m wazed mia

Dr. M Wazed Mia

রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নাম হোক ‘ডঃ এম ওয়াজেদ মিয়া পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’

ড. এম.এ ওয়াজেদ মিয়া সম্পর্কে কিছু লেখার যোগ্যতা আমার হয়নি এবং কোন কালে হবেও না। তিনি ছিলেন এদেশের একজন মেধাবী বিজ্ঞানী এবং বাংলাদেশের আণবিক পাওয়ার প্লান্টের একজন সত্যিকারের বিশ্বাসী । ক্ষমতার ভিতর থেকেও কখনও ক্ষমতার অপব্যবহারের সামান্যতম সুযোগ নেননি। যা তাঁর জন্য খুব সহজ ছিলো। তিনি আপন অবস্থানে থেকেই কাজ করে গেছেন। তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের রূপপুরে একটি পরমাণু বিদুৎ কেন্দ্র চালু করা, দেশের বিজ্ঞানীদের পেশাগত কাজের উৎকর্ষতা বৃদ্ধির জন্য একটি বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করা। কিন্তু দু:খজনক বাস্তবতা হলো, তিনি তার ইচ্ছার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করে যেতে পারেন নি। দেশের বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরনীয়। 

যার আজন্ম স্বপ্ন ছিল রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা, কিন্তু নানান প্রতিবন্ধকতা ও সরকার গুলোর আন্তরিকতার অভাবে তার সেই স্বপ্ন তার মৃত্যুর আগে পূরণ হয়নি। আশার কথা হল বর্তমান সরকারের আন্তরিকতায় ও প্রচেষ্টায় অবশেষে সেই কেন্দ্রটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। আমরা কি পারি না সেই নির্মোহ, নিঃলোভী, মেধাবী বিজ্ঞানীর নামে এই কেন্দ্রের নামকরন করে একজন মহান মানুষের স্বপ্নকে মূল্যায়ন করতে? তার নামে এর নামকরন হলে ‘রুপপুর’ গ্রাম ধন্য হবে। এখানে, তিনি বঙ্গবন্ধুর জামাতা বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী এই পরিচয়ে তার নাম দিতে বলছি না। তার নিজ গুনে, মেধায়, তার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ এই প্রকল্পে তার নামকরন হওয়াটা বরং দেশের বিজ্ঞানীদের সম্মান দেওয়া, একজন নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক মেধার উপযুক্ত মূল্যায়ন হওয়া। তিনি তার সমগ্র জীবন উৎসর্গ করে গেছেন দেশের বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে, আনবিক শক্তিকে আমাদের মত দরিদ্র দেশের মানুষের কল্যানে কাজ করানর গবেষনায়। তার কাছে আমাদের সেই ঋণ শোধ করার সুযোগ এসেছে। আসুন আমরা দাবী তুলি রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নাম হোক ‘ডঃ এম ওয়াজেদ মিয়া পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র’।

যদিও তিনি রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত নন তবুও তার জীবনের কিছু স্মরনীয় ক্ষন পাঠকদের জানানো দরকার। এই তথ্যগুলো নেট থেকে পাওয়া

একজন সাধারন বিজ্ঞানী কিভাবে বঙ্গবন্ধুর মত মহীরূহের ছায়ায় এলেন?

রংপুরের আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমান ডঃ ওয়াজেদ কে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি মুজিব ভাইয়ের মেয়ে হাসিনাকে দেখেছো? আমার মনে হয়, ওর সঙ্গে তোমাকে খুব মানাবে। ওয়াজেদ মিয়া বললেন, সে কি করে সম্ভব? শেখ সাহেবকে তো আমি ভাই বলে ডাকি। 

