
The Popularity of Insults in Islam
ইসলামের কাছে ‘জারজ’ শব্দটি এতো প্রিয় কেন?
আপনি ইসলামের সমালোচনা করেন, নবী মুহাম্মদের অপকর্মের ফিরিস্তি দেখান, আল্লাহর অমানবিক রুপ উন্মোচন করেন আর ইসলামিস্টদের কাছে তাদের সর্বোচ্চ গালি ‘জারজ’ শব্দটি শোনেননি তা হতে পারে না। আপনার বাবা-মা থাকলে তারা বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ থাকলেও এই গালি আপনাকে অনেক ইসলামিস্ট দিবে। শুধু সাধারন ইসলামিস্টই নয়, অনেক বক্তাও হরহামেশা এটা ব্যবহার করে। আপনাকে আমাকে গালি হিসাবে এই শব্দ বলে – আমরা হয়তো কানে নেই না, কারন একজন শিশুর জন্ম পরিস্থিতি কোন গালি হতে পারে না, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তারা একজন মানব শিশুকে অবমাননা করে, ঘৃনা করে।
জন্মের পরিস্থিতির সঙ্গে মানুষের প্রতিভা, নৈতিকতা বা অবদানের কোনো সম্পর্ক নেই – নীচের এই সংক্ষিপ্ত তালিকা সেটাই দেখায়। তবে এর উদ্দেশ্য শুধু বিষয়টি স্পষ্ট করা। কোনো মানুষের মর্যাদা তাঁর সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না। যাঁরা বিখ্যাত হননি, সাধারণ জীবন কাটিয়েছেন, কিন্তু তাদের বাবা-মায়ের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল না, তাঁরাও পূর্ণ সম্মানের যোগ্য।
- লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (শিল্পী ও বিজ্ঞানী): একজন নোটারি ও এক কৃষক নারীর সন্তান, যাঁদের বিয়ে হয়নি।
- অ্যালেক্সান্ডার হ্যামিল্টন (যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের একজন ও প্রথম অর্থমন্ত্রী): ক্যারিবীয় দ্বীপে অবিবাহিত বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম।
- স্টিভ জবস (অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা): অবিবাহিত দুই শিক্ষার্থীর সন্তান, পরে দত্তক নেওয়া হয়।
- লারি এলিসন (ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা): অবিবাহিত মায়ের সন্তান, তিনিও দত্তক গৃহীত।
- উইলিয়াম দ্য কনকারার (ইংল্যান্ড জয়ী নরম্যান শাসক): নর্মান্ডির ডিউকের অবৈধ সন্তান, যিনি পরে ইংল্যান্ডের রাজা হন। ইতিহাসে তিনি “উইলিয়াম দ্য বাস্টার্ড” নামেও পরিচিত ছিলেন।
- ইরাসমাস (রেনেসাঁর বিখ্যাত মানবতাবাদী চিন্তাবিদ): এক যাজকের অবৈধ সন্তান।
- এরিক ক্ল্যাপটন (কিংবদন্তি গিটারিস্ট): অবিবাহিত কিশোরী মায়ের সন্তান।
- সারাহ বার্নহার্ট (বিশ্বখ্যাত ফরাসি অভিনেত্রী): অবিবাহিত মায়ের ঘরে জন্ম।
- ইভা পেরন (আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় নেত্রী): বাবা-মায়ের বিয়ে ছাড়াই জন্ম।
- জাঁ ল্য রঁ দালাম্বেয়ার (ফরাসি গণিতবিদ ও দার্শনিক): অবিবাহিত বাবা-মায়ের সন্তান, জন্মের পর পরিত্যক্ত।
ইরাসমাস স্কলারশিপ পেয়ে ইউরোপে পড়তে যাওয়া অনেক ইসলামিস্টকেও সেই গালিবাজদের তালিকায় দেখলেও অবাক হবেন না। তখন হয়তো আপনার মনে হতে পারে ইসলাম তাদের ইসলামিস্ট বানিয়েছে, মানুষ বানাতে পারেনি।
কোনো মানুষ কোন পরিবারে, কোন সম্পর্কের ফলে জন্মাবে, তা সে নিজে বেছে নিতে পারে না। জন্মের সময় একটি শিশুর পক্ষে ভালো বা মন্দ কিছু করা সম্ভব নয়। সে শুধু পৃথিবীতে আসে, আর তার সামনে অপেক্ষা করে একটি পুরো জীবন। এই সহজ সত্যটি ভুলে গিয়েই আমাদের সমাজে বিশেষ করে ইসলামিস্টদের কাছে “জারজ” শব্দটি সবচেয়ে নিকৃষ্ট গালি হিসেবে চালু আছে। আরও দুঃখের বিষয়, ইসলাম ধর্মের সমালোচনা করলে এই গালিটাই সবচেয়ে বেশি ছুটে আসে। বাংলাদেশে যেমন, বিশ্বের নানা প্রান্তে ইসলামপন্থী কিছু মানুষের আচরণেও এটা দেখা যায়। যার সঙ্গে মতের অমিল, তার বিশ্বাস নিয়ে যুক্তি দিয়ে লড়তে না পেরে তার মা-বাবার সম্পর্কের দিকে আঙুল তোলা হয়, সেটার বাস্তবতা না থাকলেও।
