Qur’an
Is the Quran Universal?

Is the Qur’an Universal?

নবী মুহাম্মদ কি বৃষ্টির সময় কাপড় খুলে গায়ে পানি মাখতে বলেছেন? কুরআন-হাদিসের বিশ্বজনীনতার দাবি কি ভ্রান্ত?

সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে (হাদিস একাডেমীঃ ১৯৬৮) বর্ণিত আছে, আনাস (রাযিঃ) বলেছেন – এক বৃষ্টির সময় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর কাপড় সরিয়ে শরীরে বৃষ্টির পানি লাগালেন এবং বললেন, এই পানি আল্লাহর কাছ থেকে সদ্য আগত। এই ছোট্ট বর্ণনাটি নিছক একটি ঘটনা নয় – এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়ঃ ধর্মীয় গ্রন্থ (যেমনঃ কোরআন, হাদিস) যেসব অনুভূতি, প্রতীক ও অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে গড়ে ওঠে, সেগুলো কি সত্যিই সর্বকালের সর্বমানুষের জন্য প্রযোজ্য, নাকি একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ছাপ বহন করে?

আমি যেই শহরে ছিলাম সেখানে কনকনে শীতের দিনে বৃষ্টি হয়, সেই বৃষ্টিতে ভিজতে চাওয়া মানে জোর করে আপদ-বিপদ সঙ্গে নিয়ে আসা। আবার আমাদের এখানে যখন গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর, ঠিক তখন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে কনকনে শীত। ১৪০০ বছর আগের হেজাজের মানুষদের এই সমস্ত বৈপরিত্ত সম্পর্কে কোন ধারনা ছিল? অন্তত, কোরআন-হাদিস বলে ছিল না, কারন কোরআন-হাদিস তো তাদের লেখা বা তাদের কাজ-কর্মের ফিরিস্ত, তাই না?

বৃষ্টির উদাহরণঃ প্রেক্ষাপট-নির্ভরতার একটি সূচক

আরব উপদ্বীপের জলবায়ু ছিল প্রায় পুরোপুরি শুষ্ক মরুময়। সেখানে বৃষ্টি ছিল বিরল, মূল্যবান, এবং প্রায় ঐশ্বরিক করুণার প্রতীক। তাই বৃষ্টিতে ভেজা, বৃষ্টি প্রার্থনা করা (ইস্তিসকা), বা বৃষ্টিকে “আল্লাহর সাম্প্রতিক অনুগ্রহ” হিসেবে বর্ণনা করাটা সেই সমাজের বাস্তবতায় স্বাভাবিক ও গভীর অর্থবহ ছিল।

কিন্তু বাংলাদেশ, ভারতের পূর্বাঞ্চল বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলে বৃষ্টির অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে দীর্ঘ বর্ষাকাল, অতিবৃষ্টি, নদীভাঙন ও বন্যা মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়া, ফসলহানি, মানুষ-গবাদিপশুর মৃত্যু – এসব এখানকার বাস্তবতা। ফলে যে গ্রন্থ বা বাণী বৃষ্টিকে নিঃশর্ত আশীর্বাদ হিসেবে চিত্রিত করে, তা, বিশেষ করে অতিবৃষ্টি এই অঞ্চলের মানুষের প্রকৃত অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রায়ই সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। এটি প্রমাণ করে যে ধর্মগ্রন্থের রূপক ও উদাহরণগুলো “সর্বজনীন মানব অভিজ্ঞতা” থেকে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার জীবনবাস্তবতা থেকে উৎসারিত।

জান্নাতের বর্ণনাঃ আকাঙ্ক্ষার সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা

এই একই যুক্তি প্রসারিত করা যায় কুরআনে বর্ণিত জান্নাতের বিবরণের দিকেও। জান্নাতে ছায়াঘেরা বাগান, প্রবাহিত ঝর্ণা, ঠাণ্ডা পানীয়, তাজা ফলমূল (বিশেষত খেজুর ও আঙুর), এবং তাপ থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি বারবার এসেছে। এগুলো এমন একটি সমাজের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি, যারা প্রচণ্ড গরম, পানির অভাব, আর ধূসর মরুভূমিতে বসবাস করত।