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইম্পিরিয়াল কলেজে ওয়াজেদ মিয়ার পিএইচডি শেষ হয় ১৯৬৭ সালের আগস্ট মাসে। সেপ্টেম্বরে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার পদে যোগ দেন আণবিক শক্তি কেন্দ্রে। কিছুদিন পরে রংপুরের আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমান তার গুলশানের বাসায় তাকে ডেকে নিয়ে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলেন। জানতে চান, অতি তাড়াতাড়ি তিনি বিয়ে করবেন কিনা। ওয়াজেদ মিয়া বলেন, তিন মাসের মধ্যে বিয়ে করতে চাই। মতিউর রহমান জানতে চান, কেমন পাত্রী তার পছন্দ। ওয়াজেদ মিয়া বলেন, কোটিপতির কন্যা কিংবা আপস্টার্ট মেয়ে হওয়া চলবে না। মেয়েকে অবশ্য সুরম্নচিসম্পন্ন, অমায়িক ও সদাচার স্বভাবের হতে হবে। এর ১০ দিন পর মতিউর রহমান আবার তাকে বাসায় ডেকে নেন। জিজ্ঞেস করেন, তুমি মুজিব ভাইয়ের মেয়ে হাসিনাকে দেখেছো? আমার মনে হয়, ওর সঙ্গে তোমাকে খুব মানাবে। ওয়াজেদ মিয়া বলেন, সে কি করে সম্ভব? শেখ সাহেবকে তো আমি ভাই বলে ডাকি। মতিউর রহমান বলেন, সেটা রাজনৈতিক সম্পর্ক। দু’দিন পর সন্ধ্যায় মতিউর রহমানের বাসায় আসেন বেগম মুজিব, শেখ কামাল, শেখ শহীদ ও একজন মুরব্বি। এর অল্প কিছুক্ষন পরে হাসিনা সেখানে আসেন। তাকে ওয়াজেদ মিয়া জিজ্ঞেস করেন, তুমি হাসিনা না? হাসিনা বলেন, হ্যাঁ, আমি হাসিনা। তারপর সেখান থেকে চলে যান। এরপর বিয়ের প্রস্তাবে ওয়াজেদ মিয়া সম্মতি জানান। বেগম মুজিব জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি জেলগেটে শেখ সাহেবের সঙ্গে আলাপ করেছেন। তিনি ওইদিনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা বিশেষভাবে বলেছেন। তার পরামর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেদিনই বিয়ের কথা পাকা করতে সম্মত হন ওয়াজেদ মিয়া। এরপর হাসিনার হাতে আংটি পরিয়ে দেন তিনি। ওই আংটি সেদিন দুপুরে বায়তুল মোকাররম থেকে কিনেছিলেন ওয়াজেদ মিয়া। পরিয়ে দেয়ার সময় দেখা যায়, আংটিটি হাসিনার আঙুলের মাপের চেয়ে বেশ বড়। এরপর ওয়াজেদ মিয়ার আঙুলে আংটি পরিয়ে দিয়ে দোয়া করেন বেগম মুজিব। তিনি জানতে চান, তাদের গাড়িতে ওয়াজেদ মিয়া যাবেন কিনা। ওয়াজেদ মিয়া রাজি হন। গাড়িতে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাদের বাসায় যেতে তার আপত্তি আছে কিনা। ওয়াজেদ মিয়া বলেন, না। গাড়িটি তাদের বাসার সামনে থামার পরপরই হাসিনা দ্রুত গাড়ি থেকে বের হয়ে বাড়ির উপর তলা চলে যান। পরদিন বিয়ের আক্ত (রুসমত) সম্পন্ন হয়। সেদিন ওয়াজেদ মিয়া স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে একটি লাল-গোলাপি শাড়ি, মাঝারি আকারের ক্রিম রঙের নতুন ডিজাইনের একটি স্যুটকেস ও এক জোড়া স্যান্ডেল কিনেছিলেন। তার সঙ্গে কোন টাকা ছিল না। দাম পরিশোধ করেছিলেন বেগম মতিউর রহমান। সেদিন রাত সাড়ে ৮টায় জনাব ও বেগম মতিউর রহমান ওয়াজেদ মিয়াকে নিয়ে যান ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসায়। সেখানে উপস্খিত ছিলেন শেখ সাহেবের ছোট বোন জামাই তৎকালীন সরকারের সিনিয়র সেকশন অফিসার এটিএম সৈয়দ হোসেন, তানু নানা ও অন্যান্য মুরব্বি। সেদিনেই বিয়ে পড়ানো ও কাবিননামা স্বাক্ষর করা হবে বলে ওয়াজেদ মিয়াকে জানানো হয়। সে রাতটি ছিল ১৭ই নভেম্বর ১৯৬৭, শবে বরাত। ওয়াজেদ মিয়া মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না, তিনি স্যুট পরে গিয়েছিলেন। এই জন্য বিয়ে পড়ানোর কথায় কিছু বাকবিতণ্ডা হয়। শেষে তিনি একটি টুপি চেয়ে নেন।