এই গালির নিজস্ব যুক্তিটাই আসলে নিজেকে খণ্ডন করে। যাঁরা আল্লাহকে স্রষ্টা ও সবকিছুর নিয়ন্তা মানেন, তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ীই প্রতিটি প্রাণের জন্ম তাঁর ইচ্ছাতেই ঘটে, আর তাকদীর আগে থেকেই নির্ধারিত। তাহলে মা-বাবা বিয়ে করেছিলেন কি না, সেই কারণে একটি শিশুর অস্তিত্ব কম বৈধ বা কম সম্মানের হয়ে যায় কীভাবে? সেই শিশুও তো একই স্রষ্টার সৃষ্টি। তাকে ছোট করা মানে তাঁর সৃষ্টিকেই ছোট করা। আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো, পিতামাতার কাজের দায় সন্তানের ঘাড়ে চাপানো কোন ন্যায়ের পরিচয়? কোনো ধর্ম বা নীতিশাস্ত্রই একজনের অপরাধের শাস্তি আরেকজনকে দিতে বলে না। অথচ এই গালি ঠিক সেটাই করে। সে একজন সমালোচককে আঘাত করতে গিয়ে বিশ্বের কোটি কোটি নিরপরাধ মানুষকে, বিশেষ করে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জন্ম নেওয়া শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের, অপমান করে। সম্ভবত অনেক গালিদাতা এটা ভেবে দেখেন না। রাগ মেটানোর জন্য তারা এমন এক ভাষা ব্যবহার করেন, যার প্রকৃত শিকার কোনো তর্কের পক্ষ নয়, বরং অসংখ্য নির্দোষ মানুষ।
সভ্যতার অগ্রগতির একটি বড় মাপকাঠি হলো, মানুষ জন্মগত পরিচয় দিয়ে অন্য মানুষের মূল্য কতটা কম মাপে। প্রতিটি মানবশিশুর জন্ম, যেভাবেই ঘটুক, বৈধ এবং আনন্দের। আধুনিক মানবাধিকারের ধারণা এ কথাই বলে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ স্পষ্ট করেছে যে জন্মের পরিস্থিতির কারণে কোনো শিশুর প্রতি বৈষম্য করা যাবে না। যিনি কাউকে তার জন্মের পরিচয় নিয়ে আক্রমণ করেন, তিনি সেই সভ্য মূল্যবোধের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।
এবার আসি মূল বিতর্কে, অর্থাৎ ধর্মের সমালোচনা ও বাক্স্বাধীনতায়। আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হলো এই বোধ যে ধারণা ও বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা যায়, আর মানুষকে সম্মান করার অর্থ এই নয় যে তার বিশ্বাসকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। মানুষের মর্যাদা আছে, কিন্তু মতবাদের কোনো মর্যাদা-অধিকার নেই। কোনো ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ, নবী বা ঈশ্বরকে যুক্তি দিয়ে প্রশ্ন করা, তীক্ষ্ণ ভাষায় সমালোচনা করা, এমনকি ব্যঙ্গ করা বাক্স্বাধীনতার অংশ। মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী ঠিক এই কারণেই ধর্মীয় বিষয়ে অপ্রিয় কথা বলার অধিকারও রক্ষা করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটিও জানিয়েছে যে ধর্মবিশ্বাসের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখালেই শাস্তি দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সমালোচনার মধ্যে ভুল তথ্য থাকতে পারে, ভাষা রূঢ় হতে পারে। তার জবাব হবে পাল্টা যুক্তি, তথ্য দিয়ে খণ্ডন, নয়তো উপেক্ষা। জেল বা মৃত্যুদণ্ড কখনোই নয়, আর মব করে আক্রমন ও হত্যা তো অসভ্য সমাজের লক্ষন। কারণ ভুল কথার চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক হলো এমন ক্ষমতা, যে ঠিক করে দেয় কোনটা বলা যাবে আর কোনটা যাবে না।
বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখায়, ব্লাসফেমি আইন এই ক্ষমতারই হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বিশ্বের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ দেশে কোনো না কোনো আকারে ব্লাসফেমি আইন আছে। পিউ রিসার্চের গবেষণা অনুযায়ী ৭৯টি দেশে এমন আইন রয়েছে, আর সাতটি দেশে ব্লাসফেমির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। পাকিস্তানের উদাহরণ সবচেয়ে আলোচিত। সেখানে রাষ্ট্র এই আইনে ফাঁসির আদেশ হলেও এখনো কাউকে ফাঁসি দেয়নি, কিন্তু শুধু অভিযোগই বারবার গণপিটুনি, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও দীর্ঘ বিচারপূর্ব কারাবাস ডেকে এনেছে। বাংলাদেশেও এমন গনপিটুনি, আগুনে পুড়িয়ে, চাপাতির কোপে হত্যার অনেক উদাহরণ আছে। সরকারি কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন যে এই ঘটনা বা মামলাগুলোর বেশিরভাগ বানোয়াট। এসব আইনের শিকার প্রায়ই সংখ্যালঘু বা ব্যক্তিগত শত্রুতার ভুক্তভোগীরা। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকার প্রতিবেদনের কথা উদ্ধৃত করে একটি সূত্র বলছে, কারাবন্দিদের অধিকাংশ মুসলিম হলেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আনুপাতিক হারে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অর্থাৎ আইনটি বিশ্বাস রক্ষার নামে বাস্তবে ক্ষমতা দখল, জমি দখল, ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর পথ খুলে দেয়। একবার “ধর্মের অবমাননা” বলে চিৎকার উঠলে উন্মত্ত জনতা আদালত, প্রমাণ বা সময়ের অপেক্ষা করে না। বাংলাদেশের মানুষও এমন ঘটনা বারবার দেখেছে।
এখানেই জন্মপরিচয়ের গালি আর ব্লাসফেমির হত্যার মধ্যে এক গভীর সংযোগ দেখা যায়। দুটোই মূলত একই মানসিকতার প্রকাশ, যেখানে ভিন্নমতকে মানুষ হিসেবে অসম্মানের যোগ্য বা বাঁচার অযোগ্য ধরা হয়। যিনি সমালোচককে “জারজ” বলেন, তিনি তাকে কথার মাধ্যমে মানবিক মর্যাদার বাইরে ঠেলে দেন। যিনি তাকে হত্যা করেন, তিনি সেই একই ঠেলে দেওয়াকে চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছে দেন। প্রথমটি গালিতে থেমে থাকে, দ্বিতীয়টি রক্তে গিয়ে শেষ হয়।
ইসলামে মুরতাদ ও নবীর অবমাননাকারীর জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। এটা সত্য যে ধ্রুপদী ফিকহের অনেক মাযহাবে এ ধরনের মত রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একবিংশ শতাব্দীতে মানবাধিকারের সার্বজনীন মানদণ্ডের সামনে সেই মত কি টিকে? কোনো শাস্তির ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় উৎস থাকলেই তা ন্যায্য হয়ে যায় না। দাসপ্রথারও একসময় ধর্মীয় ও আইনি স্বীকৃতি ছিল। সভ্যতা এগিয়েছে ঠিক সেখানে, যেখানে মানুষ বলেছে, যা অতীতে চলত তা আজ অন্যায়। বিশ্বাসের স্বাধীনতার মধ্যে বিশ্বাস ত্যাগ করার, প্রশ্ন করার, এমনকি বিশ্বাসকে অস্বীকার করার স্বাধীনতাও থাকে। যে ধর্ম তার অনুসারীদের কেবল ভয় দেখিয়ে ধরে রাখে, সে ধর্মের নিজের আত্মবিশ্বাসেই ঘাটতি আছে বলে মনে হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত দাবিটা সহজ। প্রতিটি মানুষ, জন্ম যেভাবেই হোক, সম্মানের যোগ্য। প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে প্রশ্ন করার, সন্দেহ করার, সমালোচনা করার। এবং কোনো মানুষকে তার মত বা বিশ্বাসের জন্য হত্যা করা বা হত্যার হুমকি দেওয়া একটি সভ্য সমাজে অগ্রহণযোগ্য। যাঁরা এই সত্যকে মানতে পারেন না, তাঁদের কাছে আমাদের আহ্বান, গালি নয়, যুক্তি দিয়ে কথা বলুন। কারণ যুক্তি টিকলে বিশ্বাসেরই জয় হয়, আর টিকতে না পারলে সেটা গালি বা তলোয়ার দিয়ে ঠেকানো যায় না।
Related Posts

Why Is the Word “Bastard” So Popular Among Islamists?
You criticize Islam, expose the misdeeds attributed to the Prophet Muhammad, unveil what you seeRead More

Actresses Shabana, Moushumi, Popy – Religious Sentiment and the Politics of the Public Sphere
In the history of Bangladeshi cinema, names like Shabana, Moushumi and Popy mark important chapters.Read More

নায়িকা শাবানা, মৌসুমী, পপি – ধর্মানুভূতি এবং জনপরিসরের রাজনীতি
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে শাবানা, মৌসুমী কিংবা পপির মতো নাম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তারা আশি, নব্বই ওRead More

Comments are Closed