
Human Values and Education
শিক্ষা যদি মানুষ হিসাবে আপনার মানই বাড়াতে না পারে, তবে সেটা কোন শিক্ষাই না
বাংলাদেশের শিক্ষা খাত আজ এক সংকটের মুখোমুখি। শুধু পাশের হার বা ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা দিয়ে এটা বোঝা যাবে না। একদিকে দেশের ৩ কোটি ৬০ লক্ষেরও বেশি শিশু-কিশোর প্রাইমারি থেকে এইচএসসি পর্যায়ে পড়াশোনা করে, অন্যদিকে পুরো শিক্ষা খাতের (প্রাইমারি, সেকেন্ডারি, টেকনিক্যাল, মাদ্রাসা ও উচ্চশিক্ষা মিলিয়ে) বাজেট মাত্র ৯৫,৬৪৫ কোটি টাকার কাছাকাছি (২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট অনুসারে)। এর মধ্যে প্রাইমারি থেকে এইচএসসি পর্যায়ের জন্য বরাদ্দ হয় প্রায় ৭০-৭৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ আমেরিকার একটি মাত্র শহর নিউ ইয়র্কের স্কুল ডিস্ট্রিক্ট (New York City Department of Education) ৮ লক্ষ ৬০ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর জন্য ব্যয় করে প্রায় ৩৩-৩৮ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩.৭ থেকে ৪.২ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি। লস এঞ্জেলেস ইউনিফাইড স্কুল ডিস্ট্রিক্ট (LAUSD) একাই ৪ লক্ষ ৪০ হাজার ছাত্রের জন্য খরচ করে ১৮.৮ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা। লস এঞ্জেলেসে আরো স্কুল ডিস্ট্রিক্ট আছে এমন, তাদেরগুলো হিসাব করলে এই পরিমান আরো অনেক বাড়বে। এই তুলনা শুধু অর্থের নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের একটা নিদর্শন।
বাংলাদেশের যেহেতু তেমন কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নেই বললেই চলে, সেহেতু বাংলাদেশের একমাত্র সম্পদ এর অগনিত মানুষের মাধ্যমেই বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব। বাংলাদেশে মানুষের সার্বিক মান বাড়াতে হলে শিক্ষার মান বাড়ানো অপরিহার্য, আর তার জন্য সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে শিশু শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। লক্ষ্য হতে হবে একটি সহানুভূতিশীল, যুক্তিনির্ভর ও বিজ্ঞানমুখী জাতি গড়ে তোলা। একদিন তারাই দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
প্রথমেই বুঝতে হবে আমেরিকার শিক্ষা ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে চলে না। সেখানে শিক্ষা পরিচালিত হয় স্থানীয় স্কুল ডিস্ট্রিক্টের মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকার মিরপুরকে যদি একটি স্কুল ডিস্ট্রিক্ট হিসেবে কল্পনা করি, তাহলে মিরপুরের সব স্কুলের পাঠ্যক্রম, প্রশাসন, নিয়োগ, বাজেট ও মান নির্ধারণ একই ডিস্ট্রিক্ট অফিসের অধীনে। নিউ ইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশন (NYC DOE) এবং লস এঞ্জেলেস ইউনিফাইড স্কুল ডিস্ট্রিক্ট (LAUSD) এই ব্যবস্থার শীর্ষ উদাহরণ। NYC DOE-এর ছাত্রসংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ ৬০ হাজার, LAUSD-এর প্রায় ৪ লক্ষ ৪০ হাজার। এই ডিস্ট্রিক্টগুলো স্থানীয় কর, রাজ্য সাহায্য ও ফেডারেল অনুদানের মাধ্যমে নিজস্ব বাজেট নির্ধারণ করে। ফলে শিক্ষার মান স্থানীয় চাহিদা অনুসারে উন্নয়ন করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয়, যা প্রায়ই স্থানীয় বাস্তবতা উপেক্ষা করে। ফলে গ্রামীণ স্কুল আর শহুরে স্কুলের মধ্যে ব্যবধান বাড়ে।
