
Islam’s Harsh Punishments vs. Crime Reality
ভয় দেখিয়ে কি অপরাধ কমে? ইসলামের নির্মম শাস্তি ও তার বিপরীতে বাস্তবতা কী বলে?
সম্প্রতি আফগানিস্তানে উৎসবের আমেজে একজনের প্রকাশ্যে শিরোচ্ছেদ করা হলো। ইরান, সৌদি আরব ও আফগানিস্তানে এই ঘটনা নতুন নয়। ইসলামি বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির কথা উঠলে প্রথমেই যা মাথায় আসে তা হলো হুদুদ – কোরআন ও হাদিসে নির্ধারিত নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি। এর মধ্যে রয়েছে চুরির জন্য হাত কাটা, ব্যভিচারের জন্য বেত্রাঘাত বা পাথর মেরে হত্যা, হত্যার জন্য কিসাস (প্রতিশোধমূলক মৃত্যুদণ্ড) এবং নবীর সমালোচনা ও ধর্মত্যাগের জন্য মৃত্যুদণ্ড। এছাড়াও ইসলামের অনেক নির্দেশনা মেনে না চলার জন্য কঠোর শাস্তি দেয়া হয়, শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্যও মৃত্যুদন্ড থেকে শুরু করে কঠোর শাস্তি দেয়ার নিদর্শন আছে। এই যে নবী, সৃষ্টিকর্তার সমালোচনা, প্রতিবাদ জানানো, সমাবেশ করা, নিজের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকারের চর্চা করা, বিবাহ বহির্ভূত শারিরীক সম্পর্ক স্থাপন, প্রেম করা – এসবের জন্য যে কঠোর ও নৃশংস শাস্তির বিধান ইসলামে আছে তা কিন্তু আধুনিক আইনে কোন অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না। ইসলাম সেগুলোকেও মারাত্মক অপরাধ হিসাবে দেখে যা সুষ্পষ্ট মানাবাধিকার লংঘন ও ইসলামের নামে মানবতা বিরোধী অপরাধ।
ইসলাম ভয় দেখিয়ে মানুষকে সোজা রাখতে চায় – কিন্তু এই পদ্ধতি কি আদৌ কাজ করে? হুজুর কী বললেন বা ইসলামিক মোটিভেটর কী বললেন সেটা ফালতু আলাপ। দেখতে হবে পরিসংখ্যান কী বলে, সামাজিক পরিবর্তন কী বলে!
সৌদি আরবঃ কঠোরতম শাস্তির দেশে অপরাধের বাস্তব চিত্র
মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বাড়ছে – কমছে না
অনেকের ধারণা সৌদি আরবের লোকজন কঠিনভাবে আইন মেনে চলে, সেখানে অপরাধের পরিমাণ খুব কম। কিন্তু বাস্তবতা হলো সৌদি আরব বাংলাদেশের চেয়েও বেশি অপরাধপ্রবণ দেশ। যদি কঠোর শাস্তিই অপরাধ দমনের নিশ্চিত পথ হতো, তাহলে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের সংখ্যা দিন দিন শূন্যের দিকে নামার কথা। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। মানবাধিকার সংস্থা ESOHR ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী:
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যাঃ ২০২০ সালে ২৭ জন, ২০২১ সালে ৬৭ জন, ২০২২ সালে ১৯৬ জন, ২০২৩ সালে ১৭২ জন, ২০২৪ সালে ৩৪৫ জন এবং ২০২৫ সালে রেকর্ড ৩৪৭ জন – যা সৌদি আরবের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
