Islam
Moon and Islam

Moon and Islam

মুহাম্মদ ও আল্লাহর জন্মেরও ১১৫০ বছর আগেই মানুষ জানতো চাঁদের নিজস্ব আলো নেই, চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার কেচ্ছা গাঁজাখোরি

চাঁদ নিয়ে ইসলামের আগ্রহের শেষ নেই। মাস, দিন, তারিখ, ইবাদত-বন্দেগী, ঈদ, রোজা সব চাঁদ কেন্দ্রিক। ইসলামের লোকজন যেমন সাঈদী, দেওয়ানবাগী – তাদের নাকি চাঁদে দেখে ভক্তরা! আজহারিরা প্রচার করে নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে গিয়ে আজান শুনে ও ফাঁটল দেখে পৃথিবীতে ফিরে ইসলাম গ্রহন করে – যদিও এগুলো স্রেফ গালগল্প। ইসলামি প্রচারকদের একটি জনপ্রিয় দাবি হলো, চাঁদের যে নিজস্ব আলো নেই, সূর্যের আলো প্রতিফলিত করেই সে জ্বলে, এই তথ্য মানুষ আধুনিক বিজ্ঞানের আগে জানত না। কোরান ১৪০০ বছর আগে এটি বলে দিয়েছে, আর নিরক্ষর মুহাম্মদের পক্ষে এ জ্ঞান পাওয়া সম্ভব ছিল না, তাই কোরান ঐশী গ্রন্থ। ইসলামের অনেক বক্তা, প্রচারকরা যে অনেক গালগল্প মানুষকে গেলায়, এটা সবাই জানে না।

মানুষ প্রথম কবে জানল?

এই প্রশ্নের একটি নির্দিষ্ট দিন বা ব্যক্তির নাম বলা সম্ভব নয়। জ্ঞানটি ধাপে ধাপে অনেক সভ্যতায় গড়ে উঠেছে। তবে লিখিত সূত্রে যা পাওয়া যায়, তা কোরানের অন্তত হাজার বছর আগের।

গ্রিস (খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ–৫ম শতক): পারমেনিডিস (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০) সম্পর্কে প্রাচীন সূত্রে বলা আছে যে তিনি চাঁদের আলোকে “ধার করা আলো” বলেছেন। থালেসের নামেও পরবর্তী সূত্রে এ ধারণা আরোপ করা হয়েছে, যদিও সেটি অপেক্ষাকৃত অনিশ্চিত। স্পষ্ট ও সুপরিচিত সূত্র হলো আনাক্সাগোরাস (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০–৪২৮)। তিনি এথেন্সে বলেছিলেন যে চাঁদ পৃথিবীর মতো পাথুরে বস্তু এবং সে সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়। এ কথা এবং সূর্যকে জ্বলন্ত পাথর বলার কারণে তাঁকে ধর্মদ্রোহের অভিযোগের মুখে পড়তে হয়েছিল।

গ্রিক জ্যামিতি ও পর্যবেক্ষণ: অ্যারিস্টটল (খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক) চাঁদের কলা এবং চন্দ্রগ্রহণকে পৃথিবীর ছায়া দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। আরিস্তার্খুস (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক) অর্ধচন্দ্রের জ্যামিতি ব্যবহার করে সূর্য ও চাঁদের আপেক্ষিক দূরত্ব হিসাব করার চেষ্টা করেছিলেন। এ হিসাবের ভিত্তিই এই ধারণা যে চাঁদের আলোকিত অংশ সূর্যের দিকে ফেরানো। হিপ্পার্খুস ও পরে টলেমি (খ্রিস্টীয় ২য় শতক) এ জ্ঞান আরও পরিমার্জিত করেন। প্লুটার্কের রচনাতেও চাঁদকে সূর্যালোকে আলোকিত একটি পৃথিবীসদৃশ বস্তু হিসেবে আলোচনা করা হয়েছে।