বাজেটের তুলনা চোখ খুলে দেয়। আমেরিকার একটি সিটির শিক্ষা ব্যয় বাংলাদেশের পুরো শিক্ষা খাতের বাজেটের কয়েকগুণ। NYC DOE-এর ২০২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রায় ৩৩.৫ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩.৭ লক্ষ কোটি টাকা), যা বাংলাদেশের প্রাইমারি-এইচএসসি পর্যায়ের বাজেটের সাড়ে ৫ গুণেরও বেশি। LAUSD-এর বাজেট ১৮.৮ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা)। বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর জন্য যে বরাদ্দ, নিউ ইয়র্কের ৮ লক্ষ ৬০ হাজার ছাত্রের জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয় প্রতি ছাত্রে। প্রতি ছাত্রে ব্যয়ের হিসাব করলে বাংলাদেশে প্রাইমারি-সেকেন্ডারি পর্যায়ে প্রায় ২০ হাজার টাকার কম পড়ে, অথচ আমেরিকায় তা লক্ষাধিক টাকা। এই অর্থ শুধু বেতন নয়—আধুনিক ল্যাব, লাইব্রেরি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং, স্পোর্টস ও ডিজিটাল সুবিধায় ব্যয় হয়। ফলে আমেরিকার শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমস্যা সমাধানে দক্ষ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে বাজেটের অভাবে শ্রেণিকক্ষে ৬০-৭০ জন ছাত্র, শিক্ষকের অভাব, জীর্ণ অবকাঠামো—এসব নিয়ে মানসম্মত শিক্ষা অসম্ভব।
শিক্ষায় বিনিয়োগ জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি। অর্থনীতিবিদরা বলেন, প্রতি এক টাকা শিক্ষায় বিনিয়োগ করে দেশ ৭-১০ টাকা লাভ করে দীর্ঘমেয়াদে। বাংলাদেশের মতো তরুণ জনসংখ্যার দেশে শিশু-কিশোরদের শিক্ষা না বাড়ালে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে না। বর্তমানে বাংলাদেশের যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব, NEET (Not in Education, Employment or Training) হার উচ্চ। শিক্ষার মান না বাড়লে এই প্রজন্ম বিজ্ঞানমুখী হবে না, বরং কুসংস্কার ও অযৌক্তিকতায় আটকে থাকবে। আমেরিকার স্কুল ডিস্ট্রিক্ট মডেল দেখায় যে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন শিক্ষাকে আরও দায়িত্বশীল করে। বাংলাদেশেও প্রতি জেলা বা উপজেলায় স্কুল ডিস্ট্রিক্ট গঠন করে বাজেট, পাঠ্যক্রম ও নিয়োগ স্থানীয়ভাবে করা যায়। এতে দুর্নীতি কমবে, স্থানীয় চাহিদা পূরণ হবে। স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলোর মধ্যে প্রতিযোগীতা বাড়বে। মন্ত্রনালয়ের আমলারা কি এই স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন দিতে দিবে?
শুধু বাজেট বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষকদের মান। বাংলাদেশে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশিক্ষণের অভাব এবং নিম্ন বেতনের কারণে যোগ্য শিক্ষক আসেন না। আমেরিকায় শিক্ষকদের বেতন উচ্চ, প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক এবং পেশাগত মর্যাদা অনেক বেশি। বাংলাদেশকে শিক্ষকদের বেতন বাড়াতে হবে, নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পারফরম্যান্স বোনাস দিতে হবে। শ্রেণিকক্ষের অনুপাত কমাতে হবে—প্রতি শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ৩০ জন ছাত্র। আধুনিক পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে যাতে বিজ্ঞান, গণিত, সমস্যা সমাধান ও সমালোচনামূলক চিন্তা প্রাধান্য পায়।
এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি – শিক্ষা থেকে ধর্মীয় শিক্ষা বিদায় করা। বাংলাদেশের পাবলিক স্কুলে ইসলাম শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান রাষ্ট্রীয় অর্থে চলে। এটি ভুল। ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়। পরিবার, মসজিদ বা মন্দিরে ধর্ম শেখানো যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের টাকায় স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা চাপিয়ে দিলে শিক্ষা হয়ে যায় অন্ধ বিশ্বাসের আখড়া। ফলে শিক্ষার্থীরা যুক্তি, বিজ্ঞান ও সমালোচনামূলক চিন্তা শেখে না। দেখা যায়, তথাকথিত শিক্ষিত মানুষও সামান্য আলোচনায় কুসংস্কারে ভোগে। ধর্মীয় শিক্ষা স্কুল থেকে সরিয়ে পাঠ্যক্রমকে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা সহানুভূতিশীল, সহিষ্ণু ও যুক্তিনির্ভর হবে। আমেরিকার স্কুলগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষা নেই, ফলে তারা বৈচিত্র্যময় সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে বাস করে। বাংলাদেশেও একই পথে যেতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকীকরণ করে সেগুলোকে সাধারণ শিক্ষায় উন্নীয় করা যায়, কিন্তু পাবলিক স্কুল থেকে ধর্মীয় পাঠ্য বাদ দিতে হবে।
