
Language is a flowing river
ভাষা, ক্ষমতা ও কপটতার রাজনীতিঃ বাংলা ভাষা নিয়ে এলিট ন্যারেটিভের সংকট
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি সাংস্কৃতিক এলিট গোষ্ঠী ভাষা ও জাতীয়তাবাদকে নিজেদের ন্যারেটিভ রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তাদের রাজনৈতিক বা বৌদ্ধিক পরাজয় যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখনই তারা ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে সামনে এনে এক ধরনের নৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে চায়। যেন ভাষা বা দেশপ্রেমের একচ্ছত্র মালিকানা তাদেরই। এই প্রবণতা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা নয় – এটি ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনকে অস্বীকার করার এক ধরনের কপটতা।
এই কপটতার সবচেয়ে সাধারণ রূপ দেখা যায় যখন তারা নতুন প্রজন্মের ব্যবহৃত শব্দ, স্ল্যাং বা বিদেশি শব্দ নিয়ে হাহাকার শুরু করে – “এই শব্দগুলো কেন?”, “বাংলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে!”, “ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করো!”। অথচ ভাষা কখনোই পবিত্র নয়, কখনোই স্থির নয়, কখনোই কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ভাষা একটি জীবন্ত সত্তা – এটি বদলায়, বাড়ে, কমে, ধার করে, ছেড়ে দেয়, আবার নতুন করে জন্ম নেয়।
ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনঃ ইতিহাসই সাক্ষী
বিশ্বের প্রতিটি ভাষাই প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এটি ভাষার মৌলিক নিয়ম।
- কিছু শব্দ যোগ হয়,
- কিছু শব্দ হারিয়ে যায়,
- কিছু শব্দ অন্য ভাষা থেকে ধার করা হয়,
- কিছু শব্দ নতুন প্রজন্মের ব্যবহারে নতুন অর্থ পায়।
১০০০ বছর আগের চর্যাপদের বাংলা আজকের বাংলা ভাষাভাষীরা কতজন বুঝতে পারে? চর্যাপদ পড়লে কি তা আমাদের কাছে বাংলা মনে হয়? আবার বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাগুলো – সিলেটি, চাটগাঁইয়া, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ – এগুলো কি একে অপরের কাছে পুরোপুরি বোধগম্য? সিলেটি বা নাগরী ভাষা তো একসময় আলাদা লিপি ও সাহিত্যধারা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাহলে ভাষার পরিবর্তনকে ভয় পাওয়ার কারণ কী?
ইংরেজি ভাষার উদাহরণঃ পরিবর্তনই শক্তি
২০২৫ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে যোগ হয়েছে ৫০০-এরও বেশি নতুন শব্দ ও ফ্রেজ।
এগুলো এসেছে –
- তথ্যপ্রযুক্তি,
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম,
- আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন ভাষা,
- অভিবাসী সম্প্রদায়ের কথ্য ভাষা,
- নতুন সাংস্কৃতিক বাস্তবতা থেকে।
কোনো ইংরেজি এলিট দাঁড়িয়ে বলেনি –
“এই শব্দগুলো ব্যবহার করো না, ইংরেজির জাত নষ্ট হয়ে যাবে!”
বরং ইংরেজি ভাষা তার শক্তি দেখিয়েছে –
মানুষ যে শব্দ ব্যবহার করে, ইংরেজি সেটাকেই গ্রহণ করে।
বাংলা ভাষা থেকে ইংরেজিতে ঢুকে পড়া শব্দগুলোর তালিকাও দীর্ঘ –
bungalow, loot, jute, chutney, paddy, dol – এগুলো আজ বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত। আরো আছে অনেক।
বাংলা ভাষার বাস্তবতাঃ ধার করা শব্দই আমাদের শক্তি
বাংলা ভাষায় আরবি, ফারসি, তুর্কি, পর্তুগিজ, ইংরেজি, সংস্কৃত – অসংখ্য ভাষার শব্দ আছে।
“জল” যেমন বাংলা, “পানি” তেমনি বাংলা।
“চেয়ার” বললে সবাই বোঝে, “কেদারা” বললে অনেকে বোঝে না।
এটাই ভাষার বাস্তবতা – ব্যবহারই ভাষাকে বৈধতা দেয়।
বাংলার প্রমিত রূপও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা পণ্ডিত ঠিক করেনি।
এটি এসেছে মুর্শিদাবাদ ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কথ্য ভাষা থেকে।
অভিধানও ব্যবহারকে অনুসরণ করে, ব্যবহার অভিধানকে নয়।
