
Countless Errors in Islam
ইসলামী সোর্সের তথ্য অনুযায়ী অনেক ইসলাম প্রচারক এখনো প্রচার চালান – পৃথিবী নয়, সূর্য ঘোরে!
পড়তে শেখার পরে দেখতাম আব্বার পারিবারিক লাইব্রেরীতে একটি বই আছে – “পৃথিবী নয়, সূর্য ঘোরে” জনৈক নূরুল ইসলাম বিএসসি বইটির লেখক ছিলেন। উনি ইসলামের দাবীর যৌক্তিকতা দেখাতে প্রমান করতে চেয়েছিলেন পৃথিবী নয়, আসলে সূর্যই পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে। চট্টগ্রামে বাড়ি, নিজের জ্ঞানের কিছু বর্ণনাও ছিল বইতে। আপনি যদি ইসলামিক সাইন্স নামের এক আজগুবি জিনিসে আস্থা রাখেন তবে আপনাকেও এটা মেনে নিতে হবে, উপায় নেই।
“পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে” – এই তথ্যটি আজ বিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক, সুপ্রতিষ্ঠিত এবং পরীক্ষিত সত্যগুলোর একটি। স্কুলের প্রথম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে এটি আছে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, জিপিএস, মহাকাশ অভিযান – সবকিছু এই সত্যের উপর দাঁড়িয়ে। ওদিকে কোরানের প্রায় সব ব্যাখ্যাকারী একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বলতেন সূর্যই পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে, এমনকি এই সময়ে এসেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ইসলামিক স্কলার এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে সরাসরি অস্বীকার করেন, কেউ কেউ প্রকাশ্যেই। যেমন, দেখুন এই ভিডিওতে https://youtu.be/qIkuo7ZcP1s বিখ্যাত স্কলার জনাব মতিউর রহমান মাদানী একই দাবী করছেন – সূর্যই পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে। ভিডিওটি দেখে নিবেন, না হলে আবার দাবী করতে পারেন আমরা মিথ্যা বলছি। উনি তো তাই বলছেন, যা কোরআন-হাদিস উনাকে শিখিয়েছে।
কোরআনে তৎকালীন সপ্তম শতাব্দীর আরবদের জানা বিষয়ের বাইরে অনন্য কোনো জ্ঞান নেই – বরং এটি প্রাচীন কিছু গ্রীক দর্শন, প্রচলিত মিথ, জরথুষ্ট্রবাদ, ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের একটি সংকলন মাত্র। বিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারের (যেমন সূর্যকেন্দ্রিক নীতি বা বিবর্তনবাদ) সাথে মেলাতে অপোলজিস্টরা প্রতিনিয়ত কোরআনের ব্যাখ্যার সুর পরিবর্তন করে থাকেন। তারা উল্লেখ করেন যে, মূল ধারার ঐতিহ্যবাহী স্কলাররা এখনো টেক্সটের আক্ষরিক অর্থের ওপর ভিত্তি করে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে এমন ভূ-কেন্দ্রিক মতবাদই প্রচার করেন। ইসলামের এই সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে ও মহাবিশ্বের আগে পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার মতো আধুনিক বিজ্ঞানবিরোধী মহাজাগতিক দাবির উপস্থিতি আল্লামুহাম্মদ ও কোরআনের ঐশ্বরিক নিখুঁত হওয়ার দাবিকে খণ্ডন করে; কারণ যেকোনো ঐশ্বরিক দাবিযুক্ত গ্রন্থে একটিমাত্র বস্তুনিষ্ঠ ভুল বা অসংগতি থাকলেই তার সম্পূর্ণ ঐশ্বরিক সত্তার দাবিটি যৌক্তিকভাবেই মিথ্যা হয়ে যায়, সেখানে অন্য কোনো কথা সঠিক থাকলেও তা আর ধোপে টেকে না।
বৈজ্ঞানিক সত্যটি
