
Islam will not Survive Without Reform
ইসলাম ও কোরআনকে রিফর্মের মধ্য দিয়ে যেতে হবে অথবা ইসলাম ছিটকে পড়বে
ঐতিহাসিকভাবে ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ক্লাসিক্যাল ফিকহ একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছিল, যা আধুনিক যুগের বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সাথে তীব্র দ্বন্দ্বে লিপ্ত। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর অনেক সাহসী মুসলিম বুদ্ধিজীবী কোরআনের বাণীকে ঐতিহাসিক ও ভাষাগত প্রেক্ষাপট থেকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। যেমন, মিশরের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী নসর হামিদ আবু জায়েদ (Nasr Hamid Abu Zayd) যুক্তি দিয়েছিলেন যে, কোরআন একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও ভাষাগত প্রেক্ষাপটে নাজিল হয়েছে, তাই এর আইনি বিধানগুলোর আধুনিক পুনর্ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ফলস্বরূপ, তাকে ‘মুরতাদ’ (ধর্মত্যাগী) ঘোষণা করা হয় এবং আদালত বাধ্যতামূলকভাবে তার স্ত্রীর সাথে তার বিবাহবিচ্ছেদ করিয়ে দেয়, যার ফলে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
একইভাবে, সুদানের বিপ্লবী চিন্তাবিদ মাহমুদ মুহাম্মদ তাহা মক্কী সূরার চিরন্তন মানবিক ও আধ্যাত্মিক বাণী এবং মাদানি সূরার সাময়িক আইনি বিধানের মধ্যে পার্থক্য করার সাহসী তত্ত্ব দিয়েছিলেন। এর খেসারত হিসেবে ১৯৮৫ সালে সুদানের তৎকালীন কট্টরপন্থী শাসক তাকে রাষ্ট্রদ্রোহ ও ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। এই নৃশংস ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ইসলামি বিশ্বে মুক্তচিন্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রচেষ্টা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ (UDHR), যা লিঙ্গ, ধর্ম বা জাতি নির্বিশেষে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করে। এর বিপরীতে, ক্লাসিক্যাল ফিকহ বা ঐতিহ্যবাহী ইসলামি আইনে অমুসলিম (জিম্মি) এবং নারীদের অধিকারকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়নি; বরং সেখানে যুদ্ধবন্দী, দাসপ্রথা, শারীরিক শাস্তি এবং কঠোর ব্লাসফেমি আইনের মতো কিছু বিধান রয়েছে, যা আধুনিক সভ্য ও শান্তিকামী মানুষের বিবেক কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। এই মধ্যযুগীয় আইনি কাঠামো এবং আধুনিক মানবাধিকারের মধ্যকার বিশাল ব্যবধান দূর করার জন্য যে আমূল ধর্মীয় সংস্কার প্রয়োজন, তা করার মতো কোনো শক্তিশালী নেতৃত্ব বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আজ মুসলিম বিশ্বে অবশিষ্ট নেই। চরমপন্থী গোষ্ঠী বা রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থার হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার সার্বক্ষণিক ভয় এই সংস্কারের পথকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। তুরস্কের মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে উগ্রপন্থাকে দমন করার মতো সাহসী ও আধুনিকমনা নেতৃত্ব বর্তমান মুসলিম বিশ্বে প্রায় অনুপস্থিত বললেই চলে।
কোরআনের আধ্যাত্মিক শিক্ষাকে চিরন্তন সত্য মনে করা এবং হাজার বছর আগের সমাজবাস্তবতায় তৈরি আইনি বিধানগুলোকে আধুনিক যুগে স্থবির ও অপরিবর্তনীয় করে রাখা – কখনোই এক বিষয় হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত, মুসলিম দেশগুলোর স্বৈরাচারী রাজনৈতিক স্বার্থ, আলেম সমাজের ধর্মীয় একচেটিয়া ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লোভ এবং সাধারণ জনগণের আবেগীয় রক্ষণশীলতাকে পুঁজি করে এই স্থবিরতাকেই জিইয়ে রাখা হয়েছে। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতা বৈধ করতে কট্টরপন্থীদের ছাড় দেয়, আর আলেম সমাজ যেকোনো প্রগতিশীল চিন্তাকে ‘ধর্মের ওপর আঘাত’ হিসেবে প্রচার করে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে তোলে। ফলে, ইসলামি বিশ্বে আইনি, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংস্কারের পথটি কেবল ঝুঁকিপূর্ণই নয়, বর্তমান বাস্তবতায় তা প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার কারণে সাধারণ মুসলিম সমাজও আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিন্তাধারার মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়ছে।
ইসলামের এই অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রভাব কেবল মুসলিম বিশ্বের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অভিবাসন সংকট, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সামাজিক মেরুকরণ তৈরি করছে। একটি শান্তিকামী, প্রগতিশীল এবং নিরাপদ পৃথিবী বিনির্মাণের স্বার্থে ইসলামকে অবশ্যই একটি গভীর এবং আমূল সংস্কারের (Reformation) মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যা তার অনুসারীদের সহনশীলতা ও বহুত্ববাদ শিক্ষা দেবে। কিন্তু যদি ধর্মীয় কট্টরপন্থা, অপরিবর্তনশীলতার গোঁড়ামি এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি সহিংসতা অব্যাহত থাকে, তবে সভ্য দুনিয়ার পক্ষে ইসলামের এই উগ্র রূপের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করা কঠিন হয়ে পড়বে। পরিশেষে, বিশ্বশান্তি ও মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে হয় ইসলামকে যুগের উপযোগী করে নিজেকে সংস্কার করতে হবে, অন্যথায় আধুনিক মুক্তবিশ্ব ও প্রগতিশীল মানবসমাজ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই ইসলামের কট্টরপন্থী ধারার সাথে এক প্রকার অনিবার্য সম্পর্কচ্ছেদ বা কঠোর দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য হবে।
Related Posts

Islam and the Qur’an must go through reform, otherwise Islam will be pushed aside
Historically, Islamic jurisprudence or classical fiqh developed within a specific social and political context, whichRead More

Reading the Qur’an, its translations, tafsir, sirah and hadith – no person with common sense can remain in Islam
Will you continue to remain a blind believer? Blind faith prevents a person from seeingRead More

কুরআন, তার অনুবাদ, তাফসির, সিরাত ও হাদিসসমূহ পাঠ করে কোন কমনসেন্সওয়ালা মানুষ ইসলামে থাকতে পারে না
অন্ধ বিশ্বাসী হয়েই থাকবেন?অন্ধ বিশ্বাস মানুষকে সত্য দর্শনে বাধা দেয়। পক্ষপাতহীন এবং বস্তুনিষ্ঠ মন নিয়েRead More

Comments are Closed