Sapiens
Let the Santal people live

Let the Santal people live

হোমো স্যাপিয়েন্সঃ আদিম প্রবৃত্তি, অভিবাসনের ইতিহাস এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি আমাদের নৈতিক দায়


মানুষ নিজেকে “সভ্য” বলে দাবি করে। আমরা নিজেদের উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান, বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর গর্ব করি। কিন্তু মানুষের ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায় – হোমো স্যাপিয়েন্স নামক প্রজাতিটি মূলত এক সংঘর্ষপ্রবণ, আধিপত্যকামী, সম্পদদখলকারী প্রাণী। সভ্যতার আবরণ যতই চকচকে হোক, মানুষের জিনগত স্মৃতিতে এখনো রয়ে গেছে সেই আদিম প্রবৃত্তি – অন্যের সম্পদ দখল করা, শক্তির মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করা, এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে দিয়ে নিজের অবস্থান সুসংহত করা।

এই প্রবন্ধে আমরা তিনটি স্তরে বিষয়টি বিশ্লেষণ করব –
১) মানুষের জৈব-আদিম প্রবৃত্তি ও সহিংসতার ইতিহাস
২) আউট অব আফ্রিকা তত্ত্ব ও ভারত উপমহাদেশে মানব অভিবাসনের নৃবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
৩) সাঁওতালসহ উপমহাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি আমাদের নৈতিক দায়

১. মানুষঃ সহিংসতা ও আধিপত্যের আদিম প্রবৃত্তি

হোমো স্যাপিয়েন্স পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র মানব প্রজাতি নয়। আমাদের পাশাপাশি ছিল হোমো নিয়ান্ডারথাল, হোমো ইরেক্টাস, ডেনিসোভানসহ আরও কয়েকটি মানবগোষ্ঠী। কিন্তু আজ পৃথিবীতে কেবল একটিই মানবপ্রজাতি বেঁচে আছে – আমরা। নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ ছিলঃ

(ক) প্রতিযোগিতা ও সংঘর্ষ
হোমো স্যাপিয়েন্স ছিল অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম, সংগঠিত, এবং দলগতভাবে শিকার ও যুদ্ধ করতে সক্ষম। নিয়ান্ডারথালরা শক্তিশালী হলেও সংখ্যায় কম ছিল এবং সামাজিক সংগঠন তুলনামূলক দুর্বল ছিল। ফলে প্রতিযোগিতায় তারা টিকতে পারেনি।

(খ) সম্পদ দখলের প্রবণতা
মানুষের মস্তিষ্কের বিবর্তন তাকে শিখিয়েছে – “সম্পদ মানেই বেঁচে থাকা।”

এই প্রবৃত্তি আজও মানুষের আচরণে স্পষ্ট। রাষ্ট্র, জাতি, ধর্ম, অর্থনীতি – সবকিছুতেই আমরা দেখি শক্তিশালী গোষ্ঠী দুর্বলদের সম্পদ দখল করে।

ঐতিহাসিক উদাহরণ

  • ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীরা আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের ভূমি দখল করে গণহত্যা চালায়।
  • অস্ট্রেলিয়ার অ্যাবরিজিনদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলে ব্রিটিশরা।
  • আফ্রিকার সম্পদ লুট করে ইউরোপীয় শক্তিগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী আধিপত্য বজায় রাখে।
  • দক্ষিণ আমেরিকায় ইনকা, অ্যাজটেকদের সভ্যতা ধ্বংস করে স্প্যানিশ কনকুইস্তাদোররা।

এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে – মানুষের সভ্যতার ইতিহাস আসলে সহিংসতা, দখলদারিত্ব ও আধিপত্যের ইতিহাস।

২. আউট অব আফ্রিকা তত্ত্ব ও ভারত উপমহাদেশে মানব আগমন

মানুষের উৎপত্তি আফ্রিকায়। প্রায় ৬০ – ৮০ হাজার বছর আগে আধুনিক মানুষের একটি ক্ষুদ্র দল আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে আসে। এই তত্ত্বকে বলা হয় Out of Africa Theory।

(ক) প্রথম আগমনঃ নেগ্রিটো জনগোষ্ঠী
নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভারত উপমহাদেশে প্রথম যে আধুনিক মানুষদের আগমন ঘটে, তারা ছিল নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর। তারা লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে লেভান্ত, ইরান হয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে।

