
Responsibilities of a Teacher !
একটি সমাজের গতি জড়তা ও শিক্ষকের ভূমিকা
আমাদের দেশে শিক্ষকের ভূমিকা আর যাই হোক, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক পথে নেই। সেই ছোট থেকেই গাদা গাদা মুখস্ত করানোই তাদের প্রধান কর্তব্য ! অথচ শিক্ষকের মূল কাজটি হল একজন ছাত্রের ভিতরে সুপ্ত বারুদকে খুঁজে বের করা, সেই বারুদে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া। যদি এই কাজটি সঠিকভাবে একজন শিক্ষক করতে পারেন তবে সেই ছাত্র সারাজীবন নিজের আলোতেই উজ্জ্বল হবে। সব মানুষের ভিতরেই কিছু না কিছু সুপ্ত বারুদ থাকে। যে জাতি সেগুলোকে আইডেন্টিফাই করতে পারে ও তাকে কাজে লাগাতে পারে তাদের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারে না। যে কেউ এই শিক্ষকের ভূমিকা নিতে পারেন।
সবাই কি শিক্ষক হতে পারেন ? হ্যাঁ, অবশ্যই। সবাই শিক্ষক আবার সবাই ছাত্র। ধরুন আপনি বেশ বোরড হয়ে গেছেন। কোনো বন্ধু বললো, ঐ মুভিটা দেখেছিস, বা ঐ বইটা পড়েছিস? হয়তো সেটা এগিয়েও দিলো সে, বা দেখলেন আপনার সংগ্রহেই ছিলো সেসব। আপনি দেখতে-পড়তে শুরু করলেন। অমনি সেই বোরডোম ভেঙ্গে সময়টা বেশ ভালো কাটতে লাগলো। এবং এর ধারাবাহিকতায় বই পড়ার বা মুভি দেখার একটা অভ্যাসই গড়ে উঠলো আপনার। এসব কাজে হয়তো অনেকেই মজা পাবে না। কিন্তু আপনার মধ্যে প্রকৃতিগত ভাবেই ঐ দিকে ঝোক ছিলো। কিন্তু শুরুতে জড়তায় আটকে ছিলেন, বন্ধুটি স্রেফ একটু ধাক্কা দিয়েছে ওদিকে। বন্ধুটি কিন্তু একজন শিক্ষকের কাজটাই করল, অন্যভাবে বলতে গেলে সে আপনাকে জাগিয়ে তুলল।
সেই জাতি বা সমাজ পিছিয়ে থাকে যাদের জড়তা ভাঙ্গার মত কোন শিক্ষক থাকে না, নেতা থাকে না। মানুষের মজা হলো, এ ধরনের জড়তায় সে শুধু একক ভাবেই আটকায় না, পুরো জাতি গোষ্ঠি মিলে আটকে থাকে অনেক সময়। সে কারণেই তো সাম্যের কথা বলে বিলিয়ন জনসংখ্যার পুরো একটা জাতিকে শ্রমদাস বানিয়ে ফেলা সম্ভব। অলিক লোভ আর ভীতির মিশ্রন দেখিয়ে বানিয়ে ফেলা সম্ভব উগ্রপন্থী। এ অবস্থায় যেসব মানুষ থাকে তাদের পুরো জীবন কেটে যায়, নিদারুণ অসহায়ত্বে। হাতের কাছেই হয়তো ছিলো মুক্তি, কিন্তু ছোট্টো করে সেদিকে ধাক্কা দেওয়ার কেউ ছিলো না। হয়তো প্রশ্ন আসবে, পুরো একটা জাতিকে কি কোনো একক ব্যক্তি ধাক্কা দিতে পারে? আসলে পারে। হয়তো সরাসরি না। কিন্তু একটা ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ একক ভাবেই সূচনা করা সম্ভব। (মানে একজন অল্প কয়েকজনকে দিলো ধাক্কা, তারা আরো তেমন অনেককে, এভাবে জ্যামিতিক হারে) ইতিহাসে তার অনেক নজির আছে। মানুষ এমনকি কোনো একক মানুষও বিশাল সব পরিবর্তনের সম্ভাবনা ধারণ করে।
এখানে আরেকটা প্রশ্ন আসবে, ‘কেন?’ কেন আমি আর পাঁচজনের জীবনকে আমার নিজস্ব ধারনা মোতাবেক পালটাতে সচেষ্ট হবো? এর সোজা সাপ্টা উত্তর হলো মজা পাবো তাই। যখন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত আশেপাশের মানুষ মারা যায়, যখন কোনো মুর্খের উস্কানিতে আপাত সাধারণ মানুষরাই নিজেদের মনুষত্ব বিসর্জন দিয়ে চোখের সামনে হয়ে ওঠে দাতাল হায়েনা, যখন অভাব অনটনে আর সুস্থ পরিবেশের অভাবে মানুষ হয়ে ওঠে অসৎ, শিশুরা মারা যায় বিনা চিকিৎসায়, দেশের প্রধানতম মানুষেরা আক্রান্ত হয় উগ্রপন্থির হাতে, চুরি যেতে থাকে রক্তের দামে পাওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা, স্রেফ একটু বুদ্ধি খাটালেই যে সমস্যা গুলো সমাধান করা সম্ভব, সেগুলো নিয়ে মাথা খাটানো, এমন কি জানা সমাধান প্রোয়োগ করার সদিচ্ছাও থাকেনা প্রয়োগকারী সস্থার। তখন ভালো লাগে না। তীব্র হতাশা আর ক্রোধ ভর করে। আশেপাশের হাজারো মানুষের চোখে যখন সেই সুতীব্র হতাশারই ছবি দেখি তখন বড্ড অসহায় মনে হয় নিজেকে। পরাজিত, আর