
Iran’s Protesting Women
ইরানের ইসলামী শাসনের দমন-পীড়নের প্রতিবাদ করলে বাংলাদেশেও হত্যার হুমকি পেতে হয়
ইরানের ইসলামী শাসনে মানুষের মৌলিক মানবাধিকারগুলো মারাত্মকভাবে সংকুচিত। সেখানে কেউ তার মতামত প্রকাশ করতে পারে না। নারীরা তাদের ইচ্ছামতো পোশাক পরে চলাফেরা করতে পারে না। খামেনি শাসনের প্রতিবাদ করলে তাকে দেশদ্রোহী, বিদেশী — বিশেষ করে ইসরায়েলের গুপ্তচর — হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। এই শাস্তি বেশিরভাগ সময়ই ঘটে জনসম্মুখে, ক্রেনে ঝুলিয়ে ফাঁসি কার্যকর করে।
২২ মার্চ ২০২৬-এ আমি আমার ফেসবুকে “মেলিকা আজিজিকে ইরানে ক্রেন দিয়ে ফাঁসি দেওয়া হবে” (https://facebook.com/smsaifrahman/posts/pfbid02Ef5GdHhHCqfuePHXqiHjQKNdysKPuqfifULBkZjjZ3c9d4Drw59EaCSdyHCGoAsvl) এই নিয়ে একটি পোস্ট দিয়ে সেখানে ইরানের শাসকদের বর্বরতা ও প্রতিবাদ দমন, বিশেষ করে নারীদের উপর চলা জঘন্য সব অত্যাচার নিয়ে লিখে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। শেষ দেখা পর্যন্ত পোস্টটি মোটামুটি অনেক রিচ হয়েছে — ৫,৫০,০০০-এর বেশি ভিউ, ৪,৫০০-এর বেশি লাইক-কমেন্ট-শেয়ার-ঘৃণা-রাগ। ২০০-র বেশি মানুষ সেভ করে রেখেছেন পরে পড়বেন বলে। যে ৭০০-র বেশি কমেন্ট এসেছে, সেখানে প্রায় সবই আমার প্রতি তীব্র ঘৃণা, ক্ষোভ ও হুমকি — তীব্র গালিগালাজসহ আমি বেজন্মা, আমার মা পতিতা, আমার মা’কে ধর্ষণ করবে, আমাকে মারবে, কাটবে, হত্যা করবে — এমন বিচিত্র সব হুমকি। বাংলাদেশে, যেখানে জঙ্গি কার্যক্রম চলে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়, সেখানে এই বিশাল সংখ্যক বদ্ধ-উন্মাদ, ধর্মান্ধ, হিংস্র মানুষের সংখ্যা যে দিন দিন বাড়তেই থাকবে, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে? আমার মতো সামান্য লেখককেও তারা হত্যা করতে পারলে তাদের দৃষ্টিতে আল্লাহ, তাদের নবী মোহাম্মদ খুশি হবে। কারণ আমি ইরানের শাসনের সমালোচনা করেছি মানে আমি আল্লাহ, নবীর দুশমন! এই কমেন্টকারীদের তালিকায় দেখলাম বিরাট সংখ্যক নারী। তারা কিছুটা সংযত হয়ে কমেন্ট করলেও ইরানে যে নারীদের চরমভাবে অপমান, অপদস্থ, নিগৃহীত করা হয় — তা তারা মানতে নারাজ। তাদের দৃষ্টিতে ইসলাম নারীকে দিয়েছে সর্বোচ্চ সম্মান, সুমহান মর্যাদা।
ইরান কট্টর ইসলামী আইন মেনে চলা দেশ। সেখানকার শাসনের মূল স্তম্ভ এক ধর্মীয় মিথ বা কুসংস্কার। ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এক ধর্মতাত্ত্বিক মিথের ওপর। শিয়া ইমামিয়া মতবাদে ১২ ইমামের ধারণা সুপরিচিত। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ১১তম ইমাম মৃত্যুর আগে তাঁর পাঁচ বছরের শিশুপুত্র — মুহাম্মদ আল-মাহদিকে — লুকিয়ে রাখেন, এবং সেই শিশু ৫ বছর বয়সে “গায়েব” হয়ে যান। এই শিশুই শিয়াদের মতে ১২তম ইমাম, যিনি ১,২০০ বছর ধরে অদৃশ্য অবস্থায় আছেন এবং একদিন ফিরে এসে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন। সেই মাহদির প্রতিনিধি খামেনি — সুতরাং খামেনি যেটা চাইবে, যেটা বলবে সেটাই সেখানকার সর্বোচ্চ আইন।
