Marriage
Special Marriage Act

Special Marriage Act

বাংলাদেশের বিশেষ বিবাহ আইন দুই ধর্মের মানুষ বা নিধার্মিকদের বিয়ের সুরক্ষা দেয়

বাংলাদেশে প্রেম বা বিয়ের আলোচনা উঠলে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসেঃ ভিন্ন ধর্মের দুজন মানুষ কি আদৌ আইনসম্মতভাবে বিয়ে করতে পারেন? সামাজিক মাধ্যমে কেউ বলেন, “ধর্ম পরিবর্তন ছাড়া বিয়ে হয়ই না”। আবার কেউ বলেন, “বিশেষ বিবাহ আইনে কাউকে ধর্ম বদলাতে হয় না, এটা সবার জানা উচিত”। দুই পক্ষই আংশিক ঠিক, আবার আংশিক ভুল। সত্যটা আইনের শব্দ ও ধারার ভেতরে, বিশেষ করে একটি ছোট ঘোষণাপত্রের ভেতরে লুকিয়ে আছে, যা অনেক আলোচনায় বাদ পড়ে যায়।

এই প্রবন্ধে আইনটির ইতিহাস, কারা এর আওতায় বিয়ে করতে পারেন, শর্ত ও প্রক্রিয়া কী, বিয়ের পর আইনি ফল কী দাঁড়ায় এবং আইনটির সীমাবদ্ধতা কোথায়, তা মূল আইনের পাঠ ধরে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

১. আইনটির পটভূমি

বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২ (১৮৭২ সালের ৩ নং আইন) ব্রিটিশ ভারতে ১৮৭২ সালের ১৮ জুলাই প্রণীত হয়। আইনের প্রস্তাবনায় বলা আছে, এর উদ্দেশ্য এমন ব্যক্তিদের জন্য বিয়ের একটি রূপ নির্ধারণ করা, যাঁরা খ্রিস্টান, ইহুদি, হিন্দু, মুসলিম, পার্সি, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন ধর্মের কোনোটিতেই বিশ্বাস করেন না। পাশাপাশি যাঁরা হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন ধর্মের অনুসারী, তাঁদের জন্যও এটি প্রযোজ্য। আইনের প্রথম ধারা অনুযায়ী এটি সমগ্র বাংলাদেশে কার্যকর। ১৯৭৩ সালের আইনে “পাকিস্তান” শব্দের জায়গায় “বাংলাদেশ” বসানো হয়, কিন্তু আইনের মূল কাঠামো বদলায়নি।

বাংলাদেশে বিয়ের আইন মূলত ধর্মভিত্তিক। মুসলিমদের জন্য মুসলিম ব্যক্তিগত আইন ও মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, খ্রিস্টানদের জন্য খ্রিস্টান বিবাহ আইন ১৮৭২, হিন্দুদের জন্য হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন ২০১২। যাঁরা এসবের কোনোটির আওতায় নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ে বিয়ে করতে পারেন না, তাঁদের জন্য নাগরিক বিয়ের (civil marriage) একমাত্র আইনি পথ এই ১৮৭২ সালের আইন।

২. কারা এই আইনে বিয়ে করতে পারেন

এই অংশটাই পুরো আলোচনার কেন্দ্র। আইনের ২ নং ধারা দুটি আলাদা দলের কথা বলে।

প্রথম দল: যাঁদের কেউই খ্রিস্টান, ইহুদি, হিন্দু, মুসলিম, পার্সি, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন ধর্মের কোনোটিতে বিশ্বাস করেন না। অর্থাৎ ধর্মে অবিশ্বাসী বা নিজের পূর্বতন ধর্ম ত্যাগ করা ব্যক্তিরা।

দ্বিতীয় দল: যাঁদের প্রত্যেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন ধর্মের কোনো একটির অনুসারী। যেমন একজন হিন্দু ও একজন বৌদ্ধ নিজ নিজ ধর্ম বজায় রেখেই এই আইনে বিয়ে করতে পারেন।

