Massacre
The Rampage of the Tawhidi Crowd

The Rampage of the Tawhidi Crowd

ইসলামের নামে তৌহিদী জনতার সেদিনের সেই ভোলা তান্ডব আজও জীবন্ত মনে হয়

এই যে হাজার হাজার টুপিওয়ালা মানুষ দেখা যাচ্ছে, যাদের সবার হাতে লাঠি, উন্মত্ত নৃত্য করতে করতে সামনে দৌঁড়াচ্ছে – এদের লক্ষ্য কী তারা জানে না। কেউ একজন বলেছে কোনো একজন ইসলাম ধর্মের অবমাননা করেছে, এজন্য এরা ছুটে যাচ্ছে। ধর্ম রক্ষা করতে হবে, সেটাই তাদের ব্রত। কে, কিভাবে বা আদৌ কেউ ধর্ম নিয়ে কিছু বলেছে কিনা তাও তারা জানে না। এই হাজার হাজার মানুষের মাথায় নিজস্ব বলে কিছু নেই। তাদের নেতারা যেভাবে তাদের নাচায়, তারা সেভাবে নাচে। মধ্যে কিছু নিরীহ মানুষের জীবন, সহায়, সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে বড় তাণ্ডব ছিল এই ভোলার ঘটনা।

সেদিন ছিল ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর। ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার আকাশটা সকাল থেকেই এক অদ্ভুত থমথমে ভাব ধারণ করেছিল। আগের দিন থেকেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়াচ্ছিল একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক যুবকের হ্যাক হওয়া আইডি থেকে নাকি ধর্মীয় অবমাননাকর মেসেজ পাঠানো হয়েছে – এই গুঞ্জন মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে পুরো উপজেলায়। সাধারণ মানুষ, যাদের অনেকেই প্রযুক্তির জটিলতা বোঝে না, তারা শুধু শুনল ‘ধর্মের অবমাননা হয়েছে’। ব্যস, আর কিছু ভাবার বা যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করল না কেউ।

সকাল গড়াতেই বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মাঠে জড়ো হতে শুরু করে হাজার হাজার মানুষ। ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে আয়োজিত এই সমাবেশে ধর্মান্ধ উন্মাদ মানুষের অন্ধ আবেগ আর ক্ষোভকে পুঁজি করে ইসলামের একদল ধান্দাবাজ উসকানিদাতা মঞ্চ কাঁপাতে থাকে। মাঠ পেরিয়ে সেই জনস্রোত যখন রাস্তায় নামে, তখন তা রূপ নেয় এক হিংস্র ও অনিয়ন্ত্রিত জমায়েতে। হাজার হাজার মানুষের হাতে লাঠিসোটা, মুখে স্লোগান, আর চোখে এক অন্ধ ক্রোধ। মিছিলের অগ্রভাগে থাকা মানুষগুলোর উন্মত্ততা দেখে মনে হচ্ছিল, তারা এক মহাধ্বংসের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সেই স্রোতে গা ভাসানো সিংহভাগ মানুষই জানত না প্রকৃত ঘটনা কী ছিল, কিংবা কাকে শাস্তি দিতে তারা এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, বা সে আসলেই কী লিখেছে বা বলেছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অন্ধ ক্ষোভ গিয়ে আছড়ে পড়ে এলাকার নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর। কোনো অপরাধ না করেও কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে একের পর এক হিন্দু বাড়িঘরে শুরু হয় তাণ্ডবলীলা। উন্মত্ত জনতা লাঠিসোটা আর রামদা নিয়ে হামলা চালায় ঘরবাড়িতে। ভাঙচুর করা হয় আসবাবপত্র, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় মন্দিরের প্রতিমা। শুধু ভাঙচুরেই শেষ হয়নি, ঘরে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র, টাকা ও গহনা লুটপাট করে নেওয়া হয়। এরপর পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বেশ কয়েকটি বসতবাড়িতে। চারদিকে তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন, আর বাতাসে উড়ছে পোড়া গন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্তনাদ। আতংকগ্রস্থ মানুষ জীবন বাঁচাতে যে যেদিকে পারে পালিয়ে যায়, এ এক ভয়ংকর অভিশপ্ত জনপদ তাদের জন্য।

