Bangladesh
Corruption, Inefficiency, and Bangladesh

Corruption, Inefficiency, and Bangladesh

ঘুষ, তদবির ও জবাবদিহিতাহীন রাষ্ট্র – বাংলাদেশ

যখন সরকারি অফিসে যাওয়াই সবচেয়ে বড় ভয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রকাঠামোর গোড়ায় ফাটল ধরেছে

বাংলাদেশে সরকারি অফিসে যাওয়ার আগে গায়ে জ্বর আসে। না জানি কত ঝামেলায় পড়তে হবে, কাকে ঘুষ দিতে হবে, কীভাবে দিতে হবে, কত দিতে হবে — এই অনিশ্চয়তাই হয়ে ওঠে নাগরিকের নিত্যসঙ্গী। অথচ রাষ্ট্রের কাজই তো ছিল নাগরিককে সেবা দেওয়া।

আমি বিদেশে থাকি। এখানে গত কয়েক বছরে মাত্র তিন-চারবার সরকারি অফিসে যেতে হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ছবি তুলতে, রাস্তায় ড্রাইভিং টেস্ট দিতে, আর একবার সোশ্যাল অফিসে — কারণ আমার নামটা তিন অংশের। “S M Saifur” — প্রথম নাম, মধ্যনাম আর শেষ নামের দেশে এই নামকাঠামো তাদের সিস্টেমকে বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। সেটা সংশোধন করতে একটাই সফর লেগেছিল। বাকি সব কাজ — ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ক্রেডিট কার্ড, ট্যাক্স, বিমা — সব হয়েছে অনলাইনে বা ফোনে। এমনকি একটি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড নিয়েছি যার শাখা এই শহরে নেই, নিকটতম শাখা ৫০০ কিলোমিটার দূরে।

এখানে কোনো সরকারি অফিসে কাজ থাকলেও মনে ভয় নেই। জানি, অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় গেলে আমার প্রাপ্য সেবাটুকু পাব। এটাই স্বাভাবিক রাষ্ট্রের চেহারা।


ঘুষের ইকোসিস্টেম: যেখানে অস্বাভাবিকটাই স্বাভাবিক

বাংলাদেশে সরকারি দফতরে গেলে দুটি পথ — হয় কোনো প্রভাবশালীর রেফারেন্স লাগবে, নয়তো ঘুষ দিতে হবে। এটা কোনো ব্যতিক্রম নয়, এটাই নিয়ম হয়ে গেছে। আমি নিজে এর শিকার হয়েছিলাম আয়কর দফতরে।

আমার আয়করে কোনো সমস্যা ছিল না — এটা পরে স্বয়ং সেই অফিসের কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু তারা ইচ্ছা করেই এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হয়রানি চালিয়ে গিয়েছিলেন — শুধু টাকার জন্য। এনবিআরের চেয়ারম্যান ও সদস্যের নির্দেশও তাদের থামাতে পারেনি। কারণ সেই সিস্টেমে ঘুষ দেওয়া-নেওয়াই স্বাভাবিক নিয়ম, নির্দেশ মানাটা নয়।

এই পরিস্থিতিতে আমি ইউনিভার্সিটির এক বড় ভাই, যিনি আয়কর বিভাগেরই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, তাঁর কাছে তিনবার গিয়েছিলাম। তিনি কোনো সাহায্য করেননি। প্রতিবার দেখতাম ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজের কাজে মগ্ন। নাগরিকের সমস্যা সমাধান করা যে তাঁর পেশাদার দায়িত্ব — সেই বোধটুকুই ছিল না। নিশ্চিত পরকীয়া, বউয়ের সঙ্গে এতো কথা বলা নিশ্চয় কোন দেবতা ছাড়া সম্ভব না, ভদ্রলোক সনাতনী। ভাবতাম, এতো এতো ফোনে কথা বলেন উনি, কাজ করেন কখন? সারাক্ষন তো ধান্দা কারো বউকে বা মেয়েকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিছানা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া!

