
Is the Taj Mahal really a symbol of love?
যে কারনে একজন দিনমজুর দশরথ সম্রাট শাহজাহানের চেয়ে বেশী সম্মান ও শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য
একজন মানুষের পক্ষে কি পাহাড়সম পরিবর্তন আনা সম্ভব?
প্রশ্নের উত্তর হলো – হ্যাঁ, সম্ভব, একজন খুব সাধারন খেটে খাওয়া মানুষ সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন।
শাহজাহান বনাম দশরথ: ভালোবাসার দুই রূপ
মানুষ তার প্রিয়জনের জন্য কত কিছুই না করে। ইতিহাসে আমরা দেখি সম্রাট শাহজাহান তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মুমতাজ মহলের স্মৃতিতে নির্মাণ করেছিলেন তাজমহল। আজ তা বিশ্বের অন্যতম সপ্তাশ্চর্য। কিন্তু একই ভারত উপমহাদেশে আরেকজন মানুষ আছেন, যিনি কোনো রাজা নন, কোনো ধনী ব্যবসায়ী নন, বরং একজন সাধারণ দিনমজুর। তাঁর নাম দশরথ মানঝি।
শাহজাহান জনগণের করের টাকায় হাজার হাজার শ্রমিক দিয়ে তাজমহল বানিয়েছেন। আর দশরথ মানঝি একাই নিজের শ্রম দিয়ে পাহাড় ভেঙে বানিয়েছেন রাস্তা। প্রশ্ন হলো – কার ভালোবাসা বেশি অনুকরণীয়?
আমরা প্রেমের নিদর্শন হিসাবে তাজমহল কে বসিয়ে দিই মনের সামনে। এর নির্মানশৈলী ও নান্দনিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। সেটা বিশ্বসেরা। আমার কনসার্ন হল এটা কি একটা মানবিক স্থাপত্য ? এটাকে আসলেও প্রেমের নিদর্শন বলা যায় ? এটাকে কি প্রেমের জন্য কোন আদর্শ মানা যায় ? সম্রাট শাহজাহান কি আসলেই হিরো ? নীচের তথ্যগুলোই আমি শুধু দিলাম, আপনি নিজেই উত্তর খুঁজে নিবেন শেষে।
স্ত্রী মমতাজ ( আসল নাম আরজুমান্দ বানু বেগম ) মহলের অকাল মৃত্যুতে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের দিলে খুব আঘাত লাগে। সেই ভেঙ্গে পড়া দিল নিয়ে তিনি স্ত্রীর কবরের উপর একটা সমাধিসৌধ নির্মাণ করেন। এটাই তাজমহল।
১৪ বছরের ইরানী কিশোরী মমতাজের দৈহিক সৌন্দর্য্য শাহজাহানকে বিমোহিত করে ফেলেছিল। তাই তিনি এ কিশোরীর সাথে বাগদান সম্পন্ন করেন, কিন্তু তাকে বিয়ে করে ঘরে তুলে নেননি। বরং মমতাজকে ঝুলিয়ে রেখে শাহজাহান আরেক নারীকে বিয়ে করেন। মমতাজ তার ২য় অন্য সূত্র মতে ৩য় স্ত্রী। তার মোট স্ত্রীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৭ জন। রক্ষিতাদের সংখ্যা নাইবা বললাম। ( মমতাজ কে ভালবাসার নিদর্শন কিন্তু এগুলো ! )
বাগদানের ৫ বছর পর ১৬১২ সালে মমতাজকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে প্রাসাদে নিয়ে আসেন শাহজাহান। আবার ১৬১৭ সালে তিনি আরো এক নারীকে বিয়ে করেন মমতাজসহ দুই স্ত্রী ঘরে থাকা সত্ত্বেও। বিয়ের ১৯ বছরের মধ্যে মমতাজ শাহজাহানের ১৪ সন্তানের মা হন। ১৪তম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মমতাজ মারা যান, মাত্র ৩৮ বছর বয়সে। বলা যায়, শাহজাহান নিজে মমতাজের মৃত্যুকে ডেকে এনেছিলেন, বোধহীনের মতো এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গর্ভবতী মমতাজকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যুদ্ধযাত্রা করেন। দুর্গম রাস্তা দিয়ে হাতির পিঠে বসে দীর্ঘক্ষণ চলার দরুন সময়ের আগেই মমতাজের প্রসববেদনা শুরু হয়। দীর্ঘ ৩০ ঘন্টার সেই প্রসবব্যথা শেষে সন্তান জন্ম দিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মমতাজ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে। মমতাজ মারা যাওয়ার পর শাহজাহান মমতাজের আপন ছোট বোনকে বিয়ে করেন।
শ্রুতি আছে, তাজমহলের ডিজাইনারের নাম ছিল ঈশা মোহাম্মদ। তিনি তার স্ত্রীকে উপহার দেওয়ার জন্য একটি ভাস্কর্য বানিয়েছিলেন। পরে সম্রাট শাহজাহানের পছন্দ হওয়ায় সেই ডিজাইনের আদলে বানানো হয় তাজমহল। সেই ব্যক্তির চোখ নষ্ট করে দেওয়া হয় যাতে তিনি নতুন করে আর এই ডিজাইন তৈরি করতে না পারেন।
তাজমহলের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৬৩২ সালে এবং পুরোপুরি শেষ হয় ১৬৫৩ সালে। এ সময়কালে ২০,০০০ শ্রমিক ও কারিগর তাজমহল নির্মাণে দাসদের মতো ব্যবহৃত হয়েছিল। কথিত আছে, তাজমহল নির্মাণ শেষে কারিগরদের হাতের আঙ্গুল কেটে দেয়া হয় যাতে তারা অন্য কোথাও আবার এ কাজ করতে না পারে, যদিও এ গল্পের সত্যতা প্রমাণিত নয়।
শাহজাহান তাজমহল নির্মাণে তখনকার সময়ের ৩২ মিলিয়ন রুপি খরচ করেছেন। তাত্ত্বিক হিসাব অনুযায়ী, এ পরিমান অর্থ বর্তমানের ৫২.৮ বিলিয়ন রুপি বা ৮২৭ মিলিয়ন ইউএস ডলারের সমান, অর্থাৎ ৬,৪৩৮ কোটি টাকার সমান। তবে এটা আসলে আরো বেশি হবে।
তাজমহল নির্মাণের ১১ বছর পর শায়েস্তা খাঁ সুবেদার হয়ে বাংলায় আসেন। শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় কত মণ চাল পাওয়া যেতো? ৮ মণ। অর্থাৎ তখন ১ মণ চালের দাম ছিল সাড়ে ১২ পয়সা বা .১২৫ টাকা। আর বর্তমানে ১ মণ চালের সর্বনিম্ন মূল্য কত? সম্ভবত: ৯০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে হবে।
ধরে নিলাম, ৯০০ টাকা। এখন ৯০০ কে .১২৫ দিয়ে ভাগ করলে ভাগফল হবে, ৭,২০০। এর মানে তখনকার চেয়ে এখন দাম বেড়েছে ৭,২০০ গুন বেশি। তাহলে তাজমহলের জন্য ব্যয়কৃত অর্থের পরিমান বর্তমানে দাঁড়াবে ৩২ মিলিয়ন x ৭,২০০ রুপি বা ২৩,০৪০ কোটি রুপিতে যা ২৮,৩১৪ কোটি টাকার সমান। তখন ভারতে এই টাকায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ১০ টি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মান করা যেত, হয়ত তার একটি আমাদের ঢাকাতেও থাকত।
এ পুরো টাকাটাই ছিল সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে আদায় করা খাজনা। শাহ্জাহান এ টাকাই ব্যয় করেছেন নিজের মৃত স্ত্রীর কবরের উপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মতো ব্যক্তিগত অভিলাষ পূরণে। কোনো সত্যিকারের প্রেমিক মন কি কখনো এমন একটা জঘন্য অন্যায় করতে চাইবে?
