Delhi Massacre
Taimur Long’s Delhi Massacre

Taimur Long’s Delhi Massacre

ইসলামের সৈনিক তৈমুর লং দিল্লিতে এক দিনে ১ লক্ষ হিন্দুকে হত্যা করেছিল

তৈমুর লং মধ্য এশিয়ার এক নির্মম মুসলিম সামরিক শাসক, যার সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে অসংখ্য শহর ধ্বংস হয়েছিল। ১৩৯৮ সালে ভারতের দিল্লি আক্রমণের সময় তৈমুর লং লোনি এলাকায় এক দিনেই প্রায় এক লক্ষ বন্দী হিন্দুকে হত্যা করেছিলেন, যাতে তারা বিদ্রোহ বা প্রতিরোধ করতে না পারে। এটি ছিল যুদ্ধের আগে “পেছন থেকে আঘাত” ঠেকানোর জন্য পরিকল্পিত এক হত্যাকাণ্ড। এরপর তিনি প্রথমে ইসলামের তাকিয়া বা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে ইসলামের মহত্ব দেখাতে হিন্দুদের প্রতি “ক্ষমা” ঘোষণা করেন। কিন্তু তার সৈন্যরা যখন লুটতরাজ ও নারীদের ওপর হামলা শুরু করে, তখন শহরের মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এতে তৈমুর ক্ষিপ্ত হয়ে পাঁচ দিনের সংগঠিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করেন। সমগ্র শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে তারা। ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে যে সৈন্যরা পাড়া ধরে ধরে ঢুকত, প্রতিরোধ দেখলেই হত্যা করত, ঘরবাড়ি লুট করে শেষে আগুন দিত। দিল্লি শহর জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। সব মিলিয়ে ১.৫ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ মানুষ নিহত হয় বলে অনেক সূত্রে জানা যায়।

তৈমুরের এই আক্রমণ ছিল দিল্লি সুলতানাতের পতনের এক ভয়াবহ অধ্যায়। তিনি তৎকালীন মুসলিম সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ তুঘলককে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ব্রিটানিকা সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুসারে, তিনি বলেছিলেন যে সুলতান হিন্দুদের প্রতি “অতিরিক্ত সহনশীল”। তাঁর মতে দিল্লির সুলতানরা পৌত্তলিকতার উচ্ছেদ না করে পৌত্তলিকদের প্রতি উদারতা দেখাচ্ছেন। এই অজুহাতে মধ্য এশিয়া থেকে দিল্লিতে এসে তিনি রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলেন। তার নিজের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘মালফুজাত-ই-তৈমুরি’ (যা পরবর্তীকালে সংকলিত হয়েছে)-তে তিনি উল্লেখ করেছেন যে কুরআনের একটি আয়াতকে “ইশারা” হিসেবে পেয়ে এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলেন। ঐ আয়াতটি ছিল সূরা আল-ফাতহ (৪৮:২৯)-এর অংশ: “মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল, আর যারা তার সঙ্গে আছে তারা কাফিরদের প্রতি কঠোর…”

তৈমুর ১৩৩৬ সালের দিকে মধ্য এশিয়ার ট্রান্সঅক্সিয়ানা অঞ্চলে (বর্তমান উজবেকিস্তানের কাছে) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম আমির তৈমুর বিন তারাগাই। তিনি বারলাস উপজাতির সদস্য ছিলেন, যা তুর্কো-মঙ্গোল বংশোদ্ভূত। যুবক বয়সে যুদ্ধে গুরুতর আঘাত পান ডান পায়ে এবং হাতে। ফলে তিনি সারাজীবন খোঁড়িয়ে হাঁটতেন। এজন্য তাঁকে “তৈমুর-ই-লং” বা “খোঁড়া তৈমুর” বলা হতো। পারস্য ভাষায় এই নাম থেকেই ইউরোপে তিনি “টেমারলেন” নামে পরিচিত হন। তিনি নিজেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর হিসেবে দাবি করলেও সরাসরি রক্তের সম্পর্ক ছিল না। রাজনৈতিক বৈধতার জন্য চেঙ্গিস খানের বংশধর এক রাজকন্যাকে বিয়ে করে “গুরগান” (গুরেগান, অর্থাৎ চেঙ্গিসের জামাতা) উপাধি গ্রহণ করেন।

