
Muhammad Ali Jinnah
জিন্নাহ ছিলেন আপদমস্তক একজন সেকুল্যার নাস্তিক, অথচ ধর্মীয় কার্ড খেলে তিনি দেশ ভাগ করেন!
ভারতবর্ষে লেখালিখির কারনে ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে প্রথম কোন হত্যাকান্ড ঘটে কলকাতায়, ১৯২৪ সালে। ১৯১১ সালে কলকাতা থেকে দিল্লিতে রাজধানী সরে গেলেও ভারতের সাহিত্যিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী বরাবরই থেকে যায় কলকাতায়। তিনি কলকাতার একজন ছোট প্রকাশক ছিলেন, যিনি বিদেশি বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করতেন, নাম নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
প্রকাশিত বইটি ছিল একটি ইংরেজি গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ। মূল বইটি মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামের ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি পশ্চিমা গবেষণামূলক কাজ। বইটিতে নবী মুহাম্মদ সম্পর্কে কিছু সমালোচনামূলক মন্তব্য ছিল – যা নিয়ে মুসলিম সমাজের একটি অংশে বিতর্ক সৃষ্টি হয়, ধর্মান্ধ মোল্লারা তো বরাবরই নবীর সমালোচনায় উগ্র হয়ে উঠে। নবী মুহাম্মদও বলে গেছে তার সমালোচনাকারীকে হত্যা করতে। বইটি আসলে কী বলেছে, কতটা আপত্তিকর – এসব নিয়ে কোনো বিশদ আলোচনা তখন হয়নি। অভিযোগের ভিত্তিতে জনমনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রেক্ষিতে একজন লোক প্রকাশক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে হত্যা করে বসে।
হত্যাকারী ছিলেন এক পতিতালয়ের দালাল। একদিন তার এলাকার পাশ দিয়ে একটি বিক্ষোভ মিছিল যাচ্ছিল। কৌতূহলবশত সে জানতে পারে, এক প্রকাশক এমন একটি বইয়ের অনুবাদ করেছেন যেখানে নবী মুহাম্মদ সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বইটি কী, আসলে কী লেখা আছে – এসব কিছুই সে জানত না। কিন্তু “রাসূলকে অপমান”, “ধর্ম অবমাননা” কথাগুলো শুনেই সে সুযোগ খুঁজে প্রকাশকের দোকানে যায় এবং ভদ্রবেশে তাকে হত্যা করে।
ধর্মীয় আচরণ কখনো পালন না করা এই ব্যক্তি রাতারাতি “ধর্মরক্ষক” হিসেবে প্রশংসিত হয়। আজকের বাংলাদেশে তার মতো অন্ধ অনুসারীর সংখ্যা লাখে লাখে – মডারেট মুসলিম, ইমাম, দোকানদার, শিক্ষক, ছাত্র, চাকুরে, ব্যবসায়ী, অপরাধী – সবাই ধর্মীয় অনুভূতির নামে এক হয়ে যায়। ১৯২০-এর দশকে ভারতবর্ষে ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতির বড় উত্থান ঘটে। হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছিল – বিশেষ করে প্রকাশনা, বক্তৃতা ও ধর্মীয় বিতর্ককে কেন্দ্র করে।
১৯২০-এর দশকে পাঞ্জাবে মুসলিম সম্প্রদায় ও হিন্দু আর্য সমাজের মধ্যে এক তীব্র ধর্মীয় বিরোধের জন্ম হয়। এর সূচনা ঘটে যখন কিছু মুসলিম লেখক একটি পুস্তিকা ছাপায়, যেখানে হিন্দুদের দেবী সীতাকে অবমাননাকরভাবে উপস্থাপন করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় আর্য সমাজের স্বামী দয়ানন্দের অনুসারী কৃষ্ণ প্রসাদ প্রতাব – ‘পণ্ডিত চামুপতি লাল’ ছদ্মনামে – “রঙ্গিলা রাসুল” নামে একটি পুস্তিকা রচনা করেন। সেখানে তিনি নবী মুহাম্মদের অল্পবয়সী আয়েশাকে বিয়ে এবং তাঁর একাধিক বিবাহ ও যৌনদাসী প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