অনুৎপাদনশীল খাতে এ বিশাল পরিমান অর্থ খরচ করা আর সেই অর্থ আদায় করতে গিয়ে জনগণের উপর চালানো অত্যাচারের কুফল হিসেবে তাজমহল নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলির খোলা চোখ তখন তাজমহলের সাদা মার্বেলগুলিকে দেখে নি।
মুঘল পরিবারের মেয়েদেরকে বিয়ে করতে দেয়া হতো না। সম্রাট শাহজাহান নিজের মেয়ে জাহানারার প্রেমকে জঘন্য উপায়ে কবর দিয়েছিলেন। জাহানারা যার প্রেমে পড়েছিলেন শাহজাহান তাকে একেবারেই পছন্দ করেন নি। কিন্তু বিদূষী জাহানারা প্রেমে অটল ছিলেন। তাঁর প্রেমিক লুকিয়ে তাঁর সাথে দেখা করতে আসতো। শাহজাহান একদিন মেয়ের প্রেমিককে আটক করতে সক্ষম হন। তারপর মেয়ের চোখের সামনেই মেয়ের সেই প্রেমিককে তক্তা দিয়ে দেয়ালের সাথে আটকে পেরেক গেঁথে গেঁথে খুন করেন ‘প্রেমের’ তাজমহলের নির্মাতা শাহজাহান। যমুনার তীরে তখন তাজমহলের নির্মাণ কাজ চলছিল।
তাজমহল নির্মাণের ৫ বছরের মাথায় শাহজাহান তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেবের কাছে সিংহাসন হারান। আওরঙ্গজেব শাহজাহানকে জোর করে বন্দি করে নিজেকে সম্রাট ঘোষনা করেন, একে একে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেন ক্ষমতার দাবিদার নিজের অন্য ভাইদের।
শাহজাহানকে তাঁর জীবনের শেষ ৮ বছর আগ্রার দুর্গে গৃহবন্দি হয়ে থেকেই কাটাতে হয়, নীরবে দেখে যেতে হয় ক্ষমতার দখল নিয়ে পুত্রদের কাড়াকাড়ি। নিজে কীভাবে নিজের ভাইদের খুন করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন সেটা নিশ্চয়ই তখন তাঁর মনে পড়ছিল। বন্দি অবস্থায়ই তিনি মারা যান।
বন্দি জীবনে কে ছিল শাহজাহানের সঙ্গী? সেই জাহানারা যার প্রেমিককে শাহজাহান নৃশংসভাবে খুন করেছিলেন। জাহানারা স্বেচ্ছায় পিতার সাথে বন্দি হয়ে দুঃসময়ে পিতাকে সঙ্গ দিয়ে গেছেন। তাহলে প্রেমিক হিসেবে কে মহান? শাহজাহানকে কি আদৌ প্রেমিক বলা যায়? মমতাজের প্রতি তাঁর যে অনুভূতি ছিল সেটাকে স্রেফ মোহ ছাড়া আর কিছু বলার উপায় নেই।
তাজমহলের অপূর্ব সৌন্দর্য্য ও কারুকার্যময়তায় অভিভূত হওয়া স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। কিন্তু তাজমহল নির্মাণের সাথে জড়িয়ে থাকা নির্মমতার ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া মোটেই স্বাভাবিক কাজ নয়। এতো কিছুর পরেও কি আপনার মনে হয় শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজকে এতোই ভালবাসতেন যে তার জন্য দেশের জনগণের উপর জুলুম করে জোগাড় করা করের টাকায় স্ত্রীর কবরের উপরে সমাধি তৈরির বৈধতা পেয়ে যাবে?