১৩৭০ সালের দিকে তিনি চাগাতাই খানাতের পশ্চিমাংশের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। তাঁর অভিযানগুলো ছিল অত্যন্ত নৃশংস। পারস্য, ইরাক, সিরিয়া, আনাতোলিয়া, মধ্য এশিয়া ও ভারতবর্ষে তাঁর বাহিনী ধ্বংসলীলা চালায়। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, তৈমুরের অভিযানে সমগ্র বিশ্বের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ নিহত হয়েছিল, যা সেই সময়ের হিসেবে ১ কোটি থেকে ১.৭ কোটি পর্যন্ত হতে পারে। তাঁর সেনাবাহিনী বহু শহরে “খুলি স্তূপ” বা মাথার পিরামিড তৈরি করত। হাজার হাজার মানুষের মাথা কেটে স্তূপ করে রাখা হতো, যা শত্রুদের জন্য ভয়ের প্রতীক ছিল। এসব কর্মকাণ্ড তিনি ইসলামের বিস্তার ও কাফেরদের দমনের নামে চালিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রগুলোতে উল্লেখ আছে।

দিল্লি আক্রমণের বিস্তারিত ঘটনা আরও ভয়াবহ। ১৩৯৮ সালের শেষের দিকে তৈমুর সিন্ধু নদ পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। তুলম্বা, মুলতান সহ বিভিন্ন স্থান ধ্বংস করে তিনি দিল্লির দিকে অগ্রসর হন। লোনিতে সুলতানের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের আগে প্রায় এক লক্ষ বন্দীকে হত্যা করা হয়। যুদ্ধে জয়লাভের পর দিল্লিতে প্রবেশ করে প্রথমে শান্তির আশ্বাস দেন। কিন্তু সৈন্যদের লুটপাটের ফলে স্থানীয়রা প্রতিরোধ শুরু করলে তিনি সাধারণ হত্যাযজ্ঞের নির্দেশ দেন। দিনের পর দিন চলা এই গণহত্যায় শহরের বিশাল অংশ জনশূন্য হয়ে যায়। লাশের স্তূপে শহর দুর্গন্ধময় হয়ে ওঠে। অনেক শিল্পী ও কারিগরকে বন্দি করে সমরকন্দে নিয়ে যাওয়া হয়, যা দিল্লির অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিনের জন্য ধ্বংস করে। দিল্লি সুলতানাত কখনো এই আঘাত থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেনি।

তৈমুরের জীবনীতে দেখা যায় তিনি শুধু যোদ্ধা ছিলেন না, নির্মম শাসকও। তাঁর অভিযানে শহর ধ্বংস, জনগণ হত্যা, নারী-শিশু নির্যাতন ও দাসত্বের ঘটনা অসংখ্য। তবু তাঁর দরবারে শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল। সমরকন্দকে তিনি রাজধানী করে সুন্দর স্থাপত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তিমুরিদ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে কিন্তু তাঁর বংশধররা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর বংশধর বাবর ১৫২৬ সালে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বাবর নিজেকে তৈমুরের বংশধর হিসেবে গর্বিত ছিলেন এবং মুঘলরা দীর্ঘদিন “তিমুরি” পরিচয় বহন করতেন।

আজকের প্রেক্ষাপটে তৈমুরকে নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত। কারিনা কাপুর ও সাইফ আলী খানের মতো তারকারা তাঁদের সন্তানের নাম রেখেছেন তৈমুর। অনেকের চোখে এই ভয়ংকর গণহত্যাকারী ইতিহাসের মহানায়ক হয়ে ওঠেন। ইসলামি ঐতিহ্যে যারা ধর্মের স্বার্থে নৃশংসতা চালিয়েছেন, তাদের অনেক সময় বীর হিসেবে দেখা হয়। তৈমুর উগ্র ইসলামিস্টদের আইডল। তাঁর বীরত্ব, কৌশল ও বিজয়ের কাহিনী এখনো অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা। কিন্তু ইতিহাসের নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একজন ধ্বংসকারী। তাঁর অভিযানগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, সভ্যতাকে পিছিয়ে দিয়েছে।