(খ) দ্বিতীয় ধাপঃ অষ্ট্রোলয়েড জনগোষ্ঠী
এরপর আসে অষ্ট্রোলয়েডরা – যাদের উৎপত্তি ভারত বা দক্ষিণ চীন – এ নিয়ে বিতর্ক আছে।
বর্তমান ভারতের বহু আদিবাসী গোষ্ঠী যেমন –

  • সাঁওতাল
  • হো
  • খাড়িয়া
  • মালপাহাড়ী
  • চেঞ্চু
  • লোধা
  • ইরুলা
  • কোটা
  • কোল
  • ভীল

– এরা সবাই অষ্ট্রোলয়েড মহাজাতির উত্তরসূরি।

(গ) তৃতীয় ধাপঃ দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী
দ্রাবিড় ভাষা ও সংস্কৃতি ভারতেই উৎপত্তি লাভ করেছে – এমন মত শক্তিশালী। তারা দক্ষিণ ভারতে শক্তিশালী সভ্যতা গড়ে তোলে।

(ঘ) চতুর্থ ধাপঃ ইন্দো-ইউরোপীয় (আর্য) আগমন
প্রায় ৩৫০০ বছর আগে মধ্য এশিয়া থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষে আসে।
তাদের মধ্যে ছিল –

  • আর্য
  • শক
  • হুন
  • গ্রীক
  • কুষাণ

তারা পূর্ববর্তী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে আধুনিক ভারতীয় জাতির ভিত্তি তৈরি করে।

৩. ভারত উপমহাদেশের প্রকৃত আদিবাসী কারা?

যদি নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বিচার করি, তবে ভারত উপমহাদেশের প্রকৃত আদিবাসী হলো –

  • সাঁওতাল
  • হো
  • কোল
  • ভীল
  • লোধা
  • ইরুলা
  • মালপাহাড়ী
  • চেঞ্চু

এরা হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে বসবাস করছে।

আমরা – বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি – যারা নিজেদের “স্থানীয়” বলে দাবি করি, আমরা আসলে বহু অভিবাসী গোষ্ঠীর সংকর। তাহলে ভূমির প্রকৃত মালিক কারা?

যদি ইতিহাসের গভীরতা বিবেচনা করি, তবে –
এই উপমহাদেশের প্রকৃত মালিক সাঁওতালসহ আদিবাসী জনগোষ্ঠী। আমাদের পূর্বপুরুষরা – আর্য, দ্রাবিড়, তুর্কি, আফগান, মুঘল, ব্রিটিশ – সবাই কোনো না কোনো সময় এসে এই ভূমিতে বসতি গড়েছে।

৪. সাঁওতালদের বর্তমান অবস্থাঃ কেন তারা বঞ্চিত?

আজকের দিনে সাঁওতালরা –

  • ভূমিহীন
  • শিক্ষাবঞ্চিত
  • অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল
  • সামাজিকভাবে প্রান্তিক
  • রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় পিছিয়ে

এটা কি তাদের দোষ? – না। এটা ইতিহাসের দীর্ঘ দখলদারিত্বের ফল।

(ক) ভূমি হারানোর ইতিহাস
ব্রিটিশ আমলে জমিদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সাঁওতালদের জমি দখল করা হয়। স্বাধীনতার পরও তারা জমি ফেরত পায়নি।

(খ) শিক্ষা থেকে বঞ্চনা
রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাসের কোনো স্থান নেই। ফলে তারা মূলধারায় প্রবেশ করতে পারে না।

(গ) অর্থনৈতিক শোষণ
তাদের শ্রম সস্তা, জমি উর্বর – ফলে বহিরাগতরা তাদের সম্পদ দখল করে।

(ঘ) সামাজিক বৈষম্য
তাদের “অসভ্য”, “পিছিয়ে পড়া” বলে দেখা হয় – যা সম্পূর্ণ ভুল ও বৈষম্যমূলক।

৫. আখ কাটাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষঃ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

সম্প্রতি আখ কাটাকে কেন্দ্র করে সাঁওতালদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা দেখিয়ে দেয় –
মানুষের আদিম প্রবৃত্তি এখনো বদলায়নি।

যে জনগোষ্ঠী হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূমির মালিক, তাদেরই আজ তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন সংবাদ হচ্ছে – দেশ ছাড়তে চাচ্ছেন গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালরা। তাদের সম্পদ, জমি, ফসল – সবকিছুতেই বহিরাগতদের লোভ। এ যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি –

  • যেমন ইউরোপীয়রা রেড ইন্ডিয়ানদের তাড়িয়েছে
  • যেমন ব্রিটিশরা অ্যাবরিজিনদের নিশ্চিহ্ন করেছে
  • যেমন আফ্রিকার সম্পদ লুট হয়েছে

তেমনি আজ সাঁওতালদের সম্পদ দখল করা হচ্ছে।

৬. আমাদের নৈতিক দায়ঃ কেন তাদের রক্ষা করা জরুরি

আমরা যদি নিজেদের “সভ্য” দাবি করি, তবে আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে।

(ক) ইতিহাসের ঋণ
আমাদের পূর্বপুরুষরা তাদের ভূমি দখল করেছে। এই ঋণ আমরা কখনো শোধ করতে পারব না, কিন্তু তাদের সুরক্ষা দিতে পারি।

(খ) সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা
সাঁওতালদের ভাষা, গান, নাচ, কৃষি জ্ঞান – এগুলো মানবসভ্যতার সম্পদ।

(গ) মানবিক দায়িত্ব
তারা মানুষ – আমাদের মতোই।

তাদেরও অধিকার আছে –

  • জমির
  • শিক্ষার
  • নিরাপত্তার
  • সম্মানের

(ঘ) রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
রাষ্ট্রের উচিত –

  • তাদের ভূমি রক্ষা করা
  • শিক্ষা নিশ্চিত করা
  • স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া
  • বৈষম্য দূর করা

৭. মানুষ কি আদিম পশুত্ব ঝেড়ে ফেলতে পেরেছে?

মানুষ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতিতে উন্নতি করেছে। কিন্তু মানুষের জিনগত স্মৃতিতে এখনো রয়ে গেছে –

  • লোভ
  • দখলদারিত্ব
  • সহিংসতা
  • আধিপত্য

আজও আমরা দেখি –

  • যুদ্ধ
  • গণহত্যা
  • জাতিগত নিধন
  • সম্পদ দখল
  • ধর্মীয় সংঘর্ষ
  • জাতিগত বৈষম্য

এগুলো প্রমাণ করে –
মানুষ এখনো সেই আদিম প্রবৃত্তি পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে পারেনি।

শেষ কথা

হোমো স্যাপিয়েন্সের ইতিহাস হলো –

  • অভিবাসনের
  • সংঘর্ষের
  • দখলদারিত্বের
  • বেঁচে থাকার সংগ্রামের

কিন্তু একই সঙ্গে –

  • সহমর্মিতা
  • সহযোগিতা
  • মানবিকতার

ইতিহাসও বটে।

আজ সাঁওতালদের মতো আদিবাসী জনগোষ্ঠী আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক মৌলিক প্রশ্ন –

আমরা কি সত্যিই সভ্য হয়েছি?
নাকি এখনো সেই আদিম প্রবৃত্তির দাস?

যদি আমরা সত্যিই সভ্য হতে চাই, তবে প্রথম কাজ হলো –
এই ভূমির প্রকৃত অধিবাসীদের সুরক্ষা দেওয়া।

তাদের সম্মান, অধিকার, শিক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তাদের ইতিহাসকে স্বীকৃতি দেওয়া।
তাদের অস্তিত্বকে রক্ষা করা।

কারণ কোনো সভ্যতা তখনই সভ্য হয় –
যখন সে দুর্বলদের রক্ষা করতে পারে।

Related Posts

What happened on the night of Miraj?

Spending the night in Umm Hani’s house and then meeting Allah in the heavens – he named it Mi’raj

Mi’raj is a central event in Islamic belief. On the night of Mi’raj, the ProphetRead More

What happened on the night of Miraj?

উম্মে হানির ঘরে রাত কাটিয়ে মহাকাশে আল্লার সঙ্গে সাক্ষাত – নাম দিয়েছেন মিরাজ

মিরাজ ইসলামি বিশ্বাসের একটি কেন্দ্রীয় ঘটনা। মিরাজের রাতে নবী মুহাম্মদকে পাওয়া যাচ্ছিল না। সাহাবীরা চিন্তায়Read More

Hoor vs. Women

The 72 full‑breasted, personality‑less houris of Paradise vs. the personality‑rich cherished women of the world! What do you want?

It is said that in Paradise a believing servant will receive 72 exquisitely beautiful houris;Read More

Comments are Closed