কোপার্নিকাস ষোড়শ শতাব্দীতে সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ প্রস্তাব করেন। গ্যালিলিও দূরবিন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে তা প্রমাণ করেন। কেপলার গ্রহের কক্ষপথের সূত্র দেন। নিউটন মহাকর্ষ তত্ত্ব দিয়ে পুরো চিত্রটি ব্যাখ্যা করেন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব আরও সূক্ষ্মভাবে এটি পরিমার্জন করে।
আজ আমরা জানিঃ
পৃথিবী সূর্যের চারদিকে প্রায় ৩৬৫.২৫ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে। এই প্রদক্ষিণের কারণে ঋতু পরিবর্তন হয়। পৃথিবী একই সাথে নিজের অক্ষে প্রায় ২৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিটে একবার ঘোরে – এই আবর্তনের কারণে দিন ও রাত হয়।
সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে না। পৃথিবীর সাপেক্ষে সূর্য প্রায় স্থির। সূর্য আসলে নিজে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রের চারদিকে ঘোরে, কিন্তু সেটি প্রায় ২৫০ মিলিয়ন বছরে একবার, এবং তার সাথে পৃথিবীর দিন-রাতের কোনো সম্পর্ক নেই।
এই তথ্যগুলো এখন আর “তত্ত্ব” নয় – এগুলো পরিমাপ করা, যাচাই করা, এবং প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা সত্য।
কোরআনে কী আছে আসলে?
বিতর্কটির কেন্দ্রে যে আয়াতগুলো বারবার আসে, সেগুলো নিরপেক্ষভাবে দেখা দরকার।
সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৩৩: “তিনিই দিবা-নিশি এবং চন্দ্র-সূর্য সৃষ্টি করেছেন। সবাই আপন আপন কক্ষপথে বিচরণ করে।”
কোরআনে সবাই বলতে সূর্য ও চাদকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু আসলে সূর্য ও চাঁদের কক্ষপথে বিচরনের কারনে রাত দিন হয় না। আমরা যদি তর্কের খাতিরে মেনে নেই সবাই বলতে পৃথিবীকেও বুঝানো হয়েছে৷ কিন্তু পৃথিবী তার কক্ষপথে বিচরন করলেও রাত দিন সম্ভব নয়। রাত দিন হয় পৃথিবী যখন বলের মতো নিজ অক্ষে ঘুরে। পৃথিবী তার কক্ষপথে ঘুরার কারনে ঋতু পরিবর্তন হয়। আয়াতটি এরকম হলে বিজ্ঞান সম্মত হতোঃ
“তিনিই চন্দ্র সূর্য তৈরি করেছেন। তারা নিজ কক্ষপথে ঘুরে। শুধু তাই নয় পৃথিবীও নিজ কক্ষপথে ঘুরে। কিন্তু তাতেও তোমাদের দিন রাত্রি হতো না যদি না আল্লাহ পৃথিবীকে নিজ অক্ষে না ঘুরাতেন৷ নিশ্চয় আল্লাহ মহান বিজ্ঞানময়।”
সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৩৮-৪০: “সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলে – এটি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নির্ধারণ। চাঁদের জন্য আমি বিভিন্ন মনজিল নির্ধারণ করেছি… সূর্যের পক্ষে চাঁদকে ধরা সম্ভব নয়, রাতও দিনকে অতিক্রম করতে পারে না; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটে।”
সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ৩৩: “তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন, তারা অনুগত হয়ে নিজ পথে চলছে। আর তিনি রাত ও দিনকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন।”
