Jewelry
Women’s Jewelry: Then and Now

Women’s Jewelry: Then and Now

বাঙালি নারীর গহনা প্রীতি – ইতিহাস থেকে বর্তমান ও বাড়াবাড়ির সংস্কৃতি

নলিনী দেবীর হাতে যখন প্রথম সোনার বালা পরানো হয়েছিল, তখন তাঁর বয়স মাত্র সাত। বিয়ের নয়, জন্মের উপলক্ষে। ঠাকুমা বলেছিলেন, “মেয়ে মানুষের গায়ে সোনা থাকা মানে তার একটা নিজস্ব সম্পদ থাকা, স্বামীর মুখাপেক্ষী না হয়ে বাঁচার একটা রাস্তা।” সেই কথাটা নলিনী দেবী সারাজীবন মনে রেখেছিলেন, এবং তাঁর মেয়ে, তাঁর মেয়ের মেয়ে – প্রত্যেকের কানে সেই একই কথা তিনি ফিসফিস করে বলে গেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই একই সোনা কীভাবে নিরাপত্তার প্রতীক থেকে প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হয়ে উঠল, সেই গল্পটাই এখানে বলার চেষ্টা করব।

ঐতিহাসিক শেকড়

বাংলার মাটিতে গহনার সম্পর্ক নতুন নয়। সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই সোনা-রুপোর অলঙ্কার নারীদেহে শোভা পেত। মৌর্য, গুপ্ত যুগের ভাস্কর্যে দেখা যায় নারীমূর্তির গলায়, কানে, হাতে জমকালো অলঙ্কার। বাংলায় বিশেষভাবে গহনার একটা সাংস্কৃতিক তাৎপর্য তৈরি হয়েছিল “স্ত্রীধন” ধারণার মধ্য দিয়ে। হিন্দু শাস্ত্রমতে বিয়ের সময় মেয়েকে যে সোনা-গহনা দেওয়া হতো, তা সম্পূর্ণভাবে তার নিজস্ব সম্পত্তি বলে গণ্য হতো – স্বামীর বা শ্বশুরবাড়ির অধিকার সেখানে ছিল না। এই ব্যবস্থার পেছনে একটা বাস্তববাদী চিন্তা কাজ করত: সেকালে মেয়েদের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার সহজলভ্য ছিল না, তাই সোনাই ছিল তাদের একমাত্র “ব্যাংক ব্যালেন্স”। দুর্ভিক্ষ, বিপর্যয়, স্বামীর মৃত্যু বা বিচ্ছেদের মতো পরিস্থিতিতে এই সোনাই একজন নারীকে বাঁচার শেষ ভরসা দিত।

মুঘল আমলে বাংলায় গহনার নকশায় আসে পারস্য ও মুঘল প্রভাব – কুন্দন, মীনাকারি, জড়োয়ার কারুকাজ। ঔপনিবেশিক যুগে জমিদার পরিবারের মহিলাদের গহনার বহর ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর – নথ, চিক, তাবিজ, বাজুবন্ধ, রামনবমী হার, শীতলপাটি নকশার কোমরবন্ধ। গ্রামবাংলায় সাধারণ কৃষক পরিবারেও মেয়ের বিয়েতে সাধ্যমতো সোনা তুলে দেওয়াটা ছিল সামাজিক কর্তব্য, প্রায় ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার মতো।

সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ নিরাপত্তা থেকে মর্যাদার প্রতীক

নলিনী দেবীর মেয়ে অপর্ণা যখন বড় হচ্ছিলেন সত্তরের দশকে, তখন সোনা শুধু নিরাপত্তার প্রতীক ছিল না, হয়ে উঠেছিল সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি। পাড়া-প্রতিবেশীর বিয়েবাড়িতে কার মেয়ের গলায় কত ভরি সোনা, কনের হাতে কয়টা চুড়ি, নাকে কেমন নথ – এসব নিয়ে ফিসফাস চলত অন্তঃপুরে। একটা মেয়ের বাবার আর্থিক অবস্থা, সামাজিক প্রতিপত্তি – সবকিছুর প্রতিফলন ঘটত তার বিয়ের গহনায়। যে পরিবার যত বেশি সোনা দিতে পারত, সমাজে তাদের অবস্থান তত উঁচুতে বিবেচিত হতো।

