Religion
Religion and Society

Religion and Society

ধর্মের উৎপত্তি, বিকাশ, নিয়ন্ত্রন, ভিত্তি, অন্ধকার ও মানব সভ্যতায় এর প্রয়োজনীয়তা

ধর্মের উৎপত্তি – কেন ও কীভাবে?

ধর্মের উদ্ভব বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে মানব সভ্যতার ভোরবেলায়, যখন মানুষ প্রকৃতির রহস্য ব্যাখ্যা করার কোনো বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার পায়নি।

আদিম মানুষের কাছে বেঁচে থাকাটাই ছিল প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের মনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন ও ভয়ের জন্ম নেয়, যা ধর্ম উৎপত্তির মূল কারণঃ

অজানার ভয় এবং ব্যাখ্যার খোঁজেঃ বজ্রপাত কেন হয়? মহামারী কেন আসে? সূর্য কেন ডোবে আর ওঠে? যখন কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিল না, তখন মানুষ ধরে নিয়েছিল যে এসবের পেছনে কোনো এক বা একাধিক অদৃশ্য, পরাক্রমশালী ‘মহাশক্তি’ কাজ করছে।

নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাঃ ঝড়-বৃষ্টি বা খরা মানুষের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তাই সেই অদৃশ্য শক্তিগুলোকে শান্ত করতে, নিজেদের অনুকূলে রাখতে মানুষ পূজা, প্রার্থনা এবং বলিদানের নিয়ম চালু করে।

মৃত্যুর ভয় এবং সান্ত্বনাঃ “মৃত্যুর পর কী হয়?” – এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবং প্রিয়জনকে হারানোর শোক কাটাতে মানুষ পরকাল বা পুনর্জন্মের ধারণা তৈরি করে, যা মনকে সান্ত্বনা দেয়।

ধর্মের মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তি

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী Pascal Boyer তাঁর প্রভাবশালী গ্রন্থ Religion Explained (2001)-এ যুক্তি দিয়েছেন যে ধর্মের উদ্ভব হয়েছে মানুষের কিছু মৌলিক জ্ঞানীয় ক্ষমতা থেকে – বিশেষত মানুষের “agency detection” বা উদ্দেশ্য খোঁজার প্রবণতা থেকে। আদিম মানুষ বজ্রপাত, বন্যা বা খরার পেছনে কোনো “ইচ্ছাশক্তি” খুঁজত। এই মনোজাগতিক প্রক্রিয়াই ক্রমশ দেবতা, আত্মা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।

নৃতত্ত্ববিদ Edward Tylor (1871) প্রস্তাব করেন যে ধর্মের আদিতম রূপ হলো “animism” – প্রকৃতির প্রতিটি বস্তুতে প্রাণ বা আত্মার কল্পনা। এ থেকেই ক্রমে বহুঈশ্বরবাদ এবং একেশ্বরবাদের বিকাশ ঘটে।

সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ

ধর্মের বিকাশে শুধু মনোজাগতিক কারণ নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণও ছিল। Émile Durkheim তাঁর The Elementary Forms of Religious Life (1912)-এ দেখিয়েছেন যে ধর্ম মূলত একটি সামাজিক ঘটনা – এটি সমাজকে একত্রিত রাখে, সম্মিলিত বিশ্বাস তৈরি করে এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

Karl Marx আরও কড়া ভাষায় বলেছিলেন: “Religion is the opium of the people.” তাঁর মতে, ধর্ম শোষিত মানুষকে পার্থিব কষ্ট ভুলিয়ে রাখার এবং শাসকশ্রেণির ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

সংক্ষেপেঃ ধর্মের উদ্ভব হয়েছে মানুষের অজ্ঞতা, ভয়, সামাজিক বন্ধনের প্রয়োজন এবং ক্ষমতার রাজনীতির সম্মিলনে। নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মের জন্ম হয়নি – নৈতিকতা ধর্মের চেয়েও পুরনো একটি সামাজিক বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া।

ধর্ম আগে না নৈতিকতা আগে?

এটি দর্শনের একটি প্রাচীন প্রশ্ন – প্লেটো তাঁর Euthyphro সংলাপে এটি তুলেছিলেন।

নৃতাত্ত্বিক ও বিবর্তনীয় প্রমাণ বলে – নৈতিকতা আগে।

প্রাইমেটদের মধ্যেও সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ, পারস্পরিক সাহায্যের আচরণ দেখা যায় – যেখানে কোনো ধর্ম নেই। আদিম মানব সমাজে গোষ্ঠীবদ্ধ টিকে থাকার জন্য “অন্যকে কষ্ট দিও না”, “ভাগ করে নাও” – এই বোধগুলো আগে তৈরি হয়েছে। ধর্ম পরে এসে এই নৈতিক বোধগুলোকে কাঠামো, আখ্যান ও পবিত্রতা দিয়েছে।

ধর্মের অবদান হলো – নৈতিকতাকে সংহিতাবদ্ধ করা, বড় অপরিচিত গোষ্ঠীতে ছড়িয়ে দেওয়া, এবং মেনে চলার একটি অতিপ্রাকৃত কারণ দেওয়া।

পৃথিবীতে কোন ধর্ম সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী?