২০২৪ সালে বিশ্বে মোট মৃত্যুদণ্ডের ২৫ শতাংশই সৌদি আরবে কার্যকর হয়েছে। তার মানে কি পৃথিবীর ২৫ ভাগ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধী সৌদিতে বাস করে? সৌদির মতো করে দিনে একটা ফাঁসি দিলেই কি অপরাধ কমে যায়? ইতিহাস বলছে, না। এতো এতো প্রকাশ্য শিরোচ্ছেদের পরেও এই শাস্তির সংখ্যা দিন দিন এতো বাড়ছে কেন? ভয়ে তো শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা।
মৃত্যুদণ্ড প্রায়ই অ-সহিংস অপরাধের জন্য, বা যা আদতে কোন অপরাধই নয়
HRW (Human Rights Watch)-এর বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট মৃত্যুদণ্ডের ৪১ শতাংশ ছিল অ-সহিংস অপরাধের জন্য – বিক্ষোভে অংশ নেওয়া, সরকারবিরোধী কার্যকলাপ এবং মাদক সংক্রান্ত অপরাধ। মাদকের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড ২০২৩ সালে ছিল মাত্র ২ জনের, ২০২৪ সালে তা একলাফে ১২২ জনে পৌঁছেছে – ৬,০০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি। এর মানে মাদকের অপরাধ বাড়েনি; রাষ্ট্র নিজের সুবিধামতো মৃত্যুদণ্ডের সংজ্ঞা প্রসারিত করছে।
সৌদি আরবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান নেই। এবং কারাগারে বন্দির সংখ্যা ৬৮,০০০ – অর্থাৎ প্রতি ১ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১৮০ জন জেলে। ছোটখাটো অপরাধে তো আর জেল দেওয়া হয় না – তাহলে বোঝা যাচ্ছে গুরুতর অপরাধের হার কতটা বেশি।
নারীর বিরুদ্ধে অপরাধঃ লুকানো বাস্তবতা
সৌদি আরবে ধর্ষণের শিকার হলেও কেউ অভিযোগ জানায় না, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষিতাকেই উল্টো শাস্তি দেওয়া হয়। সেখানে প্রতি ৩ লক্ষ মানুষের মধ্যে মাত্র ১ জন ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেন। ২০১৯ সালে ধর্ষণের অভিযোগে মাত্র ৮ জনের শাস্তি হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৯ সালের শুধু আগস্ট মাসেই সৌদি আরব থেকে ১১১ জন বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মী ফিরে এসেছিলেন নির্যাতনের শিকার হয়ে, যাদের মধ্যে ৩৮ জন জানিয়েছিলেন তারা গৃহকর্তার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এখন ১২ মাসের হিসাব করুন। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ফিলিপাইন ও আফ্রিকার দেশ থেকে যাওয়া লক্ষাধিক কর্মী মিলিয়ে প্রকৃত চিত্র কতটা ভয়াবহ? ধর্ষণের শিকার হওয়া সবাই তো আর দেশে ফিরে যায় না বা মুখ খোলে না, অনেকে অভাবের কারণে ধর্ষণকেও মুখ বুঝে মেনে নেন।
যে সমাজে শাস্তির ভয়ে অপরাধ কমার কথা, সেখানে এই চিত্র কীভাবে সম্ভব?
বাংলাদেশঃ তুলনামূলক বাস্তবতা, সৌদির তুলনায় কি অপরাধ কম না বেশি?
বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি প্রচলিত, তবে জনসংখ্যার তুলনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার হার খুবই কম। দেশ স্বাধীনের পর এখন পর্যন্ত কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। এখানে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে শূন্য। বাংলাদেশে কারও ফাঁসি কার্যকর হলে দেশব্যাপী সবাই জেনে যায়, কারণ সেটা খুব বিরল। অনেকে হিসাব করেই বলে দিতে পারবেন জীবনে কয়টা ফাঁসি হতে দেখেছেন।
অনেকের মনে হতে পারে বাংলাদেশে প্রচুর নৃশংস অপরাধ হয় – কিন্তু জনসংখ্যার তুলনায় সেটা সৌদি আরবের চেয়ে কম, যদিও দুর্নীতি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। বাংলাদেশ ছোট্ট একটা দেশ, এখানে এত ঘনবসতি যে কেউ জোরে কাশি দিলেও ১০ জন জেনে যায়। সে তুলনায় সৌদি বিশাল দেশ, সেখানে শত শত অপরাধ লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়।
বাংলাদেশের কারাগারের বাস্তবতা
জুলাই ২০২৫-এর হিসাবে বাংলাদেশের কারাগারে মোট বন্দির সংখ্যা ৭৭,২৯১ জন – ১৮ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে প্রতি ১ লক্ষে মাত্র ৪৩ জন। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশই বিচারাধীন বন্দি এবং মাত্র প্রায় ১৫ হাজার শাস্তিপ্রাপ্ত আসামী। বাংলাদেশের কারাগারে অধিকাংশই বিচারাধীন, এবং তাদের বড় একটি অংশ রাজনৈতিক কারণে বন্দি।
সৌদি আরবে (প্রতি ১ লক্ষে ১৮০ জন) বনাম বাংলাদেশে (প্রতি ১ লক্ষে ৪৩ জন) – এই পার্থক্যই বলে দেয় কঠোর শাস্তি কতটা ‘কার্যকর’। সৌদিতে শত শত প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরেও সেখানে কারাবন্দির হার বাংলাদেশের চারগুণেরও বেশি।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা কী বলে?
ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের সিদ্ধান্ত
মার্কিন ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল ২০১২ সালে ৩ দশকেরও বেশি সময়ের গবেষণার পর্যালোচনা করে জানায় – মৃত্যুদণ্ড হত্যার হারকে প্রভাবিত করে কিনা তা প্রমাণ করার মতো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি। এর কারণ হিসেবে তিনটি মৌলিক ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছিল – অ-পুঁজিবাদী শাস্তির প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি; সম্ভাব্য খুনিরা কীভাবে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি উপলব্ধি করেন তা পরিমাপ করা হয়নি; এবং পরিসংখ্যানগত মডেলগুলো অবিশ্বাসযোগ্য।
কানাডা ও ইউরোপের বাস্তব উদাহরণ
কানাডায় ১৯৭৬ সালে মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হয়। বাতিলের আগে হত্যার হার ছিল প্রতি ১ লক্ষে প্রায় ৩ জন – মৃত্যুদণ্ড বাতিলের পরে তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০০৩ সালে ১.৮৫ জনে নেমে আসে। জাতিসংঘের এক গবেষণা সারাংশ বলছে – মৃত্যুদণ্ডের অস্তিত্ব ও কম অপরাধের হারের মধ্যে কোনো প্রমাণিত সম্পর্ক নেই।
অপরাধবিজ্ঞানীদের ঐকমত্য
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮৬.৫ শতাংশ অপরাধবিজ্ঞানী বিশ্বাস করেন মৃত্যুদণ্ড হত্যার হারে কোনো অর্থবহ প্রভাব ফেলে না। Carnegie Mellon-এর ড্যানিয়েল নাগিন বলেছেন – ‘সম্ভাব্য খুনিরা আসলে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি কীভাবে উপলব্ধি করেন, সে সম্পর্কে কিছুই জানা নেই।’
