Heart
Love and Emotion

Love and Emotion

হৃদয় নাকি মস্তিষ্ক? কোথায় ভালবাসার অনুভূতিরা খেলা করে?

জীবন মানে শুধুই যদি প্রেম-রসায়ন, জোৎস্না রাতে মুগ্ধ কেন আমার নয়ন!

প্রয়াত ব্লগার ইমন জুবায়েরের একটি বিখ্যাত লাইন এটি।

দুনিয়ার সবকিছুই পদার্থ বিজ্ঞানের খেলা। অরো ভেঙ্গে বললে পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়নের খেলা। এরপর জীববিজ্ঞান, তারপরে শরীর, অনুভূতি এসব। সবকিছুই বৃহৎ থেকে একেবারে আনবীক্ষনিক সব অনু পরমানুর ক্রিয়া, বিক্রিয়া, প্রতিক্রিয়ার ফল।

ভালবাসাসহ যত প্রকার অনুভূতি আছে, সবই মস্তিষ্কে সংঘটিত হওয়া রাসায়নিক বিক্রিয়া। কিন্তু ভালোবাসার সাথে হৃৎপিন্ড/heart জড়িয়ে আছে সেই প্রাচীনকাল থেকে। একটা সময় মনে করা হতো শরীরের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে হৃদপিন্ড, এমনকি ইসলামের কোরান/হাদীসসহ অন্যান্য ধর্মীয় কেতাবগুলোতেও আছে তেমনই। ইসলাম সেদিনও বলতো, এখনো বলে মানুষের জ্ঞান, অনুভূতি, স্মৃতি, পাপপুণ্য সব হৃদপিণ্ডে থাকে। বিজ্ঞান বলে এই সব কিছুই মস্তিস্ক নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু কিসের কী? ইসলাম সেটা কেন মানবে? নবী মুহাম্মদই তাদের শেষ কথা! সুতরাং রক্ত সঞ্চালন করা হৃদপিন্ডই তাদের কাছে সব জ্ঞানের আঁধার। কোরআনের ১১:৫, ২২:৪৬, ৭:১৭৯, ৬:১২৫ তাই বলে – বক্ষস্থিত হৃদয়, ত্যানা প্যাঁচানোর আগে তাফসির দেখবেন দয়া করে। এটা হাদিস দ্বারাও বহুল সমর্থিত, যেমন দেখেন – এখানে, এখানে। এর সমর্থনে ইসলামের স্কলারের বক্তব্য শুনুন – https://youtu.be/OvcHLpTu_gM


থাক বাদ দেন ইসলামের গালগল্পের কথা। এখন বিজ্ঞান ও সচেতন মানুষ নিশ্চিত যে জ্ঞান, চেতনা, অনুভূতি, স্মৃতি সবই মস্তিষ্কের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিন হয়। কিন্তু সবকিছু আগের সেই ভুল ধারনা থেকে সরে আসলেও সাহিত্যের “ভালবাসা” আজও সরে আসেনি, মানে অনুভূতিকে ব্যাখ্যা করতে এখনো আমরা ‘হৃদয়’ শব্দ ব্যবহার করি। বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে “ভালবাসা কী?” প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আসছেন। দেখা যাচ্ছে যে প্রেমের পিছনে বিজ্ঞান আমাদের ধারণা থেকে বেশ জটিল। তবে চলুন ভালবাসার পেছনে মস্তিষ্ক ঘটিত রসায়ন বিশ্লেষণ করা যাক।

তার আগে জানা যাক “আমরা প্রেমে কেন পড়ি?”

বিবর্তনীয় দৃষ্টিতে প্রেমে পড়া মূলত একটি অভিযোজনগত কৌশল। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে যৌন আকর্ষণ ও আবেগগত বন্ধন তৈরি হয়েছে প্রজননকে সফল করার জন্য—কিন্তু এর কাজ শুধু সন্তান উৎপাদন নয়। দীর্ঘ বিবর্তনের পথে প্রেম মানুষের মধ্যে জুটি-বন্ধন (pair bonding) শক্তিশালী করেছে, যাতে দুই অভিভাবক মিলে সন্তানের যত্ন নিতে পারে; এতে সন্তানের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। একই সঙ্গে প্রেম মস্তিষ্কে ডোপামিন, অক্সিটোসিন, ভ্যাসোপ্রেসিন–এর মতো রাসায়নিক নিঃসরণ ঘটায়, যা ঘনিষ্ঠতা, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ায়। ফলে প্রেম শুধু যৌন তৃপ্তির প্রবৃত্তি নয়—এটি সামাজিক বন্ধন, স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা তৈরির একটি বিবর্তিত জৈব-মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।

