
Moral Policing in Ramadan
অটোফেজি, রমজান, মানবাধিকার হরণ, নৈতিক পুলিশিং, অপরাধ ও আমাদের ভ্রান্তিবিলাস
বাংলাদেশ প্রতিবছর রমজান এলেই অনেক মানুষ শারীরিক, মানসিক, সামাজিক অনেক সমস্যার সম্মুখীন হন। এমনকি অপমান, অপদস্থ হওয়া থেকে শুরু করে আক্রমন, শারীরিক শাস্তি, হুমকিসহ নানান ফৌজদারী অপরাধের শিকার হন। ইসলামিস্টরা রমজানকে মনে করে বরকতময় মাস, সংযমের মাস। সেজন্য তারা সূর্য উদয়ের কিছু সময় আগে থেকে সন্ধায় সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত কিছু খায় না, পানিও না। এই না খাওয়ার সংস্কৃতিকে তাদের অনেকে মব করে সমাজে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তারা খাবারের দোকান, ছোট রেস্তোরা, ফুটপাথের ক্ষদ্র ব্যবসায়ী সবাইকে জোর করে ব্যবসা বন্ধ করতে বলে। সেটা না পারলে সেগুলো সারাদিন কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে বাধ্য করে তাদের খাবার সামগ্রী প্রদর্শনে বাঁধা প্রদান করে। এমনকি গত বছর ২০২৫ সালে বর্তমান বিরোধী দলনেতা ও বাংলাদেশের ইসলামভিত্তিক ধর্মীয় দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির জনাব শফিকুর রহমানও সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেনো রাষ্ট্র রাস্তার খাবারের দোকানগুলো বন্ধ করে দেয়।


