Relation
Palestine Bangladesh

Palestine Bangladesh

ফিলিস্তিন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের এতো মায়াকান্না, ওরা বাংলাদেশীদের কিভাবে দেখে?

আপনারা জানেন, সম্প্রতি আমেরিকার ফ্লোরিডায় বাংলাদেশী দুই পিএইচডি গবেষক শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন (২৭) এবং নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি (২৭) নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। আমি আর বিস্তারিত বললাম না, আপনারা জানেন। খুনি এতোটাই ক্ষিপ্ত ও উন্মাদ ছিল যে তাদের লাশগুলো কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। বাংলাদেশের মুমিন ভাইরা এই নৃশংস হত্যাকান্ড নিয়ে তেমন উচ্চিকিত না। কারন খুনি হিসাবে যিনি অভিযুক্ত হয়েছেন তিনি একজন ফিলিস্তিনি, নাম হিশাম সালেহ আবুঘরবেহকে (২৬)। ফিলিস্তিনি জাতি ভাই (মুমিনরা আবার সব মুসলমানকে এক জাতি মনে করে, নৃবিজ্ঞান কী বলে, হু কেয়ারস!) এর নামে বেশি বদনাম হওয়ার আগেই বিষয়টা ধামাচাপা দেয়ায় ব্যস্ত আমাদের মুমিন ভাইয়েরা। তারা নানান ষড়যন্ত্র তত্ত্বও বের করেছেন যেখানে দোষের সিংহভাগ আবার নিহত নারী শিক্ষার্থীর। মুমিন ভাইদের কাছে এটা অবধারিত ব্যাপার যে, তারা ভাবে দুনিয়ার সকল সংকট নারীর জন্য! নবী মুহাম্মদও বলেছেন, পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে ক্ষতিকর আর কোন বস্তু নেই, নারী শয়তানের বেশে আসে পুরুষের ক্ষতি করার জন্য। যাইহোক, ইসলামের চোখে নারী তো বস্তুই।

লিমন আমার ইউনিভার্সিটির সরাসরি ছোট ভাই, আমাদের দুজনেরই একই ডিগ্রী, একই ডিসিপ্লিন। সেই হিসাবে লিমনের এই নৃশংস হত্যাকান্ড আমার কাছে ভাই হারানোর মতোই বেদনার। বৃষ্টি আমার সরাসরি কিছু না হলেও সেও একজন মানুষ, গবেষক, আমার ছোট বোন। তারা বেঁচে থাকলে পৃথিবীর জন্য নতুন কোন জ্ঞান সৃজন করতেন নিশ্চয়। সে হিসাবে তাদের চলে যাওয়ার কারনে পৃথিবী ও মানুষ বঞ্চিত হলো। যার কারনে তারা হত্যাকান্ডের শিকার সেই ফিলিস্তিনি যুবক আগে থেকেই বখাটে, সন্ত্রাসী। তার পৃথিবীকে দেয়ার কিছু নেই, বরং সে পৃথিবীর জন্য ক্যান্সার। কিন্তু আমাদের মুমিন ভাইদের আবার ফিলিস্তিনানুভূতি খুব চাঙ্গা, সেজন্য জাতিভাই হিসাবে আল্লাহর নির্দেশনা মেনে তার পাপ যতো গোপন করা যায় ততোই মুমিন ভাইদের জন্য ছওয়াবের সুযোগ থাকবে।