ব্যাবিলন: ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিদরা শত শত বছর ধরে চন্দ্র-সূর্যগ্রহণের নিয়মিত রেকর্ড রেখেছেন এবং গ্রহণ পূর্বাভাস দেওয়ার পদ্ধতি (সারোস চক্র) আয়ত্ত করেছিলেন। চন্দ্রগ্রহণের সঙ্গে সূর্য-পৃথিবী-চাঁদের অবস্থানের সম্পর্ক তাঁরা জানতেন।

ভারত: আর্যভট (জন্ম ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর আর্যভটীয় গ্রন্থে স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে চাঁদ ও গ্রহগুলো সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে উজ্জ্বল হয়। বরাহমিহির (৬ষ্ঠ শতক)-ও একই কথা বলেছেন। এঁরা কোরান অবতীর্ণ হওয়ার (৬১০–৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) প্রায় একশো বছর আগের।

চীন: জিং ফাং (খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতক) লিখেছিলেন যে চাঁদ ও গ্রহের নিজস্ব আলো নেই, সূর্যের আলোয় তারা আলোকিত হয়। পরবর্তী কালে শেন কুও (১১শ শতক) চাঁদকে একটি গোলকের সঙ্গে তুলনা করে সূর্যালোকের দিক অনুযায়ী কলার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

সবচেয়ে সতর্ক হিসাবেও, ধারণাটি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গ্রিসে নিশ্চিতভাবে লিখিত আকারে ছিল। অর্থাৎ কোরানের প্রায় ১০০০–১১০০ বছর আগে। “মানুষ আধুনিক বিজ্ঞানের আগে জানত না” কথাটা ঐতিহাসিকভাবে ভুল। এটি প্রাচীন জ্ঞান।

কোরানের আয়াত আসলে কী বলে?

ইসলামি প্রচারকরা সাধারণত এই আয়াতগুলো উদ্ধৃত করেন:

  • ১০:৫: আল্লাহ সূর্যকে করেছেন দিয়া (দীপ্তি) এবং চাঁদকে নূর (আলো)।
  • ২৫:৬১: তিনি আকাশে রেখেছেন সিরাজ (প্রদীপ) এবং কামারান মুনিরা (আলোদানকারী চাঁদ)।
  • ৭১:১৫–১৬: সাত আসমানের স্তরে স্তরে সৃষ্টি, তার মধ্যে চাঁদকে নূর এবং সূর্যকে সিরাজ করা।

তাঁদের যুক্তি হলো, সূর্যের জন্য দিয়া/সিরাজ (জ্বলন্ত উৎস) এবং চাঁদের জন্য নূর/মুনির ব্যবহার করে কোরান পার্থক্য করেছে যে সূর্যের আলো নিজস্ব, চাঁদের আলো প্রতিফলিত। এ দাবির দুর্বলতাগুলো নিচে দেখানো হলো।

(ক) কোনো আয়াতে “সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়” বলা নেই
কোনো আয়াতেই বলা হয়নি যে চাঁদ সূর্য থেকে আলো নিয়ে ফেরত দেয়। আয়াতগুলো শুধু বলে, আল্লাহ চাঁদকে আলো করেছেন। প্রতিফলনের ধারণাটি ইসলামিস্টদের নিজস্ব সংযোজন।

(খ) “নূর” শব্দটি প্রতিফলিত আলো বোঝায় না
কোরানে নূর সাধারণ অর্থে “আলো”। একই গ্রন্থে “আল্লাহ আসমান ও জমিনের নূর” (২৪:৩৫), তাওরাত নূর (৫:৪৪) এবং মুমিনদের সামনে চলমান নূর (৫৭:১২) বলা হয়েছে। এর কোনোটিই প্রতিফলিত আলো নয়।

(গ) “মুনির” শব্দ নিজেই বিভ্রান্তিকর প্রমাণ
মুনির এসেছে আনারা (“আলোকিত করল”) থেকে। এটি কর্তৃবাচক বিশেষণ, অর্থাৎ যে আলো দেয়। আরও লক্ষণীয়, কোরান (৩৩:৪৬) মুহাম্মদকে সিরাজান মুনিরা বলেছে। এখানে সূর্যের জন্য ব্যবহৃত সিরাজ-এর সঙ্গে মুনির জুড়ে আছে। অর্থাৎ এই দুই শব্দ দিয়ে “নিজস্ব বনাম ধার করা” পার্থক্য করা কোরানের ভাষা-ব্যবহার সমর্থন করে না।