এরপর কাবিননামা স্বাক্ষর করেন। কাবিনপত্রে ২৫ হাজার টাকা বিয়ের দেনমোহরানা সাব্যস্ত করা হয়। বউ দেখার জন্য উপর তলায় যাওয়ার মুখে শেখ শহীদ একটি বড় তাজা লাল গোলাপ দেন ওয়াজেদ মিয়াকে। বাসরঘরে বসেছিলেন বউ বেশে হাসিনা, এটিএম সৈয়দ হোসেনের বড় মেয়ে শেলী ও ছোট বোন রেহানা। ওয়াজেদ মিয়াকে দেখেই রেহানা বলেন, দুলাভাই খালি হাতে এসেছেন বউ দেখতে। বউ দেখতে দেবো না। এর কিছুক্ষণ পর ওয়াজেদ মিয়া নিচে চলে আসেন। পরদিন বিকালে জেলগেটের কাছে একটি কক্ষে শেখ সাহেবের সঙ্গে তার দেখা হয়। তিনি জড়িয়ে ধরে দোয়া করেন, তার হাতে একটি রোলেক্স ঘড়ি পরিয়ে দেন। ওই ঘড়ি ও বিয়েতে হাসিনাকে দেয়া শাড়ি এবং স্যুটকেস তিনি সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন। সেদিন বাসায় ফিরে বেগম মুজিব তাকে বলেন, তুমি আমার বড় ছেলের মতো শেখ সাহেব অনুমতি দিয়েছেন। যথাসম্ভব তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে। এরপর থেকে প্রতিদিন বিকালে গাড়ি পাঠিয়ে বেগম মুজিব বাসায় নিয়ে যেতেন তাকে। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে ১১টার দিকে বাসায় ফিরতেন তিনি। দিন দশেক পরে শেলী জোর করে রাতে তাকে বাসায় থাকতে বাধ্য করেন। এরপর থেকে প্রায় রাতেই ৩২ নম্বরে থাকতেন ওয়াজেদ মিয়া। 

সুধা মিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন,  ক্ষমতা কেন্দ্রের পাশে থেকেও তিনি ছিলেন নির্মোহ

তিনি শুধু একজন মেধাবী ছাত্র বা পরমাণু বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন নির্লোভ, নিভৃতচারী, নীতিবান, নিরহংকার, নির্ভীক, স্পষ্টবাদী, দৃঢ়চেতা, দেশপ্রেমিক, আদর্শবান, সত্, সহজ-সরল, বিনয়ী, চরিত্রবান, যুক্তিবাদী, অজাতশত্রু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন আদর্শ মানুষ। তার প্রতিভার অনেক দিকই আমাদের অজানা। 

রাজনীতিক পরিবারের সদস্য হয়েও নিজেকে আলাদা করে, নিজের পরিচয়ে ভাস্বর হয়েছিলেন দেশের বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া। রাজনৈতিক বলয়ে থেকেও বিজ্ঞানী হিসাবে নিজের গবেষণা নিয়ে আলাদা জগৎ তৈরি করেছিলেন তিনি।  ১৯৪২ সালে ১৬ ফেব্রয়ারি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে জন্ম নেয়া ওয়াজেদ মিয়াকে প্রিয়জনরা ডাকতেন ‘সুধা মিয়া’ নামে। বাবা ছিলেন আব্দুল কাদের মিয়া, মা ময়জন্নেসা বিবি। 

রংপুরের পিছিয়ে পড়া এক গ্রামে জন্ম, সেখানেই বেড়ে ওঠা। তারপরেও কিন্তু নিভৃতচারী মেধাবী এ মানুষটি নিজেকে এগিয়ে নিয়েছেন শিক্ষার মাধ্যমে। মেধাবী হিসাবে ছোটবেলাতেই শিক্ষকদের দৃষ্টি কাড়েন তিনি। ১৯৫৬ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৮ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। সে বছরই ভর্তি হন ঢাকা বিশববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে। ছিলেন ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র। সে সময়ই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সংশিস্নষ্টতা; ফজলুল হক মুসলিম হলের ভিপিও নির্বাচিত হন তিনি ১৯৬১-৬২ শিক্ষা বছরে। তখনই বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসেন ওয়াজেদ মিয়া। ১৯৬১ সালে স্নাতক, ১৯৬২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৬৩ সালের ৯ এপ্রিল তিনি তৎকালীন পাকিস্থান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগ দেন। এরপর ’৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডারহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউক্লিয়ার এন্ড হাই এনার্জি পার্টিকেল ফিজিকস এ পিএইচডি করেন। সহজ, সরল, মেধাবী, সদা সত্যভাষী এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় অনন্য এই মানুষটিকে রংপুরের আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমানের প্রস্তাবে কন্যা শেখ হাসিনার স্বামী হিসাবে পছন্দ করেন বঙ্গবন্ধু। তাদের বিয়ে হয় ১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর। বঙ্গবন্ধু তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দী। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর পরিবারের হাল ধরেন তিনি। 

