Nature
Saltan City – The Dead Dream

Saltan City - The Dead Dream

স্যালটন সিটির পরিনতি শেখায় প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রন করতে চাইলে হিতে বিপরীত হতে পারে

স্যালটন সাগরঃ এক ভুতুড়ে স্বপ্নের গল্প

তিন ঘন্টায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটার ড্রাইভ দিয়ে, সারি সারি খেঁজুর বাগানের মাঝ দিয়ে কোন এক জুলাইয়ের তপ্ত দুপুরে যখন স্যালটন সাগরের তীরে পৌছালাম তখন দর্শনার্থী বলতে ছিলাম আমি একা, দুইজন চীনা পর্যটক ও অনেক দূরে একজন, একটু পরে গাড়ি থেকে দুজন তরুণী নামলেন। অথচ এক সময় মিরাকল হিসাবে তৈরি হওয়া স্যালটন সাগরের তীরে পরিকল্পিত আবাসিক শহর স্যালটন সিটি গড়ে তোলার মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছিল। সেখানে ট্যুরিজম বুম হয়েছিল, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে স্কী করতো, ছিল ডজন ডজন বিলাসবহুল রিসোর্ট, ছিল জমকালো সব ক্যাসিনোর সারি। এখন সেখান থেকে লোকজন অন্যত্র সরে গেছে, যাচ্ছে। আজ সেটা বিরাণ মরুভূমি, কালের সাক্ষী হিসাবে কিছু ভগ্নাংশ দাঁড়িয়ে আছে! কিভাবেইবা উৎপত্তি হয়েছিল এই সাগরের? এর আয়তনই বা কত? কেন ডেভেলপমেন্ট ডিজাস্টারের এই পরিনতি হলো এই সাগর ও তার তীরবর্তী শহরের?

একটি প্রকৌশলগত ভুল থেকে জন্ম নেওয়া সাগর

স্যালটন সাগরের ইতিহাস শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে, তবে এর গল্প কোন প্রাকৃতিক অলৌকিক ঘটনা নয় – বরং একটি মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের ফসল। ক্যালিফোর্নিয়ার এই এলাকাটি বহু হাজার বছর ধরে “সল্টন সিংক” নামে পরিচিত একটি বিশাল নিম্নভূমি, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২২৬ ফুট নিচে অবস্থিত। ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কলোরাডো নদী বহুবার পথ পরিবর্তন করে এই সিংকে বন্যা ঘটিয়েছে, তৈরি হয়েছে প্রাচীন হ্রদ “লেক ক্যাহুইয়া”, যা আবার শুকিয়েও গেছে বহুবার।

১৯০০ সালের দিকে ইম্পেরিয়াল ভ্যালিতে কৃষিকাজের প্রসারের জন্য ইঞ্জিনিয়াররা কলোরাডো নদী থেকে সেচখাল কেটে পানি সরবরাহের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ১৯০৫ সালে বসন্তের ভারী বৃষ্টি ও বরফগলা পানির চাপে খালের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ফলাফল – পুরো কলোরাডো নদীর স্রোত পথ পরিবর্তন করে সরাসরি সল্টন সিংকের দিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে। প্রায় দুই বছর ধরে, ১৯০৫ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত, নদীর সম্পূর্ণ প্রবাহ এই শুকনো মরুভূমির অববাহিকায় ঢুকতে থাকে, যতক্ষণ না প্রকৌশলীরা অবশেষে নদীর গতিপথ পুনরায় নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। ততদিনে তৈরি হয়ে গেছে ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে বড় হ্রদ -স্যালটন সাগর।

আয়তন ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য

স্যালটন সাগর বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে বড় হ্রদ, যদিও এর আয়তন প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে কমছে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী এর আয়তন প্রায় ৩৪৩ থেকে ৩৫০ বর্গ কিলোমিটার – দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থে প্রায় ২৪ কিলোমিটার। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৩৪ ফুট নিচে অবস্থিত, যা একে পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু স্থানগুলোর একটি বানিয়েছে। হ্রদটির কোনো প্রাকৃতিক জলনির্গমন পথ (আউটলেট) নেই – শুধু আশপাশের কৃষিজমির সেচের বাড়তি পানি এসে এতে জমা হয়, আর প্রচণ্ড গরমে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পানি বেরিয়ে যায়। এই বৈশিষ্ট্যই পরবর্তীতে হ্রদটির ধ্বংসের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

যখন এটি ছিল “ক্যালিফোর্নিয়ার রিভিয়েরা”

১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে স্যালটন সাগর রূপান্তরিত হয় আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে। বিনিয়োগকারী ও ডেভেলপাররা একে দেখেন সোনার খনি হিসেবে – মরুভূমির মাঝে বিশাল একটি জলাশয়, যেখানে গড়ে তোলা যাবে বিলাসবহুল রিসোর্ট শহর। এভাবেই জন্ম নেয় স্যালটন সিটি, বোম্বে বিচ, নর্থ শোর, ডেজার্ট শোরসের মতো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা।

সেই সময়ে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসতেন এখানে ওয়াটার স্কিইং, বোটিং, ফিশিং আর সাঁতারের জন্য। ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা, বব হোপ, দ্য বিচ বয়েজের মতো তারকারাও এই তীরে সময় কাটিয়েছেন বলে জানা যায়। মার্কেটিং করা হতো “সল্টন সি রিভিয়েরা” নামে – পাম স্প্রিংসের চেয়েও বেশি ভিজিটর টানার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। ডজন ডজন মোটেল, ইয়ট ক্লাব, মেরিনা আর বিলাসবহুল রিসোর্ট গড়ে ওঠে হ্রদের চারপাশে। জমির দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়, আর ডেভেলপাররা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এটিকে দ্বিতীয় লাস ভেগাস বা পাম স্প্রিংস বানানোর।

