Myths
Religious Myths & Animal Aggression

Religious Myths & Animal Aggression

ধর্মীয় বিশ্বাসের মিথ হিংস্র প্রাণীদের সামনে আপনার জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে

বাগেরহাটের হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন ঠাকুর দীঘিতে সম্প্রতি একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। দীঘিতে রাখা কুমির একটি শিশুকে টেনে নিয়ে যায়, পরে সেই শিশুর লাশ উদ্ধার হয়। এর কয়েকদিন আগেই একটি পঙ্গু কুকুরকে ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিরের সামনে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় সারা দেশে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছিল।

ধর্মীয় বিশ্বাসের মিথ কি হিংস্র প্রাণীদের সামনে মানুষকে নিরাপত্তা দেয়? ধর্মীয় পরিবেশে পোষা হিংস্র প্রাণীর উপর আমাদের “আধ্যাত্মিক আস্থা” কি যুক্তিসংগত? বিশ্বাস কি প্রাণীর সহজাত প্রবৃত্তিকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে?

লোকমুখে শোনা যায়, ধলা পাহাড় ও কালা পাহাড় নামের সেই দুই পুরনো কুমির মাজারের খাদেমদের ডাকে তীরে আসত, কখনো মানুষকে আক্রমণ করত না। এই গল্পটি সত্য হতেও পারে — দীর্ঘকাল মানুষের সান্নিধ্যে বড় হওয়া কিছু প্রাণী অপেক্ষাকৃত কম আক্রমণাত্মক আচরণ করে। কিন্তু এটি একটি ব্যতিক্রম, কোনো নিয়ম নয়। আর এই ব্যতিক্রমকে আধ্যাত্মিক শক্তির প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া এবং নতুন প্রাণীর ক্ষেত্রেও সবসময় একই প্রত্যাশা রাখা — এটিই বিপদের মূল কারণ।

প্রথমবার ভারতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকারের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শিমলার হনুমান টেম্পল ভ্রমনের সময় আমার এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল। উঁচু পাহাড়ের ধারে বেঞ্চে বসা ছিলাম, পিছনে গভীর খাদ, সেখানে কোন মানুষের আগমন সম্ভব না। হঠাৎ চমকে উঠে বুঝলাম আমার সানগ্লাসটা কেউ একজন পিছন থেকে দু হাত দিয়ে সরিয়ে নিচ্ছে। সটকে পড়ে আবিষ্কার করলাম এক বানর মিয়া ওটা নিয়ে সরে পড়েছে। কোন একটা দূর্ঘটনা হতে পারতো, চোখের ক্ষতি হতে পারতো, হয়নি সে যাত্রায়!

ধর্মীয় স্থানে হিংস্র প্রাণী ও মানুষের ক্ষয়ক্ষতি

প্রাচীন মিশরঃ সোবেক দেবতার কুমির ও নীল নদের রক্ত

হাজার বছর আগে প্রাচীন মিশরীয়রা কুমিরকে দেবতা মানত। “সোবেক” নামক কুমির-দেবতার মন্দিরে জীবন্ত কুমির পালা হত। ফারাওরা বিশ্বাস করতেন, কুমিরকে পূজা করলে নীল নদ রক্ষা পাবে, ফসল ফলবে, রোগ সারবে। কুমিরের পূজারি দল নিয়মিত তাদের মাংস, রুটি ও মদ খাওয়াত।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। প্রাচীন মিশরীয়রা কুমিরকে দেবতার মর্যাদা দিয়েছিল কারণ কুমির তাদের জীবনের জন্য প্রকৃতপক্ষে মারাত্মক বিপদ ছিল — কোনো রূপক অর্থে নয়। নীল নদে কুমিরের আক্রমণে বহু মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা ঐতিহাসিক রেকর্ডে রয়েছে। মিশরীয়রা ভেবেছিল পূজা করলে কুমির আক্রমণ করবে না — কিন্তু কুমির তা মানেনি।

আজও মিশরে কুমিরের হামলায় বছরে প্রায় ২০০ জন মানুষ মারা যায়। প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস কুমিরের প্রবৃত্তিকে পরিবর্তন করতে পারেনি — শুধু মানুষের মনে একটি মিথ্যা নিরাপত্তাবোধ তৈরি করেছিল।