সংস্কারের আরও কয়েকটি দিক উল্লেখযোগ্য।
- প্রথমত, ডিজিটাল শিক্ষা – প্রতি স্কুলে ইন্টারনেট, কম্পিউটার ল্যাব ও অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম চালু করতে হবে।
- দ্বিতীয়ত, মেয়েদের শিক্ষায় বিশেষ জোর – যদিও প্রাইমারিতে মেয়েরা এগিয়ে, সেকেন্ডারিতে ড্রপআউট বেশি।
- তৃতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন – রুটিন পরীক্ষার পরিবর্তে প্রজেক্ট, ক্রিয়েটিভিটি ও স্কিল-ভিত্তিক মূল্যায়ন।
- চতুর্থত, অবকাঠামো উন্নয়ন – প্রতি স্কুলে ল্যাব, লাইব্রেরি, খেলার মাঠ ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হবে।
- পঞ্চমত, অভিভাবক ও সমাজের অংশগ্রহণ বাড়াতে PTA (Parent-Teacher Association) শক্তিশালী করা।
এই সংস্কারের ফলাফল কী হবে? একটি জাতি যেখানে যুক্তি চলে, বিজ্ঞানমুখী চিন্তা প্রচলিত এবং সহানুভূতি স্বাভাবিক – সেখানে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা এমনিতেই এসে ধরা দেয়, ধর্মীয় কুসংস্কার কমে, নারী-পুরুষ সমতা বাড়বে, উদ্ভাবন বৃদ্ধি পাবে। অর্থনীতি শক্তিশালী হবে কারণ দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে। বাংলাদেশের মতো দেশে শিক্ষা না বাড়ালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও উন্নয়ন টেকসই হবে না। বাজেট বাড়ানোর জন্য সরকারকে জিডিপির অন্তত ৪% শিক্ষায় বরাদ্দ করতে হবে। বর্তমান ১.৫% এর মতো হার অপর্যাপ্ত। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা, কর আদায় বৃদ্ধি ও অপ্রয়োজনীয় খাত থেকে অর্থ সরিয়ে শিক্ষায় লাগাতে হবে।
অবশ্যই চ্যালেঞ্জ আছে। রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন ক্ষমতা দরকার। কিন্তু ইতিহাস বলে, যে দেশ শিক্ষায় বিনিয়োগ করে, সে দেশ এগিয়ে যায়—দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের উদাহরণ তাই বলে। বাংলাদেশও পারবে যদি আজ থেকে শুরু করে। তথাকথিত শিক্ষিতদের কুয়ুক্তি ও সরল চিন্তা দেখে বোঝা যায়, শিক্ষার গভীর সংস্কার ছাড়া জাতি এগোবে না। ধর্মীয় শিক্ষা রাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দিয়ে আমরা প্রকৃত মুক্তচিন্তার পথ খুলে দিতে পারি।
উপসংহারে বলা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আমেরিকার স্কুল ডিস্ট্রিক্ট মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ, বাজেট বৃদ্ধি, শিক্ষক উন্নয়ন এবং ধর্মনিরপেক্ষতা নিশ্চিত করুক। এটি শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নের প্রশ্ন। যদি আজ বিনিয়োগ না করি, তাহলে কালকের বাংলাদেশ অন্ধকারে থাকবে। সরকার, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও সমাজ—সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। তবেই একদিন আমরা গর্ব করে বলতে পারব—আমাদের জাতি যুক্তিনির্ভর, বিজ্ঞানমুখী ও সহানুভূতিশীল। শিক্ষাই একমাত্র পথ। শিক্ষা যদি মানুষ হিসাবে আপনার মানই বাড়াতে না পারে, তবে সেটা কোন শিক্ষাই না।
Related Posts

Is Bangladesh, with 90% Muslims, better than the so‑called free‑sex countries?
Bangu male believers think — and even some women — that the Western world meansRead More

তথাকথিত ফ্রি সেক্সের দেশের চেয়ে ৯০% মুসলমানের বাংলাদেশ কি ভাল?
বাঙ্গু পুরুষ মুমিনদের ধারনা, এমনকি কিছু নারীরও যে – পশ্চিমা দুনিয়া মানে ফ্রি সেক্স, সেখানেRead More

People’s Arabic names are not the property of Allah or Muhammad. Stop demanding that others change their names
One fine morning you log into Facebook and see that everyone—from Mokhles, the tea sellerRead More

Comments are Closed