লক্ষ করার বিষয়, দ্বিতীয় দলের তালিকায় ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, ইহুদি ও পার্সি ধর্ম নেই। তাদেরকে ঘোষনা দিতে হবে তারা নিধার্মিক। যারা প্রেম করেন, বিয়ে করতে চান, তাদের জন্য এটা কোন বড় কিছু বলে মনে হয় না।

ঘোষণাপত্রঃ যেখানে ধর্ম নিয়ে প্রশ্নটি নির্ধারিত হয়

আইনের ১০ নং ধারা অনুযায়ী বিয়ের আগে বর-কনে ও তিনজন সাক্ষীকে নিবন্ধকের (Registrar) সামনে দ্বিতীয় তফসিলে নির্ধারিত ফরমে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে হয়। ঘোষণাপত্রের ভাষা দুই ধরনেরঃ হয় “আমি খ্রিস্টান, ইহুদি, হিন্দু, মুসলিম, পার্সি, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন ধর্মের কোনোটিতে বিশ্বাস করি না”, নয়তো “আমি হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন ধর্মে বিশ্বাস করি”।

এর ফল দাঁড়ায় এইঃ

  • হিন্দু ও বৌদ্ধ (বা শিখ, জৈন) দম্পতি দ্বিতীয় ঘোষণা দিয়ে নিজ নিজ ধর্ম বজায় রেখেই বিয়ে করতে পারেন।
  • হিন্দু ও মুসলিম, মুসলিম ও খ্রিস্টান, কিংবা খ্রিস্টান ও হিন্দুর মতো জুটির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ঘোষণার সুযোগ নেই, কারণ ইসলাম বা খ্রিস্টধর্ম সেই তালিকায় নেই। তাঁদের প্রত্যেককে প্রথম ঘোষণা দিতে হয়, অর্থাৎ আইনের খাতায় কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাস করেন না বলে স্বাক্ষর করতে হয়।

দ্য ডেইলি স্টারের “Your Advocate” কলামে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর খান জয় স্পষ্ট লিখেছেন, ভিন্ন ধর্মের দুজন প্রাপ্তবয়স্ক এই আইনে বিয়ে করতে পারেন, কিন্তু নিজেদের অবিশ্বাসী (non-believer) ঘোষণা করার পরই। একই কলামে বলা হয়েছে, মেয়েটি নিজেকে হিন্দু ঘোষণা করলে তাঁর পক্ষে মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করা সম্ভব নয়, কারণ ঘোষণাপত্রের দ্বিতীয় অংশে ইসলাম নেই। ২০১০ সালের আরেকটি কলামে একজন আইনজীবী এমন এক দম্পতিকে ব্যাখ্যা করেছেন, যাঁরা এই আইনে বিয়ে করে ঘরে নিজ নিজ ধর্ম পালন করেন। তাঁর মতে, ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরের কারণে আইনি নথিতে তাঁরা কোনো ধর্মেরই অনুসারী নন। তিনি আইনটি সংশোধনের দাবিও জানিয়েছেন।

অতএব “ধর্ম পরিবর্তন করতে হয় না” কথাটি আক্ষরিক অর্থে হিন্দু-মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সত্য নয়। ধর্ম বদলে অন্য ধর্ম নিতে হয় না, এটা সত্য। কিন্তু আইনি ঘোষণায় নিজের ধর্ম অস্বীকার করতে হয়, আর সেটাই আসলে মূল আইনি শর্ত। কেউ ব্যক্তিগত জীবনে, বিশ্বাসে ও আচরণে নিজের ধর্ম পালন করতে পারেন, কিন্তু আইনি রেকর্ডে ওই ঘোষণা থেকে যায়। এর আইনি পরিণতি নিয়ে পরে আলোচনা আছে।

