
Indigenous peoples must be protected
দেশ ছাড়তে চাচ্ছেন গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালরা – এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য লজ্জা!
মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্স স্বাভাবিকভাবেই একটি মারামারি, কাটাকাটি, ঝগড়াঝাটিপ্রিয় প্রজাতি যারা সবসময় অন্যের পরিশ্রমলব্ধ উপার্জন, জমি জমা, সম্পদ দখলে নিতে চায়। হয়ত বিশ্বে অনেকে এখন সভ্য বলে দাবী করে। তবে আমেরিকানরা কিন্তু রেড ইন্ডিয়ান নামক সেখানকার আদিবাসীদের সম্পদ দখল করে, তাদের উপর অত্যাচার চালিয়ে জেঁকে বসা ইউরোপিয়ান মানুষের বংশধর। অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা সবখানেই এমন একটি চিত্র আছে । মানুষের গড় আয়ু ৬০-১০০ বছর ধরলে এই সময়টা হয়ত অনেক মনে হতে পারে কিন্তু সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় ১০০/১০০০ বছর কিছুই না।
‘আউট অব আফ্রিকা’ তত্ব অনুযায়ী ভারতবর্ষে আধুনিক মানুষদের প্রথম যে গোত্রটির আগমন ঘটেছিল, নৃ-তত্বের পুরাতন সংজ্ঞা অনুযায়ী তারা ছিল নেগ্রিটো প্রজাতির মানুষ( নেগ্রিটো- আফ্রিকার বাইরের নিগ্রো)। এই তত্ব অনুযায়ী আধুনিক মানুষের একটি ক্ষুদ্র দল এইত সেদিন ৬০-৮০ হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে লেভান্ত (ইসরাইল-ফিলিস্তিন-সিরিয়া) ও ইরানের জাগ্রেব হয়ে ৫৫-৭০ হাজার বছর আগে ভারতে প্রবেশ করে। এর পরে সারা ভারতে এবং দক্ষিন ও দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ায় সুসংহত অবস্থান গ্রহন করে অষ্ট্রোলয়েড প্রজাতির মানুষেরা। অষ্ট্রোলয়েডদের উৎপত্তি ভারতে নাকি দক্ষিন চীনে – এ নিয়ে মতবিরোধ আছে নৃ-বিজ্ঞানী মহলে, তবে বর্তমান ভারতের মুন্ডা, দ্রাবিড় এবং ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠী যেমন সাঁওতাল ( মনে রাখুন নামটা ), হো, খাড়িয়া, মালপাহাড়ী (মুন্ডা), চেঞ্চু, লোধা, ইরুলা, কোটা(দ্রাবির), কোল, ভীল(ইন্দো-ইউরোপীয়) ইত্যাদি জনগোষ্ঠী যে নৃ-তাত্বিক অষ্ট্রোলয়েড মহাজাতির উত্তর প্রজন্ম, সে বিষয়ে তেমন কোন মতান্তর নেই। পরবর্তীতে প্রথমে এদের মধ্যে সংস্থাপিত হয়েছে দ্রাবিড় ভাষা ও সংস্কৃতি( দ্রাবিড় ভাষা ও সংস্কৃতির উৎপত্তি ভারতে, নাকি বাইরে, এ নিয়ে গুরুতর মতভেদ আছে)। এর পরে মোটামুটি সাড়ে তিন হাজার বছর আগে থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী বিভিন্ন জাতি ক্রমাগতভাবে ভারতে আগমন করতে থাকে, প্রথমে আর্য, তারপর শক, তারপর হুন, গ্রীক, বিভিন্ন জাতি। পূর্বতন ভারতীয় জনগোষ্ঠীর সাথে দীর্ঘকালীন নানামূখী সংস্বর্গে নানা ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে এভাবেই ভিত গড়ে ওঠে আধুনিক ভারতীয় জাতি ও সংস্কৃতির। অবশ্য এর মধ্যে রয়ে গেছে একটি রহস্যময় অধ্যায়, সিন্ধু সভ্যতা। এর বহু পরে মধ্য এশিয়া, ইরান আফগানিস্তান থেকে যে মানুষদের ক্রমাগত অভিবাসন চলতে থাকে ভারতবর্ষে, তাদের সাথে পূর্বে আগত আর্য ও অপরাপর ইন্দো ইউরোপীয় ভাষাভাষীদের মধ্যে নৃ-তত্বগত ভাবে তেমন একটা পার্থক্য নেই, পার্থক্য মূলতঃ ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিতে।
