
Story - I Need a Break
বিরতি
১
উলিপুর ডাকঘরের টিনের চালে ভোরের রোদ পড়লে জায়গাটা একটু একটু করে জেগে ওঠে। বারান্দার কোণে ঝুলে থাকা লাল চিঠির বাক্সটার রং এখন প্রায় মরচে-বাদামি। তার সামনে প্রতিদিন সকাল দশটায় এসে দাঁড়ান এক মানুষ। বয়স বাষট্টি-তেষট্টি, চুলে রুপোলি ছোপ, গায়ে ধোয়া কিন্তু পুরোনো ফুলহাতা শার্ট। এলাকার লোকে তাঁকে ডাকে পাগল সবুজ। তিনি এ নাম শুনেও শোনেন না।
পোস্টম্যান রহিম মিয়া তাঁকে দেখলেই মাথা নাড়েন। কথা বলার আগেই সবুজ বুঝে যান।
“আজও নাই, সবুজ ভাই।”
“আচ্ছা,” সবুজ হাসেন। “কাল আসবে হয়তো।”
এই “কাল” শব্দটা তিনি পঁয়ত্রিশ বছর ধরে বুকের ভেতর পুষে রেখেছেন।
২
১৯৯১ সালের কথা। সবুজের বয়স তখন সাতাশ, ছোট একটা স্কুলে পড়ান। দিনের শেষে ফেরেন ধুলোমাখা রাস্তা ধরে, আর সপ্তাহের একটা দিনের জন্য বেঁচে থাকেন। সেদিন জকিগঞ্জ থেকে চিঠি আসে।
নীল খাম, গোটা গোটা অক্ষর, ওপরে লেখা “প্রিয় সবুজদা”।
তনুকে তিনি কখনও দেখেননি। অথচ তার হাতের লেখা চিনতেন নিজের হাতের রেখার চেয়েও ভালো। কোন চিঠিতে সে বৃষ্টির কথা লিখেছে, কোনটায় সুরমা নদীর ওপারের সন্ধ্যা, কোনটায় শুধু এটুকু: “আজ কিছু লেখার নেই, শুধু জানাতে চাইলাম যে ভালো আছি, আর তুমি কেমন আছো সেটা জানতে চাই।”
পাঁচ বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে একটি চিঠি। এমন নিয়মে বাঁধা সম্পর্কে ঝড়ও ঢুকতে ভয় পায়।
তারপর একদিন তনু লিখল, “আমাদের একবার দেখা হওয়া দরকার। শুধু চিঠির মানুষ হয়ে থাকতে আর ইচ্ছে করে না।”
সেদিন সবুজ কোনো উত্তর লেখেননি। সারা রাত জানালার পাশে বসে থেকেছেন।
কিছুদিন পর ডাকে এল একটা বড় খাম। ভেতরে একটা ছবি। কোনো স্টুডিওর পর্দায় আঁকা কাশফুলের বন, ওপরে নীল আকাশ, আর সেই কৃত্রিম আকাশের নিচে সাদা শাড়িতে দাঁড়ানো এক তরুণী। কেউ হয়তো ভাবত, ব্যাকগ্রাউন্ড নকল। সবুজের মনে হলো, নকল আকাশের নিচেও একজন মানুষ এত সত্যি হতে পারে, যেন কোনো রাজকন্যা মেঘের ভেলায় ভেসে যেতে যেতে এক মুহূর্তের জন্য থেমে তাঁর দিকে তাকিয়েছে।
ছবির পেছনে লেখা: “তোমার ছবির অপেক্ষায় রইলাম।”
সবুজ ছবিটা অনেকক্ষণ দেখলেন। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
আয়নায় একটা সাধারণ মুখ, একটু বেশি চওড়া কপাল, চোখে ক্লান্তি। কলেজের দিনের কথা মনে পড়ল। ক্লাসের মেয়েদের চাপা হাসি, একজনের ছুড়ে দেওয়া কথা, “তুই আয়নায় নিজেকে দেখিস না?” সেই কথাগুলো এতদিন মাটির নিচে চাপা ছিল। আজ তারা ফিরে এল।
তিনি ভাবলেন, তনু এই মুখ দেখলে কি চিঠির সবুজকে আর খুঁজে পাবে? পাঁচ বছরের গড়া প্রাসাদ কি একটা ছবির ভারে ভেঙে পড়বে?
দিন গেল। সপ্তাহ গেল। তনুর তাগিদ এল আবার, তারপর আবার। সবুজ লিখলেন, “পাঠাব, একটু সময় দাও।” অবশেষে তনুর অভিমানী শেষ চিঠিটা এল: “তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করো না?”