ক্লাস সেভেন/এইট থেকে ধর্মকর্ম না করলেও উৎসবগুলো এটেন্ড করি। মানুষের জীবনে উৎসবের উপলক্ষ তো খুবই কম। সে হিসাবে চেষ্টা করি সব রকমের উৎসব যেখানে মানুষের কর্মকান্ড দেখার সুযোগ হয়, সেগুলোতে এটেন্ড করতে। ঢাকায় থাকতে কলাবাগান মাঠে পূজা দেখতে যেতাম সময় করে, ইফতারী পার্টিও এটেন্ড করতাম সুযোগ হলে। আমেরিকায় থাকাকালীন এক বড় মসজিদে মাঝে মাঝে ইফতারী এটেন্ড করতাম। ভিন্ন ভিন্ন কালচারের খাবার চেখে দেখার সুযোগ হতো, ভিন্ন কালচারের মানুষের কর্মকান্ড দেখে বোঝার চেষ্টা করতাম তাদের সম্পর্কে। বাঙালিরা যেদিন আয়োজন করতো সেদিন থাকতো আড্ডার আমেজ, হৈ-হুল্লোর, আড্ডা, খোশগল্প – বাঙালির যেটা বৈশিষ্ট্য।

একবার আয়োজনের দায়িত্বে ছিল ফিলিস্তিনিরা, মসজিদটা ফিলিস্তিনিদের এলাকায়। সেদিন খুব বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা হয়েছিল। দেখলাম, ওরা ওরাই শুধু সব। মধ্যপ্রাচ্যের লোকদেরই সব প্রাধান্য দিচ্ছে। কোথায় মুসলিম ভাতৃত্ব? কোথায় বাঙালি মুসলিম ভাইদের প্রতি তাদের টান? পিজ্জাগুলো তারা আগেই নিয়ে নিচ্ছে তাদের টেবিলে, যতোগুলো পারে, আইসক্রিম, কেক সব তারা একজন দুই তিনটা করে নিচ্ছে, ভিন্ন সংস্কৃতির শিশুদের দেখিয়ে বুড়ো দামড়ারা খাচ্ছে। বাঙালি শিশুরা আশপাশে ঘুরছে, কোন পাত্তা নেই সেই শিশুদের প্রতি। ভাবটা এমন যে তোমরা শিশু হও আর যেই হও – তোমরা তো খাঁটি মুসলমান না, তোমরা তো ফকির মিসকিনের জাত, তোমাদের এসব খাওয়ার কী দরকার! ওদের প্রতি আমার সেইদিনের পাঠটা ছিল এমনই যে ওরা নিজেদের খুব অভিজাত মুসলমান ভাবে, ইন্ডিয়ান রঙের গায়ের চামড়াওয়ালা লোকজন তাদের কাছে অস্পৃশ্য। তবে তারা বেশিরভাগ সবাই নামাজ-ফামাজের ধার না ধরে খাওয়ায় ব্যস্ত ছিল, খাওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কোন লাইনের শৃঙ্খলা নেই, যে যেভাবে পারছে আমদের পিছনে ফেলে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছিল। আমেরিকার মতো দেশে থেকেও লাইন ধরে দাঁড়িয়ে খাবার নেয়ার মতো ভদ্রতা সেখানে ছিল না। তাদের অনেককেই মনে হয়েছিল খুব অহংকারী, তারা যে কোন নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মানুষ – তা মনেই হয়নি তাদের আচরনে। অন্য বাঙালিদের কাছেও শুনে যাচাই করলাম আমার ধারনা সঠিক।

এই যে বাঙালি মুমিন ভাইয়েরা ফিলিস্তিনের জন্য এতো কাঁদে, ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের বাঙালিদের উপর পাকিস্তানের বাহিনী, স্বদেশী রাজাকার, আল-বদর পৈশাচিক গণহত্যা চালাচ্ছে, নারীদের ধর্ষণ করে হত্যা করছে তখন ফিলিস্তিন বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের জন্য কাঁদেনি। তাদের সমর্থন ছিল পাকিস্তানের প্রতি। নিজেকে নিপীড়িত দাবী করে যারা অন্য দেশের গণহত্যার শিকার জনগোষ্ঠীর পক্ষে না দাঁড়ায় তাদেককে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশকে ফিলিস্তিনের কাছে প্রমান করতে হয়েছিল যে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের অংশ, তখনই তারা বাংলাদেশকে মেনে নেয়। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বাংলাদেশ সমর্থন জানালে এবং মেডিকেল টিম পাঠালে আরব দেশগুলো বাংলাদেশকে একটু একটু করে মেনে নেয়া শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালে লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ইয়াসির আরাফাতের বৈঠকের পর ফিলিস্তিনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