এই বইটি ১৯২৩ সালে লাহোরের প্রকাশক রাজপাল ছাপান। বইটি বাজারে আসার পরপরই মুসলিম সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রাজপালের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়। প্রথম আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে, এবং আপিলেও সেই রায় বহাল থাকে। শেষ পর্যন্ত রাজপাল হাইকোর্টে যান, এবং হাইকোর্ট রায় দেয় যে তাঁর কাজ ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৫৩ ধারার আওতায় অপরাধ নয়। এই রায় মুসলিম সমাজে প্রবল ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এই উত্তেজনার মধ্যেই ১৯ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রীর ছেলে ইলমুদ্দিন ১৯২৯ সালের ৬ এপ্রিল, ওয়াজির খান মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাওলানা আতাউল্লাহ শাহ বুখারীর উত্তেজনামূলক ভাষণ শোনে। ভাষণে নবীকে অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছিল। ভাষণের প্রভাবে ইলমুদ্দিন এক রুপি দিয়ে একটি ছুরি কেনে এবং সেদিনই লাহোরের উর্দু বাজারে গিয়ে রাজপালকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো – ইলমুদ্দিন নিজে কখনো বইটি পড়েই দেখেনি।
ইলমুদ্দিন এই হত্যাকান্ডকে তার ঈমানী দায়িত্ব মনে করে কোন আইনজীবী নিয়োগ দিতে চাননি, শহীদি মৃত্যু মেনে সে জান্নাতে গিয়ে ৭২ হুর, হাজার হাজার গেলমান, হাজার মাইল দীর্ঘ খেজুর বাগান, মদের নদী, দুধ-মধুর নহরের স্বপ্নে বিভোর ছিল। কিন্তু লন্ডন ফেরৎ ব্যারিস্টার কায়েদ-এ-আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বিনা পারিশ্রমিকে তিনি ইলমুদ্দিনের মামলা পরিচালনার দায়িত্ব নেন। মনে করছেন জিন্নাহ খাঁটি মুসলমান?
জিন্নাহ ছিলেন বিলেতি শিক্ষায় শিক্ষিত, সাংস্কৃতিক বিশ্বাসে ছিলেন একজন ইংলিশ, স্যুট-টাই পরতেন, মদ খেতেন নিয়মিত, ঘরে বাড়িতে কুকুর রাখতেন, যত্র-তত্র প্রাণীর ছবি-পেইন্টিংসতো ছিলই। তিনি বিয়ে করেছিলেন একজন অমুসলিম কে। তার একমাত্র সন্তান ডিনাও বিয়ে করেছিলেন একজন অমুসলিমকে। ডিনা ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে যাননি। জিন্নাহর নাতি, নাতনি কেউই মুসলমান নয়, নাতি নাতনিদের বংশধরেরাও কেউ মুসলমান নয়। জিন্নাহ নামাজ রোজা করতেন না, ধর্ম-কর্ম করতেন না, নাস্তিক ছিলেন, অথচ ধর্মের দোহাই দিয়ে মুসলমানদের অনুভূতি চুলকে দিতে এই হত্যাকারীর পক্ষে আদালতে দাঁড়ায়। একজন আপদমস্তক নাস্তিক ব্যক্তি, যার জীবনে ধর্মের ছিটে-ফোঁটাও নেই তিনিও মানুষকে উস্কে দিয়েছেন ধর্মের দোহাই দিয়ে।
ভারতবর্ষের অপর অনেক অদূরদর্শী রাজনৈতিক নেতার সহযোগীতায় জিন্নাহ ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগের নেতৃত্ব দেন। ১৯৩৯ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন যে, হিন্দু মুসলমান দুটি আলাদা জাতি। জিন্নাহ এবং সে সময়ের অন্য কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সিদ্ধান্তের ফলে ১৯৪৭ সালে ধর্মীয় দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত জটিল এবং সংবেদনশীল অধ্যায়। নেহেরু, জিন্নাহসহ সেই সময়ের প্রাধান সব রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন নাস্তিক, সেকুল্যার। অথচ তারা ধর্মীয় উন্মাদনা ও চরমপন্থাকে মেনে নিয়ে, প্রকারান্তরে উসকে দিয়ে হাজার বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করা একটা সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক জনপদের মানুষদের বর্ডার নামক লাইন টেনে আলাদা করে দেন।