একই সময়ে আরও এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে। উন্মত্ত জনতার হাত থেকে বাঁচতে ভয়ে-আতঙ্কে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীসহ অনেকেই ভেতরে আশ্রয় নেন। কিন্তু হিংস্র জনতা চারদিক থেকে স্কুলটি ঘিরে ফেলে সবাইকে অবরুদ্ধ করে রাখে। ভেতরে আটকে পড়া নিষ্পাপ শিশু ও মানুষগুলোর চোখে-মুখে তখন মৃত্যুর অবর্ণনীয় আতঙ্ক। বাইরে তখন চলছে ইটপাটকেল নিক্ষেপ আর গগণবিদারী স্লোগান। অবরুদ্ধ সেই মানুষগুলো দীর্ঘ সময় ধরে চরম মানসিক ট্রমা আর জীবন সংশয়ের মধ্যে পার করতে বাধ্য হয়। হাজার হাজার উন্মাদ তৌহিদী জনতা, যাদের সামনে পুলিশ, প্রশাসন অসহায়। বিপরীতে সামান্য কজন মানুষ বিদ্যালয়ের দরজা, জানালা বন্ধ করে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে থাকার লড়াই করছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ যখন কাঁদানে গ্যাস ও শটগানের গুলি ছোঁড়ে, তখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। ইটপাটকেলের আঘাতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, চারদিকে শুধু চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ। পুলিশের সাথে দফায় দফায় চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ঝরে যায় চারটি তাজা প্রাণ, আহত হয় পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক মানুষ। নিমিষেই পুরো এলাকা যেন এক মৃত্যুপুরীতে রূপ নেয়। যে ধর্মের নামে এই তাণ্ডব, সেই ধর্মের মূল বাণী ‘শান্তি’কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেদিন এক পৈশাচিক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের নামে ‘তৌহিদী জনতা’র এই তাণ্ডব এ দেশে নতুন কিছু নয়। এর আগেও নানা উছিলায়, নানা সময়ে দেশে আরও অনেকবার ঘটেছে এমন পৈশাচিক বর্বরতা। সাতক্ষীরার ফতেহপুর, রামু, নাসিরনগর, শাল্লা কিংবা মালোপাড়াসহ ডজন ডজন ঘটনাগুলো এর বড় প্রমাণ। প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই স্রেফ গুজবকে পুঁজি করে একদল সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী উন্মত্ততার সৃষ্টি করে। আর এই হুজুগে ও পরিকল্পিত তাণ্ডবের শিকার হয় এ দেশের নিরীহ, অসহায় সংখ্যালঘু্রা, বিশেষ করে হিন্দু জনগোষ্ঠী। রাজনীতির দাবার ঘুঁটি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরে বারবার তাদের ঘরবাড়ি, উপাসনালয় এবং জীবনকে নরকে পরিণত করা হয়েছে।

ভোলার সেই ২০ অক্টোবরের ঘটনা কেবল একটি সহিংসতার গল্প নয়, এটি ছিল গুজবের শক্তির আড়ালে ইসলামের উন্মত্ততার এক ভয়াবহ প্রদর্শনী। একটা ভুয়া বা হ্যাকড আইডি থেকে ছড়ানো উসকানি কীভাবে এক মুহূর্তের মধ্যে হাজারো ইসলামী মানুষকে অন্ধ করে দিতে পারে, বোরহানউদ্দিনের সেই তাণ্ডব তার জীবন্ত প্রমাণ। দিনটি শেষে রেখে গিয়েছিল কিছু লাশ, পুড়ে যাওয়া ছাই, নিঃস্ব কিছু পরিবার, আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গায়ে এক গভীর ক্ষত। আজো যখন সেই টুপি পরা, লাঠি হাতে উন্মত্ত জনতার অবয়ব চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন গা শিউরে ওঠে এই ভেবে যে – ইসলামের ধর্মান্ধদের এই অশিক্ষা, হুজুগ আর পরধর্মসহিষ্ণুতার অভাব কীভাবে মানুষের বিবেককে মুহূর্তের মধ্যে গিলে খেতে পারে।

Related Posts

Cinmoy vs Anayetullah

Chinmoy Krishna Prabhu or Enayetullah Abbasi?

From Bonn in Germany, I reached a local station to catch the last train toRead More

Cinmoy vs Anayetullah

চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভু নাকি এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী?

জার্মানির বন থেকে বার্লিনে যাওয়ার শেষ ট্রেন ধরতে একটা লোকাল স্টেশনে পৌঁছে দেখি, ট্রেন ছাড়তেRead More

Are All Social Customs Beneficial?

Custody of Society” – Group News! You will find them all around you

I was in class eight then. That day there was no school, I was probablyRead More

Comments are Closed