⇉ প্রথম ধাপঃ প্রেমে পড়া, ক্রাশ খাওয়া, ভাললাগা

এই পর্যায়ে মস্তিষ্কে ঘটে দ্রুত, স্বয়ংক্রিয় এবং বিবর্তনগতভাবে প্রোথিত কিছু প্রতিক্রিয়া। কারও প্রতি আকর্ষণের সম্ভাবনা দেখা দিলেই চোখের মণি বড় হয়ে যাওয়ার (mydriasis) মতো শারীরিক সংকেত দেখা দেয়, যা sympathetic nervous system-এর সক্রিয়তার ফল। একই সঙ্গে dopamine নিঃসরণ বাড়ে, যা “reward prediction”–এর অনুভূতি তৈরি করে—অর্থাৎ মস্তিষ্ক মনে করে সামনে কিছু আনন্দদায়ক ঘটতে পারে। Hypothalamus তখন testosterone ও estrogen-এর মতো সেক্স হরমোন নিঃসরণে উদ্দীপনা দেয়, যা প্রাথমিক আকর্ষণকে আরও তীব্র করে।

এই পর্যায়ে cortisol-এর মাত্রা বেশি থাকে, ফলে শরীরে উত্তেজনা, নার্ভাসনেস এবং “butterflies in the stomach” অনুভূতি তৈরি হয়। Cortisol নতুন বা অজানা পরিস্থিতির ভীতি কাটাতে সাহায্য করে, তাই নতুন কারও প্রতি আকর্ষণ তৈরি হলে এই হরমোন আচরণকে আরও সাহসী করে তোলে। একই সময়ে ফেরোমোন ও গন্ধ-সংক্রান্ত রাসায়নিক নিঃসরণ বাড়ে, যা বিবর্তনগতভাবে সঙ্গী নির্বাচনে ভূমিকা রাখে বলে ধারণা করা হয়। Serotonin-এর মাত্রা কমে যায়, যা obsessive thinking বা এক ব্যক্তিকে নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনার প্রবণতা বাড়ায়। Prefrontal cortex—যা যুক্তি, বিচার-বিবেচনা ও সতর্কতা নিয়ন্ত্রণ করে—এই পর্যায়ে কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যাতে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ না করে আকর্ষণ বজায় থাকে। এজন্যই প্রথম প্রেমে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সাধারণ একটি মানবিক অভিজ্ঞতা। এই ধাপটি মূলত infatuation, “সত্যিকারের ভালবাসা” নয়।

⇉ ২য় ধাপঃ প্রবল আকর্ষণ, ভালবাসা

এই পর্যায়ে সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হয়। Cortisol ও serotonin স্বাভাবিক মাত্রায় ফিরে আসে, ফলে আবেগের ওঠানামা কমে। Oxytocin ও vasopressin ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে—এগুলো pair bonding, বিশ্বাস, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি সংযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Pituitary gland থেকে নিঃসৃত এই হরমোনগুলো মস্তিষ্কের receptor-এর সাথে যুক্ত হয়ে গভীর আবেগগত সংযোগ তৈরি করে।

এই পর্যায়ে dopamine-এর নিঃসরণ আবারও বাড়ে, তবে এবার তা স্থিতিশীল আনন্দ, নিরাপত্তা ও সংযুক্তির অনুভূতির সাথে যুক্ত। Norepinephrine নিঃসরণ বাড়ায় উদ্যম, উত্তেজনা ও শক্তি—যার ফলে ক্ষুধা কমে, ঘুম কম লাগে, এবং প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনা তৈরি হয়। এই ধাপটিকে অনেক গবেষক “romantic love” বা “passionate love” বলেন—এটি জৈবিকভাবে এমনভাবে তৈরি যে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি সঙ্গী নির্বাচনের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়।

⇉ ৩য় ধাপঃ আসল ভালবাসা

এই ধাপে সম্পর্ক গভীর, স্থায়ী ও পরিণত রূপ নেয়। Oxytocin, vasopressin এবং endorphin—এই তিনটি রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদি বন্ধন, নিরাপত্তা, সহানুভূতি ও পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তি তৈরি করে। Oxytocin সাধারণত নারীদের মধ্যে বেশি সক্রিয় থাকে, যা তাদেরকে আবেগগতভাবে গভীর সংযোগে আবদ্ধ করে। Vasopressin পুরুষদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি সক্রিয়, যা রক্ষণাবেক্ষণ, দায়িত্ববোধ ও সুরক্ষার প্রবণতা বাড়ায়। এটি বিবর্তনগতভাবে “biparental care”–এর অংশ—অর্থাৎ মা-শিশুর বন্ধন ও বাবা-পরিবার রক্ষার প্রবণতা।

