করেন। ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর মতো সিনেমাগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়। এই সময়েই রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, ববিতা, ফারুক এবং অলিভিয়ার মতো তারকারা পর্দায় রাজত্ব শুরু করেন।
শেষের কথা
লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয়ের সেই সাদাকালো নির্বাক ছায়াছবি থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তির রঙিন ডিজিটাল দুনিয়া – সিনেমার এই দীর্ঘ যাত্রাপথ মানবসভ্যতার সৃষ্টিশীলতার এক অপূর্ব নিদর্শন। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টেছে সিনেমার ভাষা ও রূপ। আর এই বিবর্তনের পথে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও তৈরি করেছে নিজস্ব এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। ‘মুখ ও মুখোশ’-এর সংগ্রাম দিয়ে শুরু হওয়া এই ইন্ডাস্ট্রি একসময় ‘দ্য রেইন’-এর মতো আন্তর্জাতিক মানের ব্লকবাস্টার উপহার দিয়েছে।
আর এই সফলতার নেপথ্যে ছিলেন অলিভিয়া গোমেজের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা। তিনি শুধু তাঁর গ্ল্যামার বা অভিনয় দিয়ে নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিত্ব, রুচিবোধ এবং পেশাদারিত্ব দিয়ে ঢাকাই সিনেমায় নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রযুক্তি হয়তো ভবিষ্যৎ সিনেমাকে আরও অনেক দূর নিয়ে যাবে, নতুন নতুন রঙের ছটায় পর্দা আরও ঝলমলে হয়ে উঠবে; কিন্তু অলিভিয়া গোমেজের মতো শিল্পীদের অবদান এবং তাঁদের অভিনীত ক্ল্যাসিক সিনেমাগুলো বাঙালি দর্শকের হৃদয়ে চিরকাল সেই একই আবেদন নিয়ে বেঁচে থাকবে।
Related Posts

From ‘Waiting… Nazir’, ‘Aijuddin is in pain’ to waiting on Facebook Messenger — the waiting of humans
About two and a half decades ago, one could see some emotional lines written onRead More

“অপেক্ষায় …নাজির”, “কষ্টে আছে আইজুদ্দিন” থেকে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে প্রতীক্ষা মানুষের
এখান থেকে প্রায় আড়াই দশক আগে ঢাকা শহরের দেয়ালে দেখা যেতো কিছু আবেগীয় পংতির দেয়ালRead More

In Search of Humans
Today, when I open YouTube, scroll through Facebook, or get lost in TikTok’s endless feed,Read More

Comments are Closed