(ঘ) পরিভাষা আলাদা হলেই বৈজ্ঞানিক পার্থক্য প্রমাণিত হয় না
আরবি কবিতা ও ভাষায় নূর ও দিয়া প্রায়ই পরস্পরের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে। ৭৮:১৩-এ সূর্যকে সিরাজান ওয়াহহাজা (প্রজ্বলিত প্রদীপ) বলা হয়েছে, কিন্তু এতে বোঝা যায় না যে বক্তা জানতেন চাঁদ ভিন্ন প্রক্রিয়ায় আলো দেয়।

(ঙ) ধ্রুপদী তাফসিরে এ ব্যাখ্যা নেই
ইসলামের প্রথম কয়েক শতকের তাফসিরকারদের মূলধারায় এ আয়াতগুলোকে “প্রতিফলিত আলো”র বৈজ্ঞানিক ঘোষণা হিসেবে পড়া হয়নি। এ ব্যাখ্যা প্রধানত আধুনিক কালে, অর্থাৎ বিজ্ঞান জানার পরে, আয়াতের ওপর আরোপ করা হয়েছে।

(চ) পাশের আয়াতগুলোর মহাবিশ্বচিত্র কী?
৭১:১৫–১৬-এ চাঁদ “সাত আসমানের মধ্যে” একটি আলো হিসেবে বসানো, যা সাত স্তরবিশিষ্ট আকাশের প্রাচীন মহাবিশ্বচিত্রের অংশ। ৩৬:৩৮–৪০-এ সূর্য “তার গন্তব্যের দিকে চলে” এবং চাঁদ-সূর্য নিজ নিজ কক্ষে “সাঁতার কাটে”, যা পৃথিবীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। হাদিসে (যেমন সহিহ বুখারি) বলা আছে, সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে। চাঁদের আলো প্রসঙ্গে বিজ্ঞান খোঁজা আর মহাবিশ্বচিত্রের এসব অংশকে “রূপক” বলে বাদ দেওয়ার মধ্যে একটি নির্বাচনী পক্ষপাত আছে।

(ছ) বাইবেলের সঙ্গে মিল
আদিপুস্তক ১:১৬-তে সূর্য ও চন্দ্র দুটোকেই “আলো” (মা’ওর) বলা হয়েছে: “বড় আলো” ও “ছোট আলো”। কোরানের শব্দব্যবহার এই দীর্ঘ সেমিটিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। এখানে প্রতিফলনের কোনো ইঙ্গিত নেই।

তাহলে মুহাম্মদ ও আরবরা কীভাবে জানত?

প্রশ্নটি আসলে “কীভাবে জানতে পারত?” নয়, কারণ কোরান এ বিষয়ে কোনো নতুন বৈজ্ঞানিক দাবিই করেনি। তবু এ প্রশ্নের উত্তর ঐতিহাসিকভাবে মোটামুটি পরিষ্কার।

১. খালি চোখের পর্যবেক্ষণ

মরুভূমির আরবরা রাতের আকাশ নিয়ে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। তারা চাঁদের ২৮টি মঞ্জিল (মানাজিলুল কামার) এবং নক্ষত্রভিত্তিক ঋতু-হিসাব (আনওয়া) ব্যবহার করত। যে কেউ নিয়মিত চাঁদ দেখলে লক্ষ করে:

  • অমাবস্যায় চাঁদ সূর্যের কাছাকাছি থাকে এবং দেখা যায় না;
  • পূর্ণিমায় সূর্যের ঠিক বিপরীত দিকে থাকে;
  • নতুন চাঁদের উজ্জ্বল দিক সব সময় সূর্যের দিকে ফেরানো;
  • চন্দ্রগ্রহণে চাঁদ পৃথিবীর ছায়ায় ঢুকে গেলে তার আলো নিভে যায়।

এ থেকে সাধারণ মানুষও সহজেই অনুমান করতে পারে যে চাঁদের আলোর সঙ্গে সূর্যের সম্পর্ক আছে। এর জন্য ঐশী জ্ঞান বা টেলিস্কোপ লাগে না।