সূর্য আমাদের জন্য রাতদিন করার জন্যে অনুগত হয়ে ঘুরে না। সূর্য না ঘুরলেও রাত দিন হতো। বরং পৃথিবী অনুগত হয়ে ঘুরছে যাতে আমাদের রাতদিন হচ্ছে। মহাবিশ্বের কাছে মানুষ কিছুই না, সব মানুষ ধ্বংস হয়ে গেলেও পৃথবী, সূর্য, মহাবিশ্বের কিছুই আসবে যাবে না, কোন ক্ষতি হবে না। দিন রাত্রি হতে হলে – হয় সূর্যকে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে হবে। নয়তো পৃথিবীকে নিজের অক্ষে ঘুরে যেতে হবে। তাহলে দিন রাত্রি সম্ভব। কোরআনে যখনই দিন রাত্রির কথা এসেছে তখনই বলা হয়েছে যে, সূর্য ও চন্দ্র সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে চলে। কিন্তু কোথাও বলা হয়নি যে পৃথিবী ঘুরে।
সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৩৩: “সূর্য নাগাল পেতে পারে না চন্দ্রের এবং রাত্রি আগে চলে না দিনের। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে প্রদক্ষিন করে।”
কোরআনে বুঝাতে চাচ্ছে সূর্যের কারনে দিন ও চাঁদের কারনে রাত – এই আয়াত থেকে এই বোঝা যায়, তাইনা? সূর্য যদি চাঁদের নাগাল পেতো তবে দিনও রাতের নাগাল পেয়ে যেতো। দিন রাত একত্রে হয়ে যেতো।
সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৮: “আল্লাহ তা‘আলা সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন। তুমি পারলে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর।”
এই আয়াতে সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠার মাধ্যমে প্রকাশ্য দলীল পাওয়া যায় যে, সূর্য পৃথিবীর উপর পরিভ্রমণ করে।
সূরা আল-কাহফ, আয়াত ৮৬: “অবশেষে যখন সে সূর্যাস্তের স্থানে পৌঁছল, তখন সে সূর্যকে একটি কর্দমাক্ত জলাশয়ে ডুবতে দেখতে পেল …”
শুধু কোরআন নয়, সহিহ হাদিসেও একই রকম বর্ননা আছে –
সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), হাদিস নাম্বার ২৯৬: “…সূর্য চলতে থাকে এবং (আল্লাহ তা’আলার) আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত হয়ে পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, ওঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও! অনন্তর সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল দিয়েই উদিত হয়। তা আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, ওঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়লে হয়েই উদিত হয় …”
আরো অনেক আছে কোরআনের আয়াত ও হাদিস। এই আয়াতগুলো ও হাদিস পড়ে কয়েকটি জিনিস স্পষ্ট হয়ঃ
- প্রথমত, কোরআন কোথাও সরাসরি বলেনি “সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে।” এই কথাটি আক্ষরিক অর্থে কোরানে নেই।
- দ্বিতীয়ত, কোরআন সূর্য ও চাঁদ উভয়কেই কক্ষপথে বিচরণকারী বলেছে। পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘোরার কোনো উল্লেখ নেই।
- তৃতীয়ত, দিন-রাতের প্রসঙ্গে সূর্য ও চন্দ্রের গতির কথা বলা হয়েছে – পৃথিবীর আবর্তনের কথা বলা হয়নি।
- চতুর্থত, সূর্য ও চাঁদকে আল্লাহ মানুষের প্রয়োজনে তথা পৃথিবীর প্রয়োজনে উদিত করান ও অস্তে পাঠান, এটা মানূষের জন্য তার রহমত।
এখন প্রশ্ন হলো এই আয়াতগুলো কি সপ্তম শতাব্দীর আরবের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা (অর্থাৎ যা মানুষ দেখে তার বর্ণনা), নাকি এগুলো বৈজ্ঞানিক দাবি?