দশরথ মানঝির জীবনের গল্প
দশরথ মানঝির জন্ম বিহারের গয়া শহরের কাছের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। তাঁর গ্রাম থেকে শহরের দূরত্ব আকাশপথে খুব বেশি না হলেও মাঝখানে ছিল এক বিশাল পর্বত। ফলে সরাসরি শহরে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। মানুষকে পুরো পাহাড় ঘুরে যেতে হতো, আর এতে ১৫ কিলোমিটারের পথ হয়ে দাঁড়াত প্রায় ৭০ কিলোমিটার।
১৯৬০ সালে স্ত্রী ফাল্গুনী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে দশরথ তাঁকে চিকিৎসার জন্য গয়া শহরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে গিয়ে ফাল্গুনী বিনা চিকিৎসায় মারা যান। স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়েন দশরথ। তাঁর মনে হলো, শুধু তিনি নন, গ্রামের অসংখ্য মানুষ এই পাহাড়ের কারণে চিকিৎসা, শিক্ষা, বাজার – সবকিছুর জন্য দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প
সরকারি সাহায্যের জন্য বহুবার দপ্তরে গিয়েছেন দশরথ। কিন্তু কোনো সাহায্য পাননি। তখন তিনি ঠিক করলেন, অন্যের ভরসায় বসে থাকলে কোনোদিন সমস্যার সমাধান হবে না। হাতে নিলেন হাতুড়ি আর বাটালি। কোনো ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই শুরু করলেন পাহাড় ভাঙার কাজ।
গ্রামের মানুষ তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করত। বলত, একজন মানুষের পক্ষে পাহাড় ভেঙে রাস্তা বানানো অসম্ভব। কিন্তু দশরথ হাল ছাড়েননি। প্রতিদিন শ্রম দিয়ে, ঘাম ঝরিয়ে তিনি কাজ করে গেছেন। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে অবিরাম পরিশ্রমের পর অবশেষে তিনি পাহাড় কেটে ৩৬০ ফুট দীর্ঘ ও ৩০ ফুট চওড়া একটি রাস্তা তৈরি করতে সক্ষম হন।
ফলাফল? গ্রামের মানুষ আর ৭০ কিলোমিটার ঘুরপথে যেতে বাধ্য হলো না। মাত্র ১৫ কিলোমিটার পথেই তারা শহরে পৌঁছাতে পারল। চিকিৎসা, শিক্ষা, বাজার – সবকিছু সহজলভ্য হলো। গ্রামের জীবনধারা পাল্টে গেল।
তুলনা: শাহজাহান বনাম দশরথ
- শাহজাহান: ২২ বছর ধরে ২০ হাজার শ্রমিক দিয়ে জনগণের টাকায় বানিয়েছেন তাজমহল – একটি সৌন্দর্যের নিদর্শন।
- দশরথ মানঝি: একাই ২২ বছর ধরে নিজের শ্রম দিয়ে পাহাড় ভেঙে বানিয়েছেন রাস্তা – যা মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।
তাজমহল নিঃসন্দেহে সুন্দর, কিন্তু দশরথের রাস্তা ছিল প্রয়োজনীয়। তাই মানবতার দিক থেকে দশরথের কাজই বেশি শ্রদ্ধার যোগ্য।
দশরথ মানঝি আমাদের শেখান – অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায় বসে থাকলে কোনোদিন সমাজ বদলাবে না। একজন মানুষ চাইলে একাই পাহাড়সম পরিবর্তন আনতে পারে। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, তা কর্মে প্রকাশ পায়।
সম্রাট শাহজাহান ইতিহাসে অমর হয়েছেন তাজমহলের জন্য, কিন্তু তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নির্মম বাস্তবতা কয়জন মানুষ জানে? কিন্তু দিনমজুর দশরথ মানঝি অমর হয়েছেন মানবতার জন্য। তিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের প্রকৃত শ্রদ্ধা অর্জিত হয় তখনই যখন নিজের ভালোবাসা ও শ্রম দিয়ে অন্যের জীবন বদলে দেওয়া যায়। তাই দশরথ মানঝি নিঃসন্দেহে সম্রাট শাহজাহানের চেয়ে অধিক সম্মান ও শ্রদ্ধার যোগ্য।
[ http://www.indianexpress.com/news/the-man-who-made-way-for-progress/968751/0 | http://en.wikipedia.org/wiki/Dashrath_Manjhi ]
Related Posts

From Somnath to Joypurhat – The Shadow of a Thousand‑Year‑Old Destruction Still Exists Today
The first blow On the Saurashtra coast of Gujarat, where the waves of the ArabianRead More

সোমনাথ থেকে জয়পুরহাট – এক সহস্রাব্দের পুরনো ধ্বংসের ছায়া আজও বিদ্যমান
প্রথম আঘাত গুজরাটের সৌরাষ্ট্র উপকূলে, যেখানে আরব সাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে পাথুরে তটে, সেখানেRead More

For 125 years, the Islamic world has been spinning on the basis of a single false key!
Once I was listening to a sermon by Professor Mufti Kazi Ibrahim Huzur where heRead More

Comments are Closed