২. বাণিজ্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির যোগাযোগ

আরবের লোকেরা বিচ্ছিন্ন ছিল না। কুরাইশরা সিরিয়া, ইয়েমেন ও আবিসিনিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করত। হিরার লাখমিদ রাজদরবার ছিল সাসানীয় পারস্যের প্রভাবে, আর গাসসানিরা ছিল বাইজেন্টাইন প্রভাবে। নাজরানে খ্রিস্টান সম্প্রদায় ছিল, মদিনায় ইহুদি গোত্রগুলো ছিল। সিরীয় খ্রিস্টানদের মাধ্যমে গ্রিক বিজ্ঞান সিরীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, আর সাসানীয় দরবারে গুন্দিশাপুরে গ্রিক, ইরানি ও ভারতীয় জ্ঞানের মিশ্রণ ঘটেছিল। বিভিন্ন ঐতিহ্যের আখ্যান যে কোরানে ঢুকেছে, তা গবেষকরা নানা উদাহরণে দেখিয়েছেন (যেমন সুরা কাহফের যুল-কারনাইন কাহিনি সিরীয় আলেকজান্ডার-কিংবদন্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বহু গবেষক মনে করেন)।

৩. প্রতিক্রিয়ার অনুপস্থিতি

কোরানের শ্রোতারা এ আয়াত শুনে বিস্মিত হয়ে আপত্তি করেছিল, এমন কোনো সূত্র নেই। এটিও ইঙ্গিত দেয় যে চাঁদ সূর্যের আলোয় আলোকিত, এ ধারণা তাদের কাছে নতুন ছিল না, অথবা আয়াতে এ ধরনের কোনো তাৎপর্যই তখন দেখা হয়নি।

৪. পরবর্তী ইতিহাসের প্রমাণ

আব্বাসীয় যুগে মুসলিম জ্যোতির্বিদরা (আল-খোয়ারিজমি, আল-ফারগানি, আল-বাত্তানি, আল-বিরুনি, ইবনুল হায়সাম) চাঁদের প্রতিফলিত আলোর তত্ত্ব শিখেছেন গ্রিক ও ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুবাদ করেই। তাঁরা কোরান থেকে এটি “আবিষ্কার” করেননি।

ফলাফল

মুহাম্মদ কোরান রচনা করেছেন কি না, সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, চাঁদের আলোর প্রকৃতি সম্পর্কে আয়াতের শব্দচয়নে অলৌকিক কিছু নেই। বিষয়টি তখনকার সাধারণ জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্যেই ছিল। মুসলিম বিশ্বাসীরা অবশ্য ওহিতে বিশ্বাস করেন, এবং সে বিশ্বাস ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের বিষয় নয়। তবে “বিজ্ঞানের আগেই কোরান বলেছে” দাবিটি ঐতিহাসিকভাবে টেকে না।

চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার গাঁজাখোরি কেচ্ছা

ঐতিহ্য কী বলে?

কোরানের সুরা কামার (৫৪:১-২) শুরু হয়েছে এভাবে: “কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে। তারা কোনো নিদর্শন দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এ তো চিরাচরিত যাদু।”

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে একাধিক হাদিসে বলা আছে, মক্কায় মুহাম্মদের জীবদ্দশায় চাঁদ দুই খণ্ড হয়েছিল। ইবনে মাসউদের বর্ণনায় আছে, এক খণ্ড পাহাড়ের এক পাশে ও অন্য খণ্ড অন্য পাশে ছিল। (হাদিসের নম্বর সংস্করণভেদে ভিন্ন হয়।) পরবর্তী সিরাত ও তাফসির সাহিত্যে এর সঙ্গে নানা বিবরণ যুক্ত হয়েছে, যেমন কুরাইশদের নিদর্শন চাওয়া এবং আঙুল বা হাতের ইশারায় চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করার কথা। এই ইশারার বিবরণ বুখারির মূল বর্ণনায় সরাসরি নেই, পরবর্তী সূত্রে পাওয়া যায়।