মৃত মনে হয়। এমনকি ভাগ্যক্রমে অন্ন-বস্ত্রের আপাত নিশ্চয়তা থাকার পরেও। আমরা মানুষরা এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছি যে গুটিকয় কুলাঙ্গার বাদে বাকি সবাই, আর সবাইকে নিয়ে হাসি আনন্দে উৎসবে, এমনকি দুঃখ-বেদনায় একাকার হয়ে বাঁচতে চাই। আমরা তো একাকী দ্বীপ নই। সবাইকে মিলেই আমরা। মানুষের মন আর তার চিন্তা-চেতনা যে গভীরতম আনন্দের উৎস হতে পারে, তার খোঁজ অন্যকে দেবার চেষ্টা করব না ? আর এই খোঁজ দিতে পারাই একজন মানুষের শিক্ষক হয়ে ওঠা।
এখন ‘নিজস্ব ধারনা’ মোতাবেক কথাটা নিয়েও প্রশ্ন আসতে পারে। আসলে মানুষের কোন ধারণাই একেবারে নিজস্ব নয়। আবার মানুষ কোনকিছু হুবহু কপি করতে গঠনগত ভাবেই অক্ষম, ফলে অন্যের ধারনাও সে নিজের মত করে একটু আধটু বদলে নেয়। ওটাই তার সৃষ্টিশীলতা। আর একটা মানুষের প্রচেষ্টা তো তার নিজস্ব বা যে ধারণাটাকে সে আপন করে নিয়েছে, যে ধারণা শুনে মনে হয়েছে, ‘আরে! এটাই তো খুঁজছি’, তেমন ধারনার আলোকেই হবে। মূল কথা হল, কেউ তার নিজস্ব ধারণা অন্যের উপর জোর করে চাপিয়ে না দিলেই হল। এই চাপিয়ে দিতে গিয়েই মানুষ হয় উগ্র, সে তখন আর ভিন্নমত সহ্য করার মত মনুষ্যত্ব ধরে রাখতে পারে না। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, ভিন্নমত সহ্য করতে পারার মত সহনশীলতা যদি মানুষের ছোটবেলাতেই মাথায় গেঁথে দেয়া যায় তবে সে জাতি সভ্য হতে বাধ্য। সুন্দরতম চিন্তা, চেতনা বা ধারনাগুলোর মধ্যে এক ধরনের আলো থাকে, মুক্তি দেবার ক্ষমতা থাকে। ওর সন্ধান কেউ পেলে তাকে আর জোর করতে হয় না। একটা প্রায় অপ্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেই। একটা অফিসের কফি মেশিনে কম করেও ১০ রকম কফি বানানো যায়। কিন্তু আপনি হয়ত সেটা জানতেনই না। গত প্রায় দেড় বছর যাবত, একটা বোতাম চেপে কিছু এস্প্রেসো নিয়ে চলে এসেছেন নিজের টেবিলে। ভাবতেন ওটা এসপ্রেসো মেশিন। এই মাত্র সেদিন একজন দেখিয়ে দিল, কিভাবে কাপাচিনো থেকে শুরু করে আরো নয় রকম কফি বানানো সম্ভব!
যে লোকটা একটা নিরানন্দ একঘেয়ে কাজ করতে করতে বিতৃষ্ণ হয়ে উঠছে, যে ছাত্রটা পড়ালেখাই করছে, ঐ রকম একটা ‘জানা একঘেয়েমির’ জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে করতে, এমন ভাবার কারণ নেই যে সে ওতেই সুখী (হয়তো কেউ কেউ) । কিন্তু তাদেরকে দেখিয়ে দেওয়া দরকার যে পৃথিবীতে আরো অনেক রকম কফি আছে। একটু চাইলেই সে মুক্তি পেতে পারে একঘেয়েমি থেকে। পার্থক্য হলো, ‘দেয়ার ইজ নো কফি মেশিন!’ এখানে আমাদের কফি মেশিন আমরাই। তাই এই ‘দেখিয়ে দেওয়ার’ কাজটা মোটেই সহজ নয়। কিন্তু আমি নিশ্চিত এই কঠিন আর কষ্টসাধ্য কাজটা করেও অনেকে অপার আনন্দ পাবে। এই লেখাটা যিনি এতক্ষন মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন, বিশ্বাস করুন, আপনার ভিতরেও আছে অন্যের সেই সুপ্ত, ঘুমন্ত মানুষটাকে জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা ! বুকে হাত দিয়ে বলুন তো ‘নেই’ !
Related Posts

জিন্নাহ ছিলেন আপদমস্তক একজন সেকুল্যার নাস্তিক, অথচ ধর্মীয় কার্ড খেলে তিনি দেশ ভাগ করেন!
ভারতবর্ষে লেখালিখির কারনে ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে প্রথম কোন হত্যাকান্ড ঘটে কলকাতায়, ১৯২৪Read More

Bengali Women and Their Love for Jewelry: History, Modern Trends, and the Culture of Excess
When the first gold bangle was put on Nalini Devi’s wrist, she was only seven.Read More

বাঙালি নারীর গহনা প্রীতি – ইতিহাস থেকে বর্তমান ও বাড়াবাড়ির সংস্কৃতি
নলিনী দেবীর হাতে যখন প্রথম সোনার বালা পরানো হয়েছিল, তখন তাঁর বয়স মাত্র সাত। বিয়েরRead More

Comments are Closed