কেরালার মন্দিরঃ “নিরামিষাশী” কুমির বাবিয়া

ভারতের কেরালা রাজ্যের কাসারগোড জেলায় প্রায় তিন হাজার বছরের পুরনো শ্রী অনন্তপদ্মনাভ স্বামী মন্দিরে “বাবিয়া” নামক একটি কুমির ছিল। ১৯৪০-এর দশক থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এটি মন্দিরের পুকুরে বাস করত। ভক্তরা বিশ্বাস করতেন এটি “দেবতার কুমির” এবং সম্পূর্ণ নিরামিষাশী — শুধু পুরোহিতের দেওয়া ভাত ও গুড় খেয়ে বাঁচে। শিশুরাও এর গায়ে হাত দিত আশীর্বাদ নেওয়ার জন্য।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাস্তবে পুকুরে পর্যাপ্ত মাছ ছিল এবং এটি মাছ খেয়েই বেঁচে ছিল। প্রাণীটি “দৈবিক শক্তির” কারণে নয়, বরং বয়স, পরিবেশগত পরিচিতি ও নিয়মিত খাবার পাওয়ার কারণে অপেক্ষাকৃত শান্ত ছিল। এটি কখনো আক্রমণ না করলেও এর ঘটনা একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করেছে — মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে সরীসৃপের সামনে শিশু নিয়ে যাওয়াকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করেছে।

বালির উলুওয়াতু মন্দিরঃ “পবিত্র” বানরের আক্রমণ

ইন্দোনেশিয়ার বালিতে উলুওয়াতু মন্দিরে প্রায় ৬০০ ম্যাকাক বানর বাস করে। বালিনিজ হিন্দু ঐতিহ্যে এদের মন্দিরের রক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ধর্মীয় পবিত্রতার কারণে এই বানরদের কেউ বিতাড়িত করে না।

বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পর্যটকদের চোখের চশমা, মোবাইল ফোন, ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে শারীরিক আঘাত পর্যন্ত নানা ঘটনা নিয়মিত ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র দুই মাসের পর্যবেক্ষণে পর্যটক ও বানরের মধ্যে ৪২০টি “আক্রমণাত্মক মিথস্ক্রিয়া” রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৮ শতাংশ ছিল শারীরিক সংঘর্ষ, এবং ৪৮টি ক্ষেত্রে ত্বক ভেদ করে কামড় দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

আরও উদ্বেগজনক হলো, ২০০২ সালের একটি সমীক্ষায় মন্দিরের ৫০ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন তারা বানরের কামড় বা আঁচড়ের শিকার হয়েছেন। বানরের রক্তে রেবিস ও হার্পিস বি-সহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের জীবাণু পাওয়া গেছে।

ভারতে সাপের পূজা ও মৃত্যু

ভারতে কোবরা সাপকে শিব, গণেশ ও বিষ্ণুর অলংকার হিসেবে পূজা করা হয়। অনেক গ্রামে সাপের গর্তকে দেবীর আবাস মনে করা হয়। ধর্মীয় কারণে অনেকেই বাড়িতে কোবরার মতো বিষধর সাপ দেখলেও তাড়ায় না।

কিন্তু ভারত বিশ্বের সর্বোচ্চ সাপের কামড়ে মৃত্যুর দেশগুলোর একটি। প্রতি বছর ভারতে সাপের কামড়ে ৪৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ মানুষ মারা যায়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঘটে মানুষ সাপকে “পবিত্র” ভেবে সময়মতো চিকিৎসা নেয় না বা সাপকে সরিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকে, এই কারনে।

বিজ্ঞান কী বলেঃ প্রাণীর সহজাত প্রবৃত্তি ও আধ্যাত্মিকতা

প্রাণীবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি সম্পূর্ণ স্পষ্টঃ

কুমিরের ক্ষেত্রেঃ কুমির একটি “অপরিবর্তিত” প্রজাতি — বিবর্তনীয়ভাবে কোটি বছর ধরে এদের শিকার-প্রবৃত্তি একই রয়েছে। এরা ক্ষুধার্ত হলে, ভয় পেলে, বা নিজেদের এলাকায় অনুপ্রবেশ অনুভব করলে আক্রমণ করে। কোনো মানবিক সম্পর্ক বা ধর্মীয় অনুভূতি এই প্রতিক্রিয়া বন্ধ করার ক্ষমতা রাখে না।

কোনো কুমির যদি দীর্ঘকাল আক্রমণ না করে, এর কারণ হতে পারেঃ

  • পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া
  • বয়সের কারণে ধীরগতি
  • পরিচিত পরিবেশে অভ্যস্ততা
  • নির্দিষ্ট মানুষের কণ্ঠস্বর ও গন্ধে অভ্যাস

কিন্তু এর কোনোটিই গ্যারান্টি নয়। একটি নতুন পরিবেশে আনা কুমির, বা একটি অপরিচিত মুখ দেখলে, বা একটি শিশুর ছোট শরীর দেখলে — প্রবৃত্তি জেগে উঠতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। কোন ধর্মীয় বিশ্বাস, মিথ, আধ্যাত্মিকতা সেখানে কাজ করে না।