অধিকাংশ ধ্রুপদী মুফাসসির আয়াতটিকে এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তবে কিছু মুফাসসির আয়াতটিকে কিয়ামতের আলামত, অর্থাৎ ভবিষ্যতের ঘটনা, বলে ব্যাখ্যা করেছেন। আরবি ভাষায় ভবিষ্যৎ ঘটনা নিশ্চিত বোঝাতে অতীতকাল ব্যবহার করার রীতি আছে।

ঐতিহাসিক সমস্যা

  • একক-সূত্র: পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ কোনো এক সময়ে চাঁদ দেখতে পায়। অথচ একই সময়ের চীনা, ভারতীয়, বাইজেন্টাইন বা পারসিক কোনো ঐতিহাসিক বা জ্যোতির্বিদের রেকর্ডে চাঁদ ভাঙার উল্লেখ নেই। চীনা জ্যোতির্বিদরা ধূমকেতু, নোভা ও গ্রহণ অত্যন্ত যত্নে লিপিবদ্ধ করতেন। এমন অভূতপূর্ব ঘটনার একটি লাইনও কেউ লেখেনি।
  • প্রত্যক্ষদর্শী: বর্ণনাকারীদের মধ্যে আনাস ইবনে মালিক ও ইবনে আব্বাস ঘটনার সময়ে (হিজরতের কয়েক বছর আগে) হয় শিশু ছিলেন, নয়তো জন্মেছিলেন কি না সন্দেহ। কাজেই তাঁদের বর্ণনা শোনা কথার ওপর নির্ভর করে।
  • কোরানের অভ্যন্তরীণ বিরোধ: কোরানের একাধিক স্থানে কুরাইশদের নিদর্শন চাওয়ার জবাবে মুহাম্মদকে বলতে বলা হয়েছে, “আমি তো কেবল একজন মানুষ, রাসূল” (১৭:৯০-৯৩)। ১৭:৫৯-এ বলা আছে, পূর্ববর্তীরা নিদর্শন অস্বীকার করায় নতুন নিদর্শন পাঠানো হয়নি। এ কারণে অনেক আলেম ৫৪:১-কে অতীতের ঘটনা না ভেবে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত মনে করেন।
  • “নাসা প্রমাণ করেছে” গল্প: চাঁদের গায়ে যে লম্বা খাঁজ (লুনার রিল) দেখা যায়, তাকে চাঁদ ভাঙার “দাগ” বলে চালানো হয়, এবং নাসার নামে এমন দাবি ছড়ানো হয়। নাসা এমন কিছু বলেনি। এগুলো আগ্নেয় ও টেকটনিক প্রক্রিয়ায় তৈরি, কোটি কোটি বছরের পুরোনো। মালাবারের রাজা চেরামান পেরুমলের কিংবদন্তিও সমসাময়িক নির্ভরযোগ্য সূত্রে সমর্থিত নয়।

পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে: চাঁদ ভাঙলে কী হতো?

চাঁদের তথ্য: ভর প্রায় 7.35 × 10²² কেজি (পৃথিবীর প্রায় ১/৮১), ব্যাসার্ধ প্রায় 1,737 কিমি, গড় ঘনত্ব প্রায় 3,344 কেজি/ঘনমিটার, পৃথিবী থেকে দূরত্ব প্রায় 3,84,400 কিমি।

১. শক্তির হিসাব: চাঁদের মহাকর্ষীয় বন্ধন-শক্তি ≈ (3/5) × GM²/R ≈ 1.2 × 10²⁹ জুল। অর্থাৎ চাঁদকে সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন করে টুকরোগুলো অসীমে ছড়িয়ে দিতে এই শক্তি লাগত। তুলনা:

  • হিরোশিমা বোমার (প্রায় 6 × 10¹³ জুল) প্রায় ২ কোটি কোটি (২ কোয়াড্রিলিয়ন) গুণ;
  • পুরো মানবজাতির বার্ষিক শক্তি ব্যবহারের (প্রায় 6 × 10²⁰ জুল) প্রায় ২০ কোটি বছরের সমান;
  • সূর্য প্রতি সেকেন্ডে যে শক্তি ছড়ায় (প্রায় 3.8 × 10²⁶ জুল), তার প্রায় ৫–৬ মিনিটের সমান।

শুধু দ্বিখণ্ড করে আলাদা করে রাখতেও শক্তি লাগবে বিপুল পরিমাণ। প্রশ্ন ওঠে, তা কোথা থেকে এল?