কিন্তু যে সমাজ ইতিমধ্যেই সবুজ, জলাবহুল, এবং শীতল আবহাওয়ায় বাস করে – যেমন স্ক্যান্ডিনেভিয়া বা উত্তর ইউরোপের মানুষ – তাদের কাছে “চিরসবুজ বাগান ও শীতলতা”র প্রতিশ্রুতি ঠিক একই মাত্রার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে না, যতটা এটি সপ্তম শতাব্দীর হেজাজবাসীর কাছে করত। বরং তুষারাবৃত অঞ্চলের মানুষের কাছে হয়তো উষ্ণতা, রোদ বা আলোর প্রতিশ্রুতিই বেশি আকর্ষণীয় হতো। এখানে প্রশ্ন ওঠে – যদি জান্নাতের বর্ণনা সত্যিই সর্বকালের সর্বমানুষের সহজাত আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করত, তাহলে তা এত স্পষ্টভাবে একটি নির্দিষ্ট মরুভূমি-কেন্দ্রিক জীবনধারার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠত না।

বিশ্বজনীনতার দাবির যৌক্তিক কাঠামো

ইসলামের কেন্দ্রীয় দাবিগুলোর একটি হলো, কুরআন ও হাদিস কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা যুগের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য চিরন্তন পথনির্দেশ। এই দাবিকে যুক্তিসঙ্গতভাবে যাচাই করতে হলে দেখতে হবে, গ্রন্থের ভাষা, উপমা, আইনি বিধান এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট কতটা নির্দিষ্ট সংস্কৃতি-নিরপেক্ষ।

বাস্তবে দেখা যায়ঃ

১. প্রাকৃতিক উপমা ও রূপকঃ মরুভূমি-কেন্দ্রিক (মরুদ্যান, উট, খেজুরগাছ, বালুঝড়, তীব্র রোদ)।
২. সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোঃ সপ্তম শতাব্দীর আরব গোত্রীয় সমাজের উপযোগী (দাসপ্রথা, গনিমতের মাল বণ্টন, নির্দিষ্ট বিবাহ-তালাক রীতি, উত্তরাধিকার হিসাব)।
৩. আইনি শাস্তির বিধানঃ সেই সময়ের আরব বিচারব্যবস্থার আদলে গঠিত।
৪. পোশাক ও আচরণবিধিঃ মরু-জলবায়ু ও বেদুইন সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই বৈশিষ্ট্যগুলো এমন এক পাঠকের কাছে অস্বাভাবিক ঠেকতে বাধ্য, যে সাব-সাহারান আফ্রিকা, আর্কটিক অঞ্চল, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ বা পূর্ব এশিয়ার কোনো ভিন্ন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠেছে। যদি কোনো গ্রন্থ সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন হতো, তাহলে তার রূপক ভাষা ও সাংস্কৃতিক উদাহরণগুলো এতটা নির্দিষ্টভাবে একটি অঞ্চলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হতো না; বরং তা বিভিন্ন জলবায়ু, ভূগোল ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বমূলক উপমা ব্যবহার করত, অথবা এমন বিমূর্ত নীতিমালা উপস্থাপন করত যা যেকোনো সংস্কৃতিতে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

সম্ভাব্য প্রতিপক্ষীয় যুক্তি ও তার সীমাবদ্ধতা

ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যাকাররা এই সমালোচনার জবাবে সাধারণত তিনটি যুক্তি দেন।

প্রথমত, তাঁরা বলেন যে কুরআন-হাদিসের ভাষা ও উপমা প্রথম শ্রোতাদের বোঝার সুবিধার্থে ব্যবহৃত হয়েছে (যাকে ইসলামি পরিভাষায় বলা হয় “মুখাতাবাতুল কওম বিমা ইয়াফহামুন”) – অর্থাৎ বার্তার সারবস্তু চিরন্তন হলেও তার প্রকাশভঙ্গি প্রথম শ্রোতাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নির্বাচিত। এই যুক্তি অনুযায়ী, বৃষ্টি বা মরুদ্যানের রূপক নিছক যোগাযোগের মাধ্যম, বার্তার মূল বিষয় নয়।