৩. বিয়ের শর্তসমূহ

আইনের ২ নং ধারা চারটি শর্ত দেয়ঃ

  1. একবিবাহ: বিয়ের সময় কোনো পক্ষেরই জীবিত স্বামী বা স্ত্রী থাকা চলবে না। অবিবাহিত, বিধবা/বিপত্নীক কিংবা বিবাহবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিরা বিয়ে করতে পারেন। কেউ বিবাহিত অবস্থায় এই আইনে আবার বিয়ে করলে সেই বিয়ে বাতিল (void), এবং ১৫ নং ধারা অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৪৯৪ বা ৪৯৫ ধারায় অপরাধ হয়। ১৬ নং ধারা অনুযায়ী এই আইনে বিয়ে করার পর স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকতে আবার বিয়ে করলে, যে ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন, একই শাস্তি প্রযোজ্য। এই কারণে বহুবিবাহের সুযোগ এই আইনে নেই।
  2. বয়স: আইনের লিখিত পাঠে ছেলের বয়স অন্তত ১৮ ও মেয়ের অন্তত ১৪ লেখা আছে, যা ১৮৭২ সালের পুরনো বিধান। তবে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে ২১ এবং মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ না করলে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক। ওই আইনে বিশেষ বিবাহ আইনের অধীনে নিযুক্ত নিবন্ধককেও বাল্যবিবাহ নিবন্ধনের জন্য দণ্ডের আওতায় আনা হয়েছে। বাস্তবে তাই বর ২১ ও কনে ১৮ বছরের নিচে হওয়া উচিত নয়।
  3. অভিভাবকের সম্মতি: আইনের পাঠ অনুযায়ী ২১ বছর পূর্ণ না হওয়া কোনো পক্ষের পিতা বা অভিভাবকের সম্মতি লাগে, এবং ১০ নং ধারা অনুযায়ী তিনি ঘোষণাপত্রেও স্বাক্ষর করেন (বিধবার ক্ষেত্রে ছাড়া)। অর্থাৎ ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী কনের ক্ষেত্রে এই শর্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ১৯৭৫ সালের সাবালকত্ব আইনে ১৮ বছরে সাবালক হওয়ার বিধানের সঙ্গে এর সংঘাত আছে। এই বিষয়ে নিবন্ধকের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া উচিত।
  4. রক্ত ও বৈবাহিক সম্পর্ক: দুজনের মধ্যে এমন কোনো রক্তের বা বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা চলবে না, যা তাঁদের কারও ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনে বিয়ে অবৈধ করে। আইনের দ্বিতীয় প্রভিসো অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক পরম্পরায় ‘প্রপিতামহের পিতা বা মাতা’-র চেয়ে নিকটবর্তী কোনো সাধারণ পূর্বপুরুষ থাকলে, অথবা একজন অন্যজনের সরাসরি উর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ বা সেই পূর্বপুরুষের ভাইবোন হলে, বিয়ে নিষিদ্ধ।

৪. বিয়ের প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে

ধাপ ১ঃ নিবন্ধকের কাছে নোটিশ (ধারা ৪)
বর বা কনের যেকোনো একজন লিখিতভাবে নোটিশ দেন। নোটিশ দিতে হবে এমন নিবন্ধকের কাছে, যাঁর এলাকায় অন্তত একজন নোটিশ দেওয়ার আগে ১৪ দিন বসবাস করেছেন।

ধাপ ২ঃ নোটিশ বহিতে লিপিবদ্ধ (ধারা ৫)
নিবন্ধক নোটিশ ফাইলে রাখেন এবং একটি সরকারি “বিবাহ নোটিশ বই”-তে তার প্রতিলিপি তুলে রাখেন। যে কেউ বিনা ফিতে এই বই দেখতে পারেন।