এখানেই লুকিয়ে ছিল একটা গভীর বিদ্রূপ। যে গহনা একদিন নারীর স্বাধীনতা আর নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল, সেটাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠল তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া সামাজিক বোঝা। বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াল “যথেষ্ট সোনা না দেওয়া”। যৌতুকবিরোধী আইন থাকা সত্ত্বেও, “সোনা” নামের আড়ালে যৌতুক প্রথা টিকে রইল দিব্যি, কারণ সোনা তো আইনত উপহার, প্রমাণ করা কঠিন এটা দাবি করে আদায় করা হয়েছে কিনা।

বিবর্তনের ধারা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গহনার ধরনও বদলেছে। ঠাকুরমার আমলের ভারী সাবেকি গহনা – শীতলপাটি, পদ্মরাগ মণি, নবরত্ন হার – মায়ের আমলে এসে হালকা হতে শুরু করল। আশির-নব্বইয়ের দশকে এল “লাইট ওয়েট” গহনার চল, তারপর এল ডায়মন্ড কাটিং, প্ল্যাটিনাম, আর এখন তো ইমিটেশন আর আর্টিফিশিয়াল জুয়েলারির যুগ। বিয়েবাড়িতে এখন খাঁটি সোনার পাশাপাশি ইমিটেশনের চোখ ধাঁধানো সেট পরার চলও বেড়েছে – কারণ দাম কম, অথচ চাকচিক্য কম নয়।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, গহনার প্রতি মোহ কমেনি, বরং বদলেছে তার প্রকাশভঙ্গি। আজকের প্রজন্মের মেয়েরা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিয়ের ছবি পোস্ট করে, আর সেই ছবিতে গহনার ঔজ্জ্বল্য মেপে দেওয়া হয় “লাইক” আর “কমেন্টে”। ইনস্টাগ্রাম রিলে দেখা যায় “ব্রাইডাল জুয়েলারি হল” ভিডিও, যেখানে প্রতিটি গহনার আলাদা ক্লোজ-আপ শট। প্রতিযোগিতাটা এখন শুধু পাড়া-প্রতিবেশীর সীমায় নেই, ছড়িয়ে পড়েছে ভার্চুয়াল জগতেও।

দুর্নীতির সঙ্গে গহনার অদ্ভুত সম্পর্ক

এই গল্পের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়টা হলো, সোনার প্রতি এই সামাজিক আসক্তি কীভাবে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। কালো টাকা সাদা করার অন্যতম সহজ মাধ্যম হয়ে উঠেছে সোনা। নগদ টাকার লেনদেনে যেখানে হিসেব চাওয়া হয়, সোনার ক্ষেত্রে সেই কড়াকড়ি অনেক শিথিল। ঘুষের টাকা, দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা অর্থ প্রায়শই সোনার গহনায় রূপান্তরিত হয় – কারণ এটি সহজে বহনযোগ্য, লুকানো যায়, আর প্রয়োজনে দ্রুত নগদে পরিণত করা যায়। বিভিন্ন দুর্নীতি দমন অভিযানে সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদের বাড়িতে হানা দিয়ে কোটি কোটি টাকার সোনার গহনা উদ্ধারের খবর আমরা প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেখি। মেয়ের বিয়েতে “উপহার” হিসেবে দেওয়া অস্বাভাবিক পরিমাণ সোনা, স্ত্রীর নামে কেনা বিপুল গহনা – এসব হয়ে উঠেছে অবৈধ অর্থ বৈধ করার এক সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য মোড়ক।

এখানেই সমাজের এক অদ্ভুত দ্বিচারিতা প্রকাশ পায়। একদিকে সোনার প্রতি মোহকে “ঐতিহ্য” আর “সংস্কৃতি” বলে মহিমান্বিত করা হয়, অন্যদিকে সেই একই মোহ ব্যবহৃত হয় দুর্নীতির টাকা লুকানোর হাতিয়ার হিসেবে। মধ্যবিত্ত পরিবারও এই প্রতিযোগিতার বাইরে থাকতে পারে না – ঋণ করে, জমি বিক্রি করে হলেও মেয়ের বিয়েতে “মানসম্মত” পরিমাণ সোনা তুলে দেওয়ার চাপ অনুভব করে তারা।