২. টুকরো দুটি স্থির থাকবে না: চাঁদের নিজস্ব মহাকর্ষই তাকে গোল ধরে রেখেছে। দুই খণ্ড হয়ে গেলে একটি খণ্ড অন্যটির কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করবে (চাঁদের মুক্ত-পতন সময় প্রায় ২০ মিনিট)। ছড়িয়ে পড়লে বিশাল পরিমাণ পাথর-ধুলো তৈরি হবে, যা পৃথিবীর কক্ষপথে চলে আসবে।

৩. পাহাড়ের দুই পাশে দেখা যাওয়ার শর্ত: আকাশে চাঁদের কৌণিক আকার মাত্র আধ ডিগ্রি। দুই খণ্ড পৃথিবীর কোনো পাহাড়ের দুই পাশে আলাদা করে দেখা যেতে হলে খণ্ডদুটো কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে সরে যেতে হতো, আর চাঁদের কক্ষপথ বদলে যেত।

৪. পৃথিবীর অবস্থা: চাঁদ সম্পূর্ণ বা আংশিক পৃথিবীর ওপর পড়লে (পলায়ন-গতিবেগ 11.2 কিমি/সেকেন্ডে কেবল চাঁদের গতিশক্তিই প্রায় 4–5 × 10³⁰ জুল) পৃথিবীর বহির্ভাগ গলে যেত। সমুদ্র বাষ্পীভূত হতো, বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়ে যেত। এটি সেই বিশাল সংঘর্ষের মতো ঘটনা, যার ফলে চাঁদের জন্ম হয়েছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন (থিয়া সংঘর্ষ তত্ত্ব)।

৫. না পড়ে শুধু সরে গেলেও: চাঁদের অস্তিত্ব পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

  • জোয়ার-ভাটা: চাঁদ সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার প্রধান কারণ। ভর ও দূরত্বে সামান্য পরিবর্তনেই উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রে বড় ব্যাঘাত ঘটে।
  • অক্ষের স্থিতিশীলতা: চাঁদ পৃথিবীর অক্ষের হেলানোকে (প্রায় 23.4°) স্থিতিশীল রাখে। জ্যাক লাসকারের গবেষণা অনুযায়ী চাঁদ না থাকলে এ হেলান বিশৃঙ্খলভাবে বদলাতে পারত, ফলে জলবায়ু চরম অস্থিতিশীল হতো।
  • দিনের দৈর্ঘ্য ও পৃথিবীর ঘূর্ণন: চাঁদের টানের সঙ্গে এগুলোও সম্পর্কিত।

অতএব প্রাকৃতিক নিয়মে চাঁদ ভাঙলে পৃথিবীর জীবজগৎ টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। অথচ ঘটনাটির পর কোনো ভূতাত্ত্বিক, জলবায়ুগত বা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চিহ্ন নেই। চাঁদ আগে যেমন ছিল, তেমনই আছে। এর পাথরে বা গড়নে কোনো “জোড়া লাগার” চিহ্ন নেই। চাঁদের নমুনা নেওয়া অ্যাপোলো অভিযান ও পরবর্তী গবেষণা দেখায়, চাঁদের ভূত্বকের বয়স ৪ বিলিয়ন বছরের বেশি, ৬১০-এর দশকে কিছু ঘটার কোনো প্রমাণ সেখানে নেই।