তুলনামূলক চিত্রঃ নেদারল্যান্ডস বনাম সৌদি আরব বনাম বাংলাদেশ
পার্থক্যটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় যখন একটি মানবিক বিচারব্যবস্থার দেশের সাথে শাস্তিকেন্দ্রিক ইসলামি রাষ্ট্রের তুলনা করা হয়ঃ
নেদারল্যান্ডস (মৃত্যুদণ্ড নেই, ১৯৮২ সালে বাতিল)
- জনসংখ্যা: ১ কোটি ৭৮ লক্ষ
- কারাগারে বন্দির হার: প্রতি ১ লক্ষে মাত্র ৫৪ জন (২০২১ সাল)
- হত্যার হার (২০২০): প্রতি ১ লক্ষে ০.৬১ জন – বিশ্বের সর্বনিম্নের মধ্যে
- ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনে আইনগত সুরক্ষা বলবৎ, রিপোর্টিং নিরুৎসাহিত নয়
- সংখ্যালঘু ও বিদেশিরাও বিচারিক সুরক্ষা পান
সৌদি আরব (শরিয়া ভিত্তিক কঠোর ও অমানবিক দণ্ডবিধি)
- জনসংখ্যা: ৩ কোটি ৮০ লক্ষ
- কারাগারে বন্দির হার: প্রতি ১ লক্ষে ১৮০ জন – নেদারল্যান্ডসের তিনগুণেরও বেশি
- প্রতি বছর মৃত্যুদণ্ড: ২০২৫ সালে রেকর্ড ৩৪৭ জন – বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ
- প্রকাশ্য শিরোচ্ছেদ, হাত কাটা, পাথর মারা এখনো প্রচলিত
- ধর্ষণের শিকার নারী নিজেই বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন; রিপোর্টিং অতি নিম্ন
বাংলাদেশ (মৃত্যুদণ্ড প্রচলিত, কার্যকর বিরল)
- জনসংখ্যা: ১৮ কোটি
- কারাগারে বন্দির হার: প্রতি ১ লক্ষে ৪৩ জন – সৌদি আরবের চার ভাগের এক ভাগেরও কম
- বন্দিদের ৭৫% বিচারাধীন; বড় অংশ রাজনৈতিক কারণে বন্দি
- ২০২৪ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর: শূন্য
তুলনাটা চিন্তার খোরাক দেয়। যেখানে মৃত্যুদণ্ড নেই বা বিরল সেখানে বন্দিত্বের হার কম, সমাজ নিরাপদ। যেখানে প্রকাশ্যে শিরোচ্ছেদ হয় সেখানে বন্দিত্বের হার অনেক বেশি এবং অপরাধ কমছে না।
কেন ভয় দিয়ে অপরাধ কমানো যায় না?
কারণ ১ঃ অধিকাংশ অপরাধ পরিকল্পিত নয়
অপরাধমনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, বেশিরভাগ সহিংস অপরাধ ঘটে আবেগের বশে, মুহূর্তের প্রভাবে — শাস্তির হিসাব করে নয়। হত্যাকারী বা ধর্ষণকারী অপরাধ করার মুহূর্তে মৃত্যুদণ্ডের পরিণতি ভাবে না। সুতরাং সর্বোচ্চ শাস্তির ভয় তাকে থামাতে পারে না।
কারণ ২ঃ শাস্তির নিশ্চয়তা, কঠোরতা নয়
ক্রিমিনোলজিস্টরা বলেন, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তি হওয়ার নিশ্চয়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে অপরাধ করলে ধরা পড়ার ও ন্যায্য বিচার হওয়ার নিশ্চয়তা আছে, সেখানে অপরাধ কম। সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড আছে, কিন্তু বিচারের স্বচ্ছতা নেই – ধনীরা ও ক্ষমতাবানরা রেহাই পায়, গরীব ও বিদেশিরা মৃত্যুদণ্ড পান।
কারণ ৩ঃ ভয়ের সংস্কৃতি অপরাধ আড়াল করে
সৌদি আরবে ধর্ষণের শিকার হলে অভিযোগ না দেওয়াটাই ‘স্বাভাবিক’ হয়ে পড়েছে, কারণ অভিযোগকারীই শাস্তির মুখে পড়তে পারেন। ফলে অপরাধ ‘কমেছে’ বলে মনে হলেও আসলে তা শুধু রিপোর্টিং থেকে হারিয়ে গেছে। ভয়ের সংস্কৃতি অপরাধ কমায় না – শুধু পরিসংখ্যান লুকায়।
কারণ ৪ঃ আইন রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে
২০২৪ সালে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের ১৩ শতাংশ ছিল ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর নামে – যার মধ্যে ছিল ২০১১-২০১৩ সালের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিয়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। হুদুদ আইন তখন আর শুধু ‘আল্লাহর নির্দেশ’ থাকে না, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