অন্যদিকে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় একমাত্র ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে ইসরায়েল বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে এবং অস্ত্র সহায়তা প্রদান করতে চেয়েছিল। কিন্তু ফিলিস্তিনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকার সেই স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রচুর ইহুদি আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছেন, অর্থ সাহায্য তুলেছেন, শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ দিয়েছেন, সেবা করেছেন, যুদ্ধ পর্যন্ত করেছেন। আমাদের একমাত্র বিদেশী বীরপ্রতীক উইলিয়াম এ এস ওডারল্যান্ড তাদের একজন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা জেনারেল জ্যাকব ছিলেন একজন ঈহুদী। বাংলাদেশকে ইসরায়েল আরও একবার ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্বীকৃতি দিলেও বাংলাদেশ সেটা আমলে নেয়নি বরং বাংলাদেশের পাসপোর্টে উল্লেখ করে দিয়েছিল ইসরায়েলের জন্য এই পাসপোর্ট বৈধ নয় যেখানে স্বয়ং ফিলিস্তিনের পাসপোর্টেও এটার উল্লেখ নেই।

আইসিস যখন মিশরের সী বীচে কপ্টিক খ্রিস্টানদের সারি বেঁধে গলা কেটে জবাই করছিলো, যখন ইরাকে ৫০০০+ ইয়াজিদীর উপর জেনোসাইড চালালো, ডজন ডজন ইয়াজিদী বৃদ্ধা ও শিশুদের যৌন আকর্ষণ না থাকায় ও বাজারে বিক্রি হবে না ভেবে জীবন্ত কবর দিলো, নারীদের যৌনদাসী বানিয়ে মাসের পর মাস ধর্ষণ করলো, দাসী হিসাবে বাজারে বিক্রি করলো, শিশুদের জোর করে দাস বানিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করলো – তখন কি নিপীড়িত দাবীদার ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো কোন প্রতিবাদ করেছিল? নাইজেরিয়ায় বোকো হারাম যখন খ্রিস্টান বাচ্চাদের স্কুল থেকে অপহরণ করলো, তখন কি তারা প্রতিবাদ করেছিল? বাংলাদেশের মুমিন ভাইদের কোন প্রতিবাদও অবশ্য চোখে পড়েনি। এদের সব প্রতিবাদ খুবই সিলেক্টিভ। এদের সকল সহানুভূতি শুধুই মুসলমানদের জন্য, মানুষের জন্য নয়।

জানি না, লিমন-বৃষ্টি মুসলিম ভাই হিসাবে তাদের খুনি হিশামকে রুমমেট হিসাবে বেছে নিয়েছিল কিনা। সেই উদারতা দেখালেও হিশামের কাছে ওরা ছিল ছোট জাতের মুসলমান, হিন্দু ভারতের প্রতিবেশী হিসাবে হিন্দুয়ানী মুসলমান, যেমনটা পাকিস্তানও মনে করতো ১৯৭১ এ। বাঙালি মুমিন ভাইয়েরাও তেমনি ফিলিস্তিন, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মানুষজনের কাছে কেঁদে বুক ভাসালেও প্রকৃত মুসলমানের স্বীকৃতি পায় না, মিসকিন হিসাবেই তারা ট্রিট করে, নারী গৃহকর্মীদের যৌনদাসীই মনে করে।

বর্তমান যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট সেটারও সূচনা করেছিল ফিলিস্তনের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হামাস। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস জল, স্থল ও আকাশপথে (প্যারাগ্লাইডার ও হাজার হাজার রকেট ব্যবহার করে) ইসরায়েলের অভ্যন্তরে আকস্মিক অনুপ্রবেশ করে। সেই হামলায় ১,১৯৫ জন ইসরায়েলি ও বিদেশি নাগরিক নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়, যা ইতিহাসে ইসরায়েলের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল। ইসরায়েলের মতো একটা জায়ান্ট অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি এটা মেনে নিবে? তারা তো ভবিষ্যৎ হামলার আশংকায় প্রতিকারের ব্যবস্থা নিবেই, স্বাভাবিক।