কোরআনের ২১:৩৩ ও ৩৬:৪০ এ যে ফালাক (Falak/فلك) শব্দটি আছে সেটি প্রাচীন গ্রীক ধারনা থেকে ধার করা। আরবের ব্যবসায়ীরা সিরিয়া বা ইয়েমেনের মতো অঞ্চলে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যেতেন। সিরিয়া অঞ্চলটি একসময় বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের অংশ ছিল, যেখানে গ্রীক সংস্কৃতির কিছু প্রভাব ছিল। সেখান থেকে অনেক গ্রীক ধারনা আরবে চলে এসেছিল। প্রাচীন গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল প্রধানত ভূ-কেন্দ্রিক (Geocentric)। অর্থাৎ, তারা বিশ্বাস করত পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্রে স্থির এবং সূর্য, চন্দ্রসহ অন্যান্য সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র একে কেন্দ্র করে ঘুরছে। গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লডিয়াস টলেমি (Ptolemy) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Almagest’ (আরবি অনুবাদে এই নাম দেওয়া হয়)-এ এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রীক ভাষায় পৃথিবীকে কেন্দ্রে রেখে স্বর্গীয় বৃত্তাকার পথ বা গোলককে বোঝাতে যে ধারণা ব্যবহার করা হতো তা পরবর্তীকালে আরবিতে ‘ফালাক’ (فلك) শব্দ দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এর বহুবচন হলো ‘আফলাক’ (أفلاك)।
কোরআন ব্যাখ্যার বিবর্তন এবং “সূর্য ঘোরে” মতবাদ
কোপার্নিকাসের আগে পর্যন্ত প্রায় সব ইসলামি তাফসিরকারক (কোরান ব্যাখ্যাকারক) ধরে নিতেন যে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। এটি ছিল তখনকার প্রচলিত বৈজ্ঞানিক বিশ্বাস – কেবল ইসলামের নয়, সমগ্র মানবজাতির।
সমস্যা শুরু হলো যখন বিজ্ঞান প্রমাণ করল যে পৃথিবীই ঘোরে। তখন দুটি পথ খোলা ছিলঃ
প্রথম পথঃ স্বীকার করা যে কোরানের আয়াতগুলো সপ্তম শতাব্দীর মানুষের অভিজ্ঞতার ভাষায় লেখা, বৈজ্ঞানিক দাবি হিসেবে নয়।
দ্বিতীয় পথঃ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে প্রত্যাখ্যান করা এবং কোরানের আক্ষরিক ব্যাখ্যাকে আঁকড়ে ধরা।
একটি অংশ প্রথম পথ বেছে নিয়েছে। আরেকটি অংশ দ্বিতীয় পথে থেকেছে।
আজও সৌদি আরব, পাকিস্তান, এবং অন্যান্য দেশের অনেক রক্ষণশীল স্কলার হাদিস এবং কোরানের নির্দিষ্ট আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন যে সূর্যই পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আব্দুল আজিজ বিন বাজ ১৯৬৬ সালে একটি বিখ্যাত ফতোয়া জারি করেন যেখানে পৃথিবীর গতিকে অস্বীকার করা হয়। পরে ১৯৮৫ সালে সৌদি মহাকাশচারী সুলতান বিন সালমান মহাকাশে গেলে তিনি এই অবস্থান নরম করেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করেননি।
এই ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য – যখন একজন মুসলিম নিজেই মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে ঘুরতে দেখলেন, তখন একটি ধর্মীয় মতবাদ নিজেই পিছু হটল।
“ইসলামিক সায়েন্স” এর ফাঁদ
বিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে একটি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যাকে অনেকে “ইজাজ আল-ইলমি” বা “বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতা” বলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কোরআনে আধুনিক বিজ্ঞানের সব আবিষ্কার আগেই বলা আছে – শুধু সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলেই বোঝা যাবে।
এই পদ্ধতির সমস্যা হলো এটি মূলত পেছন থেকে সামনে কাজ করে। বিজ্ঞান প্রথমে কিছু আবিষ্কার করে, তারপর কোরআনের আয়াত খুঁজে সেটার সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়। যদি বিজ্ঞান ভবিষ্যতে সেই তত্ত্ব পরিবর্তন করে, তাহলে ব্যাখ্যাও বদলে যায়।
একটি উদাহরণঃ একসময় দাবি করা হতো কোরানে “বিগ ব্যাং” বলা আছে। এখন দাবি করা হচ্ছে কোরানে বিবর্তনবাদ বলা আছে। পঞ্চাশ বছর আগে যে স্কলাররা সূর্যের ঘূর্ণনের পক্ষে কোরানের দলিল দিতেন, তারাই আবার কোরানকে বৈজ্ঞানিক বলার দাবিদার ছিলেন।
কোরআনের দাবি এবং যুক্তির মানদণ্ড
যদি কোনো গ্রন্থ নিজেকে ঐশ্বরিক বলে দাবি করে, তাহলে সেই গ্রন্থের মধ্যে স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে সেই দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে – এটি একটি যৌক্তিক অবস্থান।
কোরআনে পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘোরার কোনো উল্লেখ নেই। দিন-রাতের ব্যাখ্যায় সূর্যের গতির কথা বলা হয়েছে। সৃষ্টির ক্রমে পৃথিবীকে আকাশের আগে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে বলা হয়েছে, যা আধুনিক কসমোলজির বিপরীত।
সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা প্রচারক নিজেরাই কোরআনকে বৈজ্ঞানিক দাবি করতে শুরু করে। যদি বলা হয় “কোরান বিজ্ঞানসম্মত,” তাহলে বিজ্ঞানের মানদণ্ডে পরীক্ষা করার দরজা খুলে দেওয়া হয়।
যারা ভিন্ন পথে হেঁটেছেন
ইসলামের মধ্যে যারা বিজ্ঞানকে স্বীকার করে ধর্মচর্চা করেন, তারাও সংখ্যায় কম নন। ইসলামিস্টরা যাদের মুসলিম বিজ্ঞানী বলে দাবী করেন, তেমন অনেক মুসলিম বিজ্ঞানী, দার্শনিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক বলেছেনঃ
কোরানের ভাষা ছিল সপ্তম শতাব্দীর আরবের মানুষের বোধগম্য ভাষা। সেই সময়ের মানুষের কাছে সূর্যকেই দৃশ্যত ঘুরতে দেখা যেত। এটি সেই দৃষ্টিভঙ্গির বর্ণনা, বৈজ্ঞানিক দাবি নয়।
এই যুক্তি সৎ এবং যৌক্তিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ – যদি সত্যিই বিশ্বাস করা হয় যে কোরআন বিজ্ঞানের বই নয়, কেবল ধর্মীয় নির্দেশিকা, সে ভুল সঠিক যাই হোক। তবে এই অবস্থান তখন দুর্বল হয়ে পড়ে যখন একই সাথে দাবি করা হয় যে কোরআনে আধুনিক বিজ্ঞানের সব কথা আগেই বলা আছে।
বিজ্ঞান অস্বীকারের সামাজিক মূল্য
ইসলামিস্টদের এই কুতর্ক কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, এর সামাজিক পরিণতি আছে। যে সমাজে শিক্ষিত ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে বলেন পৃথিবী ঘোরে না, সেই সমাজের শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্তিতে পড়ে। তাদের মধ্যে একটি মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয় – পাঠ্যবইয়ে যা পড়ছি এবং হুজুরের মুখে, ওয়াজ মাহফিলে, মসজিদে যা শুনছি, দুটো কি একসাথে সত্য হতে পারে?