সে চিঠি পড়ে সবুজের বুক কেঁপে উঠল। বিশ্বাস তিনি তনুকে করতেন। তিনি আসলে ভয় পেতেন নিজেকে।
পরদিন তিনি রংপুর শহরে গিয়ে এক স্টুডিওতে ছবি তুললেন। ফটোগ্রাফার বলল, “একটু হাসুন।” তিনি হাসতে পারলেন না। যে হাসি বেরোল, সেটা কোনো ভীতু মানুষের অনুরোধের হাসি।
ছবি ডাকে গেল।
৩
এরপর তনু দু-একটা চিঠি লিখেছিল। ছোট চিঠি, ভদ্র চিঠি, যার ভেতরের উষ্ণতাটুকু যেন কেউ সাবধানে সরিয়ে নিয়েছে। সবুজ সেগুলো বারবার পড়লেন, প্রতিটি শব্দের ফাঁকে খুঁজলেন কোনো অর্থ, কোনো ইঙ্গিত।
তারপর নীরবতা।
সবুজ লিখে চললেন। প্রতি সপ্তাহে, ঠিক আগের মতো। তনুর শহরে বৃষ্টি হচ্ছে কি না জানতে চাইলেন, নদীর জল বেড়েছে কি না, তার শরীর কেমন। কোনো উত্তর এল না। তাঁর চিঠিগুলো গেল কোন অন্ধকার গহ্বরে, কেউ জানে না।
শেষে একদিন তিনি লিখলেন: “আমি জকিগঞ্জে আসছি। তোমার ঠিকানায়।”
এবার উত্তর এল, দ্রুত, ছোট।
“সবুজদা, আমি লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমাদের সম্পর্কে একটু বিরতি চাই। আসবেন না।”
এই ছিল শেষ চিঠি।
সবুজ সেটা পড়লেন একবার। তারপর ভাঁজ করে বুকপকেটে রাখলেন। সেদিন রাতে তিনি কাঁদলেন না, রাগও করলেন না। শুধু নিজের সঙ্গে একটা নিঃশব্দ চুক্তি করলেন।
পরদিন তিনি লিখলেন, “ঠিক আছে। আমি তোমার বিরতি শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকব।”
সেই চিঠির কোনো উত্তর আসেনি।
৪
বছর গড়াল। উলিপুরের মাটির রাস্তা পিচঢালা হলো। বাজারে টিভির দোকান এল, তারপর মোবাইলের টাওয়ার। ছেলেমেয়েরা আঙুলের ডগায় পৃথিবী নিয়ে ঘুরতে লাগল। সবুজের ছাত্ররা বড় হয়ে চাকরি নিয়ে ঢাকায় গেল, বিদেশে গেল, কেউ কেউ ফিরে এসে দেখে স্যার আজও ডাকঘরে দাঁড়িয়ে।
“স্যার, এখন তো ফোন নম্বর আছে, ফেসবুক আছে। একটু খোঁজ করলেই…”
সবুজ মৃদু হাসেন। “বিরতি চেয়েছে সে। জিজ্ঞেস না করে খুঁজতে যাওয়া তো তার চাওয়ার অপমান।”
ছাত্ররা বুঝত না। এ যুগে কেউ কারও জন্য এভাবে অপেক্ষা করে না।
লোকে বলল, লোকটার মাথা খারাপ। পাশের দোকানের বুড়ো বলল, “পাঁচ বছরের চিঠির প্রেমে বত্রিশ বছর কাটিয়ে দিল, এ কি স্বাভাবিক?”
সবুজ শুনতেন। কিছু বলতেন না।
তিনি জানতেন, যা কিছু মানুষ বোঝে না, তাকেই সে পাগলামি বলে। কিন্তু অপেক্ষারও একটা স্বাদ আছে, যা শুধু সেই জানে যে তার ভেতরে বসবাস করেছে। প্রতিদিন সকালে ডাকঘরের বারান্দায় পা রাখার সময় বুকের ভেতর যে অল্প কম্পন জাগে, আজ যদি এসে থাকে!, সেই কম্পনটুকুই তাঁর বেঁচে থাকার শেষ সুতো। সেটা ছিঁড়ে গেলে কী থাকে?
৫
এখন শরৎকাল। আকাশ নীল, আর নদীর ধারে ধারে কাশফুল ফুটেছে।
সবুজ সকালে ডাকঘরে যাওয়ার পথে থামলেন। নদীর পাড়ে বাতাসে দুলছে সাদা ফুলের সারি। কতদিন তিনি এদিকে আসেননি, কারণ কাশফুল দেখলেই এক স্টুডিওর পর্দা মনে পড়ে, আর সেই পর্দার সামনে দাঁড়ানো এক তরুণীর মুখ।
আজ তিনি থামলেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
মনে মনে বললেন, তনু, তুমি কি জানো এখনও কাশফুল ফোটে? তুমি ঠিক যেমন ছবিতে দাঁড়িয়েছিলে, তেমনই।
তারপর ধীরে ধীরে ডাকঘরের দিকে হাঁটলেন।
রহিম মিয়া তো অনেক আগেই অবসর নিয়েছেন। এখন যে ছেলেটা ডাক দেয়, সে নতুন, আধুনিক, তার হাতে স্মার্টফোন। সে সবুজকে দেখে একটু বিরক্ত, একটু করুণা মিশিয়ে বলল, “চাচা, আজও এলেন?”
