
The Restraint of Ramadan and the Reality
২৫০০ টাকার ইফতার! অন্যদিকে সেহরিতে মরিচ পোড়া – পানি ভাত, ইফতারে রুটি আর শাকপাতা
ছোটবেলা শিক্ষা পেয়েছিলাম কাউকে শেয়ার দিয়ে খাওয়ার সুযোগ না থাকলে অন্যের সামনে প্রকাশ্যে খাওয়া ঠিক নয়। ধরুন আপনার সামনে একজন অভুক্ত আর আপনি লোভনীয় কিছু খাবার গোগ্রাসে গিলছেন ! সোস্যাল মিডিয়ার যুগে এমনও দেখতে হয়। ফেসবুকে, নেটে বিজ্ঞাপন, রিভিউ দেখি বাহারী ইফতারের। কোনটার মূল্য ২৫০০+ টাকা জনপ্রতি, কোনটা ৫০০+ টাকা যা আমার মত আদার ব্যাপারীর জন্য নিতান্তই বিলাসিতা। আপনি বলতে পারেন, আপনার টাকায় আপনি খান, আপনার বন্ধুদের দেখান, কার কী? আমরা সাধারন মানুষ, কোনকালেই এসব কিনে খেতে পারিনি, এখনও পারি না। তবুও দেখতে হয় প্রতিনিয়ত, সামনে চলে আসে। এসবের অনেক ক্রেতাও আছে আমার লিস্টে ! অনেক বড় লোক সব বন্ধুর ভীড়ে আমি ছোট মানুষ চাপা পড়ে যাই।
বিশ্বাস করেন, আমি গ্রামে বড় হয়েছি – রোজার ইফতারে যে পিঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা খেতে হয় এসব আমি জানতামই না শহরে আসার আগ পর্যন্ত। তীব্র গরমের সময় দেখতাম সর্বোচ্চ উপজেলা শহর থেকে ১ টাকার এক গোল্লা আইস কিনে আনতে। ইফতার বলতে ছিল মূলত চিড়া, মুড়ি, গুড়, নারিকেল, খিঁচুড়ি, ভাত, তরকারী – এসবের এক বা একাধিক। আমি কত পিছয়ে থাকা একজন মানুষ, তাই না? তিনবেলা ভাতই ছিল আমাদের প্রধান খাবার। সকালে রুটি, পরোটা বা বিকালে স্ন্যাক্স এসব খুব রেয়ার জিনিস ছিল। বিকালে সর্বোচ্চ এক গ্লাস দুধ, দুধ-আম দিয়ে ভাত এই, তাও মাঝে মধ্যে। আর রোজার মাসের কথা তো আগেই বললাম।
আমার ফেসবুকে গুলশান বনানী এলাকার কয়েকজন আছেন। তারা প্রতিদিন ডজনখানিক করে ছবি আপলোড দেন। প্রায় সবই পার্টি, খানা-পিনার ছবি। এক এক দিন এ ওর বাসায়, এক এক রেস্টুরেন্ট, কত আয়োজন। প্রতিদিন সময় করে সেগুলো দিতে তারা ভুল করেন না। সবাইকে দেখানোতেই তাদের অপার আনন্দ! মাঝে মাঝে ভাবি, এদের কি কোন কাজ করে খেতে হয় না? এত টাকা আসে কোথা থেকে? প্রতিদিন নিত্য নতুন জামা কাপড় পরে দল বেঁধে এ রেস্টুরেন্ট, সে রেস্টুরেস্ট খেতে যাওয়া! এর বাড়ি ওর বাড়ি পার্টি করা! নাম দেয় আবার ওমুকের প্যালেস!
ছবির প্রথম দিকে দেখুন ইফতারের অফার, সব মিলে আপনার খরচ হয়ে যাবে ২৫০০ টাকার উপরে একবেলা একজন। ফেসবুক কেন দেখায় এগুলো আমাদের মত ছা-পোষা গরীব মানুষদের যাদের ৫০ টাকার সংস্থান করতেই গায়ের ঘাম ঝরে শার্ট ভিজে যায় প্রতিদিন?
আর কত রসিকতা আমরা করব? দেশের এক বিরাট সংখ্যক মানুষ তাদের স্বপ্নের ফসল হারিয়েছে, গবাদি পশু, মাছ, হাঁস, মুরগি, সবজি ক্ষেত সব হারিয়েছে অকাল বন্যায়। ঘূর্ণিঝড়ে বাড়ি-ঘর হারিয়েছে হাজার হাজার মানুষ। আপনি যখন প্রতিদিন নতুন নতুন রেস্টুরেন্টে ইফতার করতে যাচ্ছেন তখন অন্য হাজার মানুষ বলছেন – ‘সেহরি খাইছি মরিচ পোড়া আর পানি ভাত দিয়া, ইফতার করমু রুটি ও শাকপাতা দিয়া। আর কোনও উপায় নাই। গোলায় ধান নাই, হাওরে মাছ নাই, কোথাও কোনও কাজ-কাম নাই। ব্যাটাইনরে বাজারের কথা কই না’ – এগুলো সংবাদে এসেছে ঠিক এভাবেই। এই মানুষগুলোই সারাবছর ফসল ফলিয়ে আপনার-আমার পাতে তুলে দেয়। আজ অকাল বন্যায় তাদের হাহাকার!