ইতালির ট্রিয়েসটের আন্তর্জাতিক পদার্থ বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রে একাধিকবার গবেষণা করেছেন ওয়াজেদ মিয়া। গবেষণা করেছেন ভারতের পরমাণু শক্তি কমিশনেও। তার গবেষণা ও জ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরুয়ে শহরের আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর গোটা পরিবারের হাল ধরেন ওয়াজেদ মিয়া। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রম্নয়ারি মাস পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তি কমিশনের দিল্লীস্থ ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ৮১ সাল পর্যন্ত নির্বাসিত জীবনে ভারতীয় পরমাণু শক্তি কমিশনের বৃত্তির টাকায় সংসার চালিয়েছেন তিনি। সর্বশেষ ২০০৬ ও ২০০৭ সালে স্ত্রী শেখ হাসিনা যখন সাব জেলে বন্দী তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে স্ত্রীর মুক্তির দাবিতে চিঠি লেখেন তিনি। 

১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে তিনি পরপর দুইবার বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৩, ১৯৮৪, ১৯৮৫ সালের জন্য তিনি পরপর তিনবার ওই বিজ্ঞানী সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ ও ১৯৮৮ পর্যন্ত ৪ বছর তিনি ‘বাংলাদেশ পদার্থ বিজ্ঞান সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৭ সালে দু’বছর মেয়াদের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। তাছাড়াও তিনি ওই বিজ্ঞান সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত পরপর দুইবছর মেয়াদকালের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান উন্নয়ন সমিতির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি পরপর দুইবছর মেয়াদকালের জন্য ওই বিজ্ঞান সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি ওই সমিতির একজন আজীবন সদস্য ছিলেন। ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ আণবিক শক্তি বিজ্ঞানী সংঘেরও সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দুই বছর মেয়াদকালের জন্য পরপর দুইবার বাংলাদেশ বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ওই সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন। তিনি ঢাকার রংপুর জেলা সমিতির আজীবন সদস্য এবং ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দুইবছর মেয়াদকালের জন্য ওই সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন।

তিনি বাংলাদেশ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা এবং ঢাকাস্থ বৃহত্তর রংপুর কল্যাণ সমিতি, উত্তরবঙ্গ জনকল্যাণ সমিতি, রাজশাহী বিভাগীয় উন্নয়ন ফোরাম, বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদ এবং রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার মির্জাপুর বছিরউদ্দিন মহাবিদ্যালয়ের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। কিডনী সমস্যা, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টসহ সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। সর্বশেষ সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল থেকে এনজিও প্লাস্ট করে দেশে ফিরে আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভর্তি করা হয় স্কয়ার হাসপাতালে। সেখানেই সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন ড. ওয়াজেদ মিয়া। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের ০৯ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামে তাঁর বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়। 

একজন নিরলস গবেষক 

১৯৬৯ সালে ইতালি ট্রিয়েস্টের আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র তাকে অ্যাসোসিয়েটশিপ প্রদান করে। এ সুবাদে তিনি ১৯৬৯, ১৯৭৩ ও ১৯৮৩ সালে ওই গবেষণা কেন্দ্রে প্রতিবার ছয় মাস করে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৯ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহরের ড্যারেসবেরি নিউক্লিয়ার ল্যাবরেটরিতে পোষ্ট ডক্টরাল গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ থেকে ২৪ আগষ্ট পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির কার্লসরবয়ে শহরের আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ভারতের আণবিক শক্তি দিল্লির ল্যাবরেটরিতে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি অনেক জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক সম্মেলনে যোগদান করেছেন। 

তার অনেক গবেষণামূলক ও বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকায় ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর প্রকাশিত চারটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে :
(1) Fundamentals of Thermodynamics,
(2) Fundamentals of Electromagnatics,
(৩) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ,
(৪) বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারী চালচিত্র।

তাঁর এসব গ্রন্থ নিজস্ব স্বকীয়তায় উজ্জ্বল।। তাঁর Fundamentals of Electromagnatics গ্রন্থটি ভারতে পাঠ্য বই হিসাবে ছিল এবং ইংল্যান্ডেও বহুল পঠিত একটি বই। 