ভাষার বয়স হিসাব করলেও ভারতীয় উপমহাদেশের দ্রাবিড়দের আধিপত্য বোঝা যায়। তামিলকে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবি ভাষার মধ্যে একটির খেতাব দেয়া হয়েছে। ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এর ইতিহাসের হদিস পাওয়া গেলেও বিশ্বাস করা হয় এর উৎপত্তি ২৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষ তামিল ভাষায় কথা বলেন। তামিল ভাষা মূলত দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় প্রচলিত দ্রাবিড় ভাষা। তামিল ভাষার সাহিত্য ২ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো এবং এর লিখিত ভাষাটির খুব সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে। তামিল ভাষার আয়ুষ্কাল ৫০০০ বছর বলেও অনেকে মনে করেন। এর সাহিত্যভাণ্ডার সুবিশাল, বৈচিত্র্যময় এবং সংগৃহীত।
ভারত অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের পরিচয় জানার একটা বড় সোর্স আছে, এমনকি সমগ্র বিশ্বের ৭০ হাজার বছর আগের মানুষের দেখাও পাবেন। বঙ্গোপসাগরের নর্থ সেন্টিনেলি দ্বীপের বাসিন্দারা সেই গোত্রের মানুষ যারা ৭০ হাজার বছর ধরে একই রকম আছে। বলা হয় পৃথিবীর একমাত্র আনকন্টাকটেড মানুষ তারা। আন্দামানের জারোয়াদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন সম্ভব হলেও সেন্টিনেলিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাগুলো সফল হয়নি। ইংরেজ সরকার সেখান থেকে কয়কজন শিশুকে পোর্ট ব্লেয়ারে ধরে নিয়ে আসলেও তারা কিছুক্ষন পরেই মারা যায়। আমাদের শরীর প্রতিদিন যেসব জীবানুর সঙ্গে হেসে খেলে যুদ্ধ করে জিতে যায়, ওদের শরীরে সেই ইমিউন সিস্টেম না থাকায় তারা সহজেই সাধারন সর্দি, কাশির জীবানুতেই মারা যেতে পারে। ইন্ডিয়ান সরকার তাদের বিচ্ছিন্ন থাকতে চাওয়াকে সম্মান করে সেখানে আধুনিক মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। এক খ্রিস্টান মিশনারী চুরি করে সেখানে ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে তাদের খাবারে পরিনত হয়েছিল, তারা খুবই হোস্টাইল। তবে তাদের এই অবস্থান ও থাকাটা মানুষের ইতিহাস বিশেষ করে ভারত অঞ্চলের আদিবাসীদের স্বরুপ বুঝতে সহায়ক।
উপরে ব্রাকেটবন্দী করে যে নামটা মনে রাখতে বলেছিলাম সেই গোত্রগুলোই কিন্তু এই ভারত উপমহাদেশের আদি বাসিন্দা হাজার হাজার বছর ধরে। যদি সেইভাবে হিসাব করেন তবে এই ভারত উপমহাদেশের সমস্ত ভূ সম্পত্তির মালিক হওয়ার কথা ছিল এই সাঁওতাল ও অন্য উল্লেখিত আদিম গোত্রগুলোর। আমরা সবাই উড়ে এসে জুড়ে বসা মানুষ বা বিভিন্ন প্রজাতির সংকর। অন্তত আমাদের গায়ের রঙ তাই বলে! এ সমস্ত কথাগুলি বলছি কারন কয়েকদিন ধরে একটি বিষয় বেশ আলোচিত হচ্ছে – আখ কাটাকে কেন্দ্র করে সাঁওতালদের সঙ্গে সংঘর্ষ। আহত-নিহত হওয়ার গুজব বা সত্য অনেক খবরই আসছে সংবাদপত্রে। মাত্র তো কয়েক হাজার মানুষ বেঁচে আছে ভারতবর্ষের আদিম এই গোত্রগুলোর যাদের আসলে ভারতবর্ষ তথা আজকের বাংলাদেশের সম্পত্তির প্রকৃত মালিক হওয়ার কথা ছিল। তাদেরকে আমরা সুন্দর জীবনের সুযোগ না দিতে পারি আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাসের ঐতিহ্য, তাদের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা ও ঋণ থেকে তাদের সুরক্ষাটুকু তো আমরা দিতে পারি যেন তাদের যেটুকু আছে সেটুকু নিয়েই তারা তাদের মত করে চলতে পারে। এই সাঁওতালরা এদেশের প্রকৃত আদিবাসী। এদের কৃষি উৎপাদন, পশুপালন, সম্পদে ভাগ বসাতে আমাদের পূর্ব পুরুষরা উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল। যদিও এটা হাজার হাজার বছরের ব্যাপার তবুও তাদের রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের সম্পদ নেই কেন? তারা শিক্ষা-দীক্ষা বঞ্চিত কেন? তাদের নির্যাতন নিগৃহীত হতে হবে কেন? তাদের কেন নিজের জন্মস্থান ছেড়ে চলে গিয়ে বাঁচতে হবে?