ইরানের কট্টর ইসলামী শাসনের মাধ্যমে নির্যাতিত, নিগৃহীত, নিষ্পেষিত প্রতিবাদী মানুষের কথা বাইরের দুনিয়া খুব কমই জানতে পারে। সেখানে খামেনির সমালোচনা মানেই ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয়। এগুলো ইসলামেরই শিক্ষা। যেমন ইসলামে বলা হয়েছে, শাতিমে রাসূল বা নবীকে সমালোচনাকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। আল্লাহকে সমালোচনা করে মাফ পেতে পারেন, কিন্তু নবীকে সামান্য সমালোচনা বা তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচারণ বা তার কোনো কাজ বা কথার প্রসঙ্গে একটু সন্দেহ করলেই আপনি শাতিমে রাসূল হয়ে যাবেন। আপনার মাফ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, আপনাকে হত্যা করাই ইসলামিস্টদের কাজ হয়ে দাঁড়ায়। বিস্তারিত জানতে পড়ুন: https://tinyurl.com/yf47vmv5 এবং https://tinyurl.com/4yjb4hhj — সেখানে ইসলামী সূত্র থেকে রেফারেন্স দেওয়া আছে। সেজন্য নবী বা তার উত্তরসূরী মাহদি বা মাহদির প্রতিনিধি খামেনির সমালোচনাও ইরানে গর্হিত অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। এই নির্যাতনের বড় শিকার হয়ে থাকেন প্রতিবাদী নারীরা। ইসলাম আসলে নারীকে কীভাবে দেখে তা জানতে পড়ুন: https://tinyurl.com/4ddazbrr — যারা বলবেন আল্লাহপাক নারীর জন্য যে বিধান দিয়েছেন সেটা নারীরা মানতে বাধ্য, তাদের জন্য এই ইসলামী রেফারেন্সগুলো অবশ্যই পড়া উচিত।
এবার দেখি কিছু উল্লেখযোগ্য নারীকে যারা খামেনি শাসনে ইরানে ভয়ংকর নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই সংখ্যা খুবই সামান্য, তবুও দেখি।
আতেফেহ সালেহ রজবী (১৯৮৭–২০০৪)
২০০৪ সালের ১৫ আগস্ট ভোর ৬টায় ইরানের মাজান্দারান প্রদেশের নেকা শহরে মাত্র ১৬ বছর বয়সী আতেফেহ রজবীকে তার জেলকক্ষ থেকে টেনে বের করে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। পথ জুড়ে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত এই কিশোরী বারবার “তওবা, তওবা” বলে চিৎকার করছিল। তার অপরাধ ছিল “নৈতিকতার বিরুদ্ধে কাজ” — অর্থাৎ বারবার ধর্ষণের শিকার হওয়া, ইসলামের বিধান অনুযায়ী ধর্ষণ প্রত্যক্ষ করেছে এমন চারজন পুরুষ সাক্ষী না দেখাতে পারা ও বিচারকের অবিচারের প্রতিবাদ করা। যে বিচারক তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, সেই বিচারকই ব্যক্তিগতভাবে তার গলায় ফাঁসির দড়ি পরিয়ে দেন, এতোটাই ছিল তার আক্রোশ। তার জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স ছিল ১৬, কিন্তু রাষ্ট্র দাবি করল তার বয়স ২২। ক্রেনের বাহু থেকে ঝুলন্ত আতেফেহ ৪৫ মিনিট ধরে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাল, আর জনতা ফুঁপিয়ে কাঁদল। যে পুরুষ তাকে বারবার ধর্ষণ করেছিল, সে পেয়েছিল মাত্র কিছু বেত্রাঘাত আর স্বল্পমেয়াদী কারাদণ্ড।
মাশা (মাহসা) আমিনি (১৯৯৯–২০২২)
২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ২২ বছর বয়সী কুর্দি-ইরানি তরুণী মাহসা আমিনিকে তেহরানে ভাইয়ের সাথে বেড়াতে এসে ইরানের ধর্মীয় নৈতিকতা পুলিশ বা “গাইডেন্স প্যাট্রোল” গ্রেপ্তার করে — অভিযোগ ছিল হিজাব ঠিকমতো পরেনি। হাসপাতালে প্রকাশিত তার ছবিতে দেখা গেল কান থেকে রক্তক্ষরণ ও চোখের নিচে ক্ষত। পুলিশ দাবি করল হৃদরোগে মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু ২০২৪ সালের মার্চে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রতিবেদন নিশ্চিত করে যে আমিনির মৃত্যু হয়েছিল হেফাজতে পাওয়া শারীরিক সহিংসতার কারণে। তার মৃত্যু ইরানজুড়ে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ ঘটায়, জন্ম দেয় “নারী, জীবন, স্বাধীনতা” আন্দোলনের। নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের উপর জীবন্ত গুলি ছুড়ে এবং লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে; ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত অন্তত ৪৭৬ জন নিহত হন।