লোক দেখানো রেওয়াজ ও প্রতিযোগিতা

অপর্ণার মেয়ে, রিমি, এখন মধ্য তিরিশে। তার বিয়ের সময় শাশুড়ি স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন, “বৌভাতের দিন কমপক্ষে দুই সেট গহনা বদলাতে হবে, নইলে লোকে কী বলবে!” রিমি বুঝতে পারল, এই গহনা এখন আর ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয় – এটা একটা সামাজিক পারফরম্যান্স, যেখানে প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা “লুক” চাই, আর সেই লুকের মূল্যায়ন করবে আত্মীয়স্বজন আর প্রতিবেশীরা।

বিয়েবাড়ির প্রতিটি অনুষ্ঠান – গায়ে হলুদ, আশীর্বাদ, বিয়ে, বৌভাত, আইবুড়োভাত – প্রতিটির জন্য আলাদা গহনার সেট বরাদ্দ হয়ে গেছে এখন এক প্রকার অলিখিত নিয়মে। কনের গায়ে কম গহনা মানে যেন পরিবারের আর্থিক দুর্বলতার প্রকাশ, আর সেই ভয় থেকেই জন্ম নেয় “লোক দেখানো” প্রথা। এমনকি অনেক পরিবার এমনও করে যে, সামর্থ্য না থাকলেও ভাড়া করা গহনা পরিয়ে ছবি তোলা হয়, শুধু সামাজিক মানসম্মান বাঁচানোর জন্য।

দুই পরিবারের মধ্যে গহনা নিয়ে তুলনা, প্রতিযোগিতা – এসব এখন বিয়ের অন্যতম “সাব-প্লট”। কনের মামাবাড়ি কত সোনা দিল, বরের বাড়ি থেকে কনেকে কী কী গয়না দেওয়া হলো, এসবের হিসেব-নিকেশ কান পাতলেই শোনা যায় যেকোনো বিয়েবাড়িতে। সামাজিক মাধ্যমের যুগে এই তুলনা আরও তীব্র হয়েছে, কারণ এখন প্রতিযোগিতাটা শুধু নিজের চেনা গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

শেষ কথাঃ শেকল, না শক্তি?

নলিনী দেবী থেকে রিমি পর্যন্ত চার প্রজন্মের এই যাত্রায় একটা জিনিস স্পষ্ট – সোনা কখনো স্রেফ ধাতু ছিল না বাঙালি সমাজে, এটা ছিল ইতিহাস, সম্মান, নিরাপত্তা আর সামাজিক অবস্থানের এক জটিল মিশ্রণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে জিনিসটা একদিন নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক ছিল, সেটাই আজ অনেক ক্ষেত্রে হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক চাপ, আর্থিক অসংগতি, এমনকি দুর্নীতির বাহক।

প্রশ্নটা তাই থেকেই যায় – এই সোনার গহনা কি সত্যিই আজও নারীর নিরাপত্তার প্রতীক, নাকি সেটা পরিণত হয়েছে একটা সোনালি শেকলে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মেয়েদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক মর্যাদা আর প্রতিযোগিতার নামে? উত্তরটা হয়তো প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব গল্পেই লুকিয়ে আছে – যেমন লুকিয়ে ছিল নলিনী দেবীর সেই প্রথম সোনার বালার মধ্যেও।

Related Posts

Muhammad Ali Jinnah

Jinnah was a thoroughly secular atheist, yet by playing the religious card he divided the country!

The first killing in India over writing and accusations of hurting religious sentiments took placeRead More

Muhammad Ali Jinnah

জিন্নাহ ছিলেন আপদমস্তক একজন সেকুল্যার নাস্তিক, অথচ ধর্মীয় কার্ড খেলে তিনি দেশ ভাগ করেন!

ভারতবর্ষে লেখালিখির কারনে ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে প্রথম কোন হত্যাকান্ড ঘটে কলকাতায়, ১৯২৪Read More

Women’s Jewelry: Then and Now

Bengali Women and Their Love for Jewelry: History, Modern Trends, and the Culture of Excess

When the first gold bangle was put on Nalini Devi’s wrist, she was only seven.Read More

Comments are Closed