ধাপ ৩ঃ ১৪ দিনের অপেক্ষা ও আপত্তির সুযোগ (ধারা ৬–৯)
নোটিশের ১৪ দিন পর বিয়ে হতে পারে, যদি কেউ আপত্তি না জানান। যে কেউ ২ নং ধারার চার শর্তের কোনোটি লঙ্ঘিত হচ্ছে, এই কারণে আপত্তি করতে পারেন। আপত্তি এলে নিবন্ধক আরও ১৪ দিন অপেক্ষা করেন, এর মধ্যে আপত্তিকারী দেওয়ানি আদালতে ঘোষণামূলক মামলা করলে আদালতের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে স্থগিত থাকে। আপত্তি যুক্তিসংগত ও সরল বিশ্বাসে না হলে আদালত আপত্তিকারীকে জরিমানাও করতে পারেন। উল্লেখ্য, আপত্তি শুধু এই চার শর্তের ভিত্তিতেই চলে; কারও ধর্মীয় বা সামাজিক অনুভূতি আপত্তির আইনি ভিত্তি নয়।

ধাপ ৪ঃ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর (ধারা ১০)
বর-কনে ও তিনজন সাক্ষী নিবন্ধকের সামনে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। নিবন্ধক তাতে প্রতিস্বাক্ষর দেন। ঘোষণায় মিথ্যা তথ্য দিলে ২১ নং ধারা অনুযায়ী দণ্ডবিধির ১৯৯ ধারা অনুসারে শাস্তি হতে পারে।

ধাপ ৫ঃ বিয়ের অনুষ্ঠান (ধারা ১১, ১২)
নিবন্ধক ও তিন সাক্ষীর সামনে বিয়ে হয়। যেকোনো রীতিতে বিয়ে হতে পারে, শর্ত শুধু এটুকু যে প্রত্যেকে অন্যজনকে বলবেন, “আমি তোমাকে আমার বৈধ স্ত্রী (বা স্বামী) হিসেবে গ্রহণ করলাম।” নিবন্ধকের অফিসে বা অফিসের যুক্তিসংগত দূরত্বের মধ্যে অন্য কোনো স্থানে বিয়ে হতে পারে।

ধাপ ৬ঃ সনদ (ধারা ১৩, ১৪)। বিয়ের পর নিবন্ধক “বিবাহ সনদ বই”-এ সনদ লেখেন, যাতে বর-কনে ও তিন সাক্ষী স্বাক্ষর করেন। এই বই সত্যতার সাক্ষ্য হিসেবে আদালতে গ্রহণযোগ্য, এবং আবেদন করে ফি দিয়ে সত্যায়িত প্রতিলিপি পাওয়া যায়। আইনে ১৩ক ধারা অনুযায়ী নিবন্ধক নির্দিষ্ট সময় পরপর এসব তথ্য জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ নিবন্ধন মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠান।

কোথায় বিয়ে হয়?

আইন সরকারকে এক বা একাধিক নিবন্ধক নিয়োগের ক্ষমতা দিয়েছে। জানা তথ্য অনুযায়ী বাস্তবে কার্যক্রম মূলত পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলী এলাকার কার্যালয়ে হয়, আর কিছু আইনজীবী বিশেষ বিবাহ নিবন্ধক হিসেবে কাজ করেন। নিবন্ধকদের নাম, ঠিকানা ও ফি সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। তাই বিয়ের আগে আইন মন্ত্রণালয় বা নিবন্ধকের কার্যালয় থেকে হালনাগাদ তথ্য যাচাই করুন, কোনো ফেসবুক পোস্টের ঠিকানার ওপর শুধু নির্ভর করবেন না। কাজী অফিস বা হিন্দু বিবাহ নিবন্ধকের কার্যালয়ে এই আইনের বিয়ে হয় না, কারণ তাঁরা অন্য আইনের অধীনে নিযুক্ত।

মূল ঐতিহ্যবাহী কার্যালয় (পুরান ঢাকা) – ঠিকানাঃ ২/৩, লয়াল স্ট্রিপ (ব্রাহ্মসমাজ ভবন), পাটুয়াটুলী, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০ (পুরান ঢাকার সদরঘাট/পাটুয়াটুলী এলাকায় অবস্থিত)।