বিশ্বব্যাপী একটি প্যাটার্ন

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একই প্যাটার্ন দেখা যায়ঃ

  • মৌরিতানিয়া ও পশ্চিম আফ্রিকাঃ পশ্চিম আফ্রিকান কুমিরকে স্থানীয় ঐতিহ্যে পবিত্র মনে করা হয়। বিশ্বাস আছে কুমির না থাকলে জলাশয় শুকিয়ে যাবে। এখানে কুমির ও মানুষ একই জলাশয় ব্যবহার করে — কিন্তু এই প্রজাতি তুলনামূলক কম আক্রমণাত্মক হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে মানুষের উপর মারাত্মক হামলার ঘটনার রেকর্ড আছে।
  • জিম্বাবুয়েঃ ২০০৫ সালে দেখা যায়, বন্যপ্রাণীর মধ্যে মানুষ মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল কুমির — মাত্র ১০ মাসে ১৩ জন নিহত।
  • সাব-সাহারান আফ্রিকাঃ প্রতিবছর নীল কুমিরের আক্রমণে শত শত, সম্ভবত হাজার হাজার মানুষ মারা যায়।

মাজার-মন্দিরে হিংস্র প্রাণী রাখার বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস মানুষের জীবনের গভীরে প্রোথিত। খান জাহান আলীর মাজারের কুমিরের ঐতিহ্যটি কয়েকশ বছরের পুরনো এবং এর সাংস্কৃতিক মূল্য অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ঐতিহ্য ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আমাদের স্বীকার করতে হবে:

১. প্রাণীর আচরণ ব্যক্তি-নির্ভর, প্রজন্ম-নির্ভর নয়। পুরনো কুমির শান্ত ছিল মানে নতুন কুমিরও শান্ত হবে — এই যুক্তি বিজ্ঞানসম্মত নয়। প্রতিটি প্রাণী তার নিজের প্রবৃত্তি নিয়ে আসে।

২. ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রাণী-ব্যবস্থাপনা আলাদা বিষয়। কুমিরকে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে রাখা যেতে পারে, কিন্তু সঠিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা থাকা বাধ্যতামূলক।

৩. শিশুদের হিংস্র প্রাণীর কাছে নেওয়া কোনো অবস্থাতেই নিরাপদ নয়। আধ্যাত্মিক বিশ্বাস যাই হোক না কেন।

৪. হিংস্র প্রাণীর সামনে অন্য প্রাণীকে খাবার হিসেবে ছেড়ে দেওয়া নিষ্ঠুর এবং বেআইনি। এ ধরনের কাজ কুমিরকে মানুষ-ঘনিষ্ঠ পরিবেশে বড় প্রাণী শিকারের দিকে উদ্বুদ্ধ করে, যা পরবর্তীতে মানুষের জন্যও বিপজ্জনক।

চাই সবাই বিজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দিক

মানুষ স্বভাবতই অর্থ খোঁজে। যখন একটি কুমির দশ বছর আক্রমণ করে না, তখন আমরা ভাবি এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো দৈবশক্তি আছে। আর যখন সে হঠাৎ আক্রমণ করে, তখন বলি “নিশ্চয়ই কোনো পাপের ফলে এটি হয়েছে।” এই চিন্তাকাঠামো সমস্যাটির সমাধান করে না — বরং একই ভুল বারবার করার সুযোগ তৈরি করে।

প্রাচীন মিশরীয়রা কুমিরকে দেবতা মেনেছিল ভয়ের কারণে, শ্রদ্ধার কারণে — কিন্তু কুমির তখনও মানুষকে মেরেছে। বালির মন্দিরের বানর “পবিত্র রক্ষক” হলেও মানুষকে কামড়েছে। কেরালার “নিরামিষাশী কুমির” সত্যিকার অর্থে মাছ খেত। বাগেরহাটের নতুন কুমির একটি শিশুর প্রাণ নিয়েছে।

তাই একটি বার্তাই বারবার দেওয়া হচ্ছেঃ হিংস্র প্রাণীর সহজাত প্রবৃত্তি বদলায় না। বিশ্বাস প্রকৃতির আইনকে স্থগিত করে না।

মানুষ ও প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর না হলে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান করুন। কিন্তু নিজেকে, আপনার শিশুকে এবং অন্য প্রাণীদের অহেতুক বিপদে ফেলবেন না। সতর্কতা কোনো বিশ্বাসের বিরোধী নয় — বরং জীবন রক্ষার দায়িত্বও একটি বড় সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক কর্তব্য।

Related Posts

Why do loved ones drift away?

When a Loved One Suddenly Feels Like a Stranger: What Causes This Neglect?

Siam met Liza in the second year of university. For the first six months, SiamRead More

Why do loved ones drift away?

যখন প্রিয় মানুষটা হঠাৎ অচেনা হয়ে যায়ঃ অবহেলার পেছনের কারণ কী?

লিজার সাথে সিয়ামের পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে। প্রথম ছয় মাস সিয়াম যেন পুরো পৃথিবীRead More

Salton Sea - Development Disaster

When Development Becomes Disaster: From Beel Dakatia to the Salton Sea

During my undergraduate years, a friend of mine wrote her thesis on the people ofRead More

Comments are Closed