রমজানকে তারা বলে সংযমের মাস, বরকতের মাস। আপনার সামনে খাবারের দোকান খোলা থাকবে, সেখানে মুখরোচক সব খাবার সাজানো থাকবে, আপনি লোভ সংবরন করে অভুক্ত থাকবেন, সেটাতেই তো আপনার রোজার পূর্নতা বেশী। রোজার সময় তো বিকাল থেকে ইফতারী বানিয়ে দোকানে দোকানে সাজিয়ে রাখে। কই সেক্ষেত্রে কিছু বলেন না তারা। হোটেল, রেস্তোরায় মানুষের দৈনন্দিন খাবার বিক্রি বন্ধ করতে তাদের এতো হুংকার ক্যান? কত মানুষই তো ইছায়, অনিচ্ছায়, বাধ্য হয়ে রোজা রাখে না। কত মানুষ গরমের দিনে কঠিন শারিরীক পরিশ্রম করে, যারা অন্য ধর্মের মানুষ তারাও রোজা রাখে না। শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ কতো মানুষ না খেয়ে থাকতে পারে না। কত মানুষের বাড়িতে রান্নার আয়োজন নেই। কত মানুষ ভ্রমনে থাকেন, তাদের খাবার বাইরে থেকে কিনে খেতে হয়। তাহলে তাদের প্রয়োজনে খাবে কোথায়? হোটেল, রেস্তোরার ব্যবসায় যাদের সংসার ও জীবন চলে তাদের বেঁচে থাকার আয় আসবে কোথা থেকে? এই ছোট ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় রোজার মাসে। সবাইকে ডান্ডা মেরে রোজা থাকতে বাধ্য করতে চায় ইসলামিস্টদের উগ্র গোষ্ঠীগুলো। এবং এই কার্যক্রমকে তারা ছওয়াবের কাজ বলে গণ্য করেন। তারা অন্যদের, যাদের খেতে দেখেন তাদের শারীরিক শাস্তি দেন, অপমানিত করেন, হুমকি দেন। এই নিয়ম এখন বাংলাদেশের প্রায় সবখানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। দুঃখের বিষয় রাষ্ট্র তথা সরকার এর কোন প্রতিকারের উদ্যোগ নেয় না, পাছে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে উগ্র গোষ্ঠী সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে পারে – এই ভয়ে। এমনকি সরকারেরও অনেকের প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকে এই কর্মকান্ডে।
এখন আসি অটোফেজি প্রসঙ্গে। মুসলমানদের অনেকে প্রচার চালান রোজা তথা সারাদিন ১২-১৫ ঘন্টা কিছুই না খেয়ে থাকা মানুষের শরীরের জন্য খুব উপকারী। এটা নাকি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত। এর প্রমান হিসাবে তারা অটোফেজিকে দেখান। তারা আরো প্রচার চালান এক জাপানি বিজ্ঞানী এই রোজার ফজিলত বা উপকারীতা নিয়ে গবেষণা করে নোবেল পেয়েছেন। আসলে কি তাই? ইসলামিস্টদের রোজাকে গ্লোরিফাই করার এতো কি দরকার? অন্য অনেক ধর্মেও রোজার মতো জিনিস আছে। এমনকি ইসলাম প্রচার শুরু হওয়ার আগে থেকেই। ইহুদী, খ্রিস্টান, জরথ্রুস্ট, সনাতনী, অনেক আদীবাসী নানা নামে, নানা প্রক্রিয়ায় এমন না খেয়ে থাকার রীতি পালন করে।
২০১৬ সালে জাপানের বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওহশোমি নোবেল পুরষ্কার পান অটোফেজির প্রক্রিয়া ( অটোফেজি-সেলুলার রিসাইকেলিং সিস্টেম ) নিয়ে গবেষণা করে। এই অটোফেজি কে ট্যাগ করে অনেকে ফেসবুকে ম্যাসেজ করেন, কেউবা আর্টিকেল লিখেন সিউডো সাইন্সে ( অপবিজ্ঞান ) ভর করে যা অটোফেজি ধারনার সম্পূর্ণ বিপরীত।
বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান ডে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ১৯৭৪ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন লাইসোসোম আবিষ্কারের কারণে। এরও এক দশক আগে বিজ্ঞানীরা কোষের মধ্যে এক ধরনের ঝিল্লির কথা বলেছিলেন যা বর্জ্য পদার্থ বা বাড়তি উপাদান আটকে রাখে। তবে সুস্পষ্টভাবে সেখানে কীভাবে কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রিত হয় তা বিজ্ঞানীদের তখন জানা ছিল না। তিনি এবং আরো অনেক গবেষক দেখতে পান কোষ নিজের ভেতরে একটি আবরণ তৈরি করে তার মধ্যে অনেক অপ্রয়োজনীয় উপাদান আটকে রাখে। ক্রিস্টিয়ান ডে ঝিল্লি-আবৃত এ অংশটির নাম দেন লাইসোসম।
জাপানের বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওহশোমি ক্রিস্টিয়ান ডে এর আবিষ্কারের সীমাবদ্ধতা বা তাত্ত্বিক দিকের প্রায়োগিক জায়গায় এসে কাজ করেছেন। এবং তিনি যে জিনটি এই অটোফেজি প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে সেটি শনাক্ত করেছেন।
অটোফেজির কারণে অনেক কোষ মরে যায়, স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল ও রোগাক্রান্ত কোষগুলোই মারা পড়ে, তাই ক্যান্সারসহ বার্ধক্যজনিত নানাবিধ রোগের গবেষণায় ইয়োশিনোরির অটোফেজি নিয়ে এ গবেষণার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
আপনি যখন কিছু খাবেন না, তখনও কোষগুলো পুষ্টি চাহিদা মেটাতে চাইবে এবং নিজেদের মাঝে খাবার খুঁজবে। এটা করতে গিয়ে শরীরের অনেক অনিষ্টকারী উপাদান খেয়ে ফেলবে (সেখান থেকে পুষ্টি উপদান বাছাই করবে) এবং বিপাকীয় ক্রিয়ায় শরীরের বর্জ্য বের করে দিবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের গ্রহণ করা প্রোটিনের একটা অংশ কাজে লাগে না, সেগুলো বিভিন্নভাবে কোষে জমা থাকে, সেগুলো মাঝে মাঝে বের করে দিতে পারলে ভালো। কিন্তু অটোফেজি প্রক্রিয়ায় অবশ্যই অনেক পানি পান করতে হবে। যথেষ্ট পানি পান ছাড়া অটোফেজি হবে না। কারন শরীরে বিপাক প্রক্রিয়া চালু থাকবে, সেক্ষেত্রে পানি অপরিহার্য। আর অটোফেজি কার্যকর হতে গেলে একটানা ২-৭ দিন শুধু পানি ছাড়া অন্য কিছু খাওয়া যায় না। মানুষ ভেদে এই সময় ২-৭ দিন হতে পারে।
রোজা, ফাস্টিং, উপবাস, অনশনের সঙ্গে অটোফেজির কোন সম্পর্ক নেই। জাপানী বিজ্ঞানী অটোফেজি আবিষ্কারও করেননি। ১৯৬০ এর দশকে আবিষ্কৃত অটোফেজি প্রক্রিয়াটা শরীরের কোন জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় সেটাই তিনি খুঁজে দেখিয়েছেন। ধর্ম আর বিজ্ঞান দুইটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। ধর্মে বিশ্বাস আনতে হয়, সেখানে প্রশ্ন করার কোন সুযোগ নেই। আর বিজ্ঞানে প্রমান ছাড়া, সঠিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ছাড়া কোন কিছুর স্থান নেই।
Related Posts

Ayisha and Arpita: A Story of Free Expression and Honesty Between Two Sisters, One Muslim and One Hindu
Ayisha and Arpita’s parents had dated for several years before marrying under Bangladesh’s Special MarriageRead More

আয়িশা ও অর্পিতা – মুসলিম ও হিন্দু দুই বোনের মুক্তবাক ও সততার গল্প
আয়িশা ও অর্পিতার বাবা-মা কয়েক বছর প্রেম করে বাংলাদেশের বিশেষ বিবাহ আইনে বিয়ে করেছিলেন। কেউRead More

Operation Entebbe – the story of one night, and the Islamic execution suffered by Nazrul Islam and Sweety Akter
What can a state do to save the lives of its citizens abroad? Are thereRead More

Comments are Closed