ধর্মের দীর্ঘস্থায়িত্ব নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়, বরং এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর টিকে থাকার সাফল্য।

পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবন্ত ধর্মীয় ঐতিহ্য হিসেবে হিন্দুধর্ম বা সনাতন ধর্ম-কে বিবেচনা করা হয়, যার শিকড় কমপক্ষে ৪,০০০-৫,০০০ বছর আগের সিন্ধু সভ্যতায়। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো অ্যানিমিস্ট ও শামানিস্ট ঐতিহ্যগুলো – এগুলো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না নিয়েই ৪০,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানব সমাজে টিকে আছে।

ইহুদি ধর্ম প্রায় ৩,৫০০ বছরের পুরনো। বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্ম আড়াই হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন। খ্রিষ্টধর্ম প্রায় ২,০০০ বছর এবং ইসলাম প্রায় ১,৪০০ বছরের পুরনো।

লক্ষণীয় বিষয় হলোঃ এই দীর্ঘ ইতিহাসে প্রতিটি ধর্মই নৈতিকতার নামে অসংখ্য যুদ্ধ, নিপীড়ন এবং অবিচারের সাথে জড়িত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়িত্ব নৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি নয়। ধর্মগুলো হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকলেও সেগুলো যে সমাজে নৈতিকতা গড়েছে এর কোন ঐতিহাসিক ও বাস্তবিক উদাহরণ নেই। বরং প্রায় সব ধর্মেই অসংখ্য নৈতিকতা বিবর্জিত নির্দেশনা, রীতি-রেওয়াজ, সহিংসতার উদাহরণ আছে।

সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্ম কোনটি?

সংখ্যার হিসেবে আজকের পৃথিবীতে খ্রিষ্টধর্ম সবচেয়ে বড় ধর্ম – প্রায় ২.৪ বিলিয়ন অনুসারী নিয়ে। এরপরে ইসলাম – প্রায় ১.৯ বিলিয়ন। হিন্দুধর্ম তৃতীয় – প্রায় ১.২ বিলিয়ন।

তবে প্রভাব শুধু সংখ্যায় নয়। ইসলাম আজকের পৃথিবীর রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত, কারণ এটি এমন একটি ধর্ম যা রাষ্ট্র, আইন ও সমাজ পরিচালনার বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে চায়। বৌদ্ধ ধর্ম দর্শন ও মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অপ্রতিম প্রভাব ফেলেছে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলোঃ যে ধর্ম প্রভাবশালী হলে সেই ধর্মের অনুসারীদের সমাজ কি সবচেয়ে নৈতিক হয়? তথ্য বলে – না। ধর্মীয় প্রভাব সমাজে নৈতিকতা তৈরিতে কোন ভূমিকা রাখে না। নৈতিকতা বিষয়টা ধর্মের চেয়ে বড়, সেটা সর্বজনীন।

ইউরোপ কেন ধর্মীয় শাসন থেকে মুক্ত হয়ে সভ্যতার পথে হাঁটল?
ইউরোপের ইতিহাস আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দেয়।

মধ্যযুগের অন্ধকার

মধ্যযুগীয় ইউরোপে ক্যাথলিক চার্চের ছিল সর্বোচ্চ ক্ষমতা। ইনকুইজিশনের নামে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গ্যালিলিওকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বৈজ্ঞানিক সত্য বলার অপরাধে। ক্রুসেডের নামে ঢেলে দেওয়া হয়েছে রক্তের নদী।

ইতিহাসবিদ Barbara Tuchman তাঁর A Distant Mirror (1978)-এ দেখিয়েছেন যে মধ্যযুগীয় ইউরোপে ধর্মীয় কর্তৃত্ব যত বেশি ছিল, সমাজে সহিংসতা, দুর্নীতি এবং অজ্ঞানতাও তত বেশি ছিল।

রেনেসাঁ ও আলোকযুগ

পরিবর্তন আসে রেনেসাঁ (১৪শ-১৭শ শতাব্দী) এবং আলোকযুগ (Enlightenment, ১৭শ-১৮শ শতাব্দী) থেকে। Immanuel Kant ঘোষণা করেন: “Sapere aude!” – “নিজে ভাববার সাহস করো!” John Locke, Voltaire, Rousseau – এঁরা প্রতিষ্ঠা করেন যে নৈতিকতার ভিত্তি ঈশ্বরের আদেশ নয়, মানুষের যুক্তি ও পারস্পরিক চুক্তি।

ফ্রান্সে ১৭৮৯ সালের বিপ্লব ধর্মীয় কর্তৃত্বকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে।
মার্কিন সংবিধান প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ।

ফলাফল কী হলো?

Sociologist Phil Zuckerman তাঁর গবেষণা Society Without God (2008)-এ দেখিয়েছেন যে Scandinavia-র দেশগুলো – যেগুলো আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে কম ধার্মিক – সেগুলোই সবচেয়ে কম অপরাধপ্রবণ, সবচেয়ে সুখী এবং সবচেয়ে দুর্নীতিমুক্ত।

ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড – এই দেশগুলোতে মাত্র ২০-৩০% মানুষ নিজেদের ধার্মিক মনে করেন। কিন্তু Transparency International-এর Corruption Perception Index-এ এই দেশগুলো বারবার শীর্ষে থাকে।

বিপরীতে, যেসব দেশে ধর্মীয় অনুশীলন সবচেয়ে বেশি – নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান – সেগুলো দুর্নীতি এবং সামাজিক অস্থিরতায় সবচেয়ে এগিয়ে।

Related Posts

Morality without Religion

The Birth of Conscience: How Humans Became Moral Without Allah or Religion

It was almost seventy-five thousand years ago. A group of Neanderthals lived in the ShanidarRead More

Morality without Religion

বিবেকের জন্মঃ আল্লাহ ও ধর্ম ছাড়াই মানুষ কীভাবে নৈতিক হয়ে উঠল?

প্রায় পঁচাত্তর হাজার বছর আগের কথা। ইরাকের শানিদার গুহায় বাস করত এক দল নিয়ান্ডারথাল। সেইRead More

Islam and Pedophilias

Why Do People Become Pedophiles? Why and How Does Islam Support Pedophilia and Severe Child Abuse?

The news that an 11-year-old child in a madrasa in Madan Upazila of Netrokona becameRead More

Comments are Closed