তৈমুরের মৃত্যু হয় ১৪০৫ সালে চীন অভিযানের পথে। ওট্রারে অসুস্থ হয়ে তিনি মারা যান। তাঁর দেহ সমরকন্দের গুর-ই-আমির সমাধিতে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য ভাগ হয়ে যায় এবং অভ্যন্তরীণ কলহ শুরু হয়। তবু তিমুরিদ যুগকে “তিমুরিদ রেনেসাঁ” বলা হয় কারণ স্থাপত্য, সাহিত্য ও শিল্পের কিছু অগ্রগতি ঘটেছিল। কিন্তু এই অগ্রগতির মূল্য ছিল অসংখ্য নিরীহ মানুষের রক্ত।

তৈমুরের গল্প আমাদের শেখায় যে ক্ষমতার লোভ কীভাবে মানুষকে নৃশংস করে তোলে। ধর্মের নামে যুদ্ধ ও হত্যা কোনো নতুন ঘটনা নয়। তাঁর জীবনী পড়লে বোঝা যায় যে ইতিহাস শুধু বিজয়ীর কাহিনী নয়, পরাজিতদের কান্নাও বহন করে। আজও যখন কোনো শিশুর নাম তৈমুর রাখা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কোন ইতিহাসকে সম্মান করছি? গণহত্যাকারী না মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো ব্যক্তিত্ব? ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়গুলো স্মরণ করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমন পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

তৈমুরের সাম্রাজ্যবিস্তার ছিল দ্রুত কিন্তু অস্থায়ী। তাঁর কৌশল ছিল ভয় ও ধ্বংসের ওপর ভিত্তি করে। শত্রু শহরে প্রবেশের আগে তিনি প্রায়ই বন্দীদের হত্যা করে সৈন্যদের মনোবল বাড়াতেন এবং লুটের সম্ভাবনা দেখিয়ে উৎসাহিত করতেন। দিল্লির পর তিনি আরও পূর্বে অগ্রসর হন কিন্তু পশ্চিমে সমস্যার কারণে ফিরে যান। তাঁর অভিযান ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেয় এবং পরবর্তীকালে মুঘল আগমনের পথ প্রশস্ত করে।

আধুনিক গবেষকরা তৈমুরের মৃত্যুর কারণ নিয়ে আলোচনা করেন। কেউ বলেন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা, কেউ বলেন ম্যালেরিয়া বা অন্য রোগ। তাঁর সমাধি খনন করে জানা গেছে তিনি লম্বা ছিলেন এবং মঙ্গোলয়েড বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। তাঁর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও অসাধারণ যোদ্ধা হিসেবে উঠে এসেছিলেন। তাঁর জীবন একদিকে সাহস ও নেতৃত্বের উদাহরণ, অন্যদিকে নৃশংসতার চরম নজির।

এই ঘটনাবলি থেকে আমরা শিখতে পারি যে ধর্ম, জাতি বা ক্ষমতার নামে অন্ধত্ব মানবসভ্যতার জন্য ক্ষতিকর। তৈমুরের মতো ব্যক্তিত্বরা ইতিহাসে বারবার এসেছেন এবং ধ্বংস ডেকে এনেছেন। তাই ইতিহাসের সত্যকে মেনে নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত করা দরকার।

Related Posts

The Ongoing Aggression of Islam

From Somnath to Joypurhat – The Shadow of a Thousand‑Year‑Old Destruction Still Exists Today

The first blow On the Saurashtra coast of Gujarat, where the waves of the ArabianRead More

The Ongoing Aggression of Islam

সোমনাথ থেকে জয়পুরহাট – এক সহস্রাব্দের পুরনো ধ্বংসের ছায়া আজও বিদ্যমান

প্রথম আঘাত গুজরাটের সৌরাষ্ট্র উপকূলে, যেখানে আরব সাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে পাথুরে তটে, সেখানেRead More

For 125 years, the Islamic world has been spinning on the basis of a single false key!

Once I was listening to a sermon by Professor Mufti Kazi Ibrahim Huzur where heRead More

Comments are Closed