“আজও,” সবুজ বললেন। “কোনো চিঠি?”
ছেলেটা চিঠির বান্ডিল উল্টেপাল্টে দেখল। বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংকের নোটিশ, কোনো সরকারি ফর্ম। নীল খাম নেই।
“নাহ, চাচা।”
“আচ্ছা,” সবুজ বললেন, তেমনই হেসে। “কাল আসবে হয়তো।”
তিনি ফিরে চললেন। ডাকঘরের বারান্দা থেকে নামতে নামতে শার্টের বুকপকেটে হাত দিলেন। সেখানে আছে একটা ভাঁজ করা, হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ, যার কালি ম্লান, ভাঁজে ভাঁজে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। বত্রিশ বছর ধরে তিনি ওটা প্রতিদিন সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন।
“আমাদের সম্পর্কে একটু বিরতি চাই।”
একটু বিরতি। এই দুটো শব্দ ধরেই তিনি বেঁচে আছেন। সত্যিই কি সেটা “একটু” ছিল, নাকি ওটা ছিল ভদ্রতার এক নরম মিথ্যা, তা তিনি ভেবেছেন বহুবার। উত্তর জানার সাহস হয়নি। কারণ উত্তর জানলে অপেক্ষা ফুরিয়ে যায়, আর অপেক্ষা ছাড়া তিনি কে?
হয়তো তনুর বিয়ে হয়েছে কবে। হয়তো তার নাতি-নাতনি হয়েছে। হয়তো সে কখনও ভাবেনি, উলিপুরের এক ডাকঘরে একজন মানুষ তার ছোট্ট একটা বাক্যকে জীবনের শপথ করে নিয়েছে। হয়তো সে বেঁচেই নেই।
এই “হয়তো”গুলোর কোনোটাই সবুজ ভাবতে চান না। তাঁর কাছে তনু আজও উনিশ, আজও কাশফুলের বনে দাঁড়ানো, আজও কোনো এক মেঘের ভেলায় ভেসে যাচ্ছে।
সন্ধ্যায় তিনি ঘরে ফিরে একটা কাগজ নিলেন, আর কলম। লিখলেন:
প্রিয় তনু,
আজ শরতের আকাশ খুব নীল। নদীর ধারে কাশ ফুটেছে। তুমি ভালো আছো তো? আমি ভালো আছি। শুধু জানাতে চাইলাম।
ইতি, তোমার সবুজ।
খামে ভরে ঠিকানা লিখলেন, জকিগঞ্জ, সিলেট। ডাকটিকিট লাগালেন।
এই চিঠি তিনি ডাকবাক্সে ফেলবেন না। তাঁর টেবিলের ড্রয়ারে সাজানো আছে এমন হাজার হাজার চিঠি, বত্রিশ বছরের প্রতিটি সপ্তাহের, প্রতিটি ঋতুর, প্রতিটি নিঃশব্দ সন্ধ্যার। পাঠানো যায়নি, কারণ সে বলেছিল “আসবেন না”, আর সবুজ কখনও তার কথার অবাধ্য হননি।
ড্রয়ার বন্ধ করে তিনি জানালার পাশে বসলেন। বাইরে সন্ধ্যা নামছে। দূরে কোথাও কেউ গান ধরেছে, ভাটিয়ালির সুর ভেসে আসছে বাতাসে।
কাল আবার সকাল হবে। ডাকঘরের বারান্দায় আবার একজন মানুষ দাঁড়াবে, বুকের ভেতর সেই ছোট্ট কম্পন নিয়ে।
আজ যদি এসে থাকে!
আর কেউ না জানুক, কাশফুলের বনে দাঁড়ানো সেই মেয়েটি যদি কোথাও থেকে থাকে, সে হয়তো কোনো এক শরতের বিকেলে অকারণে থমকে যায়। বুকের ভেতর একটা অচেনা টান অনুভব করে, যেন বহুদূর থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকছে, নিঃশব্দে, অবিরাম।
কিন্তু সে ডাকের ঠিকানা তার জানা নেই।
আর সবুজ? তিনি জানেন, কিছু প্রেম সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য নয়। কিছু প্রেম শুধু অপেক্ষার ভেতরেই সবচেয়ে সম্পূর্ণ।
ডাকঘরের বারান্দায় কাল আবার ভোর হবে।
Related Posts

Islam’s Circular‑Logic Fallacy
Place: Cabin of a Dhaka–Sylhet-bound trainCharacters: Maulana Abdur Rahman (a responsible member of Tabligh Jamaat)Read More

ইসলামের সার্কুলার লজিক ফ্যালাসি
স্থান: ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনের কেবিনচরিত্র: মাওলানা আব্দুর রহমান (তাবলিগ জামাতের একজন দায়িত্বশীল) ও অধ্যাপকRead More


Comments are Closed