এই ব্যবস্থাতেই তদবির জন্ম নেয়। মানুষ জানে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তার কাজ হবে না। তাই প্রভাবশালীর ফোনের দরকার পড়ে। তদবির থাকলে ঘুষের পরিমাণটা একটু কমে — এটাই যেন সান্ত্বনা। ফলে মন্ত্রী-সচিবদের মূল কাজ দাঁড়িয়ে যায় তদবির ব্যবস্থাপনা করা। এটি এখন বাংলাদেশে একটি পরিপূর্ণ বাণিজ্যিক শিল্প।

ঘুষের ইকোসিস্টেম টিকে থাকে কারণ জবাবদিহিতার কোনো ব্যবস্থা নেই — কর্মকর্তারা জানেন, কাজ না করলেও বেতন যাবে না, পদোন্নতি বন্ধ হবে না।

দুটি দেশ, দুটি অভিজ্ঞতা

পার্থক্যটা কোথায়? শুধু সম্পদে নয়, মানসিকতায়ও নয় — পার্থক্যটা ব্যবস্থায়। যে দেশে কর্মকর্তার কাজের মূল্যায়ন হয়, সে দেশে কর্মকর্তা কাজ করে। যে দেশে মূল্যায়ন নেই, সে দেশে ঘুষ-তদবিরই একমাত্র গতি।

✓ জবাবদিহিতার ব্যবস্থা যেখানে আছে

অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে গেলে সেবা পাওয়া যায়। ক্রেডিট কার্ড থেকে শুরু করে ট্যাক্স রিটার্ন — সব অনলাইনে। শাখা ৫০০ কিলোমিটার দূরেও হোক, সেবা পেতে অফিসে যেতে হয় না।

✗ জবাবদিহিতা যেখানে নেই

সরকারি অফিসে ঢোকার আগেই মনে প্রশ্ন জাগে — কাকে ঘুষ দিতে হবে? কত দিতে হবে? এমনকি এনবিআরের চেয়ারম্যানের নির্দেশেও কাজ হয় না, যদি না টাকার ব্যবস্থা থাকে।

লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক: পরিমাপ না থাকলে উন্নতি হয় না

উন্নয়ন কাজে আমি বছরের পর বছর লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাপ্রোচ (LFA) নিয়ে কাজ করেছি। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি প্রকল্পের জন্য একটি ম্যাট্রিক্স তৈরি করা হয় — লক্ষ্য কী, সূচক কী, যাচাইয়ের উৎস কী এবং কী অনুমানের উপর ভিত্তি করে এগোনো হচ্ছে। এই ম্যাট্রিক্স দেখেই বোঝা যায়, একটি প্রকল্প সফল না ব্যর্থ।

আমাদের অফিসে নিয়োগ পরীক্ষার ধরন বদলেছিলাম। প্রজেক্ট লিড পদের জন্য প্রার্থীদের দেওয়া হতো প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কিছু বিবরণ। তাদের কাজ ছিল একটি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন তৈরি করা — ওপেন বুক পদ্ধতিতে। বই দেখতে পারবেন, ইন্টারনেট ঘাঁটতে পারবেন, এমনকি কারো সঙ্গে কথা বলতেও পারবেন।

কারণটা সহজ — মানুষ সবকিছু জানে না, কিন্তু কীভাবে জানতে হয় সেই দক্ষতাটা থাকাটা জরুরি। সব প্রার্থীর প্রেজেন্টেশন একসঙ্গে দেখা হতো, এবং সেখানেই স্পষ্ট হয়ে যেত কে সত্যিকারের চিন্তা করতে পারেন। অন্য প্রার্থীরাও জানতে পারতেন তাদের দুর্বলতাগুলো কোথায়।

বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে এই ধরনের কোনো মূল্যায়ন পদ্ধতি নেই। জেলা প্রশাসক নিয়োগ পান দলীয় আনুগত্য দেখে। সেই জেলা সম্পর্কে তার জ্ঞান কতটা, তার পরিকল্পনা কী, তার সৃজনশীলতা কোথায় — এসব কেউ জিজ্ঞেস করে না। আর জানতে না চাইলে, উত্তর খোঁজার দরকারও পড়ে না।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রী বলছেন উনি সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক তদবির পেতে থাকেন
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রী বলছেন উনি সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক তদবির পেতে থাকেন