প্রতিবাদের ভাষা: গালি, স্ল্যাং, নতুন শব্দ – সবই ভাষার অংশ
মানুষ যখন প্রতিবাদ করে, তখন ভাষাও প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
যে শব্দগুলোকে এলিটরা “অশ্লীল” বা “অসভ্য” বলে তিরস্কার করে, সেগুলোই আন্দোলনের ভাষায় শক্তি পায়।
“চ্যাটের বাল” আজকের তরুণদের কাছে একটি রাজনৈতিক অভিব্যক্তি – এটি তাদের ক্ষোভ, হতাশা, প্রতিবাদ ও ব্যঙ্গের ভাষা।
ইংরেজিতে “genocide” শব্দের আইনি সীমাবদ্ধতা থাকলেও বাংলায় “গণহত্যা” শব্দটি মানুষের অভিজ্ঞতা ও বেদনার বাস্তবতাকে ধারণ করে। শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ স্বৈরশাসন ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয় ২০২৪ সালের আগস্টে। জেন জি প্রজন্মের দূর্বার গণঅভ্যুত্থানের মুখে খুন, গুম, নিপীড়ন করেও তিনি টিকতে পারেননি। তার এই সহস্র মানুষের হত্যাকে শাব্দিক অর্থে “genocide” বলা না গেলেও বাংলায় গণ-হত্যা বলা যায়। অর্থগত দিক থেকে এটা “genocide” এর সমতূল্য।
ভাষা এখানে শুধু শব্দ নয় – এটি অনুভূতি, ইতিহাস ও সংগ্রামের প্রকাশ।
শব্দের সূক্ষ্মতাঃ ইনসাফ বনাম সুবিচার
“ইনসাফ” ও “সুবিচার” – অভিধানে হয়তো সমার্থক, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতায় ও ধারনাগতভাবে এদের অর্থ আলাদা।
আপনি নিজের টাকায় খাবার কিনে নষ্ট করলে সেটি “অবিচার” বলতে পারবেন না, কিন্তু সেটি “ইনসাফ” নয় – কারণ ইনসাফ মানে আইনগত ন্যায়, নৈতিক ন্যায়, সামাজিক ন্যায়, মানবিক ন্যায়। অন্যদিকে সুবিচার মানে আইনগত ন্যায়। অন্যকে অভুক্ত রেখে আপনি খাবার নষ্ট করলে আপনি সুবিচারের কোন শর্ত ভংগ করবেন না, কিন্তু সেটা ইনসাফ হবে না।
শহীদ ওসমান হাদির মতো ক্ষণজন্মা নেতারা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পেরেছিলেন বলেই মানুষ তাকে নিজের কণ্ঠস্বর মনে করেছিল। তিনি “ইনসাফ” প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন, কারণ সেই শব্দে মানুষের বঞ্চনা, ক্ষোভ, নৈতিক দাবি – সবকিছুই ধরা পড়ে।
ভাষার ওপর এলিট নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাঃ কেন এটি ব্যর্থ
যারা ভাষাকে “পবিত্র” রাখতে চায়, তারা আসলে ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
তারা চায় –
- কোন শব্দ ব্যবহার করা যাবে,
- কোন শব্দ নিষিদ্ধ,
- কোন শব্দ “ভদ্র”,
- কোন শব্দ “অভদ্র” –
এসবের ওপর তাদের কর্তৃত্ব থাকুক।
কিন্তু ভাষা কখনোই কারো আদেশ মানে না। ভাষা মানুষের, জনগণের, ব্যবহারকারীর। এলিটদের নয়।
ভাষা প্রবহমান, ভাষা স্বাধীন, ভাষা মানুষের
বাংলা ভাষা আজ যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, তা কোনো একক গোষ্ঠীর দান নয়। এটি হাজার বছরের বিবর্তন, মিশ্রণ, ধার, পরিবর্তন, সংগ্রাম ও মানুষের ব্যবহার থেকে তৈরি। ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা যতই করা হোক – ভাষা শেষ পর্যন্ত নিজের পথ নিজেই ঠিক করে নেয়।
যারা ভাষার নামে কপটতা করে, তারা ভাষার শত্রু নয় – তারা ভাষার স্বাধীনতার শত্রু। আর ভাষার স্বাধীনতা মানেই মানুষের স্বাধীনতা।
Related Posts

In Bangladesh, the very meaning of the “blasphemy” law is to find a new pretext for persecuting minorities
The attack on the house, shop, and temple of Deepto Roy in Tahirpur, Sunamganj isRead More

বাংলাদেশে “ধর্ম অবমাননা” আইনের অর্থই হলো সংখ্যালঘু নির্যাতনের নতুন এক বাহানা খোঁজা
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে দীপ্ত রায়ের বাড়ি, দোকান ও মন্দিরে হামলার ঘটনা নতুন কিছু নয়। এটি একটিRead More

Islam and the Qur’an must go through reform, otherwise Islam will be pushed aside
Historically, Islamic jurisprudence or classical fiqh developed within a specific social and political context, whichRead More

Comments are Closed