যৌনসঙ্গম, সন্তান জন্মদান, বুকের দুধ খাওয়ানো—এসব পরিস্থিতিতে oxytocin-এর নিঃসরণ সর্বোচ্চ থাকে, যা পরিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে। Endorphin দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের শান্তি, আরাম ও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে। Dopamine ও serotonin এই বন্ধনকে আরও স্থিতিশীল করে, ফলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে “companionate love”-এ রূপ নেয়—যা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের মূল ভিত্তি।

⇉ ৪র্থ ধাপঃ হৃদয় ভাঙ্গা, কষ্ট, মানসিক যন্ত্রণা

সম্পর্ক ভেঙে গেলে যে বুকে ব্যথা অনুভূত হয় তা কেবল রূপক নয়—মস্তিষ্কে শারীরিক ব্যথা ও মানসিক ব্যথা একই neural circuitry ব্যবহার করে। বিশেষ করে anterior cingulate cortex ও insula—যা শারীরিক ব্যথা প্রক্রিয়াজাত করে—সেগুলোই বিচ্ছেদের সময় সক্রিয় হয়। এজন্য heartbreak সত্যিকারের শারীরিক যন্ত্রণার মতো অনুভূত হয়।

এই সময়ে adrenaline/epinephrine-এর নিঃসরণ বাড়ে, যা উদ্বেগ, অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি তৈরি করতে পারে। Dopamine withdrawal—অর্থাৎ হঠাৎ dopamine কমে যাওয়া—এক ধরনের “addiction withdrawal”-এর মতো অনুভূতি তৈরি করে, কারণ প্রেমের সময় মস্তিষ্ক আসলে এক ধরনের প্রাকৃতিক আসক্তির অবস্থায় থাকে। এজন্য বিচ্ছেদের পর obsessive thinking, আকাঙ্ক্ষা, হতাশা, এমনকি clinical depression-এর মতো মানসিক প্রভাব দেখা দিতে পারে। এটি মানব মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, তবে দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রয়োজন।


মানুষের প্রেম, আকর্ষণ, উত্তেজনা, নিরাপত্তা—সবই মূলত মস্তিষ্কের রাসায়নিক ও হরমোনের সমন্বিত প্রতিক্রিয়া। ডোপামিন আমাদেরকে পুরস্কারের অনুভূতি দেয়, সেরোটোনিন স্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করে, অক্সিটোসিন ও ভ্যাসোপ্রেসিন বন্ধন ও বিশ্বাস তৈরি করে, আর কর্টিসল উত্তেজনা ও উদ্বেগ বাড়ায়। এই রাসায়নিকগুলোর ওঠানামাই নির্ধারণ করে কখন আমরা কারও প্রতি আকৃষ্ট হব, কখন গভীর সংযোগ অনুভব করব, আর কখন বিচ্ছেদে ব্যথা পাব। অর্থাৎ প্রেমের সমস্ত নাটকীয়তা, আবেগ, উচ্ছ্বাস ও যন্ত্রণা—সবই বিবর্তনের তৈরি এক জটিল জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যা আমাদের আচরণকে পরিচালিত করে, যদিও আমরা তা “হৃদয়ের অনুভূতি” বলে মনে করি।

শুরু করেছিলাম কবিতার লাইন দিয়ে, এবার চলুন শেষ করি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার কিছু লাইন দিয়ে

নারীকে ছুঁতে পারা সাধনার বিষয়।
শরীর ছুঁয়েই যে পুরুষ বলে নারীকে ছুঁয়েছি, সে নির্বোধ,
নারীর হৃদয় ছুঁয়েই তবে দেহ ছুঁতে হয়
শরীর তো ধর্ষকও ছোঁয়।

পুরুষের ভালোবাসা পাওয়াও সাধনার বিষয়।
দেহদানের পরেই যে নারী বলে পুরুষের ভালবাসা পেয়েছি, সে নির্বোধ,
পুরুষের বিশ্বাস ছুঁয়েই দেহ ছুঁতে হয়
শরীর তো বেশ্যাও দেয়।

Related Posts

Is the Earth and the universe orderly? Has everything been created only for humans?

Many Muslim people argue by saying, look, how orderly the earth and the universe are,Read More

পৃথিবী ও মহাবিশ্ব কি সুশৃঙ্খল? সব কিছু কী মানুষের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে?

অনেক মুসলিম লোকেরা যুক্তি দিয়ে বলেন, দেখ, পৃথিবী ও মহাবিশ্ব কত সুশৃঙ্খল, কি নিখুঁতভাবে সবRead More

Islamic Clothing for Women is Harmful

Hijab, niqab and burqa: these restrictive garments for women offer no benefit except harm

Among the roughly 1.8 to 2 billion Muslims in the world, a significant portion ofRead More

Comments are Closed