২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে হামলার পর, বিচারের দাবি ও চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাঁওতাল পরিবারগুলো ভারত চলে যাওয়ার কথা বিবেচনা করছে এবং সরকারি ত্রাণ প্রত্যাখ্যান করে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা তাদের পৈতৃক ভিটায় ফেরার নিশ্চয়তা এবং হামলার বিচারের দাবিতে অনড় থেকে স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের দ্বারা দেশত্যাগে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ তুলেছে। একটা খুবই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের এমন অভিযোগ একটা রাষ্ট্রের জন্য খুবই লজ্জার ব্যাপার। “দেশ ছাড়তে চাচ্ছেন গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালরা” – বনিক বার্তার এই সংবাদ শিরোনাম একটি রাষ্ট্রের ভিতই নাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
পার্বত্য অঞ্চলে যারা শতাব্দী ধরে বসবাস করছে সেই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজন ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। সেটেলার বাঙালিরা পাহাড়ে গিয়ে অনিয়ন্ত্রিত জন্মহারের কারনে দ্রুত সংখ্যাগরিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রান-প্রতিবেশ-জীববৈচিত্রের সঙ্গে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যারা নিবিড় সহাবস্থান গড়ে তুলেছে সেই আদিবাসীরা সেখানে আজ কোনঠাসা। একটা দেশের জন্য এটা ভাল কোন লক্ষন নয়। ইদানিং দূর্গম পাহাড়ে মসজিদ, মাদ্রাসা স্থাপন, জঙ্গি প্রশিক্ষন ক্যাম্প স্থাপনের সংবাদ আসে। সবকিছু যদি এভাবে ধর্মের ভিত্তিতে দখল হয়ে যায়, অন্যদের ধর্ম পরিবর্তনে বাধ্য করা হয় তবে সেটা একটা দেশের জন্য তো বটেই, মানবতার জন্যও অভিশাপ।
হোমো স্যাপিয়েন্স তার সমসাময়িক অন্য মানব প্রজাতি যেমন হোমো নিয়ার্ন্ডারর্থাল, হোমো ইরেক্টাস, হোমো সেপিয়েন্স সবাইকে ধ্বংস করেছে। একপর্যায়ে নিজেদের সুরক্ষার জন্য নানান সামাজিক চুক্তি করে সভ্যতার পথে হেঁটেছে। কিন্তু দেখা যায় এখনো ধর্মের নামে, জাতীয়তার নামে, জাতির নামে নিজদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য একই কাজ করছে বিভিন্ন গোষ্ঠী! মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে উন্নতি করেছে সত্য কিন্তু সেই মানুষগুলো অন্তরের সেই আদিম পশুত্বের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য এখনো ফেলতে পারেনি। চারিদিকেই এর ভুরি ভুরি উদাহরণ।
Related Posts

Thousands of people have been killed in Iran in the name of the Child Imam Mahdi, who disappeared around 1,200 years ago
The Islamic Republic of Iran is one of the rare states in the modern worldRead More

১২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া শিশু ইমাম মাহদীর নামে ইরানে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়
ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র আধুনিক বিশ্বের এমন এক বিরল রাষ্ট্র, যার ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্রে একজন অনুপস্থিত, অদৃশ্যRead More

Ayisha and Arpita: A Story of Free Expression and Honesty Between Two Sisters, One Muslim and One Hindu
Ayisha and Arpita’s parents had dated for several years before marrying under Bangladesh’s Special MarriageRead More

Comments are Closed