৫. বিয়ের পরের আইনি পরিণতি

বিয়ের ছবি আর সনদই শেষ কথা নয়। এই আইনে বিয়ের পর কয়েকটি বিষয় অন্যরকম হয়ে যায়, আর সেগুলো আগে জানা থাকলে পরে বিপদে পড়তে হয় না।

বিবাহবিচ্ছেদ
আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী এই আইনে হওয়া বিয়ের ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদ আইন, ১৮৬৯ প্রযোজ্য। অর্থাৎ বিচ্ছেদ ধর্মীয় রীতিতে হয় না, আদালতের মাধ্যমে আইনে নির্ধারিত কারণে হয়।

উত্তরাধিকার
২৪ ধারা অনুযায়ী হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন ধর্মের যে ব্যক্তি এই আইনে বিয়ে করেন, তাঁর এবং এই বিয়ের সন্তানের সম্পত্তির উত্তরাধিকার উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ নিজ ধর্মের ব্যক্তিগত আইনের জায়গায় একটি ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রযোজ্য হয়। ধর্মে অবিশ্বাসী ঘোষণা দেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আদালত বাস্তবে উত্তরাধিকার কীভাবে দেখবে, তা নিয়ে আমি স্পষ্ট ও হালনাগাদ সূত্র পাইনি। সম্পত্তি জড়িত থাকলে আগেভাগে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

যৌথ পরিবার ও দত্তক
২২ ধারা অনুযায়ী অবিভক্ত পরিবারের কোনো হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন সদস্য এই আইনে বিয়ে করলে ধরা হয় যে তিনি ওই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। ২৫ ধারা অনুযায়ী তাঁর দত্তক নেওয়ার অধিকার থাকে না। এসব বিধানের ফলে পারিবারিক সম্পত্তির হিসাবেও প্রভাব পড়তে পারে।

সন্তানের ধর্মীয় পরিচয়
আমার পড়া আইনের পাঠে সন্তানের ধর্ম নির্ধারণের কোনো সরাসরি বিধান নেই। ১৮ ধারা শুধু এটুকু বলে যে এই বিয়ের সন্তানরা নিজেরা এই আইনে বিয়ে করলে নিষিদ্ধ রক্তসম্পর্কের প্রশ্নে পিতার আইন প্রযোজ্য হবে। তাই সন্তানের পরিচয়, অভিভাবকত্ব বা স্কুলে ধর্মশিক্ষার মতো বিষয়ে পরিবারকে নিজেদের মধ্যে আগে থেকেই বোঝাপড়া করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

মিথ্যা ঘোষণার ঝুঁকি
২১ ধারা অনুযায়ী ঘোষণাপত্রে জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দিলে দণ্ডবিধির ১৯৯ ধারা অনুযায়ী অপরাধ হয়। সেজন্য ঘোষণাপত্রের ভাষা না বুঝে সই করা উচিত নয়।

৬. সীমাবদ্ধতা ও সংস্কারের দাবি

আইনটি দেড় শতাব্দীর পুরোনো। এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আইনজীবীরা আগেও লিখেছেন।

প্রথমত, ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নটি। দ্য ডেইলি স্টারের ২০০৯ সালের একটি আইনি লেখায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীনে বিয়ের ক্ষেত্রে ধর্ম ত্যাগ করতে হয় এবং এ বিষয়ে ১৮ ডিএলআর ৫০৯ মামলার নজির আছে। ২০১০ সালে একই পত্রিকার আইন-বিষয়ক কলামে একজন আইনজীবী মন্তব্য করেছেন, এই আইন হিন্দু-মুসলিম বিয়েকে ধর্ম অক্ষুণ্ণ রেখে অনুমতি দেয় না। তিনি আইনটি সংশোধনের দাবিও জানিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত আইনের সঙ্গে সংঘাত। বাংলাদেশে বিয়ে ও পারিবারিক বিষয় মূলত ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনে চলে। ব্যারিস্টার ওমর খান জয় দ্য ডেইলি স্টারে লিখেছেন, দুজন নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ধরে রাখলে বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় তাঁদের বিয়ে অনুমোদিত নয়। আইনের ফাঁক এখানেই। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পূর্ণ আইনি স্বীকৃতিসহ নিজ নিজ ধর্মীয় পরিচয় ধরে রেখে বিয়ে করতে পারবেন, এমন নাগরিক আইন বাংলাদেশে এখনো নেই।