সংস্কারের রোডম্যাপ: দক্ষতা দিয়ে পদোন্নতি

আমি যদি নীতি নির্ধারক হতাম, তাহলে দুটি বড় পরিবর্তন আনতাম।

প্রস্তাবিত সংস্কার কাঠামো

  1. নিয়োগে দক্ষতা যাচাই: জেলা প্রশাসক পদে আবেদনকারী উপসচিবদের একটি প্যানেলের সামনে তাঁদের কাঙ্ক্ষিত জেলা নিয়ে প্রেজেন্টেশন দিতে হবে — সেই জেলার সমস্যা কী, সমাধানের পরিকল্পনা কী, সম্পদ কীভাবে কাজে লাগাবেন। এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ থাকবে এবং অংশগ্রহণকারী সবাই একে অপরের প্রেজেন্টেশন দেখতে পারবেন।
  2. লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক ম্যাট্রিক্স: নিয়োগের পর প্রতিটি কর্মকর্তাকে একটি ম্যাট্রিক্স ধরিয়ে দেওয়া হবে — নির্দিষ্ট লক্ষ্য, পরিমাপযোগ্য সূচক এবং নির্ধারিত সময়সীমা। বার্ষিক মূল্যায়নে এই ম্যাট্রিক্সের স্কোরই নির্ধারণ করবে পুরস্কার না তিরস্কার।
  3. পদোন্নতিতে বয়স নয়, দক্ষতা: কোনো উপসচিব যদি যোগ্যতা ও দক্ষতায় অসাধারণ ফল দেখাতে পারেন, তিনি সরাসরি সচিব পদে যেতে পারবেন। সচিব হতে গেলে “বুড়ো” হতে হবে — এই নিয়ম কোনো যোগ্যতার মানদণ্ড নয়, এটা নিছক সিনিয়রিটির অলস ব্যবস্থাপনা।

মূল প্রশ্ন: কাজ করেই কি বেতন নেওয়া হয়?

সরকারি চিঠির শেষে লেখা থাকে “জনস্বার্থে জারি করা হলো।” কিন্তু সেই জনস্বার্থ আদৌ অর্জিত হচ্ছে কিনা, সেটা কেউ যাচাই করে না। বছরের পর বছর জবাবদিহিতাবিহীন চাকরি চলতে থাকে। মাঝে মাঝে কোনো উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে “স্যার” না বললে বা প্রটোকল ভাঙলে সামান্য শাস্তি হয় — কিন্তু সেবা না দিলে কোনো শাস্তি নেই।

সরকারি কর্মকর্তাদের কাজ করেই বেতন নেওয়া এবং দক্ষতা দেখিয়েই পদোন্নতি পাওয়া নিশ্চিত না করা গেলে ঘুষ, দুর্নীতি ও তদবির বন্ধ করা সম্ভব নয় — কোনো দিন।

যে ব্যবস্থায় পারফরম্যান্স মাপা হয় না, সে ব্যবস্থায় পারফরম্যান্স কখনো ভালো হয় না। এটা বাংলাদেশের সরকারি সেবার মৌলিক সমস্যা। সমাধানও সেখানেই — মূল্যায়নের সংস্কৃতি তৈরি করা, জবাবদিহিতার কাঠামো দাঁড় করানো, এবং দক্ষতাকে পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

নাগরিকের গায়ে জ্বর আসবে না সেদিন, যেদিন সরকারি দফতরে গেলে সে জানবে — সেখানে তাকে সেবা দেওয়াই কর্মকর্তার কাজ, সেটাই তার পদের দায়িত্ব, এবং সেটা না করলে তার পরিণতি আছে।

Related Posts

Special Marriage Act

Bangladesh’s Special Marriage Act Provides Legal Protection for Interfaith Couples and Non-Religious Individuals to Marry

When discussions of love or marriage arise in Bangladesh, one question keeps coming back: canRead More

Special Marriage Act

বাংলাদেশের বিশেষ বিবাহ আইন দুই ধর্মের মানুষ বা নিধার্মিকদের বিয়ের সুরক্ষা দেয়

বাংলাদেশে প্রেম বা বিয়ের আলোচনা উঠলে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসেঃ ভিন্ন ধর্মের দুজন মানুষRead More

Islam and Bengali Culture

Why do Islamist clerics consider Bengali cultural festivals their enemy?

This year, unlike many previous years, the major Hindu religious festival Durga Puja in BangladeshRead More

Comments are Closed