
Political Prophets
বাংলাদেশের রাজনীতির ভগবানেরা ও তাদের শেষ পরিনতি
মীর জাফর যেমন বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বেঈমান ছিলেন, ঠিক তেমনি সিরাজউদ্দৌলাও ছিলেন এক অপদার্থ, বিদেশি বংশোদ্ভূত, স্বৈরাচারী, অদূরদর্শী ও বেয়াক্কল শাসক। তিনি এবং তার পূর্বসূরিরা অন্য দেশ থেকে এসে এই অঞ্চলের শাসন জবরদখল করেছিলেন। সিরাজকে আজ দেশপ্রেমিক আইকন হিসেবে দেখা নিছক এক মিথ। এই অঞ্চলের রাজনীতিবিদেরা নিজেদের স্বার্থে এসব মিথ জিইয়ে রাখে, কারণ তারাও একসময় এমন আইকনিক মিথে পরিণত হতে চায়। ঠিক এই ধরনের অবাস্তব কল্পনাবিলাসের কারণেই এই অঞ্চলের মানুষ এগোতে পারে না। তারা অনেককে ভগবান বা নবীর আসনে বসায় – যেখানে বাস্তবে তারা তা নয়। ‘মীর জাফর’ নাম কেউ রাখে না, কারণ সেটি বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক। তাহলে ‘সিরাজ’ নাম কেন বেয়াক্কল, বখাটে, অপদার্থ বা গাড়লের প্রতীক নয়?
মাস্টার্সে পড়ার সময় আমরা ঢাবির বর্তমান ভিসি ড. নিয়াজ আহমেদ খানের কাছে ৯ ক্রেডিটের তিনটি কোর্স করেছিলাম – Development Organization and Management, Philosophy and Forms of Development and Governance, এবং Public Management, Reform and Governance। এসব বিষয়ে তিনি দেশের সেরা মেধাবীদের একজন। সরকারের বহু আমলা ও সামরিক কর্মকর্তাকে তিনি ব্যাচ ধরে এসব বিষয়ে পড়িয়েছেন। তার সততা ও অগাধ পাণ্ডিত্য নিয়ে কোনো সংশয় নেই। ক্লাসে তিনিও সিরাজউদ্দৌলার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন এবং তার বিদেশি সত্ত্বাকে এদেশের অংশ হিসেবে মানতেন না।
মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন ভাষণে বলেছিলেন – সঠিক কাজ সবসময় জনপ্রিয় হয় না। এই অঞ্চলের রাজনীতিবিদ, বিপ্লবী, শাসক ও বুদ্ধিজীবীরা সবাই জনপ্রিয় কাজ করতে চান; সঠিক কাজ করতে চান না। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তারা জনপ্রিয়তার পথই বেছে নেন। কিন্তু যে কাজ আপাত অজনপ্রিয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ভালো – সেটা তারা করেন না। ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ভগবান ও নবীরা শেষ পর্যন্ত অপদার্থ হিসেবেই প্রমাণিত হন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায় – চট্টগ্রাম বন্দরের একটি টার্মিনাল বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া অনেকের কাছে অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটাই সঠিক কাজ হবে।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যে বিপুল ম্যান্ডেট পেয়েছিলেন, সেই সুযোগে তিনি দূরদর্শিতা দেখাতে পারেননি। তিনি যদি তখন কিছু কঠিন কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেন, বাংলাদেশ আজ হতাশার সাগরে নিমজ্জিত থাকত না। তিনি দেশের দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক না হয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কাছে ভগবান বা নবীর আসনে থাকতে চেয়েছিলেন। মোল্লাদের তুষ্ট করতে গিয়ে দেশকে পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগারদের কাছে তার চরিত্র এখনো মিথ; একজন শাসক হিসেবে তার ব্যর্থতাগুলো তারা মানতে চান না।
এরশাদ স্বৈরশাসক ছিলেন, বিশ্ববেহায়া ছিলেন, দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গেছেন। তবুও দেশের কিছু জরুরি সংস্কার তিনি করে গিয়েছিলেন – এ নিয়ে সন্দেহ নেই। যেমন – ৬৪ জেলা সৃষ্টি, উপজেলা পরিষদ প্রবর্তন, হাইকোর্টের চেম্বার বিভিন্ন বিভাগে নেওয়া। তবে এরশাদ ও জাতীয় পার্টি এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ায় এসব নিয়ে আর আলোচনা হয় না।
খালেদা জিয়ার শাসন ছিল গড়পড়তা। তিনিও ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নানা ফন্দি-ফিকির করেছেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে তিনি কবর দিয়েছিলেন। তবে তিনি ভগবান বা নবীর আইকনে পরিণত হতে চাননি। তাকে সমালোচনা করা যেত, পত্রিকায় ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন আঁকা যেত, তার সমালোচনা করলে তার অনুসারীরা হামলে পড়ত না। ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তিনি গণতান্ত্রিক চেতনাকে পায়ে মাড়িয়েছিলেন। তার কারণেই শেখ হাসিনা স্বৈরাচার হওয়ার পথে পা বাড়ান। তার আমলে শেখ হাসিনার ওপর একাধিকবার হত্যাচেষ্টা হয়েছে – কোটালিপাড়ায় গ্রেনেড পুঁতে রাখা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা – এমন বহু উদাহরণ আছে।
শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র শাসক যিনি ২০০১ সালে ক্ষমতা ধরে রাখার কোনো দূরভিসন্ধি না করে নির্দিষ্ট দিনে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারণ তখনো তিনি ভগবান বা নবী হয়ে ওঠেননি; তখনো তিনি ছিলেন এমন এক নেত্রী যার সমালোচনা করা যেত।
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসে। এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতাই আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এরপর তিনি ক্ষমতাকে স্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত করেন, গণতন্ত্রকে হত্যা করেন, স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেন, গুমসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ শুরু করেন, এমনকি গণহত্যাও সংঘটিত হয় – এমন অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ভগবান বা নবীর মতো এক আইকনে পরিণত হন। এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল যেখানে তার কোনো ভুল হতে পারে না, তার সমালোচনা করা যায় না। অনুন্নত সমাজে ভগবান বা নবীর সমালোচনা যেমন ব্লাসফেমি হিসেবে দেখা হয়, তেমনি আওয়ামী লীগ ও প্রশাসন শেখ হাসিনাকে নিয়ে এক অলিখিত ব্লাসফেমি আইন তৈরি করেছিল।
এই ভগবান-নবী আইকনে পরিণত হওয়াই আজ তাকে ও তার দলকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে। অথচ তিনি চাইলে এই দীর্ঘ সময়ে দেশের বহু ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারতেন। তা না করে তিনি নিজের আইকনিক চেহারা রক্ষায় দল ও সরকারকে সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের সুযোগ দিয়েছেন, নিজে হয়েছেন ‘মাদার অফ মাফিয়া’। মোল্লাদের কোলে তুলে সাম্প্রদায়িকতাকে আরও বিস্তার দিয়েছেন। ইতিহাস তাকে যে সুযোগ দিয়েছিল – সেটা হয়তো আর কোনো নেতা কখনো পাবেন না।
২০২৪ সালের বর্ষা বিপ্লবের পর পুরো স্টিয়ারিং ছিল তারেক রহমানের হাতে। তার দলের লোকেরা তাকে ‘দেশনায়ক’ বলে ডাকত। কিন্তু এই সময়ে তার সামনে দেশনায়ক হওয়ার সুযোগ এলেও তিনি তা নেননি। তিনি বিএনপির প্রধান হয়েই থাকতে চেয়েছেন। ব্যক্তিগত ও দলের কিছু উচ্চাভিলাষ ছাড় দিলে তিনি দেশের জন্য ইতিবাচক ধারা তৈরি করতে পারতেন। বিদেশের বিলাসী জীবন ও আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও মানুষ তার ভালো উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানাত। কিন্তু তিনিও ভগবান বা নবী হতে চেয়েছেন। এখন তারা সরকারে; অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তার দলের লোকজন তার সমালোচনাও সহ্য করবে না। লক্ষণগুলো স্পষ্ট। তারা ২০২৪ সালের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামকে পাত্তা দিচ্ছে না। ১৯৯১ সালের মতো আবারো দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার পথে হাঁটছে – বিনিময়ে তারেক রহমানের ভগবান-নবী ইমেজ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।
মর্ত্যের মানুষ ভগবান বা নবী হয়ে উঠলে সেই মর্যাদা কেবল নিজেদের ও কর্মী-সমর্থকদের কাছে পাওয়া যায়; ইতিহাস তা ক্ষমা করে না। ইতিহাস একসময় সত্য ও বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সেই ভগবান-নবীর শ্রেষ্ঠত্বকে চূর্ণ করে দেয়।
Related Posts

Allah reveals verses about something as trivial as a piece of clothing, yet does not answer the fundamental questions of the universe
A being who is claimed to be the creator of the vast universe, whose scopeRead More

আল্লাহ সামান্য কাপড়ের বিষয় নিয়ে আয়াত নাজিল করে, কিন্তু মহাবিশ্বের মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয় না
যে সত্তাকে বিশাল মহাবিশ্বের স্রষ্টা বলে দাবি করা হয় – যার ব্যাপ্তি আমাদের ধারণার সীমানাRead More

Did Prophet Muhammad have OCD along with other mental issues, which is why he used to do and say everything three times?
In Islamic rituals and practices, a clear pattern of three or odd numbers can beRead More

Comments are Closed