তৃতীয়ত, বয়সের বিধানে অসংগতি। ১৮৭২ আইনের মূল পাঠ, ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন এবং ১৯৭৫ সালের সাবালকত্ব আইনের মধ্যে মিল নেই। ২০১৭ সালের আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালতের অনুমতি নিয়ে কম বয়সে বিয়ের বিধানও আছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচিত হয়েছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদনও বয়সসীমা নিয়ে আইনি অসংগতির কথা বলেছে।

চতুর্থত, সামাজিক বাস্তবতা। আইনি পথ থাকলেও পরিবার ও সমাজের চাপ অনেক দম্পতির জন্য আসল বাধা। একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশি দম্পতিদের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় এই চাপের কথা উঠে এসেছে। আইন জানা তাই প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়।

৯. উপসংহার

বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২ বাংলাদেশে সত্যিই বহাল আছে এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের জন্য এটাই নাগরিক বিয়ের একমাত্র আইনি পথ। যাঁরা বলেন “এমন বিয়ে হয়ই না”, তাঁদের কথা ভুল। আবার যাঁরা বলেন “কাউকে কিছুই ছাড়তে হয় না”, তাঁদের কথাও পুরো সত্য নয়। হিন্দু-মুসলিম যুগলকে ঘোষণাপত্রে কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করার কথা লিখতে হয়, আর বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার ও সন্তানের পরিচয়ের মতো বিষয়ে এর প্রভাব পড়ে।

এই আইনের সুবিধা হলো আইনি স্বীকৃতি, সনদ আর একবিবাহের সুরক্ষা। দাম হলো ঘোষণাপত্রের শর্ত আর পরবর্তী আইনি জটিলতা।

যাঁরা এই পথে বিয়ে করতে চান, তাঁদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শঃ

  1. বিয়ের আগে নিবন্ধকের কার্যালয় থেকে নোটিশ ফর্ম ও ঘোষণাপত্রের ফর্ম নিয়ে পড়ে দেখুন।
  2. নিজ নিজ ধর্ম ও ঘোষণার ধরন কী হবে, তা জেনে নিন এবং এর আইনি ফল নিয়ে দুজন একসঙ্গে আলোচনা করুন।
  3. কার্যালয়ের ঠিকানা, ফি, কাগজপত্র ও সাক্ষীর শর্ত সরাসরি যাচাই করুন।
  4. সম্পত্তি, সন্তান বা বিদেশ যাত্রার পরিকল্পনা থাকলে পারিবারিক আইনের অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
  5. বিয়ের পর সনদের সত্যায়িত অনুলিপি সংগ্রহ করে নিরাপদে রাখুন।

Related Posts

Special Marriage Act

Bangladesh’s Special Marriage Act Provides Legal Protection for Interfaith Couples and Non-Religious Individuals to Marry

When discussions of love or marriage arise in Bangladesh, one question keeps coming back: canRead More

Islam and Bengali Culture

Why do Islamist clerics consider Bengali cultural festivals their enemy?

This year, unlike many previous years, the major Hindu religious festival Durga Puja in BangladeshRead More

Islam and Bengali Culture

ইসলামিস্ট মোল্লারা কেন বাঙালিদের আনন্দ উৎসবকে তাদের শত্রু মনে করে?

এবার বাংলাদেশে অন্যবারের তুলনায় বেশ শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর পরিবেশে হিন্দু ধর্মের বড় ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজা হয়েRead More

Comments are Closed