সুর্য্যা বানু নিম্নধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহিনী। বাড়ির পাশের হাওরে অনেক কষ্ট করে ৭ কেয়ার জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু চৈত্রের আগাম বন্যায় ক্ষেতের কাঁচা ধান তলিয়ে গেছে। এখন সংসার চালানোর কোনও সামর্থ্য অবশিষ্ট নেই। এর মধ্যেই এসেছে রমজান মাস। কিন্তু রোজার আগে থেকেই সুর্য্যা বানু ও তার পরিবার তীব্র অভাব অনটনের মধ্যে দিনযাপন করছেন। এর ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। ফলে সেহরিতে মরিচ পোড়া আর পানি ভাত খেয়েই রোজা থাকতে হচ্ছে। আর রোজা ভাঙতে হচ্ছে ইফতারে রুটি ও শাকপাতা খেয়ে। ভাগ্যিস গ্রামাঞ্চলে কিছু জংলি শাকপাতা পাওয়া যায়।
অভিজাত ৫ জনের একদিনের ইফতারির আড্ডার খরচে এমন বিপন্ন ২০০ পরিবারের একদিনের ইফতার হয়ে যাবে! হিসাব করে দেখুন! পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা আমরা মানুষেরা রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ এ পঞ্চগুণের উজ্জীবিত ও সজিব জীবনের উপস্থিতি লাভ করি আমাদের মানব জীবনে। এই রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ দ্বারা জীবনের সকল সুখ খুঁজে বেড়াই, পূরণ করার চেষ্টা করি ষড়রিপু’র দাবীসমুহকে। রমজান আসে ‘সংযম’ শিক্ষার মাধ্যমে নিজ পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা লাভ করে সারা বছর ব্যাপী ষড়রিপু’কে দমন করে একটি সুন্দর এবং সুস্থ মানব জীবন পরিচালনার সামর্থ্য অর্জন করার জন্য।
‘সিয়াম’ বা ‘রোযা’ শব্দের উৎপত্তি আরবী ‘সাওম’ শব্দটি হতে; রোযা মূলত একটি ফারসী শব্দ। সাওম অর্থ বিরত থাকা। সিয়ামের সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান শিক্ষা হল ভোগস্পৃহা নিয়ন্ত্রণ করে দেহমনকে ত্যাগের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে তোলা। একজন স্বাভাবিক মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয় রয়েছে এ কথা আমরা সবাই জানি। ইন্দ্রিয়গুলো হলো- কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, চক্ষু ও ত্বক। আর রয়েছে ‘ষড়রিপু’ অর্থাৎ মানুষের চরম ও প্রধান ছ’টি শক্র হলো-কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। রমজানের মূল শিক্ষা হল এই পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে এই ষড়রিপু’কে ধ্বংস করা।
অথচ বাস্তবে কি হচ্ছে? আমাদের কাছে ‘রমজান’ শুধু সারাদিন অনাহারে কাটিয়ে সন্ধ্যা হলে ভুঁড়িভোজে মত্ত হওয়ার নিমিত্ত মাত্র। রমজানের এই সংযম আর ত্যাগের শিক্ষা কি আদৌ আমরা গ্রহন করছি?
Related Posts

Why do Islamist clerics consider Bengali cultural festivals their enemy?
This year, unlike many previous years, the major Hindu religious festival Durga Puja in BangladeshRead More

ইসলামিস্ট মোল্লারা কেন বাঙালিদের আনন্দ উৎসবকে তাদের শত্রু মনে করে?
এবার বাংলাদেশে অন্যবারের তুলনায় বেশ শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর পরিবেশে হিন্দু ধর্মের বড় ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজা হয়েRead More

Why do Islamist cyber‑jihadis insult, threaten, and file false reports against people with different opinions?
Maulana Azhari once advised Islamists that sharing his Facebook posts is also an Islamic act;Read More

Comments are Closed