দ্বিতীয়ত, অনেকে যুক্তি দেন যে জান্নাতের বর্ণনা প্রতীকী – মানুষের ভাষায় অবর্ণনীয় এক বাস্তবতাকে বোঝানোর জন্য উপমা ব্যবহৃত হয়েছে, আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা উচিত নয়।

তৃতীয়ত, কেউ কেউ মনে করেন, কেন্দ্রীয় নৈতিক শিক্ষা (ন্যায়বিচার, সততা, করুণা) সংস্কৃতি-নিরপেক্ষ, আর প্রাসঙ্গিক খুঁটিনাটি বিবরণ কেবল সেই শিক্ষার বাহন মাত্র।

তবে এই জবাবগুলো নিজেই একটি স্বীকারোক্তি বহন করে – যে গ্রন্থের প্রকাশভঙ্গি সংস্কৃতি-নির্দিষ্ট, তা মেনে নেওয়া মানেই এই দাবিতে ফাটল ধরানো যে গ্রন্থটি “সরাসরি” ও “আক্ষরিকভাবে” সকল যুগের সকল মানুষের জন্য অভিন্নভাবে প্রযোজ্য। যদি ব্যাখ্যা ও পুনর্পাঠের প্রয়োজন হয় প্রতিটি নতুন সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে খাপ খাওয়ানোর জন্য, তাহলে গ্রন্থটির “আক্ষরিক বিশ্বজনীনতা” নয়, বরং তার “ব্যাখ্যাযোগ্য অভিযোজনযোগ্যতা” নিয়েই আলোচনা করা সঙ্গত।

শেষের কথা

বৃষ্টির এই ছোট্ট হাদিসটি একটি বড় প্রশ্নের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়ঃ ধর্মগ্রন্থের ভাষা, রূপক ও প্রতিশ্রুতি কি সত্যিই সমগ্র মানবজাতির অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত, নাকি তা মূলত একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক গোষ্ঠীর জীবনবাস্তবতা থেকে গঠিত, যা পরবর্তীতে সর্বজনীন বলে দাবি করা হয়েছে? মরুভূমির মানুষের কাছে বৃষ্টি আশীর্বাদ, বাংলার কৃষকের কাছে তা কখনো কখনো সর্বনাশ। এই বৈপরীত্য দেখিয়ে দেয়, নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়া ধর্মীয় রূপক ও প্রতিশ্রুতি সহজাতভাবেই আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা বহন করে – এবং তাই “বিশ্বজনীনতা”র দাবিকে যুক্তির নিরিখে সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন, নিছক বিশ্বাসের ভিত্তিতে গ্রহণ না করে।

এই ধরনের সমালোচনামূলক পাঠ ধর্মবিরোধিতা নয় – বরং যেকোনো প্রাচীন গ্রন্থকে তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বোঝার এবং তার দাবিগুলো যুক্তির আলোকে যাচাই করার একটি স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া – যা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মীয় ইতিহাস চর্চায় সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়।

Related Posts

The nexus of corruption in Bangladesh

Government Employees’ Salaries Are Rising by 100% to 142%: Will Corruption Decrease? How Can the Inhumane Living Conditions of Private-Sector Workers End?

When I was at university, I dreamed of getting a job with a salary ofRead More

The nexus of corruption in Bangladesh

সরকারী কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে ১০০-১৪২% পর্যন্ত, দুর্নীতি কমবে? বেসরকারীদের মানবেতর জীবনযাপনের অবসান কীভাবে হবে?

আমি ইউনিভার্সিটিতে থাকতে স্বপ্ন দেখতাম পাশ দিয়ে ১০০০০ টাকা বেতনের জব নিবো। তখন সবার কাছেRead More

Rape in Islamic Countries

Why is the rate of rape low in Islamic Sharia‑ruled countries? Is it real?

Because of my writing and as an outspoken activist against sexual violence against women, IRead More

Comments are Closed