এই দ্বন্দ্বের একটি সমাধান হলো বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করা এবং নিজের বিশ্বাসকে নতুনভাবে বোঝার চেষ্টা করা। আরেকটি সমাধান হলো বিজ্ঞানকে অবিশ্বাস করা এবং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের উপর নির্ভর করা।
দ্বিতীয় পথটি বিপজ্জনক কারণ এটি বিজ্ঞান শিক্ষা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং শেষমেশ একটি সমাজের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে বাধা দেয়। এই কাজটিই হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশে। এখানে লক্ষ লক্ষ মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রী, এমনকি জেনারেল শিক্ষার লক্ষ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী এই চিন্তা নিয়ে বড় হচ্ছে। বিজ্ঞানের প্রমানিত থিওরি, ফ্যাক্টকে তারা আমলে না নিয়ে ইসলামিস্ট হুজুরদের কথাকে তারা বেশি প্রাধান্য দেয়। তাদের কাছে – কোরআনে যা আছে সেটাই চুড়ান্ত, বিজ্ঞান ভুল হতে পারে, কোরআন নয়।
অন্য ধর্মের সাথে তুলনা
এই সমস্যা ইসলামের একার সমস্যা নয়। খ্রিস্টান চার্চ গ্যালিলিওকে বিচারে দাঁড় করিয়েছিল একই কারণে। ক্যাথলিক চার্চ ১৯৯২ সালে – গ্যালিলিওর মৃত্যুর ৩৬০ বছর পরে – আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে যে গ্যালিলিও সঠিক ছিলেন। তবে এখন আর সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরার দাবী কেউ করে না তাদের মধ্যে।
কিছু হিন্দু সংগঠনও বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করেছে। এমনকি ভারতের অনেক মন্ত্রী পর্যন্ত এর বিপক্ষে বক্তব্য দেন।
কিছু অতি-রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়ও এই প্রশ্নে বিবাদে জড়িয়েছে।
পার্থক্য হলোঃ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্য ধর্মগুলো ধীরে ধীরে বৈজ্ঞানিক সত্যকে মেনে নিয়েছে এবং তাদের ধর্মতত্ত্বকে পুনর্গঠন করেছে। ইসলামের মধ্যেও সেই প্রক্রিয়া কেউ কেউ চালু করতে চায়, কিন্তু সেটা সম্ভব করাটা তাদের জন্য দূরুহ হয়ে পড়ে, ইসলামিস্টরা তাকে হত্যাযোগ্য করে তোলে।
ইসলাম কী বললো, তা দিয়ে তো আর বিজ্ঞান চলবে না
পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে – এটি এখন আর কোনো দার্শনিক বা ধর্মীয় তর্কের বিষয় নয়। এটি পর্যবেক্ষণ করা, পরিমাপ করা এবং প্রযুক্তিগতভাবে ব্যবহার করা সত্য।
যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি – ধর্মীয় হোক বা রাজনৈতিক – যখন এই সত্যকে অস্বীকার করে, সে নিজেকেই দুর্বল করে। ইতিহাস সাক্ষী যে বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে টেকে না। ইসলাম কতদিন টিকতে পারবে?
ইসলামের মধ্যে যারা বৈজ্ঞানিক সত্যকে স্বীকার করে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে নতুনভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন, তারা আসলে ইসলামকে বাঁচানোর কাজ করছেন – ধ্বংস করার নয়।
আর যারা মীমাংসিত বৈজ্ঞানিক সত্যকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করছেন, তারা তাদের অনুসরণকারীদের একটি মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যে রেখে যাচ্ছেন – এবং শেষমেশ ক্ষতি হচ্ছে সেই মানুষগুলোর, যারা উভয় জগতে সৎভাবে বাঁচতে চান, ধর্মেও থাকতে চান আবার বিজ্ঞানের সুবিধাও নিতে চান।
বিজ্ঞান এবং ধর্মবিশ্বাস – দুটো একসাথে থাকতে পারে, যদি উভয়ের সীমানা সম্পর্কে সততা থাকে। সমস্যা তখনই হয়, যখন সেই সীমানা অস্বীকার করা হয়। ইসলাম প্রায়ই সেই সীমানা ভেঙ্গে ফেলে গায়ের জোরে।
Related Posts

When a Loved One Suddenly Feels Like a Stranger: What Causes This Neglect?
Siam met Liza in the second year of university. For the first six months, SiamRead More

যখন প্রিয় মানুষটা হঠাৎ অচেনা হয়ে যায়ঃ অবহেলার পেছনের কারণ কী?
লিজার সাথে সিয়ামের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে। প্রথম ছয় মাস সিয়াম যেন পুরো পৃথিবীRead More

When Development Becomes Disaster: From Beel Dakatia to the Salton Sea
During my undergraduate years, a friend of mine wrote her thesis on the people ofRead More

Comments are Closed