পতনের সূচনাঃ কেন ভেঙে পড়লো এই স্বপ্ন

এই জাঁকজমকপূর্ণ ভবিষ্যতের স্বপ্ন বেশিদিন টেকেনি। একাধিক কারণের যোগফলে ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায় পুরো এলাকাটি।

লবণাক্ততা ও বাস্তুতান্ত্রিক বিপর্যয়ঃ যেহেতু হ্রদটির কোনো প্রাকৃতিক নির্গমনপথ নেই, তাই পানি শুধু বাষ্পীভবনের মাধ্যমেই বের হতে পারে, আর তার সাথে থেকে যায় সব লবণ ও রাসায়নিক পদার্থ। সময়ের সাথে সাথে হ্রদের পানি সমুদ্রের চেয়েও বেশি লবণাক্ত হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি আশপাশের কৃষিজমি থেকে আসা সার ও কীটনাশকযুক্ত পানি হ্রদে পুষ্টি উপাদানের আধিক্য (ইউট্রোফিকেশন) তৈরি করে, যা বিশাল আকারের শৈবাল ব্লুম ঘটায়। এর ফলে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে বারবার ঘটে মাছের গণমৃত্যু – কোটি কোটি মৃত মাছ ভেসে উঠতো হ্রদের তীরে।

দুর্গন্ধ যা পর্যটক তাড়িয়ে দিলঃ মৃত মাছ, পচা শৈবাল আর হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের কারণে সৃষ্ট তীব্র দুর্গন্ধ কয়েক মাইল দূর থেকেও অনুভূত হতো, এমনকি লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত এই গন্ধের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানা যায়। এই দুর্গন্ধই পর্যটকদের মন থেকে “রিভিয়েরা”র স্বপ্নকে মুছে দিতে শুরু করে।

বন্যার আঘাতঃ ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে একাধিক ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে হ্রদের পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা তীরবর্তী বাড়িঘর, মোটেল ও রিসোর্টগুলোকে ডুবিয়ে দেয়। বহু বিনিয়োগকারী তাদের সম্পত্তি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যান, আর একের পর এক ব্যবসা বন্ধ হতে থাকে।

জলের সংকট ও বিষাক্ত ধুলাঃ সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ইম্পেরিয়াল ভ্যালিতে কৃষি সেচের পানি ব্যবহারের পরিমাণ চুক্তির মাধ্যমে কমিয়ে আনা হয়েছে, ফলে হ্রদে পানি প্রবেশের পরিমাণও কমে গেছে। এর সাথে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত বাষ্পীভবনের কারণে হ্রদটি দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। হ্রদের তলদেশ যেখানে বছরের পর বছর ধরে কীটনাশক ও ভারী ধাতু জমা হয়েছিল, তা এখন উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে। শুকনো এই তলদেশ থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে সূক্ষ্ম বিষাক্ত ধুলা, যা আশপাশের বাসিন্দাদের – বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে – শ্বাসকষ্ট ও হাঁপানির হার বৃদ্ধি করছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

আজকের স্যালটন সাগরঃ ভুতুড়ে শহরের নীরবতা

আজ যখন কেউ স্যালটন সিটি বা বোম্বে বিচের দিকে গাড়ি চালিয়ে যান, তখন দেখতে পান পরিত্যক্ত মোটেলের কঙ্কাল, মরচে ধরা নৌকা, ভাঙা জেটি আর ধুলোয় ঢাকা রাস্তা – এক সময়ের জমজমাট রিভিয়েরার ছায়ামাত্র। যে জায়গায় একসময় হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করতেন, এখন সেখানে হাতে গোনা কিছু পর্যটক, স্থানীয় শিল্পী আর প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ আসেন – কেউ কৌতূহল নিয়ে, কেউবা এই “আমেরিকান ড্রিম”-এর ব্যর্থতার প্রতীক দেখতে।

তবে আশার কথা হলো, ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য সরকার ও বিভিন্ন পরিবেশ সংস্থা এখন স্যালটন সাগর পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে – যার মধ্যে রয়েছে জলাভূমি তৈরি, ধুলা দমন এবং এমনকি হ্রদের তলদেশে থাকা বিশাল লিথিয়াম মজুদ থেকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরির পরিকল্পনা। ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারির জন্য প্রয়োজনীয় লিথিয়াম উত্তোলনের সম্ভাবনা এই অঞ্চলকে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, যদিও এই পরিকল্পনা কতটা সফল হবে তা এখনো অনিশ্চিত।

স্যালটন সাগর তাই শুধু একটি হ্রদের গল্প নয় – এটি মানুষের উচ্চাভিলাষ, প্রকৃতির প্রতিশোধ আর পরিকল্পনাহীন উন্নয়নের এক জীবন্ত পাঠ, যা আজও মরুভূমির বুকে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।

Related Posts

The size of a woman's breasts and hips

Why does Allah show such preference for women with large breasts and large buttocks? Do men feel the same way? Does this give women any advantage?

If you leave Prophet Muhammad in Pattaya’s Walking Street and Beach Road after evening, inRead More

The size of a woman's breasts and hips

নারীর বড় বক্ষ ও নিতম্বের প্রতি আল্লাহর এতো পক্ষপাত কেন? পুরুষেরও কি তাই? এটা কি নারীকে সুবিধা দেয়?

আপনারা যদি পাতায়ার ওয়াকিং স্ট্রীটে ও বীচ রোডে সন্ধ্যার পর আলো আঁধারিতে নবী মুহাম্মদকে ছেড়েRead More

Women and the Pink

Do women like the color pink? What is the psychology behind it?

Last winter my friend Lamia went to buy a birthday present for her niece. TheRead More

Comments are Closed