বিশ্বাসীদের অবস্থান

একজন বিশ্বাসী বলতে পারেন, এটি অলৌকিক ঘটনা এবং আল্লাহ সর্বশক্তিমান, তাই তিনি চাইলে সব পরিণতি ছাড়াই চাঁদ ভাঙতে ও জোড়া লাগাতে পারেন। এটি বিজ্ঞানের আওতার বাইরে, এবং বিশ্বাসের প্রশ্ন। কিন্তু তখন তিনি এটিকে “বিজ্ঞানসম্মত” প্রমাণ বলে দাবি করতে পারেন না। ইসলামি প্রচারকরা একদিকে চাঁদের আলোর আয়াতকে “আধুনিক বিজ্ঞানের সমর্থন” বলে প্রচার করেন, অন্যদিকে চাঁদ ভাঙার কাহিনিতে বিজ্ঞান অস্বীকার করেন। এই দ্বৈত মানদণ্ডই সমস্যা। বিজ্ঞান যেখানে মেলে সেখানে “কোরান আগেই বলেছে”, আর যেখানে মেলে না সেখানে “অলৌকিক”, এভাবে দাবি অখণ্ডনীয় হয়ে যায়, কিন্তু তার প্রমাণমূল্য শূন্য হয়ে পড়ে।

তাহলে কী দাঁড়ালো? ইসলামিস্টরা যা দাবী করেন তা কি ঠিক?

১. চাঁদের আলো প্রতিফলিত, এ ধারণা প্রথম লিখিতভাবে পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকের গ্রিসে (পারমেনিডিস, আনাক্সাগোরাস), যা কোরানের প্রায় এক হাজার বছর আগে। পরে ভারত (আর্যভট, বরাহমিহির) ও চীনেও (জিং ফাং) এটি লিখিত হয়।

২. কোরানের আয়াতে চাঁদকে “নূর”/”মুনির” বলা হয়েছে, যার অর্থ “আলো দেয় এমন”। এতে প্রতিফলনের কোনো উল্লেখ নেই, ধ্রুপদী তাফসিরেও সেভাবে বোঝা হয়নি। শব্দদ্বয়ের পার্থক্য দিয়ে বিজ্ঞান টেনে আনা পরবর্তী কালের আরোপ।

৩. আরবরা আকাশ-পর্যবেক্ষণ, গ্রহণ, ও প্রতিবেশী সভ্যতার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি জানার মতো অবস্থানে ছিল। এর জন্য অলৌকিক ব্যাখ্যার দরকার নেই।

৪. চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার কাহিনি প্রাকৃতিক নিয়মে অসম্ভব। এতে ১.২ × ১০²⁹ জুলের বেশি শক্তি লাগত, আর তাতে পৃথিবীর জীবজগৎ বিপন্ন হতো। অথচ তার কোনো ভূতাত্ত্বিক বা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চিহ্ন নেই, সমসাময়িক অন্য কোনো সভ্যতায় কোনো রেকর্ডও নেই।

ধর্মবিশ্বাস একটি ব্যক্তিগত ও দার্শনিক বিষয়। কিন্তু কোনো ধর্মগ্রন্থকে “বিজ্ঞানের আগে বিজ্ঞান বলা” গ্রন্থ হিসেবে প্রমাণ করতে হলে সেই দাবিকে ইতিহাস ও প্রমাণের কষ্টিপাথরে টিকতে হয়। এখানে সে পরীক্ষায় দাবিটি উত্তীর্ণ হয় না।

Related Posts

Moon and Islam

People knew that the Moon has no light of its own more than 1,150 years before the births of Muhammad and Allah; the story of the Moon splitting in two is a fanciful myth

Islam’s interest in the Moon seems endless. Months, days, dates, acts of worship, Eid, andRead More

Are humans the best of creation?

Humans cannot even see 1% of the beauty and colors of Earth and the universe! Are humans really the best of creation?

The human eye can generally detect visible light or color in the wavelength range ofRead More

Are humans the best of creation?

পৃথিবী ও মহাবিশ্বের সুন্দর জিনিসের ১% সৌন্দর্যের রঙও মানুষ দেখতে পায় না! মানুষ কি সৃষ্টির সেরা?

মানুষের চোখ সাধারণত ৩৮০ থেকে ৭৪০ ন্যানোমিটার (nm) তরঙ্গদৈর্ঘ্যের (wavelength) দৃশ্যমান আলো বা রঙের রেঞ্জRead More

Comments are Closed