১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধের সময় প্রায় ১,০০০ থেকে ৮,০০০ বাঙালি তরুণ মুমিন ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (PLO) হয়ে সরাসরি ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং অনেকে মারাও যান। এতো কিছু করেও বাঙালি মুমিন ভাইরা ফিলিস্তিনের মুমিনদের মন পান না। শুনি যে, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম বাজারে অনেক বাঙালি শ্রমিক ফিলিস্তিনের অনেকের আক্রোশের স্বীকার হয়ে থাকেন। আমিও তেমন কোন ফিলিস্তিনিকে দেখিনি যারা বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল, কেউ কেউ হয়তো থাকতে পারে।

বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনের পক্ষে অনেকেই রাস্তায় নেমেছেন, প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আমেরিকায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা জেলও খেটেছেন, শাস্তি পেয়েছেন যারা কিন্তু কেউ মুসলমান নন। ইউরোপে অনেক শান্তিকামী মানুষসহ LGBTQ গ্রুপের অনেকে ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। খ্রিস্টান বংশোদ্ভূত এ্যাডাল্ট সিনেমার নায়িকা মিয়া খলিফাও আছেন প্রতিবাদকারীদের তালিকায়।

এই যে ইহুদী, খ্রিস্টান, নাস্তিক, মানববাদী, সাধারন বিধর্মী, স্বল্পবসনা পশ্চিমা তরুণী, এ্যাডাল্ট নায়িকা, সমকামী গ্রুপ তারা যদি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য স্বাধীন ফিলিস্তিনে বেড়াতে যায় ফিলিস্তিনিরা, বিশেষ করে হামাস কি তাদের বিপদের বন্ধু হিসাবে সমাদর করবে? হামাস কট্টর ইসলামী বিধান মেনে চলে। ইসলামে বলা আছে সমকামীদের হত্যা করতে হবে। তারা কি ফিলিস্তিন ভূখন্ডে তাদের আগমন, তাদের অবস্থান, তাদের বন্ধুত্বের হাত মেনে নিবে? ইউরোপের এই সমকামী গ্রুপগুলোকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো ইসলামে ও ফিলিস্তিনে যে সমকামীতা নিষিদ্ধ, হত্যা করার বিধান আছে, তারা কি তা জানে? তারা বিস্ময়ের সাথে উত্তর দিয়েছিল – যারা এত যুগ ধরে নিপীড়িত, তারা কি সমকামীতার জন্য নিজেদের মানুষকে শাস্তি দিতে পারে? প্রশ্নের উত্তর আপনারাই খুঁজে বের করুন। উত্তরটা যখন আসবে কোরআন ও হাদিস থেকে – তখন কে বন্ধু ছিল সেসব চিনবে কি তারা? বাংলাদেশের অনেক মুমিন ভাই কি ১৯৭১ এর বিপদের বন্ধুদের চেনে? সামনে পাইলে কচুকাটা করবে তাদের। ইসলামের স্বার্থে অকৃতজ্ঞতা দেখানোটা ফরজ।

Related Posts

The Brutality of Imam Mahdi in Iran

Thousands of people have been killed in Iran in the name of the Child Imam Mahdi, who disappeared around 1,200 years ago

The Islamic Republic of Iran is one of the rare states in the modern worldRead More

The Brutality of Imam Mahdi in Iran

১২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া শিশু ইমাম মাহদীর নামে ইরানে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়

ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র আধুনিক বিশ্বের এমন এক বিরল রাষ্ট্র, যার ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্রে একজন অনুপস্থিত, অদৃশ্যRead More

Bengali Women and Beauty

Ayisha and Arpita: A Story of Free Expression and Honesty Between Two Sisters, One Muslim and One Hindu

Ayisha and Arpita’s parents had dated for several years before marrying under Bangladesh’s Special MarriageRead More

Comments are Closed