ধর্মের দাবি বনাম বাস্তবতা
ইসলামি সুবক্তারা প্রায়ই দাবি করেন, হুদুদ শাস্তির কারণে ইসলামি রাষ্ট্রগুলোতে অপরাধ কম। কিন্তু তথ্য বলে ভিন্ন কথা। ইরান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে – সমগ্র বিশ্বে যত মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তার প্রায় অর্ধেক শুধু ইরানে। সৌদি আরব দ্বিতীয়। এ দুটি দেশেই মাদক ব্যবসা, দুর্নীতি ও সহিংসতা মারাত্মক মাত্রায় বিদ্যমান।
আফগানিস্তানে তালেবান শাসনে প্রকাশ্য শিরোচ্ছেদ ও পাথর মারার ঘটনা ঘটে। তবুও সেখানে মাদক উৎপাদন, নারী নির্যাতন ও সহিংসতা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। শাস্তি মানুষের মানসিকতা বদলায় না।
বিপরীতে, নরওয়ে, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, জাপানের মতো দেশে মৃত্যুদণ্ড নেই বা দীর্ঘদিন থেকে কার্যকর নয়। এই দেশগুলোতে অপরাধের হার বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। তাদের কাছ থেকে শেখার আছে – কিন্তু সেটা হলো সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ন্যায়সঙ্গত বিচারব্যবস্থা।
পরিসংখ্যান নিষ্ঠুর – কিন্তু সৎ
সৌদি আরব প্রতি বছর রেকর্ড সংখ্যক মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে, অথচ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ কমছে না – বরং বাড়ছে। বাংলাদেশ মৃত্যুদণ্ড খুব কমই কার্যকর করে, অথচ জনসংখ্যার তুলনায় কারাবন্দির হার সৌদি আরবের চার ভাগের এক ভাগ। নেদারল্যান্ডস মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছে, অথচ সেখানে অপরাধের হার বিশ্বের সর্বনিম্নের মধ্যে। এই তিনটি উদাহরণ মিলিয়েই উত্তর স্পষ্ট।
বিশ্বের শীর্ষ অপরাধবিজ্ঞানীরা, জাতিসংঘের গবেষণা এবং দশকের পর দশকের পরিসংখ্যান একই সত্যে এসে মিলেছেঃ মৃত্যুদণ্ড বা শরিয়া-ভিত্তিক কঠোর শাস্তি ঘোরতর অপরাধের কার্যকর প্রতিরোধক নয়। ভয় মানুষকে ভালো মানুষ বানায় না – বানায় ভয়ার্ত। কিন্তু বিচারের মূল কনসেপ্ট হলো, অপরাধ কমানো, অপরাধীকে ভাল করা।
অপরাধ কমাতে হলে দরকার ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার প্রসার, আইনের সমান প্রয়োগ এবং মানুষের মর্যাদার স্বীকৃতি। তরবারির ছায়ায় নয়, মর্যাদার আলোয় মানুষ সত্যিকারের ভালো হয়।
________________________________________
তথ্যসূত্রঃ Amnesty International, Human Rights Watch, ESOHR, Death Penalty Information Center, National Research Council (USA) 2012, Harm Reduction International, UN Office on Drugs and Crime, World Prison Brief, Macrotrends, Bangladesh Prison Directorate।
Related Posts

From Somnath to Joypurhat – The Shadow of a Thousand‑Year‑Old Destruction Still Exists Today
The first blow On the Saurashtra coast of Gujarat, where the waves of the ArabianRead More

সোমনাথ থেকে জয়পুরহাট – এক সহস্রাব্দের পুরনো ধ্বংসের ছায়া আজও বিদ্যমান
প্রথম আঘাত গুজরাটের সৌরাষ্ট্র উপকূলে, যেখানে আরব সাগরের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে পাথুরে তটে, সেখানেRead More

For 125 years, the Islamic world has been spinning on the basis of a single false key!
Once I was listening to a sermon by Professor Mufti Kazi Ibrahim Huzur where heRead More

Comments are Closed