মরহুম ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া দীর্ঘদিন যাবত দেশের আনবিক শক্তি বিষয়ক গবেষণায় অবদান রেখেছেন, বাংলাদেশ আনবিক শক্তি গবেষণা কেন্দ্রকে গড়ে তুলেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্তরের পদার্থবিজ্ঞান, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিভাগের ছাত্রদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। বাংলাদেশের আনবিক শক্তি বিজ্ঞান গবেষণায় তাঁকে একজন পথিকৃৎ বলা যায়। 

৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ও গনতান্ত্রিক আন্দোলনেও  ছিল তার গৌরবোজ্জ্বল অংশগ্রহন 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে পড়ার সময় সংশ্লিষ্ট হন ছাত্র রাজনীতির সাথে। তিনি ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্রলীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৬১-’৬২ শিক্ষা বছরের জন্য হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তারবরণ করেন। তখনই বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসেন ওয়াজেদ মিয়া।স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনের কারণে তিনি কিছুদিন কারাবরণও করেন।

এবং শেষে যা বলবো 

ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার ব্যক্তিগত নিষ্ঠা ও তত্পরতার জন্যই পরমাণু বিজ্ঞান চর্চায় বাংলাদেশ অনেকখানি অগ্রসর এবং পরমাণু শক্তির ব্যবহারে বিশ্বে সুনাম কুড়াতে পেরেছে। সে হিসেবে আমরা এই বিজ্ঞানীকে ততটা সম্মানিত করতে পারিনি, তিনি যতটা প্রাপ্য। ময়মনসিংহে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ক্যাম্পাসে একটি অডিটরিয়ামের নামকরণ হয়েছে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার নামে। এটুকুতেই কি আমাদের দায়-দায়িত্ব শেষ? আমাদের কি আর কিছুই করার নেই? যে দেশ, জাতি এবং সমাজ তার জ্ঞানীজনদের সম্মান করতে জানে না, সে দেশ, জাতি এবং সমাজে গুণীজনদের জন্ম হয় না। আমাদের কৃতী সন্তানদের সম্মানিত করতে না পারলে পিছিয়ে পড়বো আমরাই।

বাংলাদেশের প্রথম এবং বিশ্বের ২৯তম পারমাণবিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের ভিত্তি স্থাপনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পূরণ হবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। সফল হবে বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার আমরণ প্রচেষ্টা এবং সুফল ভোগ করবে সারা দেশের মানুষ।’

মৃত্যুর আগেও তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে কিভাবে, কোন দেশের সাথে পারমানবিক চুক্তি করলে দেশ লাভবান হবে তা নিয়ে কথা বলে গেছেন। যে মানুষটি তার মৃত্যুর সময়ও দেশের কল্যানে ভেবেছেন, যার সপ্নে ও গবেষনায় প্রাপ্ত ফলাফলে আজ বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে রুপপুর পারপমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি তার নামেই হোক এই কেন্দ্রের নাম। একজন নির্মোহ বিজ্ঞানী কে এই সামান্য স্বীকৃতি দিলে দেশের শিশুরা জানবে এক দেশপ্রেমী বিজ্ঞানীর কথা, তারাও স্বপ্ন দেখবে একজন বিজ্ঞানী হওয়ার।

Related Posts

Bad Culture

৫/১০ টাকা লাগবে না, রেখে দিন। এটি কি খুব ভালো সংস্কৃতি ?

কলকাতায় হাওড়া ব্রীজে উঠার ঠিক আগে ফুটপাতে এক ফল বিক্রেতা মহিলাকে দাম জিজ্ঞেস করলাম। উনিRead More

cruel and unusual punishment

শাস্তির নামে এই সমস্ত বর্বর ও অমানবিক প্রথা বন্ধ হোক পৃথিবী থেকে

সভ্য দেশগুলো যখন মৃত্যুদন্ড উঠিয়ে দিয়েছে/দিচ্ছে তখন পৃথিবীর কিছু কিছু দেশ এখনো এই সমস্ত বর্বরRead More

Keep away from Fraud Business !

সেদিনও লোভী শেয়ালগুলো বাঁশ খেয়েছে, এখনো খাচ্ছে, আগামীতেও খেতে থাকবে

আপনি ১০০ জনের কাছ থেকে কোন একটি পণ্যের জন্য ১,০০০ টাকা করে মোট ১,০০,০০০ টাকাRead More

Comments are Closed