এভাবেই ধান্দাবাজ লোকজন নিজেরা ধর্মের অসারতা ও ভন্ডামি জানলেও সবসময় ব্যক্তিস্বার্থে ধর্মীয় গোষ্ঠী, বিশেষ করে তৌহিদী জনতা নামের মূর্খ মববাজ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে। সে ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ কলকাতা দাঙ্গা, ১০ অক্টোবর ১৯৪৬ নোয়াখালি দাঙ্গা থেকে শুরু করে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০২ এর গুজরাট দাঙ্গা বলেন, ২০১৯ সালের ভোলা ম্যাসাকার বলেন, আর এখনকার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের ধর্মীয় মব সন্ত্রাস বলেন – সবই একই সূত্রে গাঁথা। সবখানে নেপথ্যে একটি সুবিধাভোগী রাজনৈতিক গোষ্ঠী থাকে। বড় বড় হুজুরদের অনেকেই ইসলামের জাল-জালিয়াতি, জারি-জুরি, ভন্ডামি, মিথ্যাচার সম্পর্কে জানে, তারা ব্যক্তি জীবনে সেগুলোর বিপক্ষে থাকে, কিন্তু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব, প্রতিপত্তির জন্য ধর্মীয় গেইম খেলে মূর্খ তৌহিদী জনতাকে ব্যবহার করে।
আগেই বলেছি জিন্নাহর পরিবারের কেউ মুসলমান নন। তার মেয়ে ডিনা বিখ্যাত পার্সি ব্যবসায়ী নেভিল ওয়াডিয়াকে বিয়ে করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পর ডিনা ওয়াডিয়া তার বাবার গড়া দেশ পাকিস্তানে যাননি; তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং মুম্বাইতেই বসবাস শুরু করেন। তিনি তাঁর পুরো জীবনে মাত্র দুইবার পাকিস্তান সফর করেছিলেন – একবার ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর বাবার মৃত্যুর পর জানাজায় অংশ নিতে, এবং শেষবার ২০০৪ সালে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ দেখার জন্য। বর্তমানে জিন্নাহর বংশধররা (ডিনা ওয়াডিয়ার ছেলে নুশলি ওয়াডিয়া ও তাঁর পরিবার) ভারতের অত্যন্ত প্রভাবশালী শিল্পপতি পরিবার (ওয়াডিয়া গ্রুপ) হিসেবে ভারতেই বসবাস করছেন। তারা কেউই কখনো পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নেননি।
বাংলাদেশের এক শ্রেনীর মুসলমান এখন জিন্নাহর জন্ম-মৃত্যু দিবস মহাসহারোহে স্মরন করেন, তাদের দৃষ্টিতে জিন্নাহ ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করে খুবই ভাল এবং ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেজন্য ১৯৪৭ তাদের কাছে খুবই গ্লোরিফাইং, সেই তুলনায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ এর অর্জন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমনকি তারা এটা প্রত্যাশাও করেন না। এখনো তারা মনে করেন ১৯৭১ পূর্ববর্তী পাকিস্তানই হয়তো মুসলমানদের জন্য ভাল ছিল। সবকিছুর মূলে তাদের কাছে ধর্ম, ইসলাম। সেখানে ভিন্নমত, ভিন্ন ধর্মের, বা নিধার্মিক মানুষদের কোন ঠাঁই নেই। তাদের আজন্ম আক্ষেপ বাংলাদেশকে তারা ইসলামিক আমিরাত বানাতে পারছে না!
Related Posts

Islam’s Circular‑Logic Fallacy
Place: Cabin of a Dhaka–Sylhet-bound trainCharacters: Maulana Abdur Rahman (a responsible member of Tabligh Jamaat)Read More

ইসলামের সার্কুলার লজিক ফ্যালাসি
স্থান: ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনের কেবিনচরিত্র: মাওলানা আব্দুর রহমান (তাবলিগ জামাতের একজন দায়িত্বশীল) ও অধ্যাপকRead More


Comments are Closed