মেলিকা আজিজি (জন্ম ২০০৭)
২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি গিলান প্রদেশের মাসাল শহরে ১৮ বছর বয়সী মেলিকা আজিজিকে গ্রেপ্তার করা হয় — অভিযোগ, সে সরকারি প্রতীকে আগুন দিয়েছে। এটি ছিল “ব্লাডি উইক”-এর পরবর্তী আন্দোলনের অংশ, যেখানে শত শত তরুণকে নিরাপত্তা বাহিনী হত্যা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ৪৫ দিন একাকী কনফাইনমেন্টে রাখার পর বিচারের মুখোমুখি হন মেলিকা। বিচারক যখন তাকে ক্ষমা চাইতে বললেন, মেলিকা সরাসরি তার মুখের উপর বললেন, “তুমি এত তরুণের রক্ত ঝরতে দিলে। আমি কীভাবে চুপ থাকব? আমার কিছু যায় আসে না। আমাকে মেরে ফেলো।” তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে “মোহারেবা” বা “ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” অভিযোগ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ২০২৬-এর ২১ মার্চ ইরানের ইসলামী শাসন আনুষ্ঠানিকভাবে মেলিকার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেছে।
নিলুফার হামেদি ও এলাহে মোহাম্মাদি
সাংবাদিক নিলুফার হামেদি ও এলাহে মোহাম্মাদিকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়, মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ার মাত্র কয়েকদিন পর। হামেদি হাসপাতালে আমিনির বাবা-মায়ের কান্নার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেছিলেন, আর মোহাম্মাদি গিয়েছিলেন আমিনির জানাজার রিপোর্ট করতে। উভয়কেই অভিযুক্ত করা হলো “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু সরকারের সাথে সহযোগিতা” এবং “জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র”র দায়ে। হামেদি পেলেন ১৩ বছর ও মোহাম্মাদি পেলেন ১২ বছর সাজা। সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বছরের পর বছর কারাবাস — ইরানের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে।
নাসরিন সতোদেহ
নাসরিন সতোদেহ একজন ইরানি মানবাধিকার আইনজীবী, যিনি সারাজীবন বিরোধী কর্মী, হিজাব-বিরোধী নারী এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নাবালকদের পক্ষে লড়াই করেছেন। বারবার গ্রেপ্তার, দীর্ঘ কারাবাস এবং হয়রানি তার নিত্যসঙ্গী হয়েছে। হিজাব-বিরোধী প্রতিবাদী নারীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার কারণে তাকে বারবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ২০২১ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেয়।
নার্গেস মোহাম্মাদি
নার্গেস মোহাম্মাদি একজন ইরানি নারী ও মানবাধিকার কর্মী। ইরানে নারীর উপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং সকলের মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে তিনি ২০২৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। ২০১৬ সালে তাকে ১৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগার থেকেও তিনি থামেননি — বাধ্যতামূলক হিজাব আইনের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ এবং সহবন্দিদের সাথে সংহতি প্রকাশ অব্যাহত রেখেছেন।
গোলরোখ ইরাই
মাহসা আমিনি-আন্দোলনের সময় ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর গোলরোখ ইবরাহিমি ইরাইকে তেহরানের বাড়ি থেকে নিরাপত্তা বাহিনী গ্রেপ্তার করে অজানা স্থানে নিয়ে যায়। স্টোনিং সাজা এবং কারাগারের অবস্থার বিরুদ্ধে তার দীর্ঘদিনের সংগ্রামের কারণে তিনি পরিচিত। তাকে “শাসনের বিরুদ্ধে সমাবেশ ও ষড়যন্ত্র” এবং “রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রচারণার” দায়ে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, সাথে দেশত্যাগ ও রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা।
মারজিয়ে আমিরি
সাংবাদিক মারজিয়ে আমিরি ২০১৯ সালে তেহরানে শ্রমিকদের বিক্ষোভ কভার করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে আনা হয় “জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে প্রচারণা” ও “বেআইনি সমাবেশে অংশগ্রহণ”র অভিযোগ। গ্রেপ্তারের পর তাকে এভিন কারাগারে রাখা হয় এবং দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হয়। পেশাদার সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনই ছিল তার ‘অপরাধ’।
জিলা মাকভান্দি
জিলা মাকভান্দি ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলের একজন কর্মী যিনি ২০১০ সালে “মোহারেবা” অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হন। আন্তর্জাতিক চাপের ফলে তার দণ্ড স্থগিত রাখা হলেও বছরের পর বছর এভিন কারাগারে বন্দি থেকেছেন। কুর্দি নারী হওয়াটাই ইরানে দ্বিগুণ নির্যাতনের কারণ — জাতিগত ও লিঙ্গ-পরিচয় উভয় কারণেই।
নিলুফার বায়ানি
নিলুফার বায়ানি একজন ইরানি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ গবেষক, যিনি ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ইসলামী রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস তাকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। তিনি জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচিতে কাজ করেছিলেন। কারাগারে তার জিজ্ঞাসাবাদকারীরা তাকে নির্যাতন করে এবং যৌন নিপীড়নের হুমকি দেয়। বিচার হয়েছিল আইনজীবী ছাড়াই, বন্ধ দরজার পেছনে। ২০২৪ সালের ৮ এপ্রিল, প্রায় সাড়ে ছয় বছর কারাগারে থাকার পর তিনি মুক্তি পান।
সেপিদেহ কাশানি
পরিবেশকর্মী সেপিদেহ কাশানি নিলুফার বায়ানির সাথেই ২০১৮ সালে একই কারণে গ্রেপ্তার হন। ইরানের বিলুপ্তপ্রায় চিতাবাঘ রক্ষার কাজ করতে গিয়ে তাকে “ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি”র মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে পুরা হয়। পরিবেশ রক্ষার নিরীহ কাজও ইরানী শাসকদের কাছে “রাষ্ট্রদ্রোহ” হয়ে যায়।
মেহরাভা সতোদেহ (নাসরিন সতোদেহর কন্যা)
নাসরিন সতোদেহর কন্যা মেহরাভা মায়ের বিচারের সময় প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন। ইরানী শাসন কেবল প্রতিবাদকারীদেরই নয়, তাদের পরিবারকেও নির্যাতনের লক্ষ্য বানায়। মেহরাভাকেও হেনস্তার মুখোমুখি হতে হয়েছে, শুধু কারণ তিনি তার মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
নেদা আগা-সোলতান (১৯৮২–২০০৯)
নেদা আগা-সোলতান ২০০৯ সালের ২০ জুন তেহরানে নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভের সময় গুলিবিদ্ধ হন। মৃত্যুর মুহূর্তে কেউ একজন মোবাইলে ধারণ করা সেই দৃশ্য সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি হয়ে ওঠেন ইরানের স্বাধীনতার আন্দোলনের এক অমর প্রতীক। “নেদা” ফার্সি ভাষায় “কণ্ঠস্বর” অর্থ বহন করে — সেই কণ্ঠস্বরকে চিরতরে থামিয়ে দিয়েছিল খামেনির বন্দুক।
সেপিদেহ ঘোলিয়ান
সাংবাদিক সেপিদেহ ঘোলিয়ানকে আইআরজিসির নৃশংসতা প্রকাশ করার কারণে বহুবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে একাধিকবার কারাবরণ করেছেন তিনি। কারাগারে বসেও সহবন্দিদের দুর্দশার কথা পাচার করে বাইরে পাঠিয়েছেন, সংহতির চিঠি লিখেছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি স্মরণসভায় যোগ দিতে গিয়ে আবারও গ্রেপ্তার হন এবং গ্রেপ্তারের সময় তাকে মারধর করা হয়।
শরিফে মোহাম্মাদি
শরিফে মোহাম্মাদি একজন ইরানি সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক বন্দি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে রাশতে তার বাড়িতে গ্রেপ্তারের পর ২০২৪ সালের ৪ জুলাই রাশতের বিপ্লবী আদালত তাকে “বাগি” বা সশস্ত্র বিদ্রোহের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তার একমাত্র অপরাধ ছিল এক দশকেরও বেশি আগে একটি শ্রমিক সংগঠনে যোগ দেওয়া। সুপ্রিম কোর্ট প্রাথমিক রায় বাতিল করলেও ২০২৫ সালের আগস্টে নতুন করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হয়। নার্গেস মোহাম্মাদিসহ ষোলজন নারী বন্দি যৌথ বিবৃতিতে বলেছিলেন, “এটা শুধু শরিফের মৃত্যুদণ্ড নয়, এটা আমাদের সকলের মৃত্যুদণ্ড।”
উপরের তালিকা অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। প্রতিটি নাম একটি করে গোটা জীবনের প্রতিনিধিত্ব করে — স্বপ্ন, প্রেম, সাহস এবং রাষ্ট্রীয় বর্বরতার মুখে অবিচল প্রতিরোধের গল্প। এইসব নারীর বাইরেও আতেনা দায়েমি, ইয়াসামান আর্যানি, বাহারে হেদায়েত, মনিরে আরাবশাহিসহ আরও অগণিত নারী একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, হচ্ছেন।
সভ্যতার ন্যূনতম শর্ত
একটি রাষ্ট্র তার প্রতিবাদী নাগরিকদের সাথে যেভাবে আচরণ করে, সেটাই তার প্রকৃত চরিত্রের দর্পণ। যে রাষ্ট্র হিজাব না পরার কারণে তরুণীকে পিটিয়ে মারে, পরিবেশ রক্ষায় কাজ করার অপরাধে বিজ্ঞানীকে কারাগারে পাঠায়, শুধু সংবাদ পরিবেশনের জন্য সাংবাদিককে দশ বছরের কারাদণ্ড দেয় এবং বিক্ষোভে শামিল হওয়া আঠারো বছরের কিশোরীকে ক্রেনে ঝুলিয়ে মারে — সে রাষ্ট্র সভ্যতার দাবিদার হতে পারে না। মানবসভ্যতার এই মূল সত্যটুকু মানুষের হৃদয়ে গেঁথে রাখাই আজকের সবচেয়ে জরুরি কাজ: রাষ্ট্রশক্তি যত বড়ই হোক, সে তার নাগরিকের কণ্ঠ চিরতরে রোধ করতে পারে না। যে শাসনব্যবস্থা ভিন্নমতকে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে গণ্য করে এবং তার শাস্তি দেয় ফাঁসিতে, সেই শাসন ধর্মের নামে নৃশংসতার চর্চা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রতিটি নেদা, মেলিকা, নার্গেস — এই প্রতিটি নাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের মর্যাদার দাবি, মানুষের অধিকার কোনো শাসকের ফরমানে মুছে যায় না। তাদের মৃত্যু হলেও সেই দাবী থেকে যায় বিশ্বজুড়ে মানবিক মানুষদের আর্তনাদে।
Related Posts

Islam and the Qur’an must go through reform, otherwise Islam will be pushed aside
Historically, Islamic jurisprudence or classical fiqh developed within a specific social and political context, whichRead More

ইসলাম ও কোরআনকে রিফর্মের মধ্য দিয়ে যেতে হবে অথবা ইসলাম ছিটকে পড়বে
ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ক্লাসিক্যাল ফিকহ একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছিল, যাRead More

Reading the Qur’an, its translations, tafsir, sirah and hadith – no person with common sense can remain in Islam
Will you continue to remain a blind believer